বিগত শতাব্দীর উত্তাল চল্লিশের দশকের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা পাড়ি দিয়েছিলেন ইসলামিয়া কলেজে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য। কলকাতা তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে বিধ্বস্ত, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের করাঘাতে শ্রীহীন এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও দেশভাগ দাবির উত্তাল আন্দোলনে মুখরিত এক রাজনৈতিক সচেতন নগরী। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে তিনি ১৯৩৪ সালে সর্বপ্রথম কলকাতায় এসেছিলেন ডাক্তার দেখানোর জন্য বেরিবেরি রোগ নিরাময়ের কারণে এবং ১৯৩৬ সালে তার চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার জন্য তিনি পুনরায় কলকাতা এসে তার চোখের অস্ত্রোপচার করেন মেডিকেল কলেজে বিশিষ্ট চিকিৎসক টি আহমেদের কাছে। দুটি ক্ষেত্রেই তিনি তার চিকিৎসকদের নাম এবং তাদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। সুতরাং কিশোর মুজিবুরের হৃদয় ও দৃষ্টিশক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল এ কলকাতায়ই। পরবর্তী সময়ে প্রায় শতাব্দী প্রাচীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তার জাতীয় রাজনীতির সূতিকাগার ছিল কলকাতা। সুতরাং শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতার ছাত্রজীবন ছিল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়।
মুজিবর রহমান যখন কলকাতায় পড়তে এলেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবের সঙ্গে কুড়ি বছর অতিক্রম করেছে। তিনি সেখানে ভর্তি হলে আবাসিক ছাত্র হিসেবে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতেন। কিন্তু তিনি হননি? তাহলে যে প্রশ্নটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবার মনে আসে, কেন তিনি পূর্ববঙ্গের আবেগজড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে কলকাতার একটি কলেজে ভর্তি হলেন? এ বিষয়ে প্রবন্ধকারের মতামত হলো যে প্রথমত, কলকাতা ছিল বাংলার রাজধানী এবং এখান থেকেই সারা বাংলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। শেখ মুজিবুর রহমান তার ছাত্রজীবন থেকেই সমাজসেবা ও রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। সেই সময়েই শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও অন্যান্য জাতীয় নেতার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। কলকাতায় থাকলে তিনি জাতীয় নেতাদের সঙ্গে মেলামেশা ও রাজনীতি করতে পারবেন। ফলে কলকাতার প্রতি তার আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার। দ্বিতীয়ত, মুজিবুর রহমানের মতে, চল্লিশের দশকে ইসলামিয়া কলেজ সারা বাংলার মুসলিম লীগের রাজনীতি ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
তৃতীয়ত, কলকাতায় শেখ পরিবারের পারিবারিক ব্যবসা দীর্ঘদিনের এবং সেই সময়ে তার বোন-ভগ্নিপতি ও নিকট কিছু আত্মীয় কলকাতা এবং তার চারপাশে চাকরি বা ব্যবসা করতেন। সর্বশেষত, গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা কাছে হলেও রেলপথের মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে তার বাড়ির যোগাযোগ ছিল অপেক্ষাকৃত মসৃণ।
