অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে। দেশে বড় বিনিয়োগ ও সম্ভাবনার জায়গা এলপিজি খাত। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ খাতে বিনিয়োগ পরিবেশ কেমন দেখছেন?

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর বড় একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো এলপিজি খাত। বর্তমানে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ও নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় রান্না, পরিবহন ও শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে মোট এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হচ্ছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এলপিজি খাতের সম্ভাবনা আরো বাড়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর, আমদানি টার্মিনাল, সিলিন্ডার রিটেস্টিং ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের দরকার রয়েছে। সরকারও কর সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ট্যারিফ নীতিতে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করছে, যা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা মান নিশ্চিতকরণ এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—এ বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে।

সব মিলিয়ে এলপিজি খাতে বিনিয়োগ পরিবেশ এখন আশাব্যঞ্জক হলেও দীর্ঘমেয়াদে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন হবে টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।

দেশের এলপিজি অবকাঠামো বৃহৎ আকারে প্রসারিত করার জন্য সরকার ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি হিসেবে সরকারের এ উদ্যোগকে ওমেরা কীভাবে দেখছে? কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা আছে কিনা?

আমাদের দৃষ্টিতে সরকারের এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদা গত কয়েক বছরে বহুগুণ বেড়েছে এবং আগামী দিনগুলোতেও এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। বৃহদাকারে আমদানি ও সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

ওমেরা সবসময়ই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছে। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সেক্টরের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছি। এর ফলে আমদানি ব্যয় হ্রাস, সাপ্লাই চেইন আরো নিরবচ্ছিন্ন করা এবং ভোক্তাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এলপিজি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিষয়ে বলতে গেলে, আমরা এরই মধ্যে ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানি অবকাঠামোয় অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওমেরা আগামীর এলপিজি চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত।

এছাড়া বাংলাদেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নব্বইয়ের দশকে ব্যবসা শুরু করলেও সিলিন্ডার রিটেস্টিংয়ের জন্য দেশে যথেষ্ট অবকাঠামো না থাকায় নির্দিষ্ট সময় পরপর যে সিলিন্ডার রিটেস্টিং ও রিকোয়ালিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে সে অনুযায়ী সিলিন্ডারগুলো রিটেস্টিং করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি এলপিজি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র ওমেরাই দেশে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে দেশের দুই প্রান্তে (হবিগঞ্জ ও মোংলা ) দুটি সিলিন্ডার রিটেস্টিং ও রিকোয়ালিফিকেশন ফ্যাসিলিটি স্থাপন করেছে, যেখানে ওমেরার সিলিন্ডারের পাশাপাশি অন্যান্য এলপিজি প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডার রিটেস্টিং ও রিকোয়ালিফিকেশন করা হচ্ছে।

বাসাবাড়ি, অটোগ্যাস পেরিয়ে শিল্পে এখন এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প মালিকরা এলপিজি অবকাঠামো গড়ে তুলছেন। এ বিনিয়োগ অবকাঠামোয় বেসরকারি খাত কীভাবে অংশগ্রহণ করছে? শিল্পে এলপিজির বাজার বৃদ্ধির সম্ভবনা আগামীতে কতটুকু?

এখন এলপিজি শুধু রান্নার গ্যাস বা অটোগ্যাসেই সীমাবদ্ধ নেই; শিল্প খাতেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প মালিক বাধ্য হয়ে এলপিজি অবকাঠামো স্থাপন করছেন। ফলে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া ডিজেলের তুলনায় এলপিজি প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি সাশ্রয়ী হওয়ায় যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল ব্যবহার করত, তারাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছে।

বেসরকারি খাত এ অবকাঠামো উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করছে। কোম্পানিগুলো শিল্প গ্রাহকদের জন্য বাল্ক স্টোরেজ ট্যাংক, ভেপোরাইজার, এসএনজি ডিভাইস, নিরাপদ পাইপলাইন সংযোগ, নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা ও সেফটি সলিউশন দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এলপিজি অপারেটররা শিল্প মালিকদের সঙ্গে জয়েন্ট ইনভেস্টমেন্ট মডেলে কাজ করছেন, যাতে শিল্প খাতে সহজে অবকাঠামো স্থাপন হয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনেক বড়। বর্তমানে শিল্প খাতে দেশের মোট এলপিজি ব্যবহারের অংশ ১২-১৫ শতাংশ হলেও পাঁচ বছরের মধ্যে এটি ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আমরা মনে করি। কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন সংযোগ না থাকায় শিল্পের বড় অংশকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হবে। এর ফলে এ বাজার বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি দ্রুতবর্ধনশীল ও স্থিতিশীল সেগমেন্ট হয়ে উঠছে।

বেসরকারি খাতের হাত ধরে এলপিজির বাজার প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন খাতে সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে এলপিজি বাজার মূলত বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

প্রথমত, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা জরুরি। গভীর সমুদ্রবন্দর, ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল ও পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা ও যৌথ বিনিয়োগ দরকার। এতে আমদানি ব্যয় কমবে এবং সরবরাহ আরো স্থিতিশীল হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে, যাদের অনেকেই নিরাপত্তা মান যথাযথভাবে মানছে না। এখানে কঠোর মনিটরিং ও স্ট্যান্ডার্ড এনফোর্সমেন্ট প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, আর্থিক ও কর কাঠামো সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পুনঃতফসিল, সুদহার যৌক্তিক করা ও কর সুবিধা প্রদান করলে খাতটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি পাবে।

সবশেষে ডলার সংকট ও আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নীতি দরকার।

সংক্ষেপে বলা যায়, স্বচ্ছ নীতি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ও আর্থিক সংস্কার—চারটি স্তম্ভই এলপিজি খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগকে টেকসই করে তুলবে।

এলপিজি শিল্পে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান ঘটেছে। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। আগামীতে এ খাতের অর্থনৈতিক আকার বড় হলে কী পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান ঘটতে পারে?

এলপিজি শিল্প বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্ত খুলেছে। এরই মধ্যে এ খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এলপিজি ইম্পোর্ট টার্মিনাল, সিলিন্ডার উৎপাদন কারখানা, পরিবহন, বিতরণ নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত—এ ভ্যালু চেইনে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে এলপিজি বাজারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। আগামী পাঁচ-সাত বছরে এ চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে ৩০ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। বাজারের এ প্রবৃদ্ধি ঘটলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রায় দ্বিগুণ হবে।

এছাড়া শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার কারণে দক্ষ টেকনিশিয়ান, সেফটি এক্সপার্ট, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে আরো হাজার হাজার নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বেকারত্ব নিরসন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এলপিজি খাত বড় অবদান রাখবে।

আমাদের বিশ্বাস, সঠিক নীতিসহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এলপিজি আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে পরিণত হবে।