গত এক বছরে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাজারে ইলেক্ট্রো মার্ট কী ধরনের নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ বা প্রবৃদ্ধির ধারা লক্ষ করছে?
গত এক বছরে দেশে ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের চাহিদা খুব বেশি বাড়েনি। মানুষ এখন ক্রয়ে অনেক বেশি সচেতন, প্রয়োজন ছাড়া নতুন পণ্য কিনতে চাইছে না। ফলে এ খাতে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ বা প্রবৃদ্ধি সীমিত আকারেই হচ্ছে।
স্থানীয় উৎপাদন বনাম আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান কীভাবে শক্তিশালী করছে কোম্পানিটি?
বর্তমানে দেশে ইলেকট্রনিকস পণ্যের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। ফলে প্রতিযোগিতাও হচ্ছে মূলত স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে, যার কারণে মান উন্নত হচ্ছে এবং দামও ক্রেতাদের সামর্থ্যের মধ্যে আসছে। আমদানিনির্ভর বিদেশী ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখন খুবই সীমিত। আমাদের উৎপাদিত কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিকস এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য আমদানীকৃত পণ্যের তুলনায় মানে উন্নত ও পরিবেশবান্ধব। দেশের আবহাওয়া, গ্রাহকের প্রয়োজন ও ক্রয়ক্ষমতা মাথায় রেখে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলো তৈরি করা হয়। এ কারণে বাজারে কনকা, গ্রী ও হাইকো এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রযুক্তি সচেতনতার পরিবর্তনের ফলে আগামী এক-দুই বছরে কোন নতুন সেগমেন্টে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে ইলেক্ট্রো মার্ট?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি, ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। গ্রাহক এখন নতুন নিত্যনতুন প্রযুক্তির পণ্য কিনতে ও ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী। কনকা, গ্রী ও হাইকো সবসময়ই ক্রেতার রুচি ও পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে পণ্য তৈরি করে। শহর ও গ্রামের ভিন্ন চাহিদা মাথায় রেখে আমরা নিয়মিত পণ্যের আধুনিকায়ন করছি। এ কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আমাদের আরঅ্যান্ডডি। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার ও স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নিয়মিত বিনিয়োগ করছি। পাশাপাশি ক্রেতাদের ভেতরেও নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামীতে এ খাতে প্রবৃদ্ধির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ডলার, আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ আর কোন সমস্যাগুলো কোম্পানির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডলার ও অধিক শুল্ক সমস্যা ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। ডলার সংকট ও বিনিময় হার বাড়ায় দেশের ইলেকট্রনিকস খাতে কাঁচামাল ও অন্যান্য খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি বেশকিছুটা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলো এলসি প্রদানে দেরি করায় সময়মতো কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বারবার উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। তবু বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে আমরা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চেষ্টা করছি।
ইলেক্ট্রো মার্ট কীভাবে স্থানীয় উৎপাদন, নতুন প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনী বিপণন কৌশল ব্যবহার করছে?
ইলেক্ট্রো মার্ট রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ারকন্ডিশনারসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের রুচি, চাহিদা ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়। শহর ও গ্রামের ভিন্ন চাহিদা মাথায় রেখে নিয়মিত আধুনিকায়ন করে, আরঅ্যান্ডডি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের আবহাওয়া, পরিবেশ ও পরিস্থিতি ভিন্ন। এ ভিন্নতাকে মাথায় রেখে কনকা ফ্রিজে সংযোজন করেছি অ্যাক্টিভিটেড কার্বন ডিওডোরাইজার টেকনোলজি। ফলে ফ্রিজে রাখা খাবারে একটার সঙ্গে আরেকটা গন্ধ মিক্সড হয় না। এতে খাবার থাকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্মত। কনকা ফ্রিজে যেসব ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয় তা শতভাগ ফুড গ্রেড ও আমেরিকান এফডিআই কর্তৃক সার্টিফায়েডকৃত। যার কারণে খাবারের মান ও গুণ থাকে শতভাগ নিশ্চিত। এছাড়া কনকা ফ্রিজে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও ওজন স্তর রক্ষাকারী গ্যাস R600 ব্যবহার করা হয়। আবার বিদ্যুতের ওঠানামা সামলাতে কমপ্রেসারে ডাবল লেয়ার প্রটেকশন ব্যবহার করা হয়। গ্রী এসিতে আছে জি বুস্ট ইনভার্টার প্রযুক্তি, বায়োলজিক্যাল ফিল্টার, ক্যাচেইন ফিল্টার, সিলভার আয়ন ফিল্টার ও কোলাজমা (কোল্ড প্লাজমা) এয়ার পিউরিফিকেশন প্রযুক্তি, যা ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখে। এভাবেই আমরা নিত্যনতুন প্রযুক্তি আমাদের পণ্যে সংযোজন করছি। এতে আমাদের প্রতিটি পণ্যেই গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
ইলেকট্রনিকস খাতের উন্নয়নে সরকারের বিদ্যমান নীতিসহায়তা (যেমন কর সুবিধা, আমদানি শুল্ক, ভর্তুকি) কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?
সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ইলেকট্রনিকস খাতে আমদানি শুল্কছাড়, কম হারে কর ও ভ্যাট অব্যাহতি তুলে নিয়েছে। এতে আমরা যারা তিন-চার বছর ধরে বিনিয়োগ করে কারখানা স্থাপন করেছি, তারা স্বল্পমেয়াদি নীতির কারণে ঝুঁকিতে পড়েছি। আসলে স্বল্পমেয়াদি নীতি খুব একটা কার্যকর হয় না। একটি শিল্পকারখানাকে ব্রেক ইভেনে পৌঁছতে কমপক্ষে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। বিনিয়োগের এক বছর পর নীতি বদলে গেলে উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পড়েন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ সামলাতে পারেন না এবং অনেকে শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করে দেন। তাই সহজে কেউ নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না।
ভবিষ্যতে এ খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও রফতানিমুখী করতে সরকারের কোন নীতি সংস্কার বা নতুন উদ্যোগ সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা। সরকার এ খাতের উন্নয়নে নানা ধরনের সহযোগিতা করায় বিনিয়োগকারীরা তাদের সুবিধাজনক স্থানে এরই মধ্যে কারখানা স্থাপন করেছেন। আমরা এ খাতে সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্সের বিগত সময়ের সুবিধাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে বাড়ানো এবং কাস্টমস শুল্কায়ন ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ার সব নীতিমালা সহজীকরণের আবেদন করছি। এ শিল্প খাতটিকে পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ এবং এ খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে রেয়াতি বা ট্যারিফ সুবিধা ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে সুপারিশ করছি। সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে দেশের বিকাশমান শিল্প খাতটি দ্রুতই রফতানিমুখী খাতে পরিণত হবে এবং ভবিষ্যতে গার্মেন্টস শিল্পের পাশাপাশি দাঁড়াতে পারবে।










