১৯৭০ সালের নির্বাচন অখণ্ড পাকিস্তানের একমাত্র ও শেষ জাতীয় নির্বাচন। এটা ছিল প্রথম সরাসরি জাতীয় নির্বাচন, যাতে পাকিস্তানের দুই অংশের প্রাপ্তবয়স্করা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরেছিলেন। আর একাধিক দল মুক্ত পরিবেশের এ নির্বাচনে অংশ নেয়। যে নির্বাচন জনপ্রতিনিধিদের একটি সরকার গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। (Choudhury:2014)

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম বড় নিয়ামক ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় পাকিস্তানে গণতন্ত্র ছিল নির্বাসিত, মিলিটারি বুটের নিচে চাপা পড়া ছিল গণতান্ত্রিক চেতনা। যদিও ১৯৪৭-৫৭ পর্যন্ত নামকাওয়াস্তে এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল। কিন্তু ততদিনে সারা দেশে একটি জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়নি। ক্ষমতাসীন পাঞ্জাবি আমলা ও নাক উঁচু সেনাবাহিনী একটি নির্বাচন দেয়নি। প্রকৃত একটি জাতীয় নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অদ্ভুত এক ধারা চলছিল পাকিস্তানে। যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন দুই অংশের রাজনীতিবিদ ও সচেতন মানুষ। আর এ কারণেই আইয়ুব খানের পতনের পর জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে আর অবজ্ঞা করতে পারেননি ইয়াহিয়া খান। বলা যায়, ইয়াহিয়া খান বাধ্য হন একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শুরুতেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বাঙালি জাতির। ১৯৫২ সালেই ভাষার প্রশ্নে রক্তদান। এরপর ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগকে ধরাশায়ী করে বাঙালিরা প্রাদেশিক সরকার গঠনের সুযোগ পেলেও সেখানে ক্ষমতার মারপ্যাঁচে বাঙালিকে ক্ষমতাহীন করা হয়েছে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা দুই মাসও টিকতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের ৩১ মে দেশদ্রোহের অভিযোগে এ মন্ত্রিসভা বাতিল করে ৯২ ক ধারা জারি করা হয়েছিল। এরপর আইয়ুব খানের টানা ১০ বছরের সামরিক শাসন। আইয়ুব খানের পতন ঘটে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে, যাতে পাকিস্তানের দুই অংশের নাগরিকরাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। সেনাবাহিনীর প্রবল চাপে ১৯৭০ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরে ১৯৭০ সালের ৩১ মার্চ এলএফও (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) ঘোষণা করা হয়, যার ভিত্তিতে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয় ১৯৭০ সালের ৭ অক্টোবর। পরে নির্বাচনের তারিখ দুই মাস পিছিয়ে নতুন তারিখ নির্ধারিত হয় ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০। তবে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ায় উপকূলীয় নয়টি আসনে নির্বাচন হয় ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১। (আহমদ: ২০১৬)

নির্বাচনের আগে এলএফও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও শেখ মুজিবুর রহমান দেখছিলেন নতুন সম্ভাবনা। তিনি জানতেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অধিকারের দাবিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর সে কারণেই ওই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা সামনে রেখে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। আওয়ামী লীগ অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রচার করে এ নির্বাচন ছয় দফা বাস্তবায়নে এক ধরনের গণভোট। আর সে কারণেই বাঙালি জাতির উচিত এ নির্বাচনে ছয় দফার পক্ষে মত দেয়া। (আহমদ: ২০১৬)

১৯৭০ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন ঘিরে পুরো পাকিস্তানেই ছিল উত্সবের আমেজ। সরকার বেতার ও টেলিভিশনে জাতীয় নেতাদের প্রাক-নির্বাচনী ভাষণ সম্প্রচারের ব্যবস্থা করে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এ সুযোগ গ্রহণ করেন, যাতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন তার নির্বাচনী ইশতেহার। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের রেকর্ডকৃত ভাষণটি সম্প্রচার করা হয় ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর। এ ইশতেহার ভাষণটি ছিল ৩০ মিনিটের। ইশতেহার ভাষণটি এখন জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইউটিউবে পাওয়া যায়। যতদূর জানা যায়, এ ভাষণের খসড়া তৈরি করেছিলেন ড. কামাল হোসেন, রেহমান সোবহান ও তাজউদ্দীন আহমদ। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ইশতেহারের মূল বিষয়গুলো ছিল:

1.     ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার। ইশতেহারে প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে গোটা ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করার অঙ্গীকার করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, পুরো পাকিস্তানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ মাত্র ২৪টি পরিবারের হাতে জমা।

2.     যমুনা সেতুর ওপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেতু নির্মাণ। একই সঙ্গে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী ও পাঞ্জাবে সিন্ধু নদীর পর সেতু নির্মাণ।

3.     প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লী চিকিত্সা কেন্দ্র নির্মাণ ও থানা সদরে হাসপাতাল স্থাপন করা।

4.     জাতীয় উত্পাদনের ন্যূনতম ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা।

5.     কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন না করা।

6.     স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ।

7.     ফারাক্কা বাঁধজনিত সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান।

8.     ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন।

9.     জাতীয়করণের মাধ্যমে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোকে জনগণের মালিকানায় নিয়ে আসা।

10.                      উপজাতীয় এলাকায় উন্নয়নের ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা।

11.                      জাতীয় জীবনের সঙ্গে মোহাজেরদের একাত্ম করা।

12.                      ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ। যার ফলে গ্রামীণ জনগণকে অর্থনীতিতে আলাদা করে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করা।

13.                      পাট ব্যবসার জাতীয়করণ।

14.                      জমিদারি প্রথার বিলুপ্তকরণ।

15.                      কৃষির আধুনিকীকরণ।

16.                      ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার।

17.                      বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা।

18.                      গ্রামে গ্রামে বিদ্যুত্ পৌঁছে দিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা করা।

19.                      স্থল ও নৌবন্দরের উন্নয়ন, সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা।

20.                      শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা, শ্রম আইন সংস্কার করা।

21.                      রাজবন্দিদের মুক্তি।

22.                      সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। পেশাদার এ বাহিনীকে জাতীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত রাখা ইত্যাদি।

পুরো ইশতেহার ঘোষণার সময় প্রতিটি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিরি উল্লেখ করেন, আগে অনেকেই উল্লেখ করেছেন, ছয় দফার কারণে বা অন্য কোনো কারণে ইসলাম বিপন্ন। এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতেও আহ্বান জানান শেখ মুজিবুর রহমান।

৩০ মিনিটের ইশতেহার ভাষণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক একজন শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত দূরদর্শী দৃষ্টিতে জনগণের সামনে একটি যথাযথ নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেছেন। যাতে ছিল একটি আধুনিক, অগ্রগামী ও স্বানির্ভর রাষ্ট্রের রূপরেখা। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যা ছিল অনন্য।

রাহাত মিনহাজ: শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়