এ প্রবন্ধে মুজিবুর রহমানের কলকাতার ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং তিনি যেসব সামাজিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন সেই সব বিষয়ের বিশ্লেষণ ও বিবরণ দেয়া হবে। সর্বপ্রথম ইসলামিয়া কলেজের কথা আলোচনা করা যাক। শেরেবাংলা ফজলুল হক যখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী, তখন তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান কলেজটি যেখানে অবস্থিত সেটি ছিল ‘ক্যালকাটা মাদ্রাসার’ খেলার মাঠ। যাই হোক ১৯২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলার তদানীন্তন ছোট লাট লর্ড লিটন এ কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে এ কলেজের সঙ্গে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মিল আছে। বাংলার এ ছোট লাটের পিতা ভারতের তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল বা বড় লাট লর্ড লিটন ১৮৭৭ সালে আলীগড় অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল মোহামেডান কলেজের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এ দুটি শিক্ষালয় ভারতে ও বাংলাদেশের মুসলিম ছাত্রদের জন্য পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য শিক্ষার সমন্বয় সাধনের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তা যুগতীর্ণ। এ কলেজ শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত এবং অতি আশ্চর্য হলেও এটা সত্য যে এ প্রতিষ্ঠানকে তিন তিনবার নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে। এ কলেজ যাত্রা শুরু করেছিল ইসলামিয়া কলেজ নামে। দেশভাগের পরে এ কলেজের নামকরণ হয়েছিল ‘সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ’ এবং ১৯৬০ সালে পুনরায় এ কলেজের নামকরণ করা হয় ‘মৌলানা আজাদ কলেজ’। ইসলামিয়া কলেজের এই রকম নামকরণ সারা ভারতবর্ষে প্রথম। পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দর্শন ও সাহিত্যের সঙ্গে ইসলামীয় সাহিত্য ও দর্শনের মিলনের অভিপ্রায় নিয়ে এ কলেজ তৈরি হয়েছিল, বলাবাহুল্য। শেরেবাংলা ফজলুল হকের এটা যদি মানসপুত্র হয়, তাহলে অবশ্যই কলকাতার লেডি ব্রাবন কলেজ (১৯৩৯) হলো মানসকন্যা। যাই হোক ১৯২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর এ কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও ১৯২৬ সালের ২ জুলাই কলেজের ভর্তি প্রক্রিয় শুরু হয়।
কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল নির্বাচিত হন মিস্টার আলেক্সজান্দার হ্যামিলটন হারলে (১৯২৬ ডিসে.)। ইনি ছিলেন স্কটিশ এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষায় সহকারী অধ্যাপক। তিনি আরবি ভাষার সুপণ্ডিত ছিলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন ডব্লিউ এ জেনকিন্স (১৯৩৭ ফেব্রু.)। এরপর ১৯৩৭-এর মে মাসে বাঙালি শিক্ষাবিদ ও রসায়ন বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদা এ কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কুদরাত-এ-খুদার পর ইংরেজির অধ্যাপক আবু হেনা প্রিন্সিপাল (১৯৩৭) হন। কলেজের পরবর্তী প্রিন্সিপাল হন (১৯৩৮ ফেব্রু.- ১৯৪২ এপ্রিল) কুরুভিল্লা জাকারিয়া। প্রফেসর জাকারিয়া ছিলেন ইতিহাসের নামকরা অধ্যাপক এবং সিরীয় খ্রিস্টান সমাজের লোক। তার আদি নিবাস কেরালা প্রদেশ। কুদরাত-এ-খুদা এবং জাকারিয়া দুজনেই ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের সমাদৃত অধ্যাপক। ইসলামিয়া কলেজের শেষ অধ্যক্ষ (১৯৪২ মে - ১৯৪৭ জুলাই) হিসেবে কাজ করেন ইশরাত হুসেন জুবেরী। তিনি ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক। সুতরাং এটা সহজেই অনুধাবনযোগ্য যে ইসলামিয়া কলেজের প্রিন্সিপালরা ছিলেন যোগ্য শিক্ষিত ব্যক্তি, যেখানে ধর্মের ও প্রাদেশিকতার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কলেজ শুরু থেকেই কৃত-বিদ্য শিক্ষক নিয়ে গুরুগম্ভীর শিক্ষাদানে ব্রতী হয় এবং অচিরেই এ কলেজ সুনাম অর্জন করে। মুজিবুর রহমানের ভর্তির সময় এ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন কুরুভিল্লা জাকারিয়া এবং পরে ইশরাত হুসেন জুবেরী। জুবেরী পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।
