দেশে ও বিদেশে আমাদের দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে এখনো একটা স্যুট তৈরি করতে ১০-১৫ দিন লাগে। কিন্তু থাইল্যান্ডে সকালে অর্ডার করলে বিকালে তা রেডি হয়ে যায়। এ থেকেই বোঝা যায় আমাদের দক্ষ শ্রমিকের অভাব। যদিও সেটা আরেকটা শিল্প। তবে সেটাকেও পোশাক শিল্পের আওতায় আনা যায়। সেটা করতে গেলে আমাদের শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনক্ষমতা লাগবে, সেটা বর্তমানে আমাদের নেই। নেই বলেই আমরা সস্তা পণ্য উৎপাদন করছি। এটা হলো প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্য অর্থনীতিতে যখন পরিবর্তন হয়, যখন অর্থনীতির অবনমন ঘটে তখন ওই সস্তা পণ্যগুলোই প্রভাবিত হয়। সুতরাং স্বল্প দামে পণ্য বিক্রি করা খারাপ নয়। সস্তা দামে পণ্য বিক্রি করা শঙ্কামুক্ত। কারণ যখন অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী হয় তখনো আমরা পণ্য বিক্রি করতে পারি, আবার যখন অর্থনীতিতে মন্দা হয় তখনো বিক্রি করতে পারি। তবে এটা বলছি না আমরা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রিতে যাব না। উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে গেলে মুনাফা বেশি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। যখন সার্বিক পরিবেশ তৈরি হবে, কর্মদক্ষ শ্রমিক পাব, তখন আমরা ধীরে ধীরে ওইদিকে এগোব। একসময় আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পই ছিল না, এখন আমাদের হয়েছে। একইভাবে আমরা দামি ও উন্নত পণ্যের দিকেও এগোব। একটা পণ্যের জন্য নেগোশিয়েট করতে গিয়ে পুরো অর্থনীতির সম্ভাবনাকে যেন বিপদে না ফেলি। এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যদি মনেই হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনেই আমরা সব করতে পারব তাহলে আমরা চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি করি কেন? চীন সস্তায় বিক্রি করে বলেই আমরা সেখান থেকে আমদানি করি। সস্তা আমদানি ছিল বলেই আমরা সস্তায় সরবরাহ করতে পারি।
দেশে পাঁচ-ছয় হাজার আরএমজি ফ্যাক্টরি রয়েছে। সেখানে শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান খুব বেশি না। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেশি যায় বায়িং হাউজে। আমদানি-রফতানির ব্যবসায় যায়। শিক্ষিত শ্রেণী এর সঙ্গে জড়িত কিন্তু সার্বিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত না। দ্বিতীয়ত, সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের কৌশল ভিন্ন হওয়া উচিত। পোশাক খাত দিয়ে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি এত বেশি হবে না। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি করতে হলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আনতে হবে। কোন বিনিয়োগ? যে বিনিয়োগে শিক্ষিত শ্রেণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। সুতরাং সেটা ভিন্ন পলিসি। পোশাক শিল্প যে প্রবৃদ্ধি দেয় সেটা এই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে আমার দেশে ২২ লাখ যে কৃষি শ্রমিক আছেন তারাও ধীরে ধীরে অকৃষিজ শ্রমের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। গত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভেতে (এইচআইইএস) দেখা যাচ্ছে, আমাদের কৃষি গৃহস্থালির ৫০ শতাংশ আয় আসে অকৃষি থেকে। অকৃষি হচ্ছে কৃষির বাইরে থেকে আয় করে। অর্থাৎ কৃষকরাও এখন কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাহলে আমরা গড় শ্রমিক প্রবৃদ্ধি যদি দুই মিলিয়ন ধরে নিই, সেক্ষেত্রে