বাংলাদেশে প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু ৫৭৫। ২০২৫ সালে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ জন এবং মারা গেছে ৩৪৮ জন। অর্থাৎ ১৮ অক্টোবরের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা আগের দুই বছরের নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। চিন্তার বিষয় হলো, এ বছর সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন, মারা গেছে ১৪৮ জন। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে আরো ৩২ হাজার ৭৮০ জন, মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের। এ সময়ে সম্মিলিত মৃত্যু বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭২ শতাংশ।

ডেঙ্গুর বিস্তার ও চিকিৎসার চাহিদা বুঝতে হলে শুধু জাতীয় পর্যায়ের মোট সংখ্যা দেখলে চলবে না, কোন এলাকায় কত রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কোথায় মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত রোগীর চাপের দিক থেকে ঢাকা বিভাগে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় যথাক্রমে ১১ হাজার ৭৬৪, ১৩ হাজার ৩০ ও ২০ হাজার ৭১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৪৫ হাজার ৫১২। মৃত্যুর হিসাবে এ তিন এলাকায় ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে খুলনা বিভাগে ১৭ হাজার ৫১৫ জন ভর্তি ও ৬৫ জনের মৃত্যু, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ হাজার ৭৭৭ জন ভর্তি ও ৩২ জনের মৃত্যু এবং বরিশাল বিভাগে ১৪ হাজার ১৪২ জন ভর্তি ও ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যানের একটি বাস্তব তাৎপর্য রয়েছে। ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া গেলে অনেক রোগীকে দূরের হাসপাতালে যেতে হবে না। আর গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে যথাযথ রেফারেল ব্যবস্থা না থাকলে চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই কতজন আক্রান্ত হলেন, শুধু তার হিসাব করলেই চলবে না, বরং রোগী কোথায় চিকিৎসা পেলেন এবং চিকিৎসা পেতে কী ধরনের বাধার মুখে পড়লেন সেটিও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ২১-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে। এ বয়সসীমার ১৬ হাজার ১১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরপর রয়েছে ২৬-৩০ বছর বয়সীরা, যাদের সংখ্যা ১৫ হাজার ৯২৯। ১৬-২০ বছর বয়সীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ২১৭ জন। অন্যদিকে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ২৬-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে; এ বয়সসীমায় মারা গেছে ৪৪ জন। শিশু-কিশোররাও রেহাই পায়নি—১৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। এসব পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয়, ডেঙ্গু কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের জন্য নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি শিশুদের জ্বরকে অবহেলা না করা এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি।

আরেকটি বিষয় বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। চলতি বছরের পরিসংখ্যানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের অংশ বেশি হলেও ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। একই প্রবণতা দেখা গেছে ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও। কিন্তু কেন নারীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত গবেষণার বিশ্লেষণে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া, পরিবারের পরিচর্যার দায়িত্ব এবং চিকিৎসাসেবা পেতে সামাজিক ও আর্থিক বাধার মতো বিষয়গুলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এসব কারণই নারীদের বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী, এমন প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগের অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর চিকিৎসা নেয়া হয়েছে এবং একাধিক হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়েছে। তবে এসব পর্যবেক্ষণ থেকে নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন লিঙ্গভিত্তিক তথ্যের নিয়মিত বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনার নিবিড় পর্যালোচনা।

কভিড-১৯ মহামারীর সময় আমরা দেখেছি, একটি সংক্রামক রোগ কত দ্রুত মানুষের জীবন, হাসপাতালের সক্ষমতা এবং পুরো দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বদলে দিতে পারে। সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার নানা বিধিনিষেধ, স্বাস্থ্যবিধি, পরীক্ষা, আইসোলেশন, হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়েছিল। তখন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও রোগটির ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার একটি দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল। ডেঙ্গু ও কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আলাদা হলেও কভিডের অভিজ্ঞতা আমাদের আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব শিখিয়েছে। ডেঙ্গু প্রতি বছর ফিরে আসে বলেই এর বিরুদ্ধে প্রস্তুতিকে নিয়মিত ও পরিকল্পিত করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার ও আমাদের করণীয় কী? সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের দিক থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে প্রথমেই নিয়মিত জরিপের ভিত্তিতে কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল বেশি, তা চিহ্নিত করতে হবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে জমে থাকা পানি অপসারণ ও লার্ভা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কাজের সময়সীমা ও অগ্রগতি অনলাইনে প্রকাশ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, পরীক্ষার সুযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি নিয়মিত যাচাই করে রোগীর চাপ বাড়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা থেকে জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত রেফারেল সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে গুরুতর রোগীকে চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে না হয়। যেসব হাসপাতালে বেশি মৃত্যু ঘটছে, সেখানে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব ও সেবার ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি রোগীর বাসস্থান, হাসপাতালে ভর্তির স্থান, বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে প্রকাশ করতে হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী জনবল ও চিকিৎসা সম্পদ বরাদ্দ করা যায়।

সরকারের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও বেশকিছু করণীয় রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, বাথরুম ও আশপাশে পানি জমে আছে কিনা তা পরীক্ষা করা যেতে পারে, এতে করে মশার প্রজননস্থল কমানো সম্ভব। বাড়ির বাইরের নালা বা পরিত্যক্ত জায়গায় পানি জমে থাকলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। পাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম গড়ে তোলা এবং কোথাও মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং জ্বর কমে গেলেও রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

মনে রাখা উচিত, ডেঙ্গু আমাদের কাছে নতুন কোনো সংকট নয়। তাই প্রতি বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলে শুধু মৌসুমি প্রকোপকে দায়ী করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন প্রয়োজন সারা বছরের প্রস্তুতি, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাজের দৃশ্যমান ফল। কারণ রোগের প্রকোপ বাড়ার পর তৎপর হওয়ার চেয়ে প্রকোপ বাড়তে না দেয়ার প্রস্তুতিই জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশি কার্যকর।

মো. মাহির ফয়সাল: সহকারী অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়