ঘুম ভাঙার কারণ পানির অপেক্ষা। ট্যাংকে পানি উঠবে কিনা সে অনিশ্চয়তায় প্রতিদিনের শুরু। কখনো আসে, কখনো আসে না। এলেও বেশি সময় থাকে না, তাও দুর্গন্ধযুক্ত।

গৃহবধূ শিউলির গল্পটি ব্যতিক্রম নয়; বরং রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া, মণিপুর, শেওড়াপাড়া ও আশপাশ এলাকায় বসবাসরত হাজারো মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তীব্র পানি সংকটে এখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রান্না, গোসল, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজগুলোও এখন হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জিং। শিউলি আক্তারের চোখে-মুখে ক্লান্তি আর ক্ষোভের ছাপ। গতকাল কথা হলে তিনি বলেন, ‘এক বালতি পানি জোগাড় করতে এখন যুদ্ধ করতে হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে পানির সমস্যা। ঠিকমতো সরবরাহ নেই। অনেক এলাকায় দিনে মাত্র একবার পানি আসে, তাও খুব কম সময়ের জন্য। কোথাও আবার দুই-তিনদিনেও দেখা মেলে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাসিন্দারা গভীর রাতে জেগে থাকে শুধু পানির অপেক্ষায়। অনেকে আবার ওয়াসার গাড়িতে করে পানি কিনে এনে জরুরি প্রয়োজন মেটায়।

মণিপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘রাতে ২টার দিকে কখনো পানি আসে। তখন সবাই উঠে যায়। বালতি, ড্রাম নিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। এভাবে আর কতদিন চলবে?’

যেসব এলাকায় পানি আসছে, সেখানেও নতুন সমস্যা—পানির মান। অনেকেই অভিযোগ করছেন, সরবরাহকৃত পানিতে রয়েছে ময়লা, দুর্গন্ধ, এমনকি কখনো কখনো কালচে রঙও দেখা যায়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা নুসরাত জাহান বলেন, ‘এ পানি দিয়ে রান্না করতে ভয় লাগে। বাচ্চাদের খাওয়ানোর আগে কয়েকবার ফুটিয়ে নিতে হয়। তার পরও নিশ্চিন্ত হতে পারি না।’

হাতে পাঁচ লিটারের দুটি প্লাস্টিকের বোতল। বয়স মাত্র ছয় কিংবা সাত। স্কুল থেকে ফিরে খেলাধুলা নয়, রাজধানীর পশ্চিম কাজীপাড়ার প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোহাম্মদকে ছুটতে হয় পানির খোঁজে। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি—যদি মেলে এক বোতল পানি। শিশু মোহাম্মদের সঙ্গে গতকাল বিকালে কথা হলে সে বলে, ‘প্রতিদিন এভাবে পরের বাসা থেকে পানি আনতে ভালো লাগে না। অনেক কষ্ট হয়। কথাও শোনায় অনেকে। কিন্তু পানি না থাকলে তো আম্মু রান্না করতে পারে না, আরো অনেক কাজের জন্যও পানি লাগে।’

সঙ্গেই ছিলেন শিশুটির মা। তিনি বলেন, ‘এক ফোঁটা পানি ছিল না ঘরে। সকালের নাশতা কিনে এনেছি হোটেল থেকে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল, এখনো চুলা জ্বালাতে পারিনি পানির অভাবে। ছেলেটা স্কুল থেকে এসে খাবার চাইছে, কিন্তু দেব কোত্থেকে? তাই বাধ্য হয়ে ছেলের সঙ্গে পানির খোঁজে বের হয়েছি। যদি কেউ একটু পানি দেয়।’

পশ্চিম কাজীপাড়ার ৬০৭, ৬০৮ ও ৬০৯/২—এসব হোল্ডিং নম্বরের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের এলাকার বেশকিছু ভবনে তিন মাস ধরে পানি সংকট। তারা দিনে একবার মাত্র পানি পাচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়িওয়ালার উদাসীনতার কথাও জানান।