ইসলামিয়া কলেজে আরবি, ফারসি ও উর্দু বিভাগ একই ছাতার নিচে ছিল, অর্থাৎ একজন বিভাগীয় প্রধান নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই সময় সকলকেই ইংরেজি পড়তে হতো। ইতিহাস, লজিক, সিভিকস, কমার্শিয়াল অংক, কমার্শিয়াল ভূগোল প্রভৃতি বিষয় আর্টসের ছাত্ররা পড়তে পারত। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আজিজুল হকের নির্দেশে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং ভূগোল বিভাগ চালু হয়। এছাড়া বিজ্ঞান বিভাগের জন্য অংক, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা—এসব বিষয় নিয়ে ছাত্রদের পড়তে হতো। ১৯৪৪ সালে কলেজে জীববিদ্যা বিষয় চালু হয়। কলেজ ভূগোল বিষয় চালু করলেও ছাত্রাভাবে বন্ধ করে দিতে হয় এবং তা প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে যায়। সম্ভবত ইসলামিয়া কলেজে স্নাতক স্তরে বাংলা বিষয় চালু ছিল না। সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ নামকরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্নাতক স্তরে বাংলা বিভাগ চালু হয়। কলেজের অধ্যাপক নির্বাচিত হতেন সর্বভারতীয় ভিত্তিতে। এদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের লোক ও বাংলাদেশের লোক। তখন সবাই ব্রিটিশ আশ্রিত ভারতীয়।
শেখ মুজিবুর রহমান যখন ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন, তখন সেই কলেজ পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে। এখন জানা দরকার সেই সময়ে কলেজে কোন কোন দিকপাল পণ্ডিত অধ্যাপনা করতেন, যাদের কাছে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে মুজিবুর রহমান শিক্ষা লাভ করেছিলেন। সেই সময়ে ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন ইশরাত হুসেন জুবেরী, আবু হেনা, জে এফ ফ্রেন্ডস পেরেইরা (বিভাগীয় প্রধান), টি এন সেন, এস কে ইন্দ্র, আবু জামাল আবু তৈয়ব ও এম আহসান। অর্থনীতির অধ্যাপকরা হলেন পরিমল রায় (বিভাগীয় প্রধান), সুধাংশু কুমার গুহ ঠাকুরতা, ভবতোশ দত্ত ও মোহাম্মদ সাদিক। ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন কুরুভিল্লা জাকারিয়া। এছাড়া ছিলেন আব্দুল মাজেদ খান ও তাহির জামিল। দর্শন বিভাগের প্রধান ছিলেন এম এ বাকি, অন্যরা হলেন জহির উদ্দিন চৌধুরী, নাজির আহমেদ ও সাইদুর রহমান। উর্দু, আরবি ও ফারসি বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপকরা হলেন আল্লামা রাজা আলী বেহসত, আব্বাস আলী খান বেখুদ, আক্তার হাসান, কায়ানাত হোসেন, মাসুদ হসেন, খলিলুর রহমান, নিয়াজ আহম্মদ খান, আব্দুল কাদির প্রমুখ। মোতাহের হোসেন চৌধুরী ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পর্যন্ত ইসলামিয়া কলেজের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। কলেজটি তৈরি হয়েছিল মোগল স্থাপত্যরীতিতে। কেমন ছিল কলেজের পরিবেশ? অধ্যাপকরা সাধারণত কোর্ট-টাই সুট পরিহিত অবস্থায় কলেজে আসতেন। মুসলমান অধ্যাপকরা তুর্কি ফেজ ও টুপি ব্যবহার করতেন। সাহেব অধ্যাপকরা হ্যাট ব্যবহার করতেন। বাঙালি অধ্যাপকরা কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরতেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে কলেজে কেবল মুসলমান ছাত্ররাই ভর্তি হওয়ার অধিকারী ছিল। ছাত্রদের ড্রেস কোড ছিল। তাদের সবাইকে চুড়িদার এবং কালো রঙের শেরওয়ানি পরে কলেজে আসতে হতো। কেউ কেউ টুপিও পরতেন। মুজিবুর রহমানের চুড়িদার এবং শেরওয়ানি পরা ছাত্রাবস্থার ছবি পাওয়া যায়। মুজিবুর রহমানের ইংরেজি ছাড়া সিভিকস, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় হিসেবে ছিল। অধ্যক্ষ এবং অধ্যাপকগণ মুজিবুর রহমানকে খুবই স্নেহ করতেন সে কথা তিনি তার আত্মজীবনীতে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। মুজিবুর রহমান কলেজে লীগ ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তিনি