আরো দুই মিলিয়ন কৃষি থেকে বেরিয়ে আসছেন। ফলে নিম্ন পর্যায়ের চাকরিগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক শিল্প একটা প্রধানতম পর্যায়ের শিল্প, পাশাপাশি আমাদের আরো অনেক ক্ষুদ্র শিল্প, চামড়া ও জুতা শিল্প আছে। বাংলাদেশে আগামীতে আসা উচিত টয় ইন্ডাস্ট্রি। এগুলো অনেক নিম্ন দক্ষতার শ্রমিককে কাজে নিয়ে নেবে। আর শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মূল টার্গেট হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ করা, যেখানে শিক্ষিতদের তারা কাজে লাগাতে পারবে। এটা ভিন্ন নীতি। পোশাক শিল্প এটা করতে পারবে না।
গত ১৫-২০ বছরে আমাদের অর্থনীতির যে পরিমাণ অগ্রগতি হয়েছে সেই তুলনায় আমাদের কর্মসংস্থান বাড়েনি। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দিই, আমরা বিপুল ব্যয়ে পদ্মা ব্রিজ তৈরি করেছি, কিন্তু সেখানে কতটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে? এগুলো আসলে জিডিপিকে বাড়িয়েছে, কর্মসংস্থান নয়। ঢাকায় ফ্লাইওভার তৈরি হয়েছে, এগুলো কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেটা অর্থনীতির ভিত। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নেই। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কখন হবে? যখন শিল্প-কলকারখানা হবে তখন। সেজন্যই বলছি, কর্মসংস্থান তৈরি করতে গেলে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগ লাগবে। কৃষি বরং স্যাচুরেটেড, কৃষি থেকে আমরা বের করতে চাচ্ছি। তাহলে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে অগ্রগতি না হলে অগ্রগতি হবে না। পোশাক শিল্পে গত ১০ বছরে (২০১৪-২৪) যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা খুব একটা হয়নি। অধিকাংশ শিল্প-কলকারখানা ম্যাকানাইজড সিস্টেমে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি অতটা না। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের ১-২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ গত ১০ বছরে আমার আউটপুট বেড়েছে শতভাগ। কিন্তু কর্মসংস্থান সেই তুলনায় হয়নি, এটাই হলো কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির উদহারণ। আমার অর্থনীতি যেদিকে যাচ্ছে সে তুলনায় কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি আসছে না। এটা আমাদের আগে ছিল না। ফলে এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আনা। বিনিয়োগ শুধু বাইরে থেকেই নয়, ভেতর থেকেও আসতে হবে। যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়। কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি বাড়ে।
অনেকে বলছেন, আমাদের জন্য সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে ফুটওয়্যার ও লেদার ইন্ডাস্ট্রি। পোশাক শিল্পে আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি হয়েছে। কিন্তু ফুটওয়্যার ও লেদার ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা আন্তর্জাতিক মানের হতে পারছি না কেন? আমরা এখানে খুব ধীরলয়ে এগোচ্ছি। আমাদের মূল সমস্যা হলো, আমাদের লেদার সরবরাহ সারা বছর সমান নয়। এছাড়া ঈদের সময় একটা বিশাল সরবরাহ আসে। সে সময় প্রচুর ছোট ছোট শিল্প তৈরি হয়, যারা লেদার প্রক্রিয়াজাত করে। আমাদের এপেক্স ও বাটা ভালো ইন্ডাস্ট্রি। তাদের নিজস্ব ইটিপি আছে। বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে সার্বিক কাজের জন্য। ঢাকায় যেটা নিয়ে আমরা বেশি হইচই করি সেটার জন্য ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে সরকারের দোষ বেশি। সাভারে জোন করে তাদের সেখানে যেতে বলা হলো। কিন্তু সেখানে ইটিপি চলে না, সিইটিপি চলে না। এর অর্থ সরকার সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারেনি। এটা বেশি দিন আগের নয়। ২০০৬ সালে আমাদের একটা প্রতিবেদনে বলেছিলাম, প্রত্যেকটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টেটে সিইটিপি করতে হবে। এটা যদি না করে তাহলে দূষণ বেড়ে যাবে। আর এই সিইটিপি করার দায়দায়িত্ব যদি পুরোটা ইন্ডাস্ট্রিকে দিই তাহলে তার খরচ বেড়ে যাবে। সুতরাং নগরায়ণের কৌশলগত নীতিমালা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একজনকে দোষ দিলে সেটা হবে না। আমরা একসময় লেদার শিল্পকে দোষ দিলাম—সেটা নিয়ে গেল সরকার, নিয়ে সেটাকে বেশি দূর নিতে পারেনি। সেখানে একই অবস্থা। তাতে বোঝা যাচ্ছে, আমরা সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করছি না। আমরা প্ল্যানিং করছি অনেকটা তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের জন্য। এ মুহূর্তে ট্রাম্পের সমস্যাকে যদি কেবল পোশাক শিল্পের সমস্যা বলি সেটা ঠিক হবে না।
দ্বিতীয়ত, পোশাক শিল্পকে যেসব সুযোগ-সুবিধা, বিশেষত ব্যাংক থেকে শুরু করে বন্ডেড ওয়্যারহাউজসহ ট্যাক্স সুবিধা দেয়া হয়, এই একই সুবিধা কখনো লেদার শিল্পকে দেয়া হচ্ছে না। একই সুবিধা ক্ষুদ্র শিল্প ও ইলেকট্রনিকস মেশিনারিজে দেয়া হচ্ছে না। টয় ইন্ডাস্ট্রিতে দেয়া হচ্ছে না। যদি একই সুবিধা সব ইন্ডাস্ট্রিকে দেয়া হয় তাহলে অগ্রগতি ভিন্ন হবে। সব সুযোগ-সুবিধা একটি শিল্পকেন্দ্রিক। সমস্যা হচ্ছে পাবলিক পলিসিতে। যারা পোশাক শিল্পের মালিক তাদের বিশাল অংশ রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন ও আছেন। তারা সবাই তাদের ইন্ডাস্ট্রির কথাই বলেছেন, তারা দেশের অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বিষয়ে কথা বলেন না। পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি খুবই কম। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে এখন দরকার অন্য শিল্পগুলোকে বিকশিত করা। ফলে প্রথম দিকে কর্মসংস্থানের হার বেশি থাকবে, কারখানার বয়স যত বাড়বে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার তত কমতে থাকবে। এভাবে চিন্তা করেই পরিকল্পনা করতে হবে। এভাবে পরিকল্পনা করে যদি আমি কর্মসংস্থান বাড়াতে চাই তাহলে বাকি শিল্পগুলোকে ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা দিতে হবে। যে প্রণোদনা আশি-নব্বইয়ের দশকে পোশাক শিল্পকে দেয়া হয়েছিল।
পোশাক শিল্প শুরু থেকেই এমনকি কভিড মহামারীতেও সরকারের আনুকূল্য পেয়েছে। অন্য খাতগুলো এমনটা পায়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আমরা আরো অস্থির ও অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চলে যাচ্ছি। কিন্তু এতে পোশাক শিল্পের তেমন ক্ষতি হয়নি। আমরা যদি রফতানি তথ্য বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রে গত এক বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রফতানি প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটা নিয়ে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এগুলো আমরা যতটা বলি ততটা ঘটে না। আমরা একসময় তৈরি পোশাক ১০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতাম। এখন আমরা ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করছি। এজন্যই বলি এটা খুব প্রতিযোগিতামূলক শিল্প। পৃথিবীতে অনেক অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও পোশাক শিল্পের ক্ষতি হয়নি। যেহেতু পোশাক শিল্পের মালিকরা ক্ষমতাশীল, তারা সরকারে আছে, তাই তারা কেবল তাদের কথাই বলবে। এটার সঙ্গে দ্বিমত করছি না। আমি যদি সরকারে থাকতাম তাহলে আমি আরো অন্য ১০টি শিল্পের কথা ভাবতাম। সব শিল্পকে একই পলিসিতে নিয়ে আসা গেলে অগ্রগতি হবে। সেভাবেই চিন্তা করা উচিত। কেবল একটা শিল্পকে নিয়ে চিন্তা করা কখনই উত্তম পলিসি নয়।
