বাংলাদেশের মতো তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলালিংক কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে? আর কীভাবে এটি তার প্রচলিত পরিষেবার বাইরে গিয়ে নিজেকে আলাদা করছে এবং গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবা দিচ্ছে?

আমার মনে হয় বাংলালিংক এখন ২০ বছর বয়সী একটি প্রতিষ্ঠান। টেলিযোগাযোগ—বিশেষ করে মোবাইল—একটি পুঁজিনির্ভর শিল্প। নেটওয়ার্ক চালাতে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আজ আমরা এক ধরনের সংকটে দাঁড়িয়ে আছি। গত চার বছরে আমরা ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছি আমাদের ফোরজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে। ফোরজি ব্যবহারকারীদের মোবাইল ইন্টারনেটে প্রায় সবকিছু করার সুযোগ দেয় এবং আমি মনে করি এটি কাজ করার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন আমাদের আরো অনেক কিছু করতে হবে। আমাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ব্যবসাকে রূপান্তর করে ‘ডিজিটাল অপারেটর’ বানানো।

১৪৪০—এটা একটি দিনের মোট মিনিট সংখ্যা। আসলে কয়টি প্রতিষ্ঠান প্রতিটি মিনিটে একজন গ্রাহকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে? কেবল মোবাইল ফোনই পারে। মাঝে মাঝে আমি উপলব্ধি করি, এটা সম্ভবত সেই ডিভাইস যা আমি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি—ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা টিভির চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে একটি ফোরজি স্মার্টফোন এখন হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক দ্বার। আমরা এরই মধ্যে সংযোগ দিচ্ছি, কিন্তু তার বাইরে আর কী দিতে পারি?

আমরা তৈরি করেছি—এবং আরো তৈরি করতে থাকব—যাকে আমরা বলি ‘ভার্টিক্যালস’। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ শিল্পের পরিভাষা, তবে মূলত এর মানে হলো ডিজিটাল সমাধান। প্রথমত আছে টফি। মোবাইল ডিভাইসের প্রধান ব্যবহারগুলোর একটি হলো বিনোদন—খেলা, সিরিজ বা অন্য যেকোনো কনটেন্ট। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হলো মোবাইল আর্থিক সেবা, যেটি আমরা সক্রিয়ভাবে উন্নয়ন করছি। বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক জনগণ ব্যাংকিং সেবার বাইরে—আজকের দিনে যা কল্পনাতীত। এ সেবাগুলো সরকার ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সফল সমাজগুলো প্রয়োজনীয় সেবাগুলো আরো সহজলভ্য করে, যা কেবল গ্রাহকদের জন্য নয়, বরং সরকারকেও সেগুলো ট্র্যাক ও পরিচালনা করতে সহায়তা করে। ফলে সিস্টেমগুলো হয় আরো ন্যায়সংগত ও দক্ষ।

আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও মনোযোগ দিচ্ছি—এগুলোও আমাদের সক্রিয়ভাবে অনুসৃত ভার্টিক্যাল। আরেকটি উদ্যোগ হলো ‘রাইজ’—এটি আমরা আলাদা করে তৈরি করেছি, তরুণদের জন্য এআই-চালিত টেলিকম সমাধান। আমরা বিশ্বাস করি এটি শিক্ষার্থী ও তরুণদের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তাদের জন্য বিশ্ব জানার এক জানালা খুলে দিচ্ছে।

আগামী পাঁচ বছরে বাংলালিংকের প্রধান কৌশলগত বিনিয়োগ অগ্রাধিকারগুলো কী?

আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো আরো উন্নত মোবাইল অভিজ্ঞতা প্রদান করা—অর্থাৎ উৎকৃষ্ট সংযোগের সঙ্গে উচ্চমানের সেবা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে আছে নেটওয়ার্ক কাভারেজ আরো বিস্তৃত করা এবং আমাদের বিভিন্ন ‘ভার্টিক্যাল’-এর মাধ্যমে সেবা দেয়া। আমরা আর্থিক সমাধান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করব। পাশাপাশি আমরা স্বাস্থ্য খাতে সমাধান তৈরি করছি এবং সহজলভ্য শিক্ষাসেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা মানুষের জীবনকে আরো উন্নত করতে সাহায্য করবে।

