বর্তমানে ইস্পাতের ব্যবসায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে?
ইস্পাত খাত নিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি। প্রথমত, ভারী এ শিল্প খাতের চাঞ্চল্য আনতে দেশে অর্থনৈতিক গতি থাকতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ না আসায় এ শিল্প খাতে ধীরগতি নেমেছে। নতুন কোনো সরকারি বা বেসরকারি বড় বিনিয়োগ নেই। মেগা প্রকল্পগুলো এখন প্রায় স্থবির। চলমান প্রকল্পের যে কাজগুলো তাও ধীরগতিতে চলছে। ফলে এ প্রজেক্টগুলোর জন্য যে পরিমাণ ইস্পাত প্রয়োজন হতো, সেই চাহিদা এখন নেই। বিনিয়োগ কমে আসায় নতুন ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণের যে কাজগুলো ছিল সেটিও বন্ধ। একই সমস্যা আবাসন খাতেও। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ছোট আকারের ফ্ল্যাটে কিছুটা চাহিদা থাকলেও মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি হচ্ছে না। মানুষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সঞ্চয় ধরে রাখছে, ঝুঁকি নিচ্ছে না। ফলে ইস্পাত খাতের আরেকটি বড় বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সামনে নির্বাচন। কী হয় না হয়, নির্বাচন নিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এরও একটা প্রভাব বাজারে পড়েছে। সব মিলিয়ে পুরো ইস্পাত শিল্প এখন এক প্রকার স্থবির।
উৎপাদন ও বিক্রির দিক থেকে কারখানাগুলোর অবস্থা কেমন?
বর্তমানে বাজারে ক্রেতার চাহিদা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। বিক্রিও নেমেছে অর্ধেকে। ইস্পাত কারখানাগুলো বর্তমানে সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করছে। অথচ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত প্রায় সব কারখানা ফুল ক্যাপাসিটিতে চলত। বাজারে চাহিদা নেই বলে পণ্য উৎপাদন করেও তা বিক্রি হচ্ছে না। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, বাজারে যদি ১০০ টনের চাহিদা থাকে, সেখানে ১০ জন সরবরাহকারী একসঙ্গে সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে। ফলে দাম কমতে কমতে এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে যেখানে ক্রেতা লাভবান হলেও উৎপাদনকারী বড় অংকের লোকসান করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ শুধু দামের প্রতিযোগিতায় নেমে কেউ স্থায়ীভাবে বাজার ধরে রাখতে পারে না। আমাদের যেহেতু প্রডাকশন ক্যাপাসিটি অনেক বেশি অথচ বিক্রির চাহিদা অনেক কম। ব্যাংকের পেমেন্ট কিন্তু আমাকে দিতে হচ্ছে নিয়মিত। এখন ব্যাংকের সুদ যাতে না বাড়ে কিংবা সেখানে যাতে আস্থার সংকট না হয় সে কারণে ব্যাংকের পেমেন্টের জন্য লস দিয়ে হলেও বিক্রি চালু রাখতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। অন্যদিকে কোম্পানির বিশাল স্থায়ী খরচ (বিদ্যুৎ বিল, মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদ, শ্রমিকদের বেতন) চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিক্রি কমে যাওয়ায় সেই খরচ মেটানোর মতো আয়ের নিশ্চয়তা থাকছে না।
দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব কেমন পড়ছে?
