বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে আকিজবশির গ্রুপ সবচেয়ে বড় কোন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের অপ্রত্যাশিত দামের ঊর্ধ্বগতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। আমরা যেহেতু মূলত উৎপাদন ও রিয়েল এস্টেট খাতে কাজ করছি, তাই কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদনে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এলসি খোলায় জটিলতা, ডলারের অপ্রতুলতা এবং আমদানি শুল্ক কাঠামোর অস্থিরতা আমাদের কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিয়ম এবং শ্রমিক দক্ষতার ঘাটতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার ব্যবসায়িক নীতিমালায় হঠাৎ পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটে, যা একটি সুস্থ বাণিজ্য পরিবেশের জন্য অনুকূল নয়।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট বা বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যার মতো বাহ্যিক সংকটগুলো আপনার ব্যবসায় কীভাবে প্রভাব ফেলছে?
এ সংকটের প্রভাব পড়ছে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে। যেমন উৎপাদন খরচ, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ও পণ্যের ডেলিভারি টাইমে প্রভাব ফেলছে। ডলার সংকটে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (LC) খোলায় সতর্ক অবস্থানে আছে। এতে কাঁচামাল কেনার সময় ও ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।
একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। প্রায় সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন শিডিউল বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমাদের যেমন অপারেশনাল খরচ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি ভোক্তাদের কাছে পণ্যের দামও সুবিধাজনক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আকিজবশির গ্রুপ আগামী ৫-১০ বছরে কোন খাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে?
আমরা ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখছি নির্মাণসামগ্রী, হোম ডেকোর, ইন্টেরিয়র সলিউশনস, কিচেন সলিউশনস, সিরামিক ও এক্সপোর্ট-ওরিয়েন্টেড ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের নগরায়ণ, মেগা প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে হোম ও লাইফস্টাইল পণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে আকিজবশির গ্রুপ উচ্চমানের, নান্দনিক ও টেকসই পণ্য তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে।
আমরা প্রযুক্তি, ডিজাইন ও টেকসই উপাদানের সংমিশ্রণে এমন পণ্য তৈরি করছি, যেগুলো স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। ভবিষ্যতে এ খাতগুলোকেই আমরা প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছি।
দেশীয় বাজারের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ বা রফতানি বৃদ্ধির জন্য আপনারা কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে, যেসব পণ্য এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা পাচ্ছে—যেমন সিরামিক, হোম ফার্নিশিং, ডেকোরেটিভ বাথরুম ফিটিংস—সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক আয়ের পরিধি বাড়ানো।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেছি:
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদ (ISO) অর্জন হয়েছে, এর সঙ্গে ডিজাইন ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে R&D বিভাগে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে এক্সপোর্ট ফোকাসড ট্রেনিং চালু করেছি। পাশাপাশি আমরা আন্তর্জাতিক ট্রেড শো ও এক্সপোর মাধ্যমে নতুন মার্কেট খুঁজে বের করছি। বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড বিল্ডিংয়ের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং ও বিদেশী ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার নিয়োগও আমাদের প্রস্তুতির অংশ।
উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্রুপটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুধু উৎপাদন নয়—উদ্ভাবন ও টেকসই হওয়াই হতে হবে মূল চালিকাশক্তি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন, কারখানাগুলোয় আধুনিক অটোমেশন প্রযুক্তি ও ইআরপি সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। উৎপাদনে কার্বন ফ্রুটপ্রিন্ট কমাতে রিনিউয়েবল এনার্জি ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তার সঙ্গে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং রিসাইক্লিং প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। গবেষণা ও উন্নয়ন বা আরঅ্যান্ডডি ফ্যাসিলিটিতে নতুন ডিজাইন, ম্যাটেরিয়ালস ও উৎপাদন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের উদ্ভাবনী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আকিজবশির গ্রুপ বর্তমানে কী ধরনের অবদান রাখছে? দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভবিষ্যতে আরো কী উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে?
বর্তমানে আকিজবশির গ্রুপের অধীনে প্রায় ২৫ হাজার সরাসরি কর্মী কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ কারিগরি, প্রশাসনিক ও সাপোর্ট ফাংশনে যুক্ত। এছাড়া পার্টনার ডিলার, পরিবহন ও কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে আরো কয়েক হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা কেবল কর্মসংস্থানই তৈরি করছি না, বরং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দিচ্ছি। নিয়মিত ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ ও ডিজিটাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম আমাদের কর্মপরিকল্পনার অংশ। ভবিষ্যতে আমরা কারিগরি ইনস্টিটিউট ও ট্রেইনিং সেন্টার স্থাপনের চিন্তা করছি, যেখানে নতুন প্রজন্মকে ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রস্তুত করে তোলা হবে। দক্ষ জনবল তৈরিই আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম শর্ত।
বাংলাদেশের শিল্পনীতিমালার কোন বিষয়গুলোকে আপনি ব্যবসার জন্য সবচেয়ে সহায়ক মনে করেন?
আমাদের মতে, ব্যবসায়িক পরিবেশে সবচেয়ে সহায়ক বিষয় হলো করছাড় সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যাংকিং সুবিধা।
বর্তমানে কিছু শিল্প খাতে দেয়া করছাড় ও ট্যাক্স ইনসেনটিভ উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ইপিজেড, শিল্পনগরী ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, রফতানি প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন ও সহজীকরণ এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করা বড় ধরনের সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। যদি এ সুবিধাগুলোকে আরো সহজলভ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক করা যায়, তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন।
আগামী দিনে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসাকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও রফতানিমুখী করতে সরকারের কোন ধরনের নীতি সংস্কার সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
আমার মতে, তিনটি ক্ষেত্রে জরুরি নীতি সংস্কার প্রয়োজন। ১. বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগে অগ্রাধিকার: শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। ২. শুল্ক ও কর কাঠামোয় স্থিতিশীলতা: নীতির পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত না হলে ব্যবসা পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৩. রফতানি সহজীকরণ: রফতানিমুখী পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, কাস্টমস, রিফান্ড প্রসেস ইত্যাদিতে ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা জরুরি। পাশাপাশি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক সমন্বয় প্লাটফর্ম (business facilitation desk) চালুর চিন্তা করা যেতে পারে।
গত এক বছরে সরকারের কোন পদক্ষেপগুলো ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো গতিশীল ও শক্তিশালী করেছে বলে আপনি মনে করেন?
গত এক বছরে আমরা কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছি। বিশেষ করে রফতানিমুখী খাতে প্রণোদনা বজায় রাখা, ইকোনমিক জোনে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু। এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট শিল্পে ব্যাংকঋণ সুবিধা শিথিল করা। এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়নে গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে আরো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সর্বশেষ
বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটে আকিজবশির গ্রুপ একদিকে যেমন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন সম্ভাবনার খোঁজেও রয়েছে। উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশকে সামনে রেখে গ্রুপটির কৌশল সাজানো হয়েছে। আর সরকারি নীতিগত সহায়তা ও স্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা যায়, তবে শুধু আকিজবশির গ্রুপ নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্প খাতই আরো এগিয়ে যাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়।










