২০১৯ সালের জুনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান। এর ঠিক ছয় মাস পর (২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯) হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের গ্রাউন্ড ব্রেকিং কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় টার্মিনাল-৩-এর নির্মাণকাজ। বেবিচক চেয়ারম্যান হিসেবে শুরু থেকেই টার্মিনালের নির্মাণকাজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন মফিদুর রহমান। ‘সফট লঞ্চিং’-এর প্রাক্কালে টার্মিনাল নির্মাণকাজের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, টার্মিনালটির সুযোগ সুবিধা এবং টার্মিনালকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামীম রাহমান
শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাই
২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২০ সালের ৬ এপ্রিল। যদিও বাস্তবে কাজটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই আমরা শুরু করে দিই। আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ করে সফট ওপেনিংয়ে যাওয়া। আমরা এখন পর্যন্ত এ লক্ষ্যের মধ্যেই রয়েছি। নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দুই সপ্তাহে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে কাজ কিছুটা বিঘ্নিত হলেও আমরা লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে নেই। ঠিকাদারের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল চার বছর অর্থাৎ ১ হাজার ৪৭১ দিনে কাজ সম্পন্ন করার। আমরা ১ হাজার ২৪৫ দিনের মধ্যেই টার্মিনালটির সফট ওপেনিং করতে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উনার প্রজ্ঞা, গতিশীল নেতৃত্বের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিশ্চয় অনেক চ্যালেঞ্জও ছিল?
প্রকল্পটি যখন শুরু হয়, তার পর পরই দেখা দেয় করোনা মহামারী। মহামারীর মধ্যেও আমরা প্রকল্পের কাজ একদিনও বন্ধ রাখিনি। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমাদের বেশ জটিলতার মুখে পড়তে হয়। যেসব জায়গা থেকে আমাদের জিনিসপত্র আসার কথা, অনেক ভেন্ডর/কোম্পানি কলাপস করে যায়। তারা ব্যাংক ডিফল্ডার হয়। তারা বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ওই জিনিসপত্রগুলো সংগ্রহ করতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। গুণগত মান বজায় রেখে নির্মাণ উপকরণগুলো সংগ্রহ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশে একসঙ্গে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেলসহ অনেক বড় বড় প্রকল্প চলছে। এ জায়গায় আন্তঃমন্ত্রণালয়, আন্তঃসংস্থার যে একটা সমন্বয় দরকার, সেটা কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে। কারণ সব মন্ত্রণালয় বা সংস্থাই নিজেদের প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চেয়েছে। এটাকে সমন্বয় করে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ সব সংস্থার কাছে। তারা আমাদের যথাযথ সহায়তা প্রদান করেছেন, যার প্রভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটিকে আপনারা কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন?
এ প্রকল্পে গর্ব করার মতো দিক হলো এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এখানে প্রত্যেক শ্রমিককে বাধ্যতামূলক এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে যোগদান করতে হয়েছে। এত বড় একটা প্রকল্প, আলহামদুলিল্লাহ আমাদের ওই তুলনায় এখানে ক্যাজুয়ালটি খুবই নগণ্য। যদিও আমাদের দুজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল কিছুটা ব্যক্তিগত অবহেলা এবং কিছুটা সুপারভিশনের অবহেলায়। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যাপারে যে কঠোর ব্যবস্থা বজায় রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, তার কারণে কিন্তু প্রকল্পে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। যারা এখানে শ্রমিক, স্টাফ আছেন সবাই অনেক উচ্চ মনোবল নিয়ে কাজ করেছেন।
আজ সফট ওপেনিং হতে যাচ্ছে। এরপর কী হবে?
প্রথমত, সফট ওপেনিংয়ের মাধ্যমে আমাদের যে পরিকল্পিত কাজ, সেটা শেষ হলো। এর আওতায় আমাদের সুবিশাল টার্মিনাল ভবনটি তৈরি হয়েছে।
ভবনটি আমাদের প্রস্তুত হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো স্থাপন করা হয়ে গেছে। চেক ইন থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, তারপর সিকিউরিটির সব ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। বিশাল বিশাল এস্কেলেটর লিফট, ব্যাগেজ হান্ডেলিং সিস্টেম স্থাপিত হয়েছে। ইমিগ্রেশনের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফায়ার সিস্টেম, ব্যাগেজ সিস্টেমসহ সব ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ সিস্টেমগুলো স্থাপনের কাজ সফট ওপেনিংয়ের মাধ্যমে সমাপ্ত হলো। আমাদের ফিজিক্যাল কাজ শেষ। যে ১০ শতাংশ কাজ বাকি তার মধ্যে রয়েছে সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় এবং শেষ মুহূর্তের কিছু সাজসজ্জা। সফট ওপেনিংয়ের পরে আমরা বাকি কাজগুলো করব।
টার্মিনাল-৩ বাণিজ্যিকভাবে কবে চালু হবে?
