অবকাঠামোগত নিরাপত্তা বিবেচনায় বাংলাদেশের শিল্প খাতে বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? অবকাঠামো ও নিরাপত্তার দিক থেকে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করেন?
বাংলাদেশে বড় যেসব অবকাঠামো আছে সেগুলো বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ সহনীয় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর ব্যাপক বিল্ডিং চেকিং, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও ফায়ার সেফটির কাজ হয়েছে। সেই সময় আমরা শুধু সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানা পরীক্ষা করেছিলাম। সেসব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫০-৬০ শতাংশ মনে করে নিরাপদ। কারণ সেগুলো নিয়ে গত ১২ বছরে ব্যাপক কাজ হয়েছে। এর বাইরে ৩০ শতাংশর মতো ভবন আনফোকাসে আছে। এটি তো গেল পোশাক শিল্প। এর বাইরেও কিন্তু আমাদের অনেক বিনিয়োগ আছে। অনেক কারখানা আছে। বিস্কুট, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও কেমিক্যাল কারখানা রয়েছে। রানা প্লাজার পর সরকারি এবং আইএলওর অর্থায়নে সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানার নিরাপত্তা যাচাই করেছে। কিন্তু অন্য কারখানাগুলো এ যাচাইয়ের বাইরে রয়েছে। ফলে আমরা ধারণা করতে পারছি না সেখানে কতগুলো কারখানা নিরাপদ বা অনিরাপদ। এ যাচাইয়ের কাজগুলো শুরু করা দরকার।
বিনিয়োগ জিনিসটি একটু অন্য রকম। এর সঙ্গে সেফটির বিষয় অবশ্যই আছে। যখন নতুন বিনিয়োগ হবে তখন নতুন ভবনও হবে। বিনিয়োগকারীরা ঋণ নেয় ব্যাংক থেকে। বিদেশে ব্যাংক ঋণ দেয়ার সময় কারখানাগুলো শতভাগ সেফটি মেইনটেইন করছে কিনা সেটি দেখভাল করে। আমাদের দেশে এখানে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। ব্যাংক যখন কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা কারখানা ভবনের জন্য ঋণ দেবে তখনই তার নিশ্চিত করা উচিত এটি বিল্ডিং কোড মেনে হয়েছে কিনা। এটি করলে যে বিনিয়োগ করছে তার টাকা নিরাপদ হবে। এ নীতিগত বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে হবে। এটি আমাদের ভবনকে নিরাপদ করতে সাহায্য করবে। কারণ বড় ব্যবসায়ীরা যখন ব্যবসা করে তখন যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। তার ভবনে আগুন লাগতে পারে—এজন্য সে একটি ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম নেয়। সে কতটা বিল্ডিং কোড মেনে চলেছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রিমিয়াম কম-বেশি হয়। ব্যাংক খাত ও ইন্স্যুরেন্সকে শক্তিশালী করা গেলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক কল্যাণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস অনেক কিছু বুঝিয়েছে। তবে রানা প্লাজার পর ইন্ডাস্ট্রিতে ফায়ার সেফটি ও অবকাঠামোর নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা টের পেয়েছি। এরপর পোশাক খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কাজ হয়েছে। যদিও এটি বিদেশী ক্রেতাদের চাপেই বেশি হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এ ১২ বছরে অন্যান্য খাতেও অনেক কাজ হতো। সেজন্য দেখা যাচ্ছে, বিদেশী ক্রেতাদের চাপে আমরা শুধু পোশাক খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেছি। শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে গেলে এখানে তার পরিবেশ, ভবনের নিরাপত্তা, বিদ্যুতের নিরাপত্তা, ফায়ার সেফটি সবগুলোর বিষয়েই চিন্তা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে বললে আমাদের পোশাক কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ৫০-৬০ শতাংশ আছে। এখনো অন্তত ৪০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এটি নেই বললেই চলে। সেজন্য এসব আমাদের পলিসিতে যুক্ত করতে হবে। আগেই বলেছি, ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে যদি এখানে আরো সক্রিয় করা যায় তাহলে ভবনের নিরাপত্তা বাড়বে। আর শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারের পলিসির বিষয়। সরকারি পলিসিতে এ নিরাপত্তার কথা কিন্তু বলা আছে। কিন্তু এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ করতে পারছে না। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় আছে। কারণ বড় বড় ব্যবসায়ীকে সামলাতে গেলে এখানে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দিতে হবে।
আপনার গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন?
যেকোনো শিল্প-কারখানার এসব দেখার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় রয়েছে। এর অধীনে রয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। আগে এটি খুবই ছোট ছিল। লোকবলও ছিল ১০ জনের মতো। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ পরিসর বাড়ানো হয়েছে। একটি ভবনের ক্ষেত্রে এর অবকাঠামো নিরাপত্তা, ফায়ার সেফটি এবং বিদ্যুতের নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় রয়েছে। কিন্তু এ অধিদপ্তরে সর্বসাকল্যে ১০ জনের মতো প্রকৌশলী রয়েছেন এসব পরীক্ষা করার জন্য। ২০১৮ সালে আইএলওর অর্থায়নে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বলা হয় আড়াইশ প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে হবে যারা বিদ্যুৎ, ভবন ও ফায়ার সেফটির বিষয়ে দক্ষ। এখানে গ্র্যাজুয়েট ম্যানপাওয়ার নিয়োগ করতে হবে, যাতে তারা এ তিনটি বিষয় যাচাই করতে পারে। কিন্তু আমরা সব জায়গায় আমলাদের প্রাধান্য দিই। যেখানে টেকনিক্যাল মানুষের দরকার সেখানে টেকনিক্যাল মানুষ বসানো হচ্ছে না। শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে এখানে বসাতে হবে।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও টেকসই অবকাঠামো ভূমিকা রাখে?