কয়েকবার মুসলিম লীগের অফিসিয়াল প্রার্থীকে পরাজিত করে নিজের মনোনীত প্রার্থীকে জয়যুক্ত করতে সক্ষম হন। ১৯৪৬ সালে তিনি একবার ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই কলেজের ছাত্র সেক্রেটারির তালিকায় এম রহমান নাম এখনো উজ্জ্বলভাবে বিদ্যমান। এখানে বলা প্রয়োজন যে তিনি কলেজের ডকুমেন্টে এম রহমান নামে সই করেছিলেন। সেই রেকর্ড এখনো কলেজে আছে। তারা আত্মজীবনী থেকে এ তথ্য প্রমাণিত হয় যে এম রহমান আসলেই মুজিবুর রহমান ছিলেন। মুজিবুর রহমান তার ছাত্রজীবনে কলেজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি স্বীকারোক্তি করেছেন, ‘কলকাতা অফিসের অলটাইম ওয়ার্কার হয়ে যায়, যদিও হোস্টেলে আমার রুম থাকত তবুও আমরা প্রায় লিগ অফিসে কাটাতাম। রাতে একটু লেখাপড়া করতাম। সময় সময় কলেজে পার্সেন্ট রাখতাম। পাকিস্তান না আনতে পারলে লেখাপড়া শিখে কি করব আমাদের অনেকের মধ্যে এই মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল।’ তিনি ছিলেন শিক্ষকদের স্নেহধন্য। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেছেন যে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে অকপটে সব কথা আলোচনা করতেন, ফলে শিক্ষকরা তাকে প্রয়োজনমতো সমর্থন করতেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। শেখ মুজিবুর নিঃসংকোচে লিখেছেন যে টেস্ট পরীক্ষার পর ফাইনাল পরীক্ষায় ভালোভাবে তৈরি হওয়ার জন্য প্রফেসর তাহের জামিল, প্রফেসর সাইদুর রহমান ও প্রফেসর নাজির আহমদের সামনে ওয়াদা করেছিলাম।
কলকাতার বেকার হোস্টেল ১৯১১ সালে চালু হয়। প্রথমদিকে এই হোস্টেলের নাম ছিল মাদ্রাসা হোস্টেল। পরে শিক্ষা কর্তা আহসানউল্লাহ সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় এটা বেকার সরকারি হোস্টেলে নামাঙ্কিত হয়। বলাবাহুল্য, যুক্ত বাংলার সমগ্র অঞ্চল থেকে মুসলমান মেধাবী ছাত্ররা বেকার হোস্টেলে থেকে ইসলামিয়া কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ তথা কলকাতার নানা কলেজে অধ্যয়ন করতেন। শেখ মুজিবুর রহমান এ বেকার হোস্টেলে ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত আবাসিক ছিলেন। তিনি বেশির ভাগ সময়েই ২৪ নম্বর রুমে অবস্থান করেছিলেন। সেই ২৪ নম্বর এবং ২৩ নম্বর রুম মিলে বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম গঠিত হয়েছে তার অমর স্মৃতি রক্ষার্থে। মুজিবুর রহমানের সময় বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন অধ্যাপক সাইদুর রহমান। এ অধ্যাপকের কথা শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে অনেকবার আলোচনা করেছেন। অনুরূপভাবে অধ্যাপক সাইদুর রহমান তার আত্মজীবনীতে মুজিবুর রহমানের ছাত্রজীবনের কথা, ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনের কথা, হোস্টেলের আবাসিক জীবনের কথা এবং স্বাধীন বাংলার জনকের কথা উল্লেখ করেছেন বারবার।
বেকার হোস্টেলের ঠিক পাশে ও কলকাতা মাদ্রাসার ঠিক সামনে ইলিয়ট হোস্টেলের অবস্থান। এ হোস্টেল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ক্যালকাটা মাদরাসার ছাত্রদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ হোস্টেলে বাংলার এবং বাংলার বাইরের বহু মেধাবী ছাত্র আবাসিক হিসেবে পড়াশোনা করেছেন। মুজিবুর রহমানের বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর ঘরের সামনেই এ হোস্টেলের অবস্থান।