আমরা মোটা দাগে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় তৈরি পোশাক রফতানি করি। এদিকে এশিয়া বৈশ্বিক জিডিপিতে ৫০ শতাংশ অবদান রাখছে। চীন, জাপান, ভারতের মতো বাজারের পাশাপাশি আসিয়ান জোটভুক্ত দেশ ও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য হাব ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ বাজারগুলোয় আমাদের দুর্বল অবস্থানের অনেকগুলো কারণ আছে। এসব জায়গায় আমাদের ভাষার সমস্যাটা অনেক বড় বাধা। আমরা একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলাম। ফলে আমরা ইংরেজি ভালো জানি, তাই আমরা ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে চলে যাচ্ছি। সুতরাং এটা আমাদের প্রাকৃতিক সুবিধা। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সেখানেই টাকা বিনিয়োগ করেন, পাচার করেন, সেখানেই ব্যবসা বাণিজ্য করেন। তারা সেখানে তাদের পরিবারসহ স্থায়ী হতে চান। ইউরোপে নাগরিকত্ব পাওয়া অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। যেসব দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া কঠিন তারা সেসব দেশকে নিরাপদ মনে করেন না। ফলে তারা ইউরোপে বিনিয়োগ করেন। আমাদের ব্যবসায়ীরা নাগরিকত্ব নেন সিঙ্গাপুরের, দুবাইয়ের। অন্যদিকে চীন ও সিঙ্গাপুরের বড় ব্যবসায়ীরা তারা নিজ দেশকেই অগ্রাধিকার দেন, তারা নিজ দেশেই পরিবারসহ স্থায়ী হতে চান। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীর উদ্দেশ্য ব্যবসা করা নয়, মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা করে টাকা-পয়সা ইনকাম করে বিদেশে পরিবারসহ স্থায়ী হওয়া। আমাকে যদি বলেন আমি কোথায় যেতে চাই? সেটা অবশ্যই ইউরোপ হবে। ফলে সেখানেই আমার বিনিয়োগ হবে, আমার অগ্রগতি সেখানেই হবে। এটাই তো প্রাকৃতিক বিষয়। এছাড়া আমি এটা অন্য কোথাও করতে পারব না। এর সঙ্গে রাজনীতি, দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং জড়িত। ফলে যদি বিষয়টাকে একভাবে দেখা হয় তখন আমি এর সঙ্গে একমত নই। তাদের উচিত ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে বিস্তৃত করে এক বিলিয়ন মানুষের বাজারে প্রবেশ করা। চীন এক্ষেত্রে বিশাল মার্কেট। জাপান-আমেরিকার মতোই বড় বাজার। ব্যবসায়ীদের চিন্তা করতে হবে কীভাবে এসব বাজারে প্রবেশ করা যায়। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় কীভাবে প্রবেশ করা যায় সেগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। এগুলো বড় মার্কেট। কিন্তু আমরা সেখানে যাচ্ছি না। আমাদের চিন্তাটা যে পুরোপুরি ব্যবসাকেন্দ্রিক সেটা মনে হচ্ছে না। এর বাইরেও অনেক চিন্তা আছে। সরকারের উচিত এসব বাজারে অনুপ্রবেশে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেয়া।