এ লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

এখানে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ আছে। সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো কর ব্যবস্থা। যদি কর আরোপের জন্য কোনো চ্যাম্পিয়নস লিগ বা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হতো, তাহলে বাংলাদেশের টেলিকম শিল্পই সেটা জিতত। গ্রাহকের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ টাকা সরাসরি সরকারের কাছে চলে যায়, আর ব্যবসা চালাতে ও বিনিয়োগ করতে হাতে থাকে মাত্র ৩৫ টাকা। এতে কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে এবং এটিই শিল্প খাতের সংগ্রামের অন্যতম কারণ। কর ব্যবস্থাই বাধা নম্বর এক।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো নিয়ন্ত্রণনীতি। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানো নিয়ন্ত্রকদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেভাবে তথ্যপ্রবাহকে বদলে দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক স্বাস্থ্য খাতকে—আগে যেখানে জ্ঞানের ভাণ্ডার প্রতি দশকে দ্বিগুণ হতো, আজ এআইয়ের কারণে প্রতিদিন দ্বিগুণ হচ্ছে। এ দ্রুত পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলছে। বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো খানিকটা খণ্ডিত মনে হয়, যা বিনিয়োগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত করছে—যেখানে এ খাতে টিকে থাকা ও সফলতার জন্য বিস্তৃত পরিসরে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।

তবে গত তিন-চার মাসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আমরা দেখেছি। শিল্প খাত আরো সংস্কার এবং করনীতির পুনর্বিবেচনা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাবে।

গত সপ্তাহে বৈশ্বিক টেলিকম সংস্থা জিএসএমএ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে বিভিন্ন দেশের স্পেকট্রাম খরচের তুলনা করা হয়েছে—যা টেলকোগুলোর জন্য বড় ব্যয়। কিছু দেশ স্পেকট্রামকে সাশ্রয়ী করে তুলেছে, যাতে টেলকোগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবা দিতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও লাভজনক। আবার কিছু দেশ স্পেকট্রামকে স্বল্পমেয়াদি রাজস্বের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে, যা অপারেটরদের বিনিয়োগ কঠিন করে তোলে। উচ্চ করের সঙ্গে ব্যয়বহুল স্পেকট্রাম মিলিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতাকে মূল্যায়ন করেন। তারা বৈশ্বিকভাবে সুযোগ খুঁজে দেখেন এবং কোথায় বিনিয়োগ করবেন তা নির্ধারণে ভেন্ডর ম্যাট্রিক্স ব্যবহার করেন। উচ্চ কর এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

তবে এটাও বলতে হয়, আমরা আমাদের শেয়ারহোল্ডার ভিইওএনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করেছি এবং তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও উৎসাহিত। এরই মধ্যে যে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার বাইরেও আগামী বছরগুলোয় ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে আরো বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা আছে। একদিকে অপ্রকাশিত সম্ভাবনা, অন্যদিকে সমাজের জন্য বিশাল সুফল অর্জনের সুযোগ—এটাই আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।

সম্প্রতি বাংলাদেশে দুটি অপারেটর ফাইভজি চালু করেছে। ইন্টারনেটের গতি নিয়ে যে উদ্বেগ আছে, সে প্রেক্ষাপটে বাংলালিংকের ফাইভজি রোডম্যাপ কী?

একটি মজার তথ্য হলো—সিক্সজি কার্যত দোরগোড়ায়। বর্তমানে এটি ল্যাব পর্যায়ে পরীক্ষাধীন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা। সিক্সজি আমাদের বর্তমানের তুলনায় ১০ থেকে ১০০ গুণ দ্রুত গতি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে ডেটার গতি অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভিন্নতর, যা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রকৃতিগতভাবে গতিশীল—লোডের ওপর নির্ভর করে কর্মক্ষমতা ওঠানামা করে।

একটি মিথ আছে যে ফাইভজি সবকিছু বদলে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশে আজও ফোরজি নেটওয়ার্কের কার্যক্ষমতা অনেকাংশে উন্নত করা সম্ভব। প্রথমত, বেজ স্টেশনগুলোতে যথেষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে নতুন বেজ স্টেশন তৈরি প্রয়োজন, সেসব জায়গায় অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাকহল উন্নত করতে হবে, যার জন্য আলাদা লাইসেন্স প্রয়োজন। এ তিনটি পদক্ষেপ ফোরজি কর্মক্ষমতাকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ফাইভজি প্রসঙ্গে আমাদের বিশ্বাস—বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো কিছুটা সময়ের আগেই পদচারণা। কারণ এটি এখনো একই স্পেকট্রামে চলছে এবং স্ট্যান্ডঅ্যালোন নয়, তাই খুব বেশি উন্নত অভিজ্ঞতা দিতে পারছে না। প্রযুক্তিগতভাবে ফাইভজি দুই ধরনের—নন-স্ট্যান্ডঅ্যালোন ও স্ট্যান্ডঅ্যালোন। নন-স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজি কেবল সামান্য উন্নতি আনে যদি ফোরজি নেটওয়ার্ক যথেষ্ট শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজি পুরোপুরি আলাদা নেটওয়ার্ক—যেমন প্রপেলার প্লেন থেকে জেট প্লেনে যাওয়া—যেখানে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়।

আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফাইভজি মূলত বড় করপোরেট এন্টারপ্রাইজ সমাধানের জন্য অর্থবহ। উদাহরণস্বরূপ আমরা সিঙ্গাপুর বন্দরে একবার স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজি ব্যবহার করেছিলাম, যেখানে কনটেইনার স্থানান্তর রোবটিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। সেখানে ফাইভজির বিষয়টি গতির নয়, বরং লেটেন্সি বা সাড়া দেয়ার সময়ের—যত কম লেটেন্সি, তত নিখুঁতভাবে কাজ হয়। এটি ছিল একটি বিশেষ শিল্পভিত্তিক ব্যবহার।

বিশ্বব্যাপী ফাইভজি নিয়ে প্রচণ্ড আলোড়ন তৈরি হয়েছে, কিন্তু বহু দেশে এটি ফোরজির বাইরে তেমন কিছু দিতে পারেনি। আমাদের দর্শন সবসময় গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেয়া। আদর্শভাবে বাংলাদেশ সরাসরি ফোরজি থেকে সিক্সজিতে লাফিয়ে যেতে পারে, সম্ভব হলে স্যাটেলাইট কাভারেজ যুক্ত করে। এতে সব ব্যবহার ক্ষেত্রের জন্য কাভারেজ নিশ্চিত করা যাবে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বর্তমানে কাভারেজ সীমিত। কাভারেজ না থাকলে গতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। দেশের বহু এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সংযোগ নেই। সিক্সজি প্রসঙ্গে বাস্তব উন্নতি কেবল তখনই ধরা পড়বে যখন একসঙ্গে অনেকগুলো ডিভাইস সংযুক্ত থেকে স্ট্রিম করবে। গত সপ্তাহে আমি আমাদের টিমকে একটি উপমা দিয়েছিলাম: এটি যেন কাউকে ল্যাম্বরগিনি বিক্রি করে তারপর ঢাকার রাস্তায় চালাতে বলা।

বাংলাদেশে এখনো বড় ধরনের ডিজিটাল বিভাজন রয়েছে। এ ব্যবধান কমাতে বাংলালিংক কী ভূমিকা রাখছে?

আমরা আরো অনেক কিছু করার পরিকল্পনা করছি। একটু ব্যাখ্যা করি। আজকের দিনে ডিজিটাল বিভাজনের পেছনে দুটি প্রধান বাধা রয়েছে। প্রথমত, এবং সবচেয়ে বড় বাধা হলো ডিভাইসের প্রাপ্যতা। টুজি আর ফোরজি ডিভাইসের দামের পার্থক্য অনেক মানুষের জন্য এখনো অগ্রহণযোগ্য। ফোরজি ডিভাইসকে আরো সাশ্রয়ী করা একটি অগ্রাধিকার এবং শিগগিরই আমরা বিষয়টি সমাধান করব। দ্বিতীয় বাধা হলো নিশ্চিত করা যে মানুষ যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে সেবা নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টির সময় আমরা বেজ স্টেশনে তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হই। যদিও আমাদের সব বেস স্টেশনে ৮-১০ ঘণ্টা চালানোর মতো ব্যাটারি থাকে, অনেক সময় বিদ্যুৎ বিপর্যয় এর চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়। এখানে জরুরি হলো অবকাঠামোকে এমনভাবে শক্তিশালী করা যাতে নিরবচ্ছিন্ন ডেটা ও ভয়েস সংযোগ বজায় থাকে। এ চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভূমিকাকেও নির্দেশ করে—যেমন স্যাটেলাইট সমাধান—যা নেটওয়ার্ককে আরো শক্তিশালী করে সেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

এ উদ্যোগগুলো কীভাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে?

এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণভাবে অবদান রাখবে। শিল্প হিসেবে আমাদের একটি বড় ভূমিকা আছে। যদি মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয় তারা বাংলালিংক সম্পর্কে কী মনে রাখে, অনেকেই প্রায় ২০ বছর আগের কথা বলবে। তারা স্মরণ করবে সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন যেখানে এক জেলে বুঝতে পারল যে সে ফোনে কাউকে ডেকে মাছ বিক্রি করতে পারে—তখন সেটি ছিল একটি সাধারণ টুজি ফিচার ফোন। সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ একটি মুহূর্ত। আজকের দিনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—যে কেউ ফোরজি ফোন হাতে পেলে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারই নয়, বরং এমন সব ডিজিটাল সমাধানেও প্রবেশাধিকার পাবে যা তার জীবনকে উন্নত করতে পারে। এখানে বিশাল সম্ভাবনা আছে। এমন মার্কেটপ্লেসে প্রবেশাধিকার যেখানে মানুষ যুক্ত হতে পারে, বীমা সুবিধা, মোবাইল আর্থিক সমাধান এবং ভার্চুয়াল স্বাস্থ্যসেবা। আমার কাছে একটি ভালো ইন্টারনেট সংযুক্ত মোবাইল ফোন হলো বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার একটি প্রবেশদ্বার—একটি সমাধানের দরজা। সঠিক টুলস হাতে পেলে আমরা আরো অনেক কিছু করতে পারব।

বাংলালিংক কীভাবে তাদের ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের ক্ষমতায়ন করবে, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে এবং প্রতিদিনের লেনদেনকে আরও সহজ ও সুবিধাজনক করে তুলবে?

এটি সত্যিই বিস্ময়কর যে মোবাইল আর্থিক সমাধান এবং ডিজিটাল ব্যাংক কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, এমনকি উন্নত দেশগুলোতেও। আমাদের লক্ষ্য হলো পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরো সহজ করা, যাতে এটি আরো সবার জন্য প্রবেশযোগ্য হয়। মাত্র তিন বা চার বছর আগেও, এমনকি সিঙ্গাপুরের মতো দেশে মানুষকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে শাখায় যেতে হতো। আজ কয়েক মিনিটের মধ্যেই কেউ একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলতে পারে এবং একটি ভার্চুয়াল ক্রেডিট কার্ডও পেয়ে যায়। এতে গ্রাহক এবং ব্যাংক—দুই পক্ষেরই খরচ কমে যায়। মোবাইল আর্থিক সমাধান আরো বুদ্ধিদীপ্ত, তাৎক্ষণিক ও সাশ্রয়ী লেনদেনের সুযোগ তৈরি করে—যা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

এছাড়া এগুলো ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়ার সুযোগও করে দেয়। টেলিকম কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের ভালোভাবে জানে—কোন ডিভাইস তারা ব্যবহার করে এবং কীভাবে ব্যবহার করে—তাই তাদের উপযুক্ত ঋণ সুবিধার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া সম্ভব। ফলে সমাজের সর্বস্তরে মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়। এগুলো কেবল কয়েকটি উদাহরণ, কীভাবে ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রাহকদের ক্ষমতায়ন করতে পারে এবং অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পারে।

আপনি আগেই পূর্বানুমানযোগ্য নীতির কথা বলেছেন। বর্তমান লাইসেন্স কাঠামো, করনীতি ও সরকারি নীতিমালা কীভাবে বাংলালিংকের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে?

যেকোনো শেয়ারহোল্ডার বা প্রতিষ্ঠান এমন একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো পছন্দ করে, যেখানে ব্যবসার ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি ব্যতিক্রম—এখানে স্থির লাইন, মোবাইল, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ইত্যাদি খাতে আলাদা আলাদা লাইসেন্সে কাজ করতে হয়। অথচ আমি যেসব দেশে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, সেখানকার লাইসেন্স সাধারণত প্রান্ত-থেকে-প্রান্ত (এন্ড টু এন্ড) কাঠামোয় দেয়া হয়। এ খণ্ডিত লাইসেন্স ব্যবস্থা পরিষেবার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, কারণ এখানে অন্য পক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ব্যয় বাড়ে এবং জটিলতাও বৃদ্ধি পায়। যেসব দেশ সফলভাবে অগ্রসর হয়েছে, তারা সাধারণত (এন্ড টু এন্ড) নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পেরেছে—যা সেবার মান বজায় রাখা এবং খরচ কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর ব্যবস্থার প্রসঙ্গে ফিরে এলে, জিএসএমএ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। টেলিকম খাতের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যে পরোক্ষ অবদান আসে—অন্য ব্যবসাকে সক্ষম করার মাধ্যমে—তা প্রায়ই অবমূল্যায়িত হয়।

কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো স্থির ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণে অত্যন্ত আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে; কার্যত পুরো দেশকে ফাইবার নেটওয়ার্কে আচ্ছাদিত করেছে অন্যদের আগে। তারা বুঝেছিল, শক্তিশালী টেলিকম অবকাঠামো বিপুল পরিমাণ ডেটা বহন করতে পারে এবং গ্রাহক ও ব্যবসার জন্য উৎকৃষ্ট সেবা নিশ্চিত করে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অগ্রাধিকার দেয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি সমানভাবে প্রযোজ্য উভয় ক্ষেত্রে—শারীরিক অবকাঠামো ও ডিজিটাল অবকাঠামো।

তবে উচ্চ কর আরোপ এমন বিনিয়োগকে কঠিন করে তোলে। শেয়ারহোল্ডাররা তখন অন্য দেশে বিনিয়োগের কথা ভাবতে বাধ্য হয়। কিছু দেশে অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে সীমিত করে দেয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—এটি চালাতে বিশাল ব্যান্ডউইডথ এবং ডেটার প্রয়োজন হয়। চীনের দক্ষতা—দ্রুত, স্বল্প খরচে এবং কার্যকরভাবে উৎপাদন করা—মূলত এআই দ্বারা পরিচালিত। তারা মডেল ও এজেন্ট ব্যবহার করে যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর জন্য অতি আধুনিক ডেটা নেটওয়ার্ক অপরিহার্য নয়; পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম এবং শক্তিশালী ব্যাকহল অবকাঠামো থাকলে এটি আজকের ফোরজি নেটওয়ার্কেই সম্ভব।

নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বাইরে, আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে বাংলালিংক কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে? বিশেষ করে যুবসমাজের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটালভাবে সক্ষম কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কী?

আমরা এ খাতে এরই মধ্যে অনেক কাজ করছি, তবে এখনো আরো অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। আমার সবচেয়ে গর্বের একটি উদ্যোগ হলো আমাদের এসএপি প্রোগ্রাম। এর মাধ্যমে প্রতি বছর মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের নিয়োগ দেয়া হয় এবং তাদের দ্রুত ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করা হয়। তারা কোম্পানির বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে ঘুরে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, যা তাদের সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ায়। একই সঙ্গে, আমরা তরুণী নারীদের জন্য একটি সমান্তরাল ট্র্যাক তৈরি করেছি, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে, বাস্তব অভিজ্ঞতা পায় এবং পেশাগতভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

আমি বিশ্বাস করি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে আরো দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই আকারে সম্প্রসারণ করা সম্ভব—এখন সেটাই আমাদের অগ্রাধিকার। এর বাইরে আমরা বিভিন্ন সিএসআর উদ্যোগের মাধ্যমে স্কুল ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করছি। আমার স্বপ্ন হলো এসব উদ্যোগকে আরো বড় পরিসরে নেয়া, যাতে প্রভাব বিস্তৃত হয়। এরই মধ্যে আমরা শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটে প্রবেশ বাড়ানোর কাজ শুরু করেছি এবং এটিকে আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেকসই উন্নয়ন। টেলিকম শিল্প প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার করে, তাই আমরা ধাপে ধাপে আমাদের বেজ স্টেশনগুলোকে ‘গ্রিনফিল্ড’ করছি। যেখানে সম্ভব, আমরা সৌর প্যানেল বসাচ্ছি, যা শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নেটওয়ার্ক সচল রাখে না, পরিবেশকেও সুরক্ষা দেয়। আমাদের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে শক্তি খাতে আরো বেশি স্বনির্ভর হওয়া। সম্প্রতি আমরা কর্মীদের অংশগ্রহণে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্পন্ন করেছি—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলার অংশ।