কেডিএস গ্রুপ বর্তমানে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বড় বিনিয়োগ ধরে রেখেছে। চলমান বৈশ্বিক মন্দা, ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আপনারা ব্যবসার স্থিতিশীলতা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?

৪২ বছরের যাত্রায় কেডিএস সবসময় প্রতিকূলতার মাঝেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করেছে। আজকের বৈশ্বিক মন্দায়ও আমরা পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণ, সাসটেইনেবল পণ্য উৎপাদন, ইআরপি ও এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শক্তি সাশ্রয়ী মেশিনারির মাধ্যমে খরচ কমাচ্ছি। আমাদের নীতি হলো- ‌‘‌Oldes t in es tablishment, lates t in technology.’

বর্তমানে ব্যবসায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন? চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে করণীয় কী?

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতি ব্যবসায় নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর মধ্যে প্রধান হলো কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, শ্রম মজুরি বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কনজেশন ও লজিস্টিকস সমস্যা। এসব চ্যালেঞ্জ শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধিকে প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে ফেলছে।

তবে আমি বিশ্বাস করি, এ চ্যালেঞ্জই আমাদের আরো দৃঢ় করছে। আমরা এরই মধ্যে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি, আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন গ্রহণ করছি, খরচ অপ্টিমাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি এবং শ্রমিক সাপোর্ট চেইনকে আরো শক্তিশালী করছি। পাশাপাশি নীতিগত সংস্কার নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন বাজার অনুসন্ধান। প্রচলিত বাজারের বাইরে বিকল্প গন্তব্য খোঁজা এবং প্রডাক্ট বৈচিত্র্যকরণই আমাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের চাবিকাঠি।

ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আপনারা কোন কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

আন্তর্জাতিক বাজার প্রবণতা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, টেকসই উৎপাদন মডেল, প্রতিযোগিতা ও এক্সচেঞ্জ রেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সাপ্লাই চেইনের ডিজিটালাইজেশন—এসব বিষয়কেই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

বাংলাদেশের নীতি—বিশেষ করে করনীতি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি উদ্যোগ-কেডিএস গ্রুপের ব্যবসা প্রসার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কতটা সহায়ক হচ্ছে?

পূর্বাভাসযোগ্য করনীতি এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি উদ্যোগ আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্ক সুবিধা হারানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এজন্য দ্রুত জিএসপি প্লাস বা বিকল্প শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে গ্রিন ফ্যাক্টরি ও কার্বন-ফুটপ্রিন্ট কমানোয় সরকার যদি করছাড় ও প্রণোদনা দেয় তাহলে বিনিয়োগ আরো সহজ হবে।

চট্টগ্রামে অবস্থিত হওয়ায় লজিস্টিকস ও বন্দরের ওপর অনেকটা নির্ভর করতে হয়। অবকাঠামো ও বন্দরের সীমাবদ্ধতা আপনার ব্যবসায় কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং এ বিষয়ে কী ধরনের সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

চট্টগ্রামে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এনার্জি সিকিউরিটি যেখানে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নেই এবং নতুন গ্যাস সংযোগও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন বাড়াতে পারছে না এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও লজিস্টিকসও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। বিশেষ করে বন্দর কনজেশন, সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ক্রমবর্ধমান লজিস্টিক খরচ রফতানির গতি কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন বন্দরের আধুনিকায়ন, নতুন আইসিডি, ওয়‍্যারহাউজ ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো নির্মাণ এবং রেল ও নৌপথ পরিবহন ব্যবহারের সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে জোরদার করতে হবে, যাতে সমন্বিতভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটে এবং শিল্প খাতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

আপনারা সম্প্রতি গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ ও টেকসই উৎপাদন মডেল ভবিষ্যতে কেডিএস গ্রুপের কৌশলে কীভাবে ভূমিকা রাখবে?

গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড আমাদের জন্য শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, বরং এক্সিলেন্স, ইনোভেশন ও কমিটমেন্টের প্রতীক। এ অর্জন ভবিষ্যতে কেডিএস গ্রুপের কৌশলে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে এবং পানি রিসাইক্লিং প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ হাতে নেয়া হবে। আমাদের বিশ্বাস—এসব পদক্ষেপ শুধু পরিবেশবান্ধব নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থাও আরো সুসংহত করবে।

কেডিএস গ্রুপ আগামী পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে?

আগামী পাঁচ বছরে কেডিএস গ্রুপ কর্মসংস্থান ও শিল্পের রূপান্তরে একটি সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ করেছে।

আমরা অ্যাডভান্সড প্রডাক্ট ডিজাইন, আইওটি, স্মার্ট চেইন ম্যানেজমেন্ট, অটোমেশন এবং ডিজিটালাইজেশনে বড় আকারে বিনিয়োগ করছি। ফলে কর্মসংস্থান ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশা করছি, বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং টেকনিক্যাল কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

এছাড়া আমরা টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, হাই-ভ্যালু অ্যাপারেল, ডিজিটাল ডিজাইন স্টুডিও, অটোমেশন-সাপোর্টেড ম্যানুফ্যাকচারিং ও সাপ্লাই চেইন সার্ভিসের মতো নতুন উদ্যোগ নিচ্ছি। এসব উদ্ভাবনী পদক্ষেপের মাধ্যমে নারী ও তরুণদের জন্য হাজার হাজার নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা শুধু কর্মসংস্থান বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক গার্মেন্টস শিল্পে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে আপনারা সরকারের কাছে কী ধরনের সহযোগিতা বা নীতিগত সংস্কার প্রত্যাশা করছেন?

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকারের সহযোগিতা ও নীতিগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। আমাদের প্রত্যাশা হলো একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় করনীতি, যা ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করলে শিল্প খাতের আর্থিক চাপ কমবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।

অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে রফতানি প্রক্রিয়ায় কার্যকারিতা বাড়ে। দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যা শ্রমিকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতায় সক্ষম করে তুলবে। পাশাপাশি নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করলে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতি তৈরি হবে, যা শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য আরো টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। আগামী ১০ বছরে কেডিএস গ্রুপ কোথায় দাঁড়াতে চায়?

আগামী ১০ বছরে আমরা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে একটি নতুন উচ্চতায় দেখতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো এ শিল্পকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রিমিয়াম ভ্যালু-অ্যাডেড অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং গ্লোবাল হাব হিসেবে গড়ে তোলা। এর সঙ্গে পণ্যের মানোন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি রূপে প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।

আমরা বিশ্বাস করি, ডিজিটাইজেশন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক উৎপাদন প্রক্রিয়া আগামী শিল্প খাতের মূল চালিকাশক্তি হবে। তাই কেডিএসকে আমরা ডিজিটালাইজড ও এআই-চালিত ম্যানুফ্যাকচারিং মডেলের পথিকৃৎ হিসেবে রূপান্তর করতে চাই। পাশাপাশি মানবিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজনের মাধ্যমে গার্মেন্টস শিল্পকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তুলতে চাই।

অর্থাৎ আগামী দশকে আমরা চাই বাংলাদেশী পোশাক শিল্প কেবল একটি উৎপাদন খাত না থেকে বরং টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিশ্বমানের উদ্ভাবনী শিল্পের রোল মডেল হয়ে উঠুক।