বিএসআরএমের বর্তমান বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কেমন এবং কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে এখন?

বর্তমানে আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। দেশের অর্থনীতি কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের পুরো শিল্প খাতে, বিশেষত ইস্পাতে। বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। অথচ এ ইস্পাত খাতে আমরা আগে থেকেই উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়েছি, নতুনভাবে বিনিয়োগ করেছি। বাজারে চাহিদা না থাকায় উৎপাদনক্ষমতাকে শতভাগ ব্যবহার করতে পারছি না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও যতটুকু জানি একই পরিস্থিতি। ক্যাপাসিটি বাড়াতে গিয়ে এখন সেটি ওভার ক্যাপাসিটি হয়ে গেছে। ফলে বাজারে এখন কোম্পানিগুলোর মধ্যে দাম নিয়ে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া দেশে চলমান নানান সংকট, রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে এ ইস্পাত শিল্পে যে গতি তৈরি হয়েছিল, সেই মোমেন্টাম ভেঙে গেছে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে কি?

বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের যেসব দরকারি প্রকল্প ছিল সেগুলো চালু করলে সংকট কাটবে। করছাড় কমে গেছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে কর বাড়ানোও হয়েছে। আমরা মনে করি সরকারের কর আদায় বাড়াতে হলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। সড়ক, অবকাঠামো, ব্রিজ এসব প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন হলে ইস্পাতের চাহিদা বাড়বে, আমাদের উৎপাদনও বাড়বে।

গত এক বছরে আপনি বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের পুরো প্রাইভেট সেক্টর এখন কিছুটা ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে। সবাই অপেক্ষা করছে নির্বাচন কীভাবে হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয় তা দেখার জন্য। বিশ্বজুড়েই দেখা যায়, অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগ থমকে যায়। যখনই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় এবং স্থিতিশীলতা ফেরে তখন আবার বিনিয়োগ বাড়ে। সেই সুসময়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি কীভাবে আপনাদের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে?

অন্তর্বর্তী সরকার এখানে তুলনামূলক ভালো করেছে। গ্যাসের দাম যতটা বাড়ানোর কথা ছিল, অন্তত তা বাড়ানো হয়নি। বর্তমান অবস্থা যদি বজায় থাকে, তবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। তবে খরচ যদি আরো বেড়ে যায়, তাহলে শিল্পে চাপ আরো বাড়বে।

রফতানির পরিস্থিতি নিয়ে বলুন।

রফতানি করতে হলে অবশ্যই প্রণোদনা চালু রাখতে হবে। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ অনেক বেশি। আমাদের ফ্রেইড কস্ট প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। এর কারণে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়ি। তবে উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষ। সরকার যদি লজিস্টিকস খাতে উন্নয়ন ঘটায়, তাহলে আমরা রফতানিতে অনেক ভালো করতে পারব। কারণ রফতানিতে আমাদের কিন্তু অনেক সক্ষমতা আছে। এখানে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিক খরচের কারণে আমাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ।

বিএসআরএমের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

আমরা নতুন কারখানার মাধ্যমে রড উৎপাদনের মধ্যবর্তী কাঁচামাল বিলেটের উৎপাদনক্ষমতার সম্প্রসারণ করেছি। এতে বছরে উৎপাদনক্ষমতাও বেড়ে ২৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের পর বিলেট ও লং স্টিল মিলিয়ে এ ক্ষমতাই ব্যবহার করছি। নতুন কারখানায় দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি করছি তারজাতীয় রড, যা ওয়্যার রড নামে পরিচিত। নাট, বল্টু, স্ক্রু, ঝালাই করার উপকরণ, যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির মধ্যবর্তী কাঁচামাল হিসেবে ওয়্যার রড ব্যবহার করা হয়। নতুন এ পণ্যে আগে শতভাগই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নতুন প্লান্ট চালু করার পর সেখানেই নিয়োগ চলছে। সামনে যদি আরো কিছু করতে চাই তার জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ তো থাকতে হবে। ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য আমাদের আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। ভবিষ্যতে যদি বাজারের অবস্থা ভালো হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ে, সরকার অবকাঠামোর দিকে আরো নজর দেয়, এমন ইঙ্গিত পেলে বিএসআরএম আরো বিনিয়োগ করবে এবং নতুন প্লান্ট চালু করবে। যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে, সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বাড়ে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প আরো বড় সাফল্য পাবে। আমাদের লক্ষ্য দেশের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

ইন্ডাস্ট্রিতে প্রযুক্তি ও অটোমেশনের ব্যবহারে কর্মসংস্থানে কেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন? বাংলাদেশের কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

এটা ঠিক ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের ধরন পরিবর্তিত হবে। হাতের কাজ কমে যাবে, সিস্টেম ও সফটওয়্যারনির্ভর কাজ বাড়বে। হাতের কাজের মান ও অটোমেটেড পণ্যের মান সম্পূর্ণ আলাদা। অটোমেডেট পণ্যের মান ও চাহিদা দুটোই বেশি থাকায় কর্মীদের নতুন স্কিল শেখাটা জরুরি। সরকার পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে পারলে এ দেশেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলংকার মতো দেশগুলোর পলিটেকনিক বা কারিগরি শিক্ষার পদ্ধতি অনেক উন্নত হওয়ায় তাদের শ্রমিকরা আরো বেশি দক্ষ। আমাদের দেশে স্কিল গ্যাপ একটা বড় সমস্যা। স্কিল লেভেল যদি মানসম্মত না হয় তাহলে দক্ষ জনশক্তির বড় একটা অভাব থেকেই যাবে। কাজের দক্ষতা তৈরি না হলে এ দেশে অটোমেটেড কাজের পরিবেশ সেভাবে তৈরি হবে না। আমাদের দেশে চলমান পলিটেকনিক শিক্ষায় নানান সীমাবদ্ধতাও কাটিয়ে উঠতে হবে। সেখান থেকে তাহলে দক্ষ জনবল মিলবে। সরকারের এ কারিগরি শিক্ষায় আরো কাজ করার সুযোগ আছে, যেটা আমাদের দেশের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পের কথা বলা হচ্ছে। দেশে প্রতি বছরই মূল্যস্ফীতি থাকবে এবং সেই সঙ্গে মজুরি বা বেতনও বাড়বে। ফলে সময়ের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বে যেভাবে হয়েছে, বাংলাদেশেও শিল্প খাতগুলো ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর হবে, স্বয়ংক্রিয়তা (অটোমেশন) বাড়বে এবং উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পে রূপ নেবে। যারা হাতে কাজ করে, তাদের যদি কম্পিউটারভিত্তিক কাজ শেখানো না হয়, তারা পিছিয়ে পড়বে। কারণ তখন কাজের ধরন হবে সিস্টেমভিত্তিক, যেখানে প্রতিদিন কিছু তথ্য কম্পিউটারে এন্ট্রি করতে হবে, যন্ত্র পরিচালনা করতে হবে, ডেটা সামলাতে হবে। যাদের এ ডিজিটাল বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকবে না, তারা চাকরির সুযোগ হারাবেন। দক্ষতা বৃদ্ধি করলে কেবল অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বিদেশে গিয়েও কর্মীরা ভালো বেতন পাবেন। যদি আমরা বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের দক্ষতা ৩০ শতাংশ বাড়াতে পারি, তাহলে তাদের আয়ও বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এখনই স্কিল ডেভেলপমেন্টে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা শিক্ষা খাতে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নত করতে না পারলে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ হারাব। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী এবং দক্ষতা উন্নয়নের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।