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শত্রু। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় আছেন। তারা অপেক্ষা করছেন নির্বাচনের পর নতুন পরিস্থিতি কেমন হয় তা দেখার জন্য। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার যখন আসবে, তখন এমনিই অটোমেটিক দেশীয় যেসব বিনিয়োগকারী আছে, তাদের আস্থা ফিরে আসবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারী বা ফাইন্যান্স এজেন্সি যারা আছে তারাও বিনিয়োগ করতে চলে আসবেন। তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যারা ফান্ডিং করে তারাও দেশে বিনিয়োগে ভরসা পাবে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আবারো ঠিকঠাক হতে শুরু করবে। এটাই হলো ইকোনমিক সাইকেল।
গত এক বছরে বাংলাদেশের বিনিয়োগ নীতিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন বা সংস্কার খেয়াল করেছেন? এ পরিবর্তনগুলোর প্রভাব নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থিতিশীল সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা। দেশীয় বিনিয়োগ হোক বা বিদেশী বিনিয়োগ, সবাই প্রথমেই দেখে এই দুইটা বিষয় কতটা নিশ্চিত। গত এক বছরে কিছু সংস্কারের চেষ্টা দেখতে পেয়েছি, যেমন কিছু খাতে করছাড় দেয়া, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা দেয়ার প্রতিশ্রুতি। নীতিমালার বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা জানতে চান, দেশে যে পলিসি আছে সেটা কতটা পরিষ্কার, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই। অনেক সময় দেখা যায়, একটি সরকার এসে এক ধরনের নীতি নেয়, আরেক সরকার এলে সেটা পাল্টে দেয়। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়ে যান। আরো একটা বড় প্রশ্ন হলো লাভজনক হবে কিনা? বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সাধারণত তিনটি বিষয় ভালোভাবে খেয়াল করেন। প্রথমত, লাভ করা যাবে কিনা, দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছ এবং শেষটা হলো, লাভের টাকা নিরাপদে নেয়া যাবে কিনা। বর্তমান আইন সেই নিশ্চয়তা কতটা দেয়, সেটা তারা খুঁটিয়ে দেখে।
এছাড়া তারা দেশের অবকাঠামো, সড়ক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, জনবলের দক্ষতা, নিরাপত্তা ইত্যাদিও বিবেচনায় নেন। এখন যদি তারা দেখেন যে আমাদের অনেক ইন্ডাস্ট্রি লোকসানে আছে বা ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকতে পারছে না, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিরুৎসাহিত হবেন। একজন বিনিয়োগকারী প্রথমেই বিদ্যমান কারখানা, কোম্পানি আর প্রকল্পগুলো পর্যবেক্ষণ করে। যদি সেগুলো সমস্যায় থাকে তাহলে বিনিয়োগে তারা এগোবেন না। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের ফলে একটি বড় অংশ বিনিয়োগ থেকে সরে গেছে। সুতরাং বিনিয়োগের আগে একজন উদ্যোক্তা বা বিদেশী কোম্পানি শুধু একটা নীতি বা প্রণোদনা দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। তারা পুরো পরিবেশ, অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করেন। তার পরই সিদ্ধান্ত নেয় বিনিয়োগ করবেন কিনা।
করনীতি ও শুল্কনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে কর ও শুল্ক ব্যবস্থা রয়েছে, তা কি বাস্তবসম্মত?
এখনকার কর ও শুল্ক কাঠামো ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সত্যিই জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে মূলত দুটি দিক বেশি সমস্যাজনক। একটি হলো আমদানি শুল্ক, আরেকটি হলো আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স)। প্রথমে বলি অ্যাডভান্স আয়করের বিষয়ে। আগে ইস্পাত খাতে আমদানির সময় টনপ্রতি ৫০০ টাকা হারে আয়কর দিতে হতো। এবার সেটি বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। শুনতে সামান্য মনে হলেও এ খাতের বিশাল আমদানি ভলিউমের কারণে এ ১০০ টাকা বৃদ্ধি বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আগে নিয়ম ছিল কোম্পানি সারা বছর ব্যবসা শেষে যদি লাভ করে, তখন লাভের অংশ থেকে আয়কর ধার্য হতো এবং আমদানির সময় দেয়া আয়কর সমন্বয় করা যেত। আর যদি লোকসান হতো, তবে আলাদা করে কর দিতে হতো না। কিন্তু নিয়ম পাল্টে