বিশ শতকের শুরুতে বাঙালি ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটলে ১৯১৭ সালে কারমাইকেল হোস্টেল প্রতিষ্ঠিত হয় স্নাতকোত্তর মুসলিম ছাত্রদের জন্য। তখনো পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সারা পূর্ব ভারতের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে সারা বাংলা আসাম বিহার উড়িষ্যা এমনকি উত্তর প্রদেশ ও কাশ্মীর থেকে ছাত্ররা কারমাইকেলে এসে ভর্তি হতো উচ্চ শিক্ষার জন্য। এ কারমাইকেল হোস্টেল মুসলিম ছাত্রদের উচ্চতর শিক্ষা লাভের তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। তদানীন্তন বাংলার প্রায় সব বিভাগের সব ছাত্রই এ হোস্টেলে থেকে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান এ হোস্টেল সম্বন্ধে তার বইতে বারবার উল্লেখ করে বিভিন্ন কাহিনী বিবৃত করেছেন। সেই সময়ের ছাত্রনেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছে তিনি নিয়মিত যেতেন। কাদের চৌধুরী তখন কারমাইকেল হোস্টেলে থাকতেন। এ ফজলুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে তার আত্মজীবনীতে বিস্তৃত বিবরণ আছে তাদের ভারত দর্শন বা ভ্রমণের কাহিনীতে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়, ’৪৬-এর দাঙ্গার সময় এবং নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারমাইকেলের ছাত্রদের অবস্থান ও সংগঠনের কথা মুজিবুর রহমান উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ করতে পারি যে কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা, আব্বাসউদ্দিন, শিক্ষাবিদ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, পীর আবু বকর সিদ্দিকি প্রভৃতি বিদগ্ধ ব্যক্তি কারমাইকেল হোস্টেলে পদার্পণ করেছেন নানা কারণে। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে দাঙ্গার সময় একবার ইন্দিরা গান্ধীও এই হোস্টেলে এসেছিলেন।
এ সময়ে মুসলিম স্নাতকোত্তর ছাত্রীদের জন্য একমাত্র আবাসস্থল ছিল মন্নুজান হোস্টেল। দানবীর মো. মুহসিনের বোনের নামের সঙ্গে এ হোস্টেলের নামকরণ করা হয়। মুজিবুর রহমানের সমসাময়িক পূর্ব বাংলার ও পশ্চিম বাংলার অনেক মহিলা এই হোস্টেলে থাকতেন, যারা পরবর্তীকালে নিজ কর্মে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মুজিবুর রহমান দাঙ্গার সময়ে মন্নুজানের মহিলাদের কীভাবে উদ্ধার করা হয় এবং এই ছাত্রীরা দাঙ্গার সময়ে কী পরিমাণ দাঙ্গা বিধ্বস্ত মুসলমানদের সেবা ও সাহায্য করেছিল সে কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার সময় সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের তৎপরতায় পুলিশ ও লীগ কর্মীরা গিয়ে এ ছাত্রীদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে আনেন।
১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগ ভোটে জয়ী হলে স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। অর্থনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ শাসকরা বাংলাদেশে সীমাহীন শোষণ ও অপশাসন জারি রাখে এবং সৈন্যবাহিনীর জন্য খাদ্য ও শস্য গুদামজাত করতে থাকে। তার ফলেই এ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। এছাড়া পরপর দুই বছর অনাবৃষ্টির ফলে দেশে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য শস্য উৎপাদন একেবারেই হয়নি। যেটুকু হয়েছিল তা সেনাবাহিনীর জন্য মজুদ করা হয়েছিল। ফলে দুর্ভিক্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এ দুর্ভিক্ষের ফলে সব সম্প্রদায়ের গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষ অতীব কষ্টের মধ্যে পতিত হয়। সাধারণ্যে এটা বিশ্বাস করা হয় যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের (১১৭৬) পরে এত বড় দুর্ভিক্ষ বাংলার মানুষ দেখেনি। কিছু সমাজবিজ্ঞানী এর অপব্যাখ্যাও দিয়ে থাকেন। সেটা হলো মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের ফলে এ দুর্ভিক্ষ বা আকাল বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করেছিল। অর্থাৎ নাজিমুদ্দিনের ক্যাবিনেটের সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী দুর্ভিক্ষকে ঠিকমতো ট্যাকেল করতে পারেননি। ফলে দুর্ভিক্ষের করাঘাতে বহু লোক প্রাণ হারায়। বাংলার সামাজিক আর্থিক স্থিতাবস্থা বিনষ্ট হয়। মুজিবুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন যে সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেব যথেষ্ট উদ্যমী মন্ত্রী ছিলেন এবং দুর্ভিক্ষ নিরসনে বাস্তব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ইংরেজ পরাশক্তিকে এ আকালের জন্য দায়ী করেন।
