২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেইআমাদের চেনা পৃথিবীটা অনেকটুকুই বদলে গিয়েছে এবং এই সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অনেকগুলো সংকট আর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভোক্তাদের চাহিদা, যোগান, উৎপাদন ও বিশ্ববাণিজ্য থেকে শুরু করে শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থান —প্রতিটি ক্ষেত্রতেই বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুসারে কোভিড-১৯ এবং এর পরবর্তী বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং এর ফলাফলস্বরূপ জ্বালানি ও খাদ্যবাজারের অস্থিরতার কারনে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারনে প্রতিনিয়ত উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) সহ প্রায় সকল খাতে কর্মসংস্থান ও দক্ষতার চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে আরও খারাপ হতে পারে। সংস্থাটি ২০২৫ সালের বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের পূর্বাভাস ৭ মিলিয়ন কমিয়ে এনেছে। তাদের মতে, সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর হবে, যা কেবল অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

কিন্তু একই সাথে প্রযুক্তিগত ও ভোক্তাদের আচরনগত পরিবর্তনের কারনে নতুন সুযোগ আর সম্ভাবনারও সৃষ্টি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, পিডাব্লিউসি, ইওয়াই এর মত বৈশ্বিক কনসাল্টিং (পরামর্শক) প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও সমীক্ষা অনুসারে বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের, বিশেষ করে জেন জি বা জেন আলফাদের মধ্যে সাসটেইনেবল প্রোডাক্ট ও ব্র্যান্ডের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারন হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা আর আগ্রহের বিষয়টি বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উঠে আসছে। এতে করে সারা বিশ্বজুড়েই গ্রিন অর্থনীতি, গ্রিন প্রবৃদ্ধি, গ্রিন বিনিয়োগ আর গ্রিন কর্মসংস্থান নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে বাংলাদেশের মত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে গ্রিন অর্থনৈতিক বিনিয়োগের কারণে জিডিপির ২% পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি হওয়ার সুযোগ আছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বিশ্ব ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০৩১ সালের মধ্য উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার জন্য বাংলাদেশের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে গ্রিন গ্রোথ বা গ্রিন প্রবৃদ্ধি।

গ্রিন গ্রোথ বা গ্রিন প্রবৃদ্ধির একটি বড় ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে গ্রিন কর্মসংস্থান। যেহেতু সাসটেনিবিলিটি আমাদের জীবন আর অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত আরও বেশি আর বাস্তব ভূমিকা রাখছে, আগামী দিনগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর বিদ্যমান কর্ম পরিবেশের গুনগত উৎকর্ষ সাধনে গ্রিন এমপ্লয়মেন্ট বা গ্রিন কর্মসংস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে যাচ্ছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে । তবে আরও একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে যে, এই ক্ষেত্রের নতুন যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে তার সিংহভাগই হতে যাচ্ছে উচ্চ দক্ষতা আর কারিগরী ক্ষেত্রে এবং এই নতুন কর্মসংস্থানগুলো দেশের গ্রাজুয়েট এমপ্লয়মেন্ট বা স্নাতকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।

গ্রাজুয়েট এমপ্লয়মেন্ট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি পরিসংখ্যানও এই চিত্র স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর প্রতিবেদন অনুসারে দেশের নীট ( নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট ওর ট্রেনিং বা শিক্ষা, কাজ বা প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে না এমন) তরুণদের সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরে বৃদ্ধি পাচ্ছে । বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১৯% তরুণ-তরুণী কোনো শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণে নেই। এই তরুণদের গ্রিন এমপ্লয়মেন্ট স্কিল বা গ্রিন এমপ্লয়মেন্ট এর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা আর প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারা শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে।

পাশাপাশি গ্রিন প্রবৃদ্ধি আর গ্রিন এমপ্লয়মেন্ট দেশের কর্মপরিবেশ আর শ্রম বাজারের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রকৃতির পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে বেকারত্বের উচ্চ হার আর সুযোগের অভাবের পিছনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শ্রমবাজারের অত্যধিক অপ্রাতিষ্ঠানিকতা। বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% কর্মসংন্থান হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কোনো আইনি সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা নেই। ফলে এসকল খাতের কর্মজীবীরা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে।

