১৯৭১-৭২ সালে দৈনিক ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট, ২০১৬-১৭ সালে দৈনিক ২৬৭১ মিলিয়ন ঘনফুট হয়ে ২০২৫-২৬-এ দৈনিক উৎপাদন নেমেছে ১ হাজার ৭১১ মিলিয়ন ঘনফুটে। দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় ২০১৮-১৯ থেকে লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস আমদানি শুরু হয়ে এখন দৈনিক কম-বেশি এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে আমদানি হচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পেট্রোবাংলার দেড়শ কূপ খনন পরিকল্পনার কিছু অগ্রগতি হলেও তার ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। অফশোর বিডিং সফল করার জন্য জরুরি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থলভাগে আগ্রাসী অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে হবে।
বিগত আট মাসে তরল জ্বালানি খাত আমাদের বেশকিছু বিরূপ অভিজ্ঞতা দিয়েছে। বিশেষ করে নভেম্বর ২০২৫ থেকে এলপিজি বা লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধজনিত কারণে হরমুজ প্রণালি সমুদ্র পথের অনিশ্চয়তা, আকাশচুম্বী জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ, লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহ লাইনে বিচ্ছিন্নতায় উচ্চমূল্যে স্পট পারচেজ আর জ্বালানি তেল সরবরাহের মজুদ হ্রাসজনিত বিশৃঙ্খলা আমরা দেখেছি। হরমুজ প্রণালি মুক্ত হতে হতে আবার অবরুদ্ধ। এ সময়ে চেষ্টা হয়েছে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কিন্তু এ বিকল্প উৎসও সীমিত। তবে এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। অতি দ্রুত মজুদক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্বিতীয় রিফাইনারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও এলপিজি বাজারে সরকারের হিস্যা বৃদ্ধি জরুরি।
বিদ্যুতে আমাদের বাড়তি উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এ বাড়তি উৎপাদনক্ষমতা সম্পদের পরিবর্তে আমাদের বোঝায় রূপান্তরিত হয়েছে। ক্যাপটিভসহ বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩৪ হাজার মেগাওয়াট, যা চাহিদার চেয়ে ১০০% বেশি অথচ ২০% বাড়তি উৎপাদন ক্ষমতাতেই চাহিদা মেটানো যেত।৷ বাড়তি উৎপাদনক্ষমতার জন্য বাড়তি ক্যাপটিভ চার্জ সরকার ও জনগণের জন্য বাড়তি বোঝায় পরিণত হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৪০০ মেগাওয়াট এবং সরকার ঘোষিত ভবিষ্যতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এখন আমাদের অতি সতর্কতার সঙ্গে উচ্চমূল্যের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবসায়ন পরিকল্পনা করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যতের সমন্বিত বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎস হবে গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য এবং আমদানীকৃত বিদ্যুৎ। তরল জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আমাদের সতর্ক পরিকল্পনার সঙ্গে পিপিএ-গুলো পুনরায় দরকষাকষি করে স্বল্পতম সময়ে এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
এ সময়ের সবচেয়ে বড় গেম চেঞ্জার হলো বাজেট ২০২৬-২৭। চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যেমন নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তেমনই অর্থ আইন ২০২৬-এ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি নীতিসহায়তা দিয়েছেন। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সব মূল উপাদানের ওপর জুন ২০৩১ পর্যন্ত শূন্য আমদানি শুল্ক ও কর এ সেক্টরকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রদত্ত নীতিসহায়তা বিবেচনা করে একে অনায়াসে গ্রিন বাজেট বলে আখ্যায়িত করা যায়। এ মুহূর্তে আমাদের ট্র্যাডিশনাল জ্বালানিভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোনো প্রয়োজন নেই। এ মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১০ হাজার মেগাওয়াটের রিনিউয়েবল, যা প্রধানত সৌরবিদ্যুৎ, লক্ষ্য অর্জন করা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেই আমি জানি।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে লক্ষ্য অর্জনে করণীয় :
১. লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা/রোডম্যাপ প্ৰণয়ন;
২. লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি মনিটরিং করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে একটি টাস্কফোর্স গঠন;
৩. অর্থ আইন ২০২৭-এ বর্ণিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে নীতিসহায়তা এবং স্টোরেজ ব্যাটারিসহ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার ঝামেলামুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা,
৪. মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টগুলোকে বিদ্যমান ট্যারিফে সঞ্চালন সুযোগ প্রদান করা;
৫. মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টগুলোকে স্বাভাবিক বিতরণ ব্যয় চার্জ করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের দায় থেকে রক্ষা করা;
৬. সঞ্চালন লাইন থেকে সরাসরি বা বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে ভোক্তার স্থাপনায় মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টের বিদ্যুৎ সরবরাহ;
৭. ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনে রুফটপ সোলারের ক্ষেত্রে এটি ভোক্তার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেয়া,
৮) বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের রুফটপ সোলারের একাধিক বাণিজ্যিক মডেল তৈরি করা ও ঢাকা মহনগরীর সব অ্যাপার্টমেন্ট হাউজকে এর বাস্তবায়নে উৎসাহ দেয়া;
৯) গ্রিড ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তান থেকে অভিজ্ঞতা নেয়া,
১০) শ্রেডাকে দায়িত্ব পালনে অধিকতর সক্ষম করে তোলা।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে আমাদের প্রত্যাশিত অর্জন আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে, পরিবেশবিষয়ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় আমাদের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।





