বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল পলিমার কী ধরনের ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে? সমাধানগুলো কী হতে পারে?
বর্তমানে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামালের দামের অস্থিরতা এবং ডলার সংকট, যার ফলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাজারে চাহিদা আগের মতো নেই। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কাঁচামালের উৎস বহুমুখী করেছি। ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টে আধুনিক কৌশল নিয়েছি এবং উৎপাদনে এনার্জি–সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। সবচেয়ে বড় কথা, গুণ-মানের সঙ্গে আপস না করে বাজারে আমাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সরবরাহ চেইন সমস্যা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামা—এগুলো কোম্পানির উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলেছে?
সরবরাহ চেইনের জটিলতায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং শিপমেন্ট সময়ও দীর্ঘ হয়েছে। পিভিসি ও সিপিভিসি রেজিনের দামের ওঠানামা সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। রফতানিতেও আমরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, বিশেষ করে ফ্রেইট খরচ ও ট্রানজিট সময় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিশ্রুত ডেলিভারিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ থাকায় ভারতীয় বাজারে পণ্য পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। তবে আমরা ভারতের বাইরে আরো বিভিন্ন দেশে রফতানি সম্প্রসারণ করেছি। পাশাপাশি আগাম কাঁচামাল চুক্তি, পাক্ষিক ভিত্তিতে ডিমান্ড–সাপ্লাই পর্যালোচনা ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব প্রভাব সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি।
ভবিষ্যতে নতুন পণ্য, প্রযুক্তি বা বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সম্পর্কে আপনারা কী ভাবছেন এবং কোন খাতগুলোয় বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা দেখছেন?
আমাদের বিশ্বাস, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সমাধানের চাহিদা ভবিষ্যতে আরো দ্রুত বাড়বে। তাই আমরা হাই-প্রেসার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাইপ, ইকো-ফ্রেন্ডলি গ্রিন বিল্ডিং সমর্থিত পাইপ, দীর্ঘস্থায়ী কম্পোজিট পাইপ, স্মার্ট ওয়াটার ট্যাংক (লেভেল মনিটরিং সুবিধাসহ), সোলার এনার্জিভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষির জন্য বিশেষায়িত সেচ পাইপ বাজারে আনার পরিকল্পনা করছি।
উৎপাদন প্রক্রিয়া আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আমরা আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম চালু করছি। এটি মান নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বাড়াবে। আমাদের দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, টেকসই নির্মাণসামগ্রী, কৃষি সেচ অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমর্থিত সমাধান খাতে।
ন্যাশনাল পলিমার কর্মী সংখ্যা ও দক্ষ মানবসম্পদ বৃদ্ধির জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, বিশেষ করে নতুন উৎপাদন ইউনিট বা ট্রেডিং সাবসিডিয়ারির প্রসঙ্গে?
আমাদের নিজস্ব ইন-হাউজ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে কর্মীদের প্রযুক্তি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও সেফটি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আনতে ইন্টার্নশিপ ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। ডিলার ও সেলস টিমকেও প্রডাক্ট নলেজ ও ডিজিটাল সেলস টুলসে দক্ষ করা হচ্ছে। নতুন উৎপাদন ইউনিট ও ট্রেডিং সাবসিডিয়ারির জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের ওপর আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আপনারা কতটা সহায়ক মনে করছেন এবং বিদেশী বা স্থানীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে কোন নীতি বা অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন?
বাংলাদেশে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস বাজারের পরিসর অনেক বড়। সঙ্গে তরুণ কর্মশক্তি থাকায় সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ইতিবাচক। অবকাঠামোতেও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে আরো সহায়ক করতে হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে নির্ভরযোগ্যতা আনতে হবে এবং মূল্য সমন্বয়ে পূর্বঘোষিত রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হবে। আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের জন্য সমতাভিত্তিক শুল্ক ও ভ্যাট নীতি প্রয়োজন। এছাড়া বন্দরের ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্স ও দ্রুত কনটেইনার মুভমেন্ট নিশ্চিত হলে বিদেশী ও স্থানীয় উভয় বিনিয়োগ আরো উৎসাহিত হবে।
গত এক বছরে বাংলাদেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশ ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবসার ওপর কী প্রভাব ফেলেছে এবং আপনারা কী ধরনের মূল্যায়ন করেছেন?
গত এক বছরে নির্মাণ ও হাউজিং সেক্টরে ধীরগতি আমাদের ব্যবসায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তবে নিরাপদ পানির চাহিদা এবং রিপ্লেসমেন্ট ডিমান্ড তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও আমরা দক্ষতা বাড়ানো, স্ক্র্যাপ রিসাইক্লিং ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবসার ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো চ্যালেঞ্জ থাকলেও ব্যবসার ভিত্তি শক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি ফিরে আসবে।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য সরকারের কোন নীতি বা কাঠামোগত সংস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মতে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, কর ও ভ্যাট কাঠামোকে সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করা। তৃতীয়ত, নন–কমপ্লায়েন্ট পণ্য নিয়ন্ত্রণে স্ট্যান্ডার্ডস এনফোর্সমেন্ট জোরদার করা। পাশাপাশি লজিস্টিকস ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল হলে ব্যবসা আরো সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কোম্পানি কীভাবে ব্যবসার পাশাপাশি সমাজে অবদান রাখছে এবং ভবিষ্যতে এগুলোকে কীভাবে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে?
আমরা রুফটপ সোলার, এনার্জি–সাশ্রয়ী মোটর ও প্রসেস হিট রিকভারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছি। শতভাগ ইন-হাউজ স্ক্র্যাপ রিসাইকেল করি। আমাদের ওয়াটার ট্যাংক ও পাইপ সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে পানির অপচয় কম হয়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও শিক্ষায় সহায়তা দিচ্ছি। ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো প্রতিটি টিন উৎপাদনে কার্বন ইন্টেনসিটি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ইএসজি রিপোর্ট প্রকাশ করা। উল্লেখযোগ্যভাবে এনপলি গ্রুপের ভালুকা ফ্যাক্টরি এরই মধ্যে দুবার গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে, আর টঙ্গী ও ভালুকা কারখানায় ইটিপি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কর্মীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আমরা নিজস্ব ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রেখেছি।