এটি করে কিনা জানি না। তবে আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েকটি বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তারা যখন কোনো শিল্প-কারখানা তৈরি করে তখন প্রথমদিন থেকেই কিন্তু এসব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এমনকি যখন তারা ভবন তৈরি করে তখনো শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সেই সময় যদি কোনো শ্রমিক সামান্য একটু ব্যথাও পায় তখন তারা কাজ বন্ধ করে দেয়। আমরা কিন্তু এটি করি না। আমাদের স্থানীয় বিনিয়োগে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবসময় এড়িয়ে যাই। কিন্তু বিদেশী যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তারা ইন-হাউজ নিরাপত্তার বিষয়টি মেনেই চলে। এমনকি তাদের কারখানায় প্রবেশ করতে গেলে প্রয়োজন হলে সেফটি বুট ও সেফটি হেলমেট পরিয়ে ঢোকাবে। আমরা স্থানীয়রা এটি করি না। আমরা এখানে সবসময় উদাসীন। আমি মনে করি, এখানে শ্রম মন্ত্রণালয়ের জোরালো ভূমিকা রাখার সময় এসেছে। শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারি সংস্থাগুলোর এখনো মূল কনসার্নে আসেনি। এটি হতাশাজনক।
দেশে অনেক গ্রিন ভবন হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পাচ্ছে। সেফটির দিক থেকে এটিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
ছয়-সাত বছর আগে বুয়েটের পক্ষ থেকে ভবনের ভূমিকম্প সহনীয়তা যাচাই করি। ওই ভবন গ্রিন সনদধারী ছিল। অ্যালায়েন্স সার্টিফায়েডও ছিল। কিন্তু ভূমিকম্প সহনীয়তা যাচাইয়ের সময় দেখলাম সেটি ভূমিকম্প সহনীয় না। এর মানে বোঝায় গ্রিন বিল্ডিং নিশ্চিত করে না সেটি পুরোপুরি নিরাপদ। পানি ও বিদ্যুৎ এফিসিয়েন্সির প্রটোকলগুলো ঠিক আছে কিনা সেটি নিশ্চিত করে।
ক্রেতাদের চাপে পোশাক কারখানার ভবন ও কর্মপরিবেশ নিরাপত্তা উন্নয়নে কিছু কর্মতৎপরতা দেখা গেছে। এগুলো দিন দিন বাড়ছে, না একই জায়গায় থেমে আছে? কী মনে করেন আপনি?
এটি বলতে গেলে আবারো রানা প্লাজার কথা আসবে। ওই ঘটনার পর পাঁচ বছর ইন্ডাস্ট্রি খুব চাপে ছিল। তখন তারা যে করেই হোক এসব নিশ্চিত করেছে। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে প্রতি পাঁচ বছর পর পর এটি যাচাই করার প্রয়োজন আছে। কারণ দেখা যাবে এ সময়ে তারা সেসব জিনিসে হাতই দেয়নি, এসবের লে-আউট চেক করার প্রয়োজন হতে পারে। বিদেশে প্রতি পাঁচ বছর পরপর এটি পুনঃযাচাই করা হয়। এরপর রিসার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। আমাদের এখানে ১২ বছর হয়ে গেছে এগুলো করিনি। ইন্ডাস্ট্রিগুলো রানা প্লাজার পর প্রথম ফেজে ২০১৭-১৮ সালের দিকে কাজটা করেছে। এরপর আর করেনি। তখন আমরা যেটি বলেছিলাম সেটি ঠিকমতো মেনে করেছে কিনা তা-ও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এখানে তারা ভুলত্রুটি করতেই পারে। সেজন্য শ্রম মন্ত্রণালয়, রাজউক, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এগুলো পুনঃযাচাই করে আবার সনদ দেয়া উচিত। যদি ঠিকমতো করে তাহলে সনদ দেবে, না মানলে লাল পতাকা টানিয়ে দেবে। এরপর তাকে একটা সময়সীমা দেয়া হবে তুমি এর মধ্যে আবার আগের প্রটোকলগুলো অনুসরণ করে সেফটি নিশ্চিত করো। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের গাফিলতি রয়েছে। পুলিশিং বা তদারকিটা নিয়মিত করতে হবে।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার, শিল্প মালিক ও শ্রমিক—এ তিন পক্ষের মধ্যে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
সংস্কৃতি তৈরি করতে গেলে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে তার জায়গা থেকে তার নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে এখানে দেখতে হবে সেই নিরাপত্তাটা সবাই নিশ্চিত করছে কিনা। মালিক পক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে তার অধীনে যারা কাজ করছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাইরের দেশগুলোয় দেখেছি মালিক পক্ষ এটি সবসময়ই নিশ্চিত করতে কাজ করে। তারাও হয়তো একসময় আমাদের মতো ছিল। কিন্তু গত একশ বছরে এখানে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯২০ সালের দিকে নিউইয়র্ক শহরেও কারখানাগুলোয় এত নিরাপত্তা ছিল না। কিন্তু এখন সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়। তারা নিয়মিত এটি পরিদর্শন করে। এটি করতে হবে। সরকারের এখানে দায়িত্ব নিতে হবে। মালিক পক্ষকেও এখানে এগিয়ে আসতে হবে।