বাণিজ্যযুদ্ধে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ব্রাজিলের মতো অনেক দেশ সুবিধা নিতে পারলেও আমরা তেমন সুবিধা করতে পারিনি। প্রথমত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে চীনের একটা ভালো বোঝাপড়ার সম্পর্ক বহুদিন ধরে চলে আসছে। চীনের ব্যবসা, বিনিয়োগ ও জনগণ—এ সুবিধা তাদের প্রাকৃতিক। চীনের অর্থনীতিতে যেহেতু লেবার ইনটেনসিভ ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে না, ফলে তারা শিফট করে যাচ্ছে। তারা শিফট করে সেখানেই যাবে যেখানে চীনারা বসবাস করছে। ফলে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া এ সুযোগ নিচ্ছে। আমাদের উচিত হবে আমাদের লক্ষ্য ঠিক করা। আমাদের লক্ষ্য যদি একবার আমেরিকা, একবার চীন, আবার আমরা চিন্তা করি যে চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেগোসিয়েট করব, তাহলে চীন এখানে বিনিয়োগে কীভাবে আসবে? ভিয়েতনামের উন্নয়ন কেবল ভিয়েতনাম দিয়ে হয়নি, ভিয়েতনামের অগ্রগতিতে চীনের ভূমিকা আছে। কারণ চীনের বিনিয়োগ ভিয়েতনামে বা কম্বোডিয়ায় শিফট করে গেছে। আমরা যদি মনে করি আমরা কেবল ইউরোপের সঙ্গে থাকব, তাহলে আমাদের উন্নয়ন খুবই সীমিত হয়ে যাবে। তখন ইউরোপ আরো নতুন নীতি নিয়ে আসবে। শ্রম মানদণ্ড, উৎপাদন নীতিমালা এবং সোর্সিং ঠিক করার কথা বলবে। তখন আমাদের উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়তে থাকবে। সুতরাং ভিয়েতনামের সঙ্গে আমরা যেভাবে তুলনা করছি, সেটা সমান নয়। আরেকটা বিষয় হলো, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষার হার আমাদের চেয়ে বেশি। শিক্ষার হার বেশি হলে কিছু ন্যাচারাল অ্যাডভান্টেজ আছে। শিক্ষার সঙ্গে জীবনযাপন পদ্ধতি জড়িত। শিক্ষার হার বেশি হলে সব ধরনের রোগের হার কমে। ফলে সেখানে অনেক নীতি সহজে বাস্তবায়ন করা যায়। আমাদের ক্ষেত্রে এগুলো চ্যালেঞ্জ। সুতরাং আমাদের এগোতে হবে সাবধানে। গত ১০ বছরে পোশাক শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি হয়নি। আমরা হয়তো পৃথিবীর সেরা পরিবেশবান্ধব শিল্প করেছি। কিন্তু তা কর্মসংস্থান তৈরিতে কাজে লাগেনি। যেহেতু পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, তখন সেই খাতের দিকে ধাবিত হওয়া উচিত যে খাতে কর্মসংস্থানের অগ্রগতি আছে। কারণ জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কর্মসংস্থানকে টার্গেট করে পলিসি আসা উচিত।
নতুন যুগের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা উচিত। আমাদের শিক্ষাকে ঔপনিবেশিকতা থেকে বের হওয়া উচিত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পুরোপুরি উপনিবেশবাদের কাঠামো টিকে আছে। আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কোনো কিছু তৈরি করা না, কোনো রকম একটা ডিগ্রি দেয়া! ঔপনিবেশিক আমলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা ডিগ্রি তৈরি করা, যাতে সিভিল সার্ভেন্ট হতে পারে। আমাদের পুরো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ছাত্ররা যেন সিভিল সার্ভেন্ট হতে পারে। সুতরাং এতে বোঝা যায়, আমরা শিক্ষার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিকতার ভেতর আছি। ঔপনিবেশিকতা থেকে বের হতে হলে শিক্ষাকে এ কাঠামো থেকে মুক্ত হতে হবে। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেবাস একই রকম হবে কেন? সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সিলেবাস হলে সেটা কোনো শিক্ষা হলো না। একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ভিন্ন ভিন্ন সিলেবাস হবে। হার্ভার্ডের সিলেবাসের সঙ্গে প্রিন্সটনের সিলেবাসের মিল নেই। প্রিন্সটনের সঙ্গে স্ট্যানফোর্ডের মিল নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মিল নেই। আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক মানসিকতার জন্য আমরা একই শিক্ষা সব জায়গায় দেয়ার চেষ্টা করছি। এটা কাজ করবে না।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)