একই সাথে আমাদের দেশের কর্মসংস্থান, কর্মপরিবেশ আর শ্রম বাজারের অপ্রাতিষ্ঠানিকতার নাজুক পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষের, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান বা লাইভলিহুড ব্যাহত হচ্ছে । লাইভলিহুড বা জীবনমানের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ভূমিকা রয়েছে এবং লাইভলিহুড নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে গ্রিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোন লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব হবে না। মৌলিক চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলে যেমন নারীর ক্ষমতায়ন বা পরিবেশ সংরক্ষণের মত সামাজিক অগ্রগতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে মনোযোগ, কার্যক্রম বা বিনিয়োগ যেমন হ্রাস পায়, তেমনি লাইভলিহুডের সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া গ্রিন প্রবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। লাইভলিহুড, কর্ম পরিবেশ আর পরিবেশ সংরক্ষণ কীভাবে সংযুক্ত আর সম্পর্কযুক্ত তার একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশেষকরে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহার হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ আর প্রক্রিয়াকরন করা বৈশ্বিকভাবে কঠিন একটি সমস্যা। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও কঠিন কারণ এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেশের সবচেয়ে অগোছালো আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি খাত। এই খাত নিয়ে কাজ করবার সময় অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংন্থানের সমস্যা আমাদের কাছে প্রকট হয়ে উঠে।

বৈশ্বিকভাবেই ইউনিলিভার ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যাপারে উৎপাদনকারীদের দ্বায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য সোচ্চার। বিশ্বব্যাপীএই ধারণা এক্সটেন্ডেড প্রডিউসারস রেস্পন্সশিবিলিটি নামে পরিচিত। বিশ্বের অনেক দেশে এটি উৎপাদনকারীদের আইনি দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এখনো এটির সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই। কিন্তু তারপরও ২০২০ সাল থেকেই ইউনিলিভার বাংলাদেশ ভোক্তা পর্যায়ের ব্যাবহার করার পর প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে আসছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে ইউনিলিভার যে পরিমান প্লাস্টিক পণ্যের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহার করে, তার থেকে বেশী পরিমান প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ওপ্রক্রিয়াজাত করতে কাজ করবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইউনিলিভার বেশ কয়েকটি পাইলট করাবার পর ২০২২ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম ভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ইপসার সাথে একটি সার্কুলার ভ্যালু চেইন মডেল বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিচ্ছতা কর্মী বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শ্রমিকদের ভূমিকা সবথেকে বেশি। কার্যক্রমের শুরুতেই মূল সমস্যা ছিল পরিচ্ছতা কর্মীদেরকে চিহ্নিত বা সনাক্ত করা এবং তাদের সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করা। । তাই আমাদের পার্টনার বা অংশীদারদের সাথে নিয়ে আমাদের প্রথম কার্যক্রমই ছিল এই পুরো প্রক্রিয়াটির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার। প্রথমেই আমরা এই পরিচ্ছতা কর্মীতাদেরকেপরিচয় পত্র দিয়েপ্রক্রিয়াটিশুরু করি এবং এবং বেসলাইন তৈরির মাধ্যেমে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা, আয়, স্বাস্থগত অবস্থা ইত্যাদি বিষয় নিবন্ধিত করা হয়। এ সকল তথ্যের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক ইন্টারভেনশন মডেল তৈরি করা হয় যার মূলে ছিলো এই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জকে ভ্যালুচেইনে নিয়ে আসা। ।

আমাদের একটি লার্নিং ছিল যে পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের জন্য একটি বড় সমস্যা হচ্ছে কাজের সময় বা কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা আর দুর্ঘটনা পরবর্তী চিকিৎসার অভাব। নিরাপত্তা সামগ্রী না থাকা আর সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে প্রায়ই তাদের কাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে । অসুস্থ থাকবার কারণে তারা প্রায়শই কাজ করতে পারে না, এবং যেহেতু তাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক সুরক্ষা নেই, চিকিৎসা ও খোরাকির জন্য তাদের উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের দারিদ্রের অন্যতম একটি কারন কিন্তু তাদের সামাজিক সুরক্ষা আর অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান।

কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করাও সম্ভব। যেমন পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের একটি প্রক্রিয়া আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিতরে নিয়ে আসার সুফল আমরা পেয়েছি। শুরুতেই আমরা তাদের প্লাস্টিক পৃথক করবার ও পাতলা প্লাস্টিকে রিসাইকেল ভ্যালূ এডিশন করবার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দিয়েছি ও হেলমেট, গ্লাভসের মত নিরাপত্তা সামগ্রী বিতরণ করেছি। পাশাপাশি তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আমরা সম্মাননা আর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে পুরস্কার দেবার ব্যবস্থা করেছি। এতে করে তাদের মধ্যে উদ্যম আর অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে তাদের তাদের পেশা যেমন কিছুটা আনুষ্ঠানিক হয়েছে, তাদের কর্মদক্ষতা আর কর্মস্পৃহাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর পরবর্তীতে আমরা পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের আরও কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক সুরক্ষা দিতে তাদের জন্য হেলথ ইন্সুরেন্স বা স্বাস্থ্য বীমা চালু করেছি। পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকরা ইতিমধ্যেই এই বীমার সুবিধা পেতে শুরু করেছন। এই ধরনের উদ্যোগগুলোর কারনে পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তুলনামূলক ভাবে স্থিতিশীল হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের নিয়ে নেওয়া উদ্যোগগুলোর কারণে শুধু প্লাস্টিক দূষন কমেনি, পাশাপাশি তাদের জীবনমান বা লাইভলিহুডের উন্নতি হয়েছে, যা সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