যদিও আমরা বলছি আগামী বছরের শেষ নাগাদ টার্মিনালটি ফুল ফাংশনাল হবে, তার পরও আমাদের চেষ্টা থাকবে, যদি সবকিছু আমাদের অনুকূলে থাকে, তাহলে এর আগেই টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করতে সক্ষম হব। টার্মিনালটি সম্মানিত যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারব। এটাই হলো আমাদের পরিকল্পনা।
টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা পরিচালনার দায়িত্ব কারা পাচ্ছে?
আপাতত আমরা টার্মিনালটি ঠিকাদারের কাছ থেকে বুঝে নেব। টার্মিনাল ১ ও টার্মিনাল ২ থেকে আমাদের যে অপারেশন, সেটা টার্মিনাল ৩-এ শুরুর প্রক্রিয়া শুরু করব। টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে এটা পরিচালিত হতে পারে। এখনো তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। চুক্তি করার জন্য পিপিপি কর্তৃপক্ষ পরামর্শক নিয়োগ করেছে। সরকারের পক্ষে তারা চুক্তির টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন তৈরি করে দিচ্ছে।
নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবার মানের দিকে আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
আমরা চাই ইউরোপের উন্নত বিমানবন্দর কিংবা এশিয়ার চাঙ্গি বা দুবাই বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মানের যে মানদণ্ড, টার্মিনাল-৩-এ তা বজায় রাখতে। এজন্য আমরা যাদের সঙ্গে টার্মিনালটির পরিচালনা নিয়ে আলোচনা করছি, তাদের বলেছি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আপনাদের পদ্ধতিগুলো কেমন হবে এবং আপনারা কীভাবে টার্মিনালটি পরিচালনা করবেন তা আমাদের লিখিতভাবে দিন। আমরা যে মানের যাত্রীসেবা চাইছি, তা নিশ্চিত করেই আমরা টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব দেব।
যাত্রীদের জন্য কী সুবিধা থাকছে এ টার্মিনালে?
স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট বিমানবন্দর হতে যাচ্ছে এ তৃতীয় টার্মিনাল। আগত ও বহিরাগত যাত্রীদের জন্য টার্মিনালটিকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। যত ধরনের ট্রান্সপোর্ট নিয়ে আমরা চিন্তা করতে পারি, সবই সংস্থান রাখা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে টার্মিনালটি যুক্ত করা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে আরো কানেক্টিভি বাড়ানোর জন্য আমরা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ভবিষ্যতে মহাসড়ক, মেট্রোরেলের মতো যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গেও টার্মিনালটি সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হজ ক্যাম্প ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমেও এ টার্মিনালের সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এরই মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যার কাজ শিগগির শুরু হবে। আমরা সিভিল এভিয়েশন থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর বাইরেও যা যা সহায়তা দরকার তা করতে আমরা প্রস্তুত। আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলটি কার্যত আমাদের বিমানবন্দরের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য টার্মিনাল ভবনের পূর্ব পাশে একটি বহুতল পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে একসঙ্গে ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি পার্ক করে রাখা যাবে।
টার্মিনাল ছাড়াও কার্গো টার্মিনাল, অ্যাপ্রোন এরিয়ার মতো অবকাঠামো এ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা হচ্ছে। এগুলো কবে থেকে ব্যবহার শুরু হবে?
টার্মিনালের পাশাপাশি এ প্রকল্পের সঙ্গে আমাদের আরো কিছু স্থাপনা আছে। এগুলো হলো ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনাল। সুবিশাল অ্যাপ্রোন এড়িয়া, যেখানে উড়োজাহাজগুলো পার্ক করে। এখানে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। বর্তমানে টার্মিনাল ১ ও টার্মিনাল ২-এর অ্যাপ্রোন এলাকায় ২৯টি বিমান পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এর সঙ্গে আরো ৩৭টি বিমান পার্কিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয় টার্মিনাল ফাংশনাল হওয়ার আগেই অ্যাপ্রোন এলাকা ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠবে। এর বাইরে রানওয়ের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত ট্যাক্সিওয়ে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো এরই মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে। সফট ওপেনিংয়ের মাধ্যমে যেগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। নতুন কার্গো টার্মিনালে বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি, পুরোটা অটোমেটেড। রোবোটিকস সিস্টেমে কার্গো রক্ষণাবেক্ষণ হবে। এটার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমরা আশা করছি, আগামী মার্চ-এপ্রিলে এটা ব্যবহার করতে পারব। সফট ওপেনিংয়ের পর পর্যায়ক্রমে আমরা প্রত্যেকটা স্থাপনা ব্যবহার করা শুরু করে দেব।





