অর্থাৎ কোনো একটি দেশের অর্থনীতির নিরবচ্ছিন্ন, টেকসই ও যুক্তিসংগত মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা পরিমাপক হিসেবে এ কাঠামো ব্যবহৃত হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তায় ব্যবহৃত প্রাপ্যতা (অ্যাভেইলেবিলিটি) শব্দটি জ্বালানি সম্পদের উপস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর জন্য নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, জ্বালানি আমদানির বিভিন্ন উৎস তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।

জ্বালানি নিরাপত্তায় নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা থাকলেও অনুসন্ধান, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছার অভাবের কারণে গত দুই দশকের বেশি সময় তা করা যায়নি বাংলাদেশে। যে কারণে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে, বেড়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি।

দ্বিতীয়ত, অভিগম্যতা (অ্যাকসেসিবিলিটি)। এ পণ্যটি শুধু থাকলেই হবে না। তা ভোক্তার কাছে সহজলভ্য ও পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো সক্ষমতা থাকতে হবে। যাতে ভৌগোলিক বা কারিগরি কোনো কারণে জ্বালানি সরবরাহে ভোক্তাকে ভোগান্তি পোহাতে না হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তায় ক্রয়ক্ষমতা (অ্যাফোর্ডেবিলিটি) অর্থাৎ পণ্যটি যাতে ভোক্তা সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। যেখানে ভোক্তার ওপর কোনো ধরনের বিরূপ প্রভাব না ফেলে তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যটি পেতে পারে। আর চতুর্থ বিষয়টি হলো গ্রহণযোগ্যতা বা (অ্যাকসেপ্টেবিলিটি)—এক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি ব্যবহার বা উৎপাদন কিংবা আমদানি করলেই হবে না, জ্বালানি পণ্যটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনসমর্থন, পরিবেশগত জটিলতা না থাকা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ছাড়াই সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এশিয়া প্যাসিফিক এনার্জি রিসার্চের বিকশিত এই কাঠামো বাংলােদশের ক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধ। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর এ জ্বালানি আমদানি করতে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু বিপুল পরিমাণ আমদানির কারণে জ্বালানি নিরাপত্তায় ব্যবহৃত ফোর এ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অবকাঠামো ও কারিগরি ত্রুটির কারণে দেেশ জ্বালানি সহজলভ্য নয়। আমদানি করা এ জ্বালানিতে সরকারের ভর্তুকির পরও গ্যাসের ঘাটতি দেশের শিল্প খাত থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক খাতগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় আকারে হুমকি তৈরি করেছে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের আমদানিনির্ভর চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। যে কারণে এসব দেশ আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে না পারায় এখনো আমদানি জ্বালানির ওপর বড় আকারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে মূলত তেল, কয়লা, এলএনজি ও এলপিজি আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে প্রতি বছর জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এ আমদানিতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিপুল পরিমাণ এ জ্বালানি তেলের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রতি বছর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি কোম্পানি থেকে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এছাড়া গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার। আর এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে আরো ৫৯ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ১৪ কোটি টাকা।

দেশে স্থানীয় গ্যাস খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে দেশে গ্যাস খাতে অনুসন্ধান ব্যতিরেকে আমদানিনির্ভরতাকে বেশি বাড়িয়ে তোলা হয়েছিল। যে কারণে স্থানীয় গ্যাস খাতে বড় কোনো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করা যায়নি। অন্যদিকে দেশের গ্যাস সংকটে সহজ সমাধান হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এই এলএনজি আমদানি শুরুতে ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে পেট্রোবাংলা গ্যাস উন্নয়ন তহবিল, বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকার বেশি এলএনজি কেনা হয়েছে। এ সময়ে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতি বছর এলএনজি আমদানিতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হলেও এ অর্থের পরিমাণ এখন দ্বিগুণের বেশি লাগছে। গত অর্থবছরে এলএনজিতে সরকার ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৭ সালে গ্যাসের মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় গ্যাস খাতে বড় বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে গ্যাস সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়া হয়। আওয়ামী আমলের ১৫ বছরের বেশি সময় অনিয়ম ও লুটপাটের একটি বড় ক্ষেত্র ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার অনিয়ম-দুর্নীতির কথা উঠে আসে।

দেশে বর্তমানে সাত হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। বিপুল পরিমাণ এ উৎপাদন সক্ষমতার ৯০ শতাংশ জ্বালানি (কয়লা) বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে প্রতি বছর অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা কয়লা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে সরকারের। অথচ দেশের ভূগর্ভস্থ বিপুল পরিমাণ কয়লা সম্পদ বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে। এ কয়লা সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে বিগত সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কীভাবে এ সম্পদ দেশের কল্যাণে ব্যবহার করে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায় সেই বিষয়ে আজও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি।