আওয়ামী লীগ সরকারের গত দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেড়শ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অর্থ পাচার হয়েছে বলে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, আমদানি-রফতানিতে মিথ্যা ঘোষণার পাশাপাশি অননুমোদিত আর যেসব পন্থায় বাংলাদেশ থেকে এসব অর্থ বেরিয়ে গেছে, তার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে হুন্ডি-হাওলা।
আবার বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর সময়ও প্রবাসীদের অনেকে হুন্ডি-হাওলা ব্যবস্থার দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ হয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক-বহির্ভূত চ্যানেলে আসা এ অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ অবস্থায় ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অবৈধ বা অননুমোদিত পন্থায় বৈদেশিক লেনদেন বন্ধের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাবায়নের পর চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই শেষে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়নের কিছু বেশিতে। যদিও এক মাস আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুন শেষে দেশের রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে ব্যাংকিং চ্যানেল বহির্ভূত অননুমোদিত বৈদেশিক লেনদেন। এভাবে লেনদেনকারীদের বড় একটি অংশ দ্বারস্থ হচ্ছেন হুন্ডি-হাওলার মতো ব্যবস্থার। যদিও বিশ্বের সব স্থানেই হুন্ডি বা হাওলাকে দেখা হয় অননুমোদিত ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হিসেবে। এক্ষেত্রে প্রেরক কোথাও অর্থ পাঠানোর জন্য ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি বা হাওলা এজেন্টের (দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো স্থানে হাওলাদার নামে পরিচিত) সহায়তা নিয়ে থাকেন। এজন্য ওই এজেন্টকে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ ও নির্দিষ্ট হারে ফি বা কমিশন পরিশোধ করা হয়। গন্তব্যস্থলে এজেন্টের কোনো সহযোগী বা অংশীদার এজেন্ট ওই অর্থ প্রাপককে পরিশোধ করে। এরপর প্রেরক প্রাপককে এবং এজেন্ট তার সহযোগীকে লেনদেনের বিশদ তথ্য অবহিত করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রেরক ও এজেন্ট আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি কোড বা পাসওয়ার্ড ঠিক করে নেয়। লেনদেনের পরে এজেন্ট ও তার সহযোগী নিজেদের মধ্যে দেনা-পাওনা পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করে। অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায় হওয়ায় এ হাওলা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারির সুযোগ থাকে কম। লেনদেন চিহ্নিত করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রেরক বা প্রাপককে চিহ্নিত করা যায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অপরাধমূলক কার্যক্রম। পণ্য বাণিজ্য, রেমিট্যান্স, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার, স্বর্ণ-মাদকসহ অন্যান্য দ্রব্য চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার ব্যবহার বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে হিসাব করেও দেখা গেছে, দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার গত বছরের মধ্যেই ৩০-৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে আরো গভীর ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান চালালে দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার আকৃতি হয়তো এর চেয়েও অনেক বড় পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
সরকারের ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেন্টিং মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্সিং অব টেরোরিজম ২০১৯-২১’ শীর্ষক একটি কৌশলপত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত (বিশেষ করে দুবাই), মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। এসব গন্তব্যে অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো হুন্ডি-হাওলা।
গত কয়েক বছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহকে চাপে ফেলেছিল হুন্ডি ও হাওলার বাজার। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, দেশে আগত রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই (৪৯ শতাংশ) আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। ব্যাংকিং বা বৈধ চ্যানেলে আসে ৫১ শতাংশ।
হিসাব অনুযায়ী, দেশে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে লেনদেনকৃত অর্থের পরিমাণ কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স হিসেবে আসছে আরো ১০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া দুর্নীতি ও কালোবাজারির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ পাচার, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্য চোরাচালান, মানব পাচারের মতো কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার অবদান ৫-১০ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া পণ্য বাণিজ্যে কর ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ হুন্ডি বা হাওলার দ্বারস্থ হয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানি মূল্য প্রকৃতের চেয়ে কম দেখানো) করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের অপ্রদর্শিত অংশটুকু পরিশোধ করা হয় হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে। বিষয়টিকে এখন দেখা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য তথ্যে গরমিলের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের প্রপার্টি ক্রয়সহ নানা বিনিয়োগের তথ্য সামনে এসেছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যসহ অনেক স্থানেই অভিজাত এলাকায় বাংলাদেশী ধনীদের গৃহসম্পত্তি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। আবার অনেকের বিদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগের তথ্যও সামনে এসেছে। কিন্তু বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে এসব বিনিয়োগের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ থেকে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পুঁজি স্থানান্তরের সন্দেহ করছেন বিশেষজ্ঞরা।