বলাবাহুল্য, শেখ মুজিবুর রহমান শুধু ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন না, ইতিমধ্যে তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কলকাতার নানা স্থানে লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলে মুজিবুর রহমান বেশ কয়েকটি স্থানে যথা মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরো বেশকিছু জায়গায় লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। সেখানে তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে লঙ্গরখানার কাজে ব্যস্ত । শেখ মুজিবুর রহমান শুধু কলকাতায়ই যে রিলিফের কাজ করেছিলেন তা নয়, তিনি তার স্বদেশ গোপালগঞ্জে গিয়েও এবং যশোর, খুলনা ও বরিশাল জেলার বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ অবস্থা অবলোকন করে রিলিফের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি গোপালগঞ্জের মুসলমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা ও ধান সংগ্রহ করার নানা সিদ্ধান্ত নেন। সেই জন্য তিনি একটা কনফারেন্সের ব্যবস্থা করেন, যাতে মানুষ মুসলিম লীগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য কিছু দান ধ্যান করেন। এটা স্বীকার করতেই হবে যে ছাত্রনেতা মুজিবুর রহমানের এ উদ্যোগ যেমন সাধুবাদ প্রাপ্য, তেমনি অসহায় মানুষের জন্য যে তার মন কাঁদত সে কথা অস্বীকার করা যায় না।
১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ বাংলার প্রাদেশিক ভোটে জয়ী হলে সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হল। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের খুবই পছন্দের নেতা। মুজিব তখন কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। আকাশে-বাতাসে বারুদের গন্ধ। ভারত ভাগ সবাই চায়। কেউ কেউ অবিভক্ত বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো দাবি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেটাও ধোপে টিকল না। মানুষের মধ্যে বিষবাষ্প এমনভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল যে হিন্দু-মুসলমান সবাই সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখত। এমনই এক পরিস্থিতিতে ১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা হলো। বাংলার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—হিন্দু না মুসলমান? বাংলায় ও কলকাতায় কারা রাজত্ব করবে—হিন্দু না মুসলমান? বাংলা কি পুরো পাকিস্তান হয়ে যাবে? কলকাতা কি পাকিস্তানের দিকে যাবে, না ভারতে থাকবে—এ তাড়নায় কলকাতায় সেদিন দাঙ্গা বেঁধেছিল। দাঙ্গায় নিহত ও আহতদের সঠিক সংখ্যা আজও জানা যায় না। জয়া চ্যাটার্জির মতে, মৃতের সংখ্যা পাঁচ থেকে দশ হাজারের মধ্যে ছিল এবং আহতের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ১৫ হাজার। এ দাঙ্গায় সরকারি হিসাব মতে মৃতের সংখ্যা ছিল চার হাজার, আহত ১০ হাজারের বেশি। শহর ত্যাগ করেছিল কমপক্ষে লক্ষাধিক লোক। এ দাঙ্গায় ধর্ম বা সম্প্রদায়গত মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
