অনেক স্থাপনায় আবার গ্যাস ডিটেকশনও নেই। এমন পরিস্থিতিতে অটোগ্যাস খাতে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্টেশনে ঘটছে বড় দুর্ঘটনাও। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব স্টেশনের বৈধ কাগজপত্র এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে অনুমোদন, নীতিমালা ও বিধিমালা সংশোধন, হয়রানিমুক্ত ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন বলে এক গোলটেবিল আলোচনায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভবনে গতকাল এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এ গোলটেবিলের আয়োজন করে। ‘রাউন্ডটেবিল অন বাংলাদেশ এলপিজি সেক্টর ফেসিং গ্রোয়িং সেফটি অ্যান্ড রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান।
দেশে ১১শর মতো অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান তার প্রবন্ধে বলেন, ‘স্টেশনগুলোর ৯০ শতাংশেরই ব্যবসা করার মতো বৈধ কাগজপত্র নেই। যত্রতত্রভাবে প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে এগুলো স্থাপন করা হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনায় মানা হচ্ছে না পরিপূর্ণ কমপ্লায়েন্স। ফলে স্টেশনগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ছে। স্টেশনের লাইসেন্সের বিষয়ে রেগুলেটরি অথরিটিকে পরিপূর্ণ একটা স্টাডি করে দ্রুত সমাধান করা দরকার। সারা দেশের অটোগ্যাস স্টেশনগুলোকে একটি সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসতে প্রয়োজনে রেগুলেটরি বডিতে (বিইআরসি) আরো লোকবল নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। শুধু রেগুলেটরি বডি এককভাবে কাজটি না করে সহায়ক প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিষয়গুলো নজরদারিতে আনতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।’
এলপিজি খাতের সেফটি ও সিকিউরিটি নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা চলছে জানিয়ে লোয়াব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘এটাকে অস্বীকার কিংবা দায় না নেয়ার কোনো কারণ নেই। বিস্ফোরক পরিদপ্তর, বিইআরসি ও লোয়াব মিলিয়ে আমাদের এমন একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে, যাতে সামনের দিনে এটাকে এগিয়ে নেয়া যায়। স্টেকহোল্ডারদের এ নিয়ে কাজ করতে হবে। রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস, নীতিমালাসংক্রান্ত জটিলতা আছে, কমপ্লায়েন্সগত ইস্যু রয়েছে। তবে কমপ্লায়েন্স বিষয়টি আমাদের মানতে হবে। তাহলে আমরা সমন্বিতভাবে একটা কাঠামোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’
আলোচনায় বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সিরাজুল মাওলা বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৭০০ অটোগ্যাস স্টেশন বিস্ফোরক এবং বিইআরসির লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় আছে। এগুলোর লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত সমাধানে আসা প্রয়োজন।’
বর্তমান নীতিমালা ও বিধিমালার শর্তাবলি মেনে স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব বলেও জানান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সিরাজুল মাওলা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্ত করলে দেখা যাবে, অতীতের কোনো এলপিজি, সিএনজি এমনকি পেট্রল পাম্প নীতিমালার আলোকে স্থাপিত হয়নি। সবাই কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে করেছে। বর্তমানে প্রাথমিক নকশা অনুমোদন পেতেই বছরের পর বছর বিস্ফোরক পরিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ, ডিসি অফিস, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়। এতে সময় নষ্ট এবং বিনিয়োগের বড় অংশই বিবিধ খরচ হিসেবে ব্যয় হয়ে যায়। এটা খুবই দুঃখজনক।’
এলপিজি স্টেশনের মালপত্র আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সিএনজির মতো এলপিজি স্টেশন ও কনভার্সনের জন্য আমদানীকৃত মালপত্রে শুল্কছাড়ের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র জটিলতার কারণে সুবিধা নেয়া যায় না। এসব ব্যাপারে বিভিন্ন দপ্তরে মিটিং করেও কোনো লাভ হয়নি। বর্তমানে প্রায় এক হাজার স্টেশন স্থাপনে এ সেক্টরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। এখানে প্রায় সবাই এসএমই উদ্যোক্তা এবং অধিকাংশ বিনিয়োগ ব্যাংক লোনের মাধ্যমেই করা। প্রায় দুই লাখ যানবাহন আছে, যেগুলো এলপিজিতে কনভার্ট হয়েছে। কিন্তু এ খাতের নানাবিধ সমস্যার কারণে উদ্যোক্তা ও গ্রাহক সবাই বিনিয়োগ ঝুঁকি ও নানা গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা যতটা না নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার চেয়ে বেশি মনোযোগী মুনাফায়। এলপিজি খাতটি আমাদের দেশে ইদানীং বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ জ্বালানি সংকট রয়েছে। তবে এটার নিরাপত্তা ইস্যুটা নিয়ে আমাদের বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। এটাকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
আলোচনায় আরো অংশ নেন বিইআরসির সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সাঈদা সুলতানা রাজিয়া, সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলি আফজাল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল বাহার বুলবুল, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান প্রমুখ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন।
জানতে চাইলে ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি খাতের প্রসারে আরেকটি সম্ভাবনাময় দিক হলো অটোগ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি। তবে এখানে বড় ঝুঁকি হলো ৯০ শতাংশ অটোগ্যাস স্টেশনের চূড়ান্ত পর্যায়ের অনুমোদন নেই। প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স না মেনে ব্যবসা করছে। এতে নানা ধরনের ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন অটোগ্যাস স্টেশনে ক্রস ফিলিং হচ্ছে, যেখানে-সেখানে অটোগ্যাস বসিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। রেগুলেটরি ও মন্ত্রণালয়কে কমপ্লায়েন্স বিষয়টি জোর দিয়ে দেখতে হবে। কারণ এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।’










