সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। নীল জলরাশি, প্রবাল, জীববৈচিত্র্য এবং অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে দ্বীপটি দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র। একই সঙ্গে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করাও আমাদের সবার দায়িত্ব।

সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও পর্যটননির্ভর ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। সেন্ট মার্টিন বন্ধ হলে এর প্রভাব শুধু সেন্ট মার্টিনের স্থানীয়দের বা সেখানকার ব্যবসায়ীদের ওপরই পড়ে না; পরিবহন খাত থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীসহ অনেকের ওপর পড়ে।

তাই বরং সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটির অধীনে একটি নিয়মিত মনিটরিং টিম থাকবে। তাদের অন্যতম দায়িত্ব হবে প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারক করা, পরিবেশবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো অনিয়ম দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।

দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কয়েকটি স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বর্জ্য ফেলা, পরিবেশের ক্ষতি করা কিংবা অন্যান্য অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে প্রশাসন ও যৌথ কমিটি নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারে।

এ ব্যবস্থাপনার ব্যয় বহনের ক্ষেত্রে সেখানে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বা মনিটরিং ফি নেয়া যেতে পারে। সংগৃহীত অর্থের ব্যবহারও হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। এতে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বটি শুধু সরকারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যেও ভাগ হয়ে যাবে। কারণ তারা শুধু ব্যবসা করবে পরিবেশ রক্ষায় কিছু করবে না তা হতে পারে না।

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে এ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহ পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, পর্যটক ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে তারা নিজেদের এলাকার পরিবেশ রক্ষায় আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই একমাত্র পথ—এমনটি মনে করার প্রয়োজন নেই। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মধ্যে কোনো সমাধান নেই; বরং নিয়ন্ত্রিত, দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি পথ। পর্যটক, ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসন—সবার দায়িত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একই সঙ্গে পর্যটন কার্যক্রম চালু রাখা এবং দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া সেন্ট মার্টিনের পর্যটক বহনকারী জাহাজগুলো ইনানী থেকে ছাড়ার জন্য প্রস্তাব করছি৷, কারণ কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিনের দূরত্ব প্রায় ১২০ নটিক্যাল মাইল, আর ইনানী থেকে মাত্র ৭০ নটিক্যাল মাইল। ইনানী থেকে জাহাজ ছাড়লে ৫০ নটিক্যাল মাইল দূষণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অন্যদিকে জাহাজ মালিকদের জ্বালানি সাশ্রয় হবে। তার মানে পরিবেশ এবং ব্যবসা দুটোই নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সেন্ট মার্টিন শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই এর সুরক্ষায় প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা, যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ এবং দায়িত্বশীল পর্যটন—তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দেয়া হবে।

নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে কার্যকর মনিটরিং, অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সেন্টমার্টিন হতে পারে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই পর্যটনের একটি সফল উদাহরণ।

এইচএম সুমন: চেয়ারম্যান, পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ইআরপিডিএফ বাংলাদেশ