দেশের উচ্চশিক্ষায় একটি বড় অংশীদার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষার মানের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান কেমন বলে মনে করেন?
সরকারি কিংবা বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই তুলনামূলক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় একজনও অধ্যাপক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। তবে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় আবার খুবই ভালো করেছে। শিক্ষা-গবেষণা সবকিছুতেই তারা এগিয়ে আছে। শিক্ষার মান বিবেচনা করলে তারা আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষাই নিশ্চিত করছে বলা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে আমাদের কাছেও অ্যাক্রেডিটেশনের আবেদন করেছে এবং তাদের অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের প্রক্রিয়াও চলছে।
মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আপনারা অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমরা অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের বিষয়ে বেশ আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। তুলনামূলক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এ আগ্রহ কম। এর একটি কারণ হতে পারে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীরা আরো বেশি আগ্রহ হবে এবং যখন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তুলনা হবে তখন তারা অ্যাক্রেডিটেশনধারী বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে রাখবে। এসব কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যমে এগিয়ে থাকতে চাচ্ছে। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয় নেই, ফলে তাদের আগ্রহ কম। তবে শিক্ষার্থীদের অর্জিত ডিগ্রির যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য পাবলিক-প্রাইভেট সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট প্রয়োজন। কারণ আমাদের অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেটে এটা বোঝাবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কোর্স মানসম্মত শিক্ষার সব শর্ত পূরণ করেছে এবং এখানকার শিক্ষার্থীরা মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে অনেক সময় শ্রমবাজারে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয় সেটি ঘটবে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন পেতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল কীভাবে ভূমিকা পালন করছে?
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৭-এর ১০ (ছ) ধারায় আন্তঃরাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনা ও সহায়তার মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স এজেন্সির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স, রাশিয়ার ন্যাশনাল সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাক্রেডিটেশন, ইন্দোনেশিয়ার অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর এডুকেশন, কাজাখস্তানের ইনডিপেনডেন্ট এজেন্সি ফর অ্যাক্রেডিটেশন অ্যান্ড রেটিংসহ আরো বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আমরা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। এসব প্রতিষ্ঠান আমাদের স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ হলো আমরা যাদের অ্যাক্রেডিটেশন প্রদান করব তারা সেটি গ্রহণ করবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোলাবরেশন আরো বাড়বে এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের কাউন্সিল নতুন, তাই আমাদের সবকিছুই নতুনভাবে প্রস্তুত করতে হয়েছে। আবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তো এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী তাদেরও প্রস্তুত হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা তাদের সহযোগিতা দিচ্ছি।
অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের ক্ষেত্রে আপনারা কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন?
অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের ১০টি প্রধান শর্ত রয়েছে। এ শর্তগুলোর মধ্যে আবার অনেক ছোট ছোট শর্ত রয়েছে। এই ১০টি শর্তের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন পদ্ধতি, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা, কারিকুলাম, শিখন-শেখানো-মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও সহযোগিতা কার্যক্রম, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, গবেষণা ও মেধাবৃত্তিক কার্যক্রম, মনিটরিং, মূল্যায়ন ও ধারাবাহিক উন্নয়নের মতো বিষয় রয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বিভাগগুলোকে উপযুক্ত পরিচালনা, দক্ষ নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা, আউটকাম বেজড কারিকুলাম, যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক-কর্মকর্তা, পর্যাপ্ত গবেষণা ও মেধাবৃত্তিক কার্যক্রম এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো জোরালো অবস্থান তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
এরই মধ্যে আমাদের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ সুপরিচিত। সাধারণত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেধাবী ও দক্ষতাসম্পন্নরা সবসময়ই মূল্যায়িত হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের জোরালো অবস্থান তৈরি করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যাতে তাদের শিক্ষার্থীরা আধুনিক শ্রমবাজারের সঙ্গে তা মিলিয়ে যথাযথ দক্ষতা, যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। আর এজন্য তাদের যোগ্য শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ, দক্ষ প্রশাসন, পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রেণীকক্ষ, গবেষণাগার, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোলাবরেশনসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের নীতিমালা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অ্যাক্রেডিটেশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে এবং আমাদের অ্যাক্রেডিটেশনের শর্তাবলিতে এ সবকিছুই উল্লেখ রয়েছে। যারা আমাদের অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণ করবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথ মূল্যায়ন লাভে অ্যাক্রেডিটেশন তাদের জন্য বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।










