জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দূষণকারী শিল্পে বিনিয়োগ করে মুনাফা করছেন বিশ্বের অতিধনীরা। একই সঙ্গে জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলা, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের ব্যবসা থেকেও আয় করছেন তারা। ফলে জলবায়ু সংকট এসব ধনীর জন্য মুনাফার দুটি পথ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দশমিক ১ শতাংশ মানুষের বড় বিনিয়োগ রয়েছে দুর্যোগ মোকাবেলা, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা ও পুনর্গঠনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়। এ খাতের বৈশ্বিক বাজার ২০২৯ সালের মধ্যে ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, বন্যা প্রতিরোধক, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পরিবহন, খাদ্য, বীমা ও ঋণসেবার মতো পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এসব ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভবান হচ্ছেন ধনীরা।
অক্সফামের মতে, জলবায়ু সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষ ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো। কিন্তু সংকটের জন্য তাদের দায় তুলনামূলকভাবে কম। চরম আবহাওয়ায় ফসল নষ্ট হলে খাদ্যের দাম বাড়ে। ঝড়, বন্যা বা দাবানলে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো মেরামত করতে হয়। অনেককে আবার অন্যত্র চলে যেতে হয়। এসব ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে সংকটের জন্য বেশি দায়ী ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব দুর্যোগ মোকাবেলার ব্যবসা থেকেও আয় করে।
অক্সফামের প্রধান প্রভাব বিস্তারবিষয়ক কর্মকর্তা জ্যঁ ম্যাকলিন বলেন, ‘জলবায়ু সংকটে দুদিক থেকেই লাভবান হন অতিধনীরা। প্রথমত, তারা দূষণকারী শিল্পে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া এবং দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। ফলে সংকটের কারণে যাদের ক্ষতি হচ্ছে তাদের কাছেই বিক্রি হচ্ছে সুরক্ষা ও পুনর্গঠনের সেবা।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দশমিক ১ শতাংশ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। তাদের কারণে সম্মিলিত কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ৩৫০ কোটি মানুষের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি। চরম তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রেও এসব ধনীদের ভূমিকা গড় মানুষের তুলনায় ১২৫ গুণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও ধনীদের কার্বন নিঃসরণ বেশি। অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজগুলো ২ সেকেন্ডে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে, তা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের পুরো এক বছরের নিঃসরণের সমান বা বেশি। তবে জলবায়ুতে ধনীদের সবচেয়ে বড় প্রভাব আসে তাদের বিনিয়োগ থেকে।
অক্সফাম এ বিষয়ে ২১৭টি কোম্পানিকে নিয়ে একটি সূচক তৈরি করেছে। এসব কোম্পানির কোনোটি জলবায়ু সংকট বাড়ায়, আবার কোনোটি সংকট মোকাবেলা ও এর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়ার ব্যবসা পরিচালনা করে।
প্রতিবেদন বলছে, গত বছর এসব কোম্পানি গড়ে ১৮০ কোটি ডলার আয় করেছে ও শেয়ারহোল্ডারদের ১০০ কোটি ডলার লভ্যাংশ দিয়েছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও জলবায়ু সংকটের প্রভাব থেকে লাভবান হচ্ছে বড় কোম্পানিগুলো। খরা, বন্যা ও ঝড়ে ফসলের ক্ষতি হলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে বড় খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী ও এদের বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও ক্ষুদ্র উৎপাদক ও সাধারণ ক্রেতারা বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েন। অক্সফাম বলছে, ২০২০ সালের পর থেকে ধনকুবেরদের নিয়ন্ত্রণাধীন বড় খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের সম্পদ ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার বেড়েছে।
এর উদাহরণ হিসেবে পশ্চিম আফ্রিকার কোকো উৎপাদনের কথা তুলে ধরেছে সংস্থাটি। ২০২৪ সালে চরম আবহাওয়ার কারণে কোকোর দাম ২৩১ শতাংশ বেড়েছিল। তবে স্থানীয় কৃষকরা এ মূল্যবৃদ্ধির সুফল পাননি বলে জানায় অক্সফাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু সংকটের স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও বণ্টিত হচ্ছে অসমভাবে। অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের বার্ষিক নিঃসরণের কারণে মৃত্যু হতে পারে অতিরিক্ত ১৯ লাখ মানুষের। এ হিসাব করা হয়েছে মানব স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদনশীলতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে। এসব মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘটতে পারে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়। কিন্তু বিশ্বে এসব দেশের সম্মিলিত নিঃসরণ কেবল ৮ শতাংশ।
সংস্থাটির মতে, ধনী ব্যক্তি ও দেশগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো বাড়িঘর, জরুরি স্থানান্তরের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়া খাদ্যের দাম বাড়লেও তা বহন করার সামর্থ্য থাকে। ফলে জলবায়ু সংকটের ক্ষতি থেকে তারা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকেন।
প্রতিবেদনের লেখক অ্যালেক্স মেইটল্যান্ড বলেন, অতিধনীরা জলবায়ু সংকটের কেবল নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী নন। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিলে সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় ধনী ব্যক্তি, ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ, তেল-গ্যাস কোম্পানি ও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি কর আরোপের দাবি জানিয়েছে অক্সফাম। পাশাপাশি দরিদ্র দেশগুলোর জলবায়ু খাতের অর্থায়নে ঋণের বদলে অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় ধনীদের সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং তাদের নিঃসরণ কমানো জরুরি বলে মনে করছে অক্সফাম।










