বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি আমাদের শ্রমিকরা। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে শিল্প, কৃষি, সেবা ও রফতানি খাতকে সচল রেখেছেন। আজ আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ, প্রবাসী আয়ে অন্যতম শীর্ষ দেশ এবং শিল্পোন্নয়নের ধারায় দ্রুত অগ্রসরমান। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর ঘাম ও শ্রম। তবে স্বীকার করতে হবে আমাদের শ্রম ও কর্মসংস্থান খাত এবং নৌ-পরিবহন অবকাঠামো এখনো নানা চ্যালেঞ্জে ঘেরা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি বিভিন্ন সভা, সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক বক্তব্য রেখেছি। আজ সেসব আলোচনাকে একত্রিত করে বাংলাদেশের শ্রম, কর্মসংস্থান ও নৌ-পরিবহন খাতের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরছি।

২০০৬ সালে প্রণয়ন করা শ্রম আইন বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের বর্তমান বাস্তবতায় সময়োপযোগী করা এখন অপরিহার্য। তাই আমরা শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। সংশোধিত আইনে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য কঠোর ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে শাস্তি বহুগুণ বাড়ানো হবে।

আমরা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করেছি, যা শিশুদের কাজে নিয়োজিত না করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একই সঙ্গে কনভেনশন ১৫৫, ১৮৭ ও ১৯০ অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া চলছে, যাতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত হয়। এ প্রক্রিয়ায় আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাকশন প্ল্যান ও আইএলওর পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আধুনিক শ্রম আইনই হবে আমাদের শ্রম খাতের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার।

বাংলাদেশে শিশুশ্রম একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এ বাস্তবতা আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। শিশুশ্রম শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকি।

আমরা এ সমস্যা নিরসনে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছি। শুধু আইন নয়, বাস্তব পদক্ষেপেও জোর দিচ্ছি। শিক্ষা প্রসার, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি—এসবের মাধ্যমে শিশুশ্রম হ্রাস করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুশ্রমের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে, যাতে সমস্যার প্রকৃত মাত্রা বোঝা যায় এবং কার্যকর সমাধান টানা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশী শ্রমিকরা আমাদের রফতানি আয়ের মূল ভিত্তি তৈরি করেছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা দেশের সাফল্যে অসামান্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমি বারবার আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আহ্বান জানিয়েছি, তারা যেন আমাদের শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য প্রদান করেন। সস্তা দামে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা শ্রমিকের জীবনমানকে নিচে নামিয়ে আনে। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি আমাদের পণ্যের প্রকৃত মূল্যনির্ধারণ করা হয়, তবে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পাবেন এবং শিল্পও স্থায়ীভাবে লাভবান হবে।

শ্রমিকের ন্যায্য বেতন-ভাতা আদায়ে সরকার সবসময় সচেষ্ট। সম্প্রতি মালিকদের বকেয়া পরিশোধে সহায়তা করতে সরকার সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করেছে। তবে তাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা এ ঋণ ফেরত দেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। শ্রমিকের পাওনা মজুরি আদায়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এ বিষয়ে সরকার আপসহীন।

আমরা দেখেছি, কিছু অসাধু মালিক বিদেশে অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে কারখানা স্থাপন করেন। পরে হঠাৎ করে কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের বকেয়া না দিয়েই পালিয়ে যান। এটি শ্রমিকের জীবনে চরম দুর্ভোগ তৈরি করে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। আমি প্রকাশ্যে সতর্ক করেছি, এ ধরনের অনিয়ম আর বরদাস্ত করা হবে না। নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শ্রম খাতের যেকোনো সংস্কার কেবল কাগজে-কলমে সফল হতে পারে না; এজন্য শ্রমিক, মালিক ও সরকারের সমন্বয় অপরিহার্য। এ কারণেই আমি নিজে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ কমিটির বৈঠক পরিচালনা করি। এখানে আমরা তিন পক্ষের মতামত শুনি এবং সমাধান খুঁজি। আমি বিশ্বাস করি, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, মালিকের ব্যবসার স্বার্থ ও সরকারের নীতিগত দায়িত্ব এ তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই টেকসই সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশের তরুণরা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই আমার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সম্প্রতি রাজশাহীতে নতুন একটি কারখানা চালু হয়েছে, যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে প্রসারিত করা হবে।

একই সঙ্গে আমরা কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছি। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে আমাদের তরুণদের আধুনিক দক্ষতায় সজ্জিত হতে হবে। এজন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের শ্রম খাত কেবল জাতীয় ইস্যু নয়, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রফতানি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে আমি বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও ধারাবাহিক আলোচনায় রয়েছি। আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে আমি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানিয়েছি, আমরা শ্রম অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি।

আমি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও কাজ করার সুবাদে বন্দর ও স্থল-পোর্ট ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছি। আমরা অপ্রয়োজনীয় ও লোকসানগ্রস্ত স্থলবন্দর বন্ধ করে এগুলোকে কার্যকর ও আয়সংক্রান্ত করা, আর প্রয়োজনীয় পোর্টগুলো সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ করেই দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গতিশীল করতে চাই। উদাহরণস্বরূপ, সোনামসজিদ ল্যান্ড পোর্টের সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি এবং হিলি, ঘুমদুমসহ সম্ভাব্য কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে কাজ চালাচ্ছি, যাতে সীমান্ত ট্রেডে সময় ও খরচ কমে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লাভবান হন।

এছাড়া আমরা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছি, বিশেষ করে বন্দর অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও ডকইয়ার্ড নির্মাণ এবং জাহাজ ক্রয়ে বিনিয়োগকারী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াচ্ছি। মাতারবাড়ী ডিপ-সি পোর্টে আন্তর্জাতিক মানের ডকইয়ার্ড গঠনের পরিকল্পনা ও বিদেশী সহায়তা গ্রহণের উদ্যোগ চলছে; একইভাবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ক্রয়ের জন্য চীনসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় কাজ করছে। এসব উদ্যোগ সম্পন্ন হলে আমাদের নৌ-পরিবহন খাতে সক্ষমতা বেড়ে যাবে এবং রফতানিমুখী শিল্পের সাপ্লাইচেইনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ এখন একটি জনমিতিক সুবিধার সময় অতিক্রম করছে। আমাদের বিপুলসংখ্যক তরুণ আগামী দিনের শ্রমবাজারের প্রধান শক্তি। তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও। এজন্য ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রেও আমরা বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

আমাদের অগ্রাধিকার স্পষ্ট। এসব অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শ্রম আইনকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা। শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করা। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করা। বকেয়া মজুরি আদায়ে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা। শ্রমিক-মালিক-সরকারের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় শক্তিশালী করা। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন। অকার্যকর বন্দর সংস্কার ও কার্যকর বন্দর আধুনিকীকরণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ডিপ-সি পোর্ট উদ্যোগ বাস্তবায়ন। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করা।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সরকার, মালিক, শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেই নয়, শ্রম অধিকার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নৌ-পরিবহন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

লেখক: উপদেষ্টা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়