ছাত্র মুজিবুর রহমান কলকাতার দাঙ্গাকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন তা মহাকালের সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তার মনে দাঙ্গার বীভৎসতা, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তা তিনি কালির আঁচড়ে ব্যাখ্যা করেছেন। দাঙ্গার দিনগুলোতে নিজ দায়িত্ববোধের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দাঙ্গাস্নাত দিনগুলোতে ভাইবোনদের জন্য কতটা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন তা তার হৃদয়স্পর্শী আবেগঘন বিবরণে লিপিবদ্ধ আছে। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক কীভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, সেইসব তিনি তার স্মৃতিচারণায় বর্ণনা করে গেছেন। মুজিবুর রহমানের অধিকাংশ সহোদর ভাইবোনেরা ঠিক সেই সময়ে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। তার ছোট ভাই নাসিরকে নিয়ে তার উদ্বিগ্নতা ছিল সবচেয়ে বেশি, কারণ নাসির প্রকৃতিগতভাবে একটু খোঁড়া ও জেদি ছিলেন। তার এক বোন পার্ক সার্কাসে, আর এক বোন শ্রীরামপুরে থাকতেন। শ্রীরামপুর হুগলি জেলার একটি সাবডিভিশন। আগে ফরাসিদের কলোনি ছিল। কলকাতা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তার কী ভূমিকা থাকা উচিত সে বিষয়ে তার সম্যক জ্ঞান ছিল। দাঙ্গার সময়ে মুসলিম ছাত্রাবাসগুলোয় খাদ্য ত্রাণ ইত্যাদি বণ্টন করেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং অসহায় দাঙ্গা কবলিত বস্তিবাসীদের জন্য রাত পাহারা দিয়েছেন নিজের জীবন বাজি রেখে। বিপদের সময় যারা সাহায্য করেন, তারাই তো বন্ধু!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতায় পড়তে আসেন উচ্চ শিক্ষার জন্য। কিন্তু কার্যত এ সময়েই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক পরিচয় প্রখর হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ অফিসে এবং আবুল হাশিমের মিল্লাতের অফিসে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি নিজেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য বলে মনে করতেন, ছিলেন আবুল হাশিমের অনুরক্ত। আবুল হাশিম তার উদার, বৈপ্লবিক ও ইসলামীয় বামপন্থার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে মুসলিম লীগ পার্টিকে গতিশীল এবং সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে মুজিবুর রহমানের মতো প্রগতিশীল ছাত্ররা মুসলিম লীগের তরুণ তুর্কিতে পরিণত হয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য ও আহ্বান তার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়ে নিজেকে ছাত্ররাজনীতির ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে জাতীয় রাজনীতির এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলেন। তাই শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি আবুল হাশিম তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। ফজলুল হকের দোদুল্যমানতা ছাত্র মুজিব মেনে নিতে পারেনি। তবে এ কথা ঠিক যে মুজিবুর রহমান ছাত্রাবস্থায় মুসলিম লীগের উপদলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের প্রতিটি রাজনৈতিক পন্থায় যেমন বিশ্বাস করতেন, ঠিক তেমনি ঢাকার নবাবদের রাজনৈতিক মতাদর্শে তার ছিল অনাসক্তি। ফলে তিনি পদে পদে এদের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো মুসলিম লীগের উপদল যদি মোটা দাগে তথাকথিত পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়, সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ উপদলের সঙ্গে মুজিবুরের সম্পৃক্ততা ছিল অনেক বেশি। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের জাতীয় নেতাদের সঙ্গে তার মনোমালিন্য প্রবলভাবে লক্ষ করা যায়। যাই হোক, মুজিবুর রহমান কলকাতার ছাত্ররাজনীতি থেকে নিজের যে জয়যাত্রা সূচনা করেছিলেন তার চূড়ান্ত সাফল্য পরিলক্ষিত হয় যখন তিনি একটি স্বাধীন দেশের জাতির জনক হিসেবে গৌরবান্বিত হন। তিনি হলেন সবার আদরের শ্রদ্ধার সম্মানের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়