দীর্ঘ তিন বছর ইউনিলিভার দক্ষতাবৃদ্ধি, কর্মপরিবেশে নিরাপত্তানিশ্চিতকরনে সুরক্ষাসামগ্রি প্রদান ও অভ্যাস পরিবর্তন, আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবন বীমার অন্তর্ভুক্তি - এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সামগ্রীক জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের পেশাকে কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে পরিচালনা করা যায় তার জন্য উদ্দ্যোগ গ্রহন করে আসছে। আজকে আমরা ট্রায়াল-অ্যান্ড-এরর-এরমাধ্যমে একটি মডেল তৈরি করতে পেরেছি তা প্লাস্টিক বর্জ্যকে কার্যকর ভাবে ভ্যালুচেইনে নিয়ে আসছে এবং একই সাথে এ কাজের সাথে জড়িতদের জীবনমান উন্নয়ন করছে। আমাদের এই মডেলটির ইমপ্যাক্ট যাচাই করতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষা ও গবেষনা প্রতিষ্ঠান যেমন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইবিএ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের রিভিউ করেছে এবং মতামত প্রদান করেছে।

মুলত ভ্যালূ চেইনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর বর্জ্য শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন করবার কারণেই ইউনিলিভারের পক্ষে তাদের প্লাস্টিক সংগ্রহ করাবার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এই পার্টনারশিপগুলো কাজ করার পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল সঠিক ডিজাইন। আমাদের এই অভিজ্ঞতা আমাদের প্রমাণ করে যে—সঠিক নীতি ও অংশীদারিত্ব থাকলে বাংলাদেশে কঠিন সমস্যাকেও সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।

শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নয়, গ্রিন ইকোসিস্টেম ও মডেল উদ্ভাবন বাংলাদেশের অন্যান্য খাতেও কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে। অবকাঠামো বলতে আমাদের দেশে মূলত ভৌত অবকাঠামোকেই প্রধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি ভ্যালূ চেইন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ কিন্তু প্রয়োজন, এবং এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কিন্তু গ্রিন প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। ভ্যালূ চেইন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ থেকে অনেক উচ্চ হারে রিটার্ন বা মুনাফা নিয়ে আসে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। যেমন কোন একটি নতুন ফ্যাক্টরি স্থাপন করলে সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যত কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হয়, তার চেয়ে অনেকগুন বেশি, ক্ষেত্রবিশেষে পাঁচ থেকে দশগুন বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় সেই ফ্যাক্টরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, বিক্রয় সহ সামগ্রিক ভ্যালূ চেইনে। তাই বৈশ্বিকভাবেই ভ্যালূ চেইন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমেই নতুন কর্ম সংস্থান সৃষ্টি আর কর্ম পরিবেশ উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়। আর এই বিনিয়োগের বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই।

অর্থনৈতিকআর ভোক্তাদের চাহিদার কারণেই সারা বিশ্বের মত আমাদের দেশেও আগামীদিনগুলোতে সাসটেইনেবল পণ্য, সেবা আর এমপ্লয়মেন্ট বা কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে আগামী দিনগুলোতে সাসটেইনেবল প্রসেস বা প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন উদাহরণ, ইনভেটিভ মডেল ও ফিল্ড লার্নিং সেই সময় সঠিক বিনিয়োগ আর সিদ্ধান্ত নিতে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে ও সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

যেহেতু এই ক্ষেত্রগুলোতে উদ্ভাবন আর বিনিয়োগের বেশিরভাগ অংশই বেসরকারি খাত থেকে আসবে, তাই বাংলাদেশ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত ম্যানুফেকচারিং বা উৎপাদনের পাশাপাশি ভ্যালু চেইনের অন্য অংশগুলোকেও আনুষ্ঠানিক খাতের নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবার ও প্রণোদনা প্রদানের। কারণ উৎপাদন পর্যায়ের একটি কাজের বিপরীতে একই প্রক্রিয়ার ভ্যালু চেইনে একাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ভ্যালু চেইনের অনানুষ্ঠানিক এই অংশগুলোকে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলেই আমাদের দেশের বেকারত্ব আর কর্মসংস্থানের জটিল চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরনে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা শুরু হবে।