আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোন (এএমইজেড) বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

এএমইজেড মূলত বাংলাদেশের জন্য একটি গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ডেস্টিনেশন হয়ে উঠেছে। ঢাকার কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪৪ কিলোমিটার দূরত্বে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ২০৪ কিলোমিটার দূরে এবং নদীপথে সহজে সংযুক্ত থাকায় এর অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক ও মাল্টি-মোডাল লজিস্টিক সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে ‘হোন্ডা’ তাদের মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলি প্লান্ট স্থাপন করেছে এবং ‘আরক্রমা’—একটি সুইস বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান—এখানে কার্যক্রম শুরু করেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এএমএল গ্রুপের নিজস্ব সিস্টার কনসার্নগুলোও এএমইজেডে বিনিয়োগ করছে। যেমন, মোনেম ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেড: প্লাস্টিক থেকে ফ্লাস্ক উৎপাদন কারখানা; ইগলু আইসক্রিম: দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের দ্বিতীয় কারখানা; ইগলু ফুডস লিমিটেড: প্রসেসড ফুড উৎপাদনের জন্য দ্বিতীয় প্লান্ট। ফলে এএমইজেড একদিকে বিদেশী বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দু, অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোক্তা ও এএমএল গ্রুপের নিজস্ব শিল্প উদ্যোগেরও বড় ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু পুঁজি নয়, বরং কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ খুলে দিচ্ছে।

গত এক বছরে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কারে কোন পরিবর্তনগুলো এএমএলের ব্যবসায়িক কৌশলকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে?

বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে যে করছাড় ও কাস্টমস সুবিধা চালু করেছে, তা বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থা তৈরি করেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ বছরের করছাড় (প্রথম তিন বছর ১০০ ভাগ করমুক্ত) নীতিটি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারী উভয়ের জন্য বড় প্রণোদনা।

এছাড়া কোম্পানি নিবন্ধন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এএমএলের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট ও ডলারের অস্থিরতা ব্যবসায়িক কৌশলে সতর্কতা এনেছে। এএমএল এখন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও বহুমুখী খাতভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করছে। অর্থাৎ কেবল ভোক্তাভিত্তিক শিল্প নয়, অবকাঠামো ও লজিস্টিকসহ টেকসই শিল্প খাতে জোর দেয়া হচ্ছে।

এএমইজেডে আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন সুবিধার মাধ্যমে কীভাবে টেকসই শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে?

এএমইজেড পরিকল্পনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। জিআইএস ম্যাপিং, ড্রোন সার্ভে ও টপোগ্রাফিক ডাটা বিশ্লেষণ করে পুরো মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। জমি এক মিটার উঁচু করা হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে বন্যা এড়ানো যায়। এখানে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট বিদ্যুতের নিশ্চয়তার জন্য রয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ডব্লিউটিপি) ও সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি), স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) সমন্বিত ড্রেনেজ সিস্টেম। ৩৪৫ একরের মধ্যে প্রায় ৬৫ ভাগ উন্নয়ন শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় আট লাখ বর্গমিটার শিল্পভূমি প্রস্তুত এবং বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো একটি স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল, যেখানে উৎপাদন ও অবকাঠামো সমানভাবে টেকসই।

বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব উন্নয়নে সরকারি অবকাঠামোগত সংস্কার কতটা সহায়ক হয়েছে?

সরকারের নেয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এএমইজেডের সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসএএসইসি রোড উন্নয়ন প্রকল্প ও ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের আধুনিকীকরণ শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সহজ করেছে। একই সঙ্গে নদীপথ উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্প্রসারণ জোনটির কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করেছে। এসব অবকাঠামো সংস্কার বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে এবং শিল্পাঞ্চলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।

পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও গ্রিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এএমএল কীভাবে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করছে?

এএমইজেডকে একটি গ্রিন ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি এএমএল দিয়েছে। এজন্য প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ইটিপি, সিইটিপি ও এসটিপি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া সোলার এনার্জি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, পরিবেশবান্ধব ও কম দূষণকারী শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (আইএসও-আইএফসি গাইডলাইন) মেনে সব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশ সংরক্ষণ একসঙ্গে নিশ্চিত হচ্ছে।

গত এক বছরে এএমএল কতজন নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে এবং দক্ষতা উন্নয়নে কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?

গত এক বছরে এএমএল প্রায় ৫০০ নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে, যার মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আইটি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সচেতনতা, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। ফলে এএমএল কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বরং একটি দক্ষ, প্রযুক্তিসম্পন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ তৈরি করছে।

কর্মীদের সামাজিক-নৈতিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী মনোভাব উৎসাহে এএমএল কী করছে?

এএমএল বিশ্বাস করে কর্মীরা শুধু শ্রমিক নয়, তারা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পদ। তাই আমরা সিএসআর কার্যক্রমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও স্থানীয় কমিউনিটি উন্নয়নে বিনিয়োগ করি। উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে নিয়মিত ইনোভেশন ক্যাম্প, কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে কর্মীরা নতুন ধারণা শেয়ার করতে এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারেন। আমাদের প্রতিষ্ঠাতার মূল দর্শন ছিল ‘ইনোভেশন ইজ দ্য হার্টবিট অব আ নেশন’—এটি এখনো আমাদের সব কাজে প্রেরণা জোগায়।

আগামী পাঁচ বছরে এএমএল কীভাবে বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানকে আরো টেকসই ও উদ্ভাবনী করবে?

আগামী পাঁচ বছরে এএমএলের পরিকল্পনা হলো এএমইজেডকে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অন্তত ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্মার্ট অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো, দেশী উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্প সুযোগ সৃষ্টি ও বিদেশী বিনিয়োগ আরো আকর্ষণ করা। এএমইজেড মূলত এএমএল গ্রুপের সিস্টার কনসার্নগুলোর শিল্পভিত্তি হয়ে উঠবে। সেখানে মোনেম ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেড, ইগলু আইসক্রিম ও ইগলু ফুডস লিমিটেড নতুন শিল্প স্থাপন করবে। ফলে দেশীয় ব্র্যান্ডের প্রবৃদ্ধি যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও আরো আস্থা পাবে।