কোনো শহরকে বসবাসের উপযোগী, নাগরিকবান্ধব করার অন্যতম উপায় হলো পরিবেশ সংরক্ষণ করা। এজন্য উন্মুক্ত স্থান যেমন মাঠ-পার্ক, সবুজ পরিসর, জলাধার সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হয়। ঢাকার মতো জনবহুল একটি শহরের পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থা বহু উদ্যোগ নিয়েছে, বড় প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বেশির ভাগ উদ্যোগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এর মূলে রয়েছে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক মনোযোগের অভাব। হাতিরঝিল নিয়ে করা বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিষয়টি আরো বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, ২ হাজার কোটি টাকার হাতিরঝিল বর্তমানে রাজধানীর দুর্গন্ধময় জলাধারে পরিণত হয়েছে, বাতাসে ছড়াচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস। লেকে পয়োবর্জ্য ফেলার কারণে প্রধানত এমনটি ঘটছে। আর গন্ধ এখন লেকের সীমানা ছাড়িয়ে আবাসিক এলাকার ঘরে ঢুকছে। ফলে অনেক ভাড়াটে বাসাই ছেড়ে দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে হাতিরঝিলের বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে; লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের দেয়া সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আবার রাজউক দুষছে ঢাকা ওয়াসাকে। যদিও কোনো কর্তৃপক্ষই এর দায় নিতে রাজি নয়।

তবে হাতিরঝিল কোনো একক উদাহরণ নয়। ঢাকার অন্য জলাধারগুলোর অবস্থাও একই। সম্প্রতি গুলশান লেকে পয়োবর্জ্য প্রবেশের ১২টি পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি লেকের দূষণ রোধে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে পয়োবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ ও এসটিপি স্থাপনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। নির্দেশটি ইতিবাচক। তবে সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই পাঁচ লেকের তালিকায় হাতিরঝিলের নাম নেই, অথচ দূষণের তীব্রতায় এটিই এখন সবচেয়ে আলোচিত। তাছাড়া এ ধরনের নির্দেশ আগেও এসেছে। তাই প্রশ্ন রয়ে গেছে বাস্তবায়ন ঘিরে।

অব্যবস্থাপনা কেবল জলাধার ঘিরে নয়। ঢাকার পরিবেশগত উন্নয়নে যত মাঠ-পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলোও শেষ পর্যন্ত দখল-দূষণমুক্ত রাখা যায়নি। ধূপখোলা মাঠ, বাহাদুর শাহ পার্ক ও গুলশান সাহাবুদ্দীন পার্কসহ বিভিন্ন পার্ক ও মাঠে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ বা নির্মাণাধীন থাকার অভিযোগ উঠেছে এবং এতে খোদ সিটি করপোরেশনসহ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, পার্কের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে আচ্ছাদিত রাখার সীমা থাকলেও অনেক পার্কে ২০-৪০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয়েছে। আবার উন্মুক্ত স্থানেরও অভাব রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের জন্য অন্তত নয় বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন, যেখানে উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ছয় বর্গমিটার।

আবার কয়েক মাস আগে বণিক বার্তায় আরেকটি প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে মন্ত্রী-বিচারপতি-সচিবদের হাঁটার পার্ক রমনায় বাড়তি যত্নে থাকে, আর অবহেলায় ধুঁকছে বাকিগুলো। অবহেলার চিত্রটি কেবল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে তাকালেও উপলব্ধি করা যায়। এর একেক দিকে একেক স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে বা নির্মাণকাজ চলছে। উদ্যানটিতে গেলে পরিচ্ছন্নতার অভাব স্পষ্ট চোখে পড়ে।

এগুলো একটি বিষয়কেই সামনে আনে যে ঢাকার পরিবেশ রক্ষার কোনো নির্দেশ, উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়নি। তাই কেবল হাতিরঝিলের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করলেই সেটি বিশেষ কোনো ফল বয়ে আনবে না। প্রয়োজন সামগ্রিক উদ্যোগ।

হাতিরঝিলের ক্ষেত্রে প্রথমেই পয়োবর্জ্য প্রবেশের সব পথ বন্ধ করতে হবে। রাজউক ও ঢাকা ওয়াসাকে দায় চাপানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোথায় অবকাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে, কোন সংস্থার কী দায়িত্ব এবং কীভাবে বর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছবে—তা স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে লেকের পানি ও বাস্তুতন্ত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ পরিকল্পনা নিতে হবে। তবে এ উদ্যোগ শুধু হাতিরঝিলে সীমাবদ্ধ না রেখে ঢাকার সব জলাধারের জন্যই নিতে হবে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি লেকের দূষণ রোধে দেয়া নির্দেশনাগুলোরও দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

মাঠ-পার্কের ক্ষেত্রেও একইভাবে দখল, অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করে বিদ্যমান উন্মুক্ত পরিসর ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এসব জায়গাকে কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প হিসেবে না দেখে নগরবাসীর পরিবেশগত অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। এজন্য জলাধার, মাঠ ও পার্কের নিয়মিত পরিবেশগত অডিট, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দখল-দূষণ নজরদারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কোন সংস্থা কোন সম্পদের দায়িত্বে রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং কাজের অগ্রগতি কী—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহিতা বাড়বে।

হাতিরঝিলের বর্তমান পরিস্থিতি মূলত ঢাকার পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান জলাধার, মাঠ ও পার্কগুলো কতটা কার্যকর আছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। সর্বোপরি মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো প্রকল্প নির্মাণের পর তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং দীর্ঘমেয়াদে তা কতটা টেকসই সেটিই প্রকল্পের সাফল্যের মূল মানদণ্ড।