মিরপুর শেওড়াপাড়ার একটি বাসার ভাড়াটিয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পানির বিল এবং কারেন্ট বিল পরিশোধ করি। অথচ এক মাসের মধ্যে মাত্র ১০-১২ দিন পানি পাইছি। বাড়িওয়ালা অন্যত্র বাসা নিয়ে থাকেন। তাই তিনি এ বাসার কোনো খোঁজখবরও রাখেন না। পানির জন্য আমাদের সারা রাত জেগে বসে থাকতে হয়, কিন্তু লাইনে একটুও পানি আসে না। অনেক সময় আশপাশের বা অন্য এলাকায় গিয়ে গোসল করে আসতে হচ্ছে।’

তবে বাড়িওয়ালারা বলছেন, ওয়াসার লাইনেই যদি পানি না থাকে, তবে তারা কোত্থেকে দেবেন। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকও পানি দিচ্ছে না ওয়াসা। তাই সবাইকে একবেলা করে দিতে হচ্ছে। ওয়াসার কাছে অভিযোগ দিলে তারা বলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার এসে নানা অজুহাত দেন, শুষ্ক মৌসুমে নাকি স্তর নিচে নামা স্বাভাবিক।

রাজধানীর ৬০ ফিটের দক্ষিণ পীরেরবাগ এলাকায়ও দেখা গেছে তীব্র পানি সংকট। সেখানকার বাসিন্দা কোহিনুর বেগম। হাতে পাঁচ লিটারের দুটি বোতল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একটি বিল্ডিংয়ের বেজমেন্টে। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি যে বাসায় ভাড়া থাকেন সেখানে তীব্র পানি সংকট। তাই পাশের বিল্ডিংয়ে এসেছেন পানি সংগ্রহ করতে। এক মাস ধরেই চলছে এ যুদ্ধ। দিনে মাত্র একবার পানি ছাড়া হয়। কোনো কোনো দিন দুবার। পানি যতটুকু জমিয়ে রাখা হয়, তা দিয়েই দৈনন্দিন সব কাজ করা হয়। অনেক সময় পানি শেষ হয়ে গেলে আশপাশের বিল্ডিংগুলোর দ্বারস্থ হন, যেগুলোয় মূলত গভীর নলকূপ রয়েছে।

লাইনে সংকটের কারণে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কিনে পানি ব্যবহার করছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত মোটর বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। এতে একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। কাজীপাড়ার একজন দোকানদার জানান, আগে মাসে পানির জন্য আলাদা খরচ ছিল না। এখন দেড়-দুই হাজার টাকা শুধু পানি কিনতেই চলে যাচ্ছে।

পশ্চিম কাজীপাড়ার বসুন্ধরা গলি, মধ্য মণিপুর, পূর্ব মণিপুর, পূর্ব কাজীপাড়ার ৫ ও ৬ নম্বর গলি, মিরপুর ৬, সেনপাড়া পর্বতা, শেওড়াপাড়া, পশ্চিম আগারগাঁওসহ আশপাশের বেশকিছু এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হলে পানি নিয়ে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। পানি সংকট শুধু মিরপুরেই নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মহাখালী, নাখালপাড়া, কুড়িল, নদ্দা, শাহজাদপুর, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের প্রাত্যহিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা।

দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকট থাকলেও এ ব্যাপারে ওয়াসা অনেকটাই নির্বিকার বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বণিক বার্তার কাছে দাবি করেন, ‘পানি সংকটের যে অভিযোগ দিচ্ছেন তা একেবারেই সত্য নয়। কারণ এসব এলাকায় নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে ওয়াসার কয়েকটি নলকূপ ঝড়ের কবলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে মিরপুরের কিছু এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা সংকটে পড়ে। সে সময় ওয়াসার গাড়ি দিয়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন নলকূপগুলো ঠিক আছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও একদম স্বাভাবিক। কোনো কোনো ভবনের পানির লাইনে বা কারিগরি ত্রুটি থাকলে সেটা অন্য সমস্যা।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ দিলে প্রযুক্তির মাধ্যমে পানির সমস্যা আছে কিনা তা দেখতে পাচ্ছি। যদি কোনো সমস্যা থাকে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করছি। এছাড়া কেউ পানির জন্য রিকুইজিশন দিলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহের চেষ্টা করছি।’