গেছে। এখন কোম্পানি লাভ করুক বা লোকসান করুক, আমদানির সময় দেয়া সেই ট্যাক্স ফেরত পাওয়া যায় না। অর্থাৎ উদ্যোক্তা লোকসান করলেও তাকে এ টাকা বহন করতে হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে অযৌক্তিক এবং ব্যবসাবান্ধব নয়। এরপর আসি টার্নওভার ট্যাক্সে। আগে এটি ছিল দশমিক ৫ শতাংশ, এখন বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের বছরে বিক্রি বা টার্নওভার হলো ৭ হাজার কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স হবে ৭০ কোটি টাকা। আবার ধরুন, প্রতিষ্ঠান আমদানির সময় ইতিমধ্যে ৬০ কোটি টাকা আয়কর দিয়েছে। এখন টার্নওভার ট্যাক্স হিসাব করলে যদি দাঁড়ায় ৭০ কোটি, তবে তাকে আরো ১০ কোটি টাকা দিতে হবে। অন্যদিকে যদি টার্নওভার ট্যাক্স হিসাবমতে ৫০ কোটি হয়, তবুও প্রতিষ্ঠান সেই ৬০ কোটি টাকাই দিয়ে ফেলেছে, এক্ষেত্রে কোনো রিফান্ড নেই। অর্থাৎ ব্যবসায়ী যেভাবেই হোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সবশেষে আসি ব্যক্তিগত করের বিষয়ে। কোম্পানি যখন লাভ করে, উদ্যোক্তা বা শেয়ারহোল্ডাররা ডিভিডেন্ড হিসেবে সেই লাভের একটা অংশ গ্রহণ করেন। আগে এটার ওপর কর তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ের করহারও বাড়ানো হয়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা দ্বিগুণ চাপে পড়ছেন। একদিকে কোম্পানি পর্যায়ে কর দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও ডিভিডেন্ডের ওপর বেশি কর গুনতে হচ্ছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তা চারদিক থেকেই করের চাপে জর্জরিত। ব্যবসায় লোকসান হলেও কর মওকুফ বা সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
কর ও শুল্কনীতির চাপ নিয়ে কি আপনারা এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন?
দেশের উন্নয়ন ও বাজেট পরিচালনার জন্য সরকারের টাকার প্রয়োজন। আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে নতুন ট্যাক্সদাতা খুঁজে বের করে ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বাড়ানো উচিত, শুধু আমাদের মতো বিদ্যমান ট্যাক্সদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে। কিন্তু তারা সেটা করতে পারছে না। ফলে বাজেটে যতটুকু বাড়তি রাজস্ব দরকার, তার সবটাই আমাদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে। সমস্যা হলো আমরা এ অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকের ওপর চাপাতে পারছি না। কারণ বাজারে চাহিদা কম, আর মূল্যস্ফীতির কারণে দাম বাড়ালে বিক্রিই কমে যাবে। অথচ কারখানার চাকা তো চালু রাখতেই হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের রোডম্যাপ কী হতে পারে?
সবচেয়ে জরুরি হলো উন্নয়ন বাজেটের টাকা ছাড় করা। মেগা প্রজেক্টগুলো চালু রাখতে হবে। মেগা প্রজেক্ট ছাড়াও সরকারি যত কাজ আছে। যেমন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সক্রিয় করা। এসব কাজ খুবই সীমিত পরিসরে চলছে। এখন সরকারের যে লাখ লাখ কোটি টাকার কাজ হয়, সেগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে গিয়ে কাজ করে। বাজারে নগদ টাকার ফ্লো চলে আসবে। এতে অর্থনীতিতে গতি আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের হাতে টাকা আসবে। সেই টাকা আবার বাজারে খরচ হবে, ডিমান্ড তৈরি হবে, ইস্পাতসহ পুরো শিল্প খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে। সেখানে কোম্পানিগুলো পণ্য থেকে শুরু করে, মিস্ত্রি, কনস্ট্রাকশন, দোকান সবকিছু যুক্ত থাকে। ধরেন আগে রাজমিস্ত্রি মাসে ৩০ দিন কাজ করত, এখন সেটা চার-পাঁচদিনে নেমে এসেছে। যার কারণে বাজারে ক্যাশ ফ্লো নেই। আমাদের শিল্প খাতগুলো চলছে ধীরগতিতে।
দ্বিতীয়ত, একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচিত ও স্থায়ী সরকার এলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবে। দেশীয় ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগ বাড়বে। তখন বিদেশী দাতা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠবে। উদ্যোক্তাদেরও নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে উৎপাদন করতে হবে। প্রয়োজনে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে।










