সিটি গ্রুপের ইকোনমিক জোনে বর্তমানে কোন খাতে বিনিয়োগ বেশি এবং বিনিয়োগ পরিচালনায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে?

বর্তমানে সিটি গ্রুপের আওতায় তিনটি ইকোনমিক জোন যথাক্রমে সিটি ইকোনমিক জোন, হোসেন্দী ইকোনমিক জোন ও পূর্বগাঁও ইকোনমিক জোনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইকোনমিক জোনগুলোয় ১৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এর বেশির ভাগই ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া সেখানে জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী উপকরণ, পেপার ও কেমিক্যালস শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিনিয়োগ পরিচালনায় প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্যাসের অপ্রতুলতা। এছাড়া আর্থিক খাত ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। শিল্প কারখানাগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ চালু রাখতে নিজস্ব অর্থায়নে গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে নিজস্ব অর্থে প্রায় পাঁচ মাইল দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২০১৮ ও ২০২১ সালে গ্যাস সংযোগের অনুমতি দেয়া হয়। অথচ আজ অবধি এ প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি।

এছাড়া ২০২২ সাল থেকে দেশীয় মুদ্রার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। আমরা আমদানির জন্য যে ঋণ নিয়ে থাকি তার সুদহার গত তিন বছরে শতকরা ৩-৪ থেকে বেড়ে ৯-১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দেশের ও ব্যাংক খাতের অবনয়নের কারণে এলসির কনফারমেশন ফি বেড়ে গেছে।

আগামী পাঁচ বছরে ইকোনমিক জোনে নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কী এবং কোন খাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখছেন?

দেশে জনসংখ্যা বিশেষ করে মধ্যম আয়ের লোকের সংখ্যা বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন নতুন বাজারে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমাদের আগামী পাঁচ বছরে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ভোক্তাপণ্য (এফএমসিজি) শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত জ্বালানি, নির্মাণ উপকরণ, পেপার ও কেমিক্যাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেগুলো গ্যাসের অভাবে এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি, তা পরিপূর্ণভাবে চালু করা। সরকারের নীতিগত সহায়তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে।

ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কেমন ভূমিকা রাখতে চাইছেন এবং কোন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?

ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থান বাড়ে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বর্পূণ অবদান রাখে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সারা দেশে পণ্য বিপণনে ব্যাপক জনবল প্রয়োজন। ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক বা স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সিটি গ্রুপের ভূমিকা কী ছিল? এক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে?

সিটি গ্রুপ দেশের একটি নির্ভরযোগ্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ৫৩ বছর ধরে আমরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল আমদানি করে তা কারখানায় প্রক্রিয়াজাতপূর্বক নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিতরণ করে আসছি। এক বছরে আমরা বিগত বছরগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেশব্যাপী সরবরাহ করেছি। এছাড়া প্রতিনিয়ত যৌক্তিক মূল্যে সরকারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রদান করেছি। পবিত্র রমজানে সাধারণ জনগণের কাছে বিক্রির জন্য খোলা ট্রাকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করেছি। দেশের ও ব্যাংক খাতের অবনয়নে বড় আমদানি ঋণপত্র খোলা এবং ঋণের সুদহার বেশ বেড়ে যায়। এলসি খোলার জন্য কনফারমেশন লাইনও অপর্যাপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং কনফারমেশন ফিও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যদিও আমরা পরিস্থিতির ক্রম উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছি। এক বছরে দেশের বেশকিছু ব্যাংক তারল্য ও ভাবমূর্তির সংকটে পড়ায় আমদানি ঋণপত্র খুলতে পারেনি, যেটি আমাদের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে সিটি গ্রুপের বিদ্যমান সংকটগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে সব আমদানিকারককে কমবেশি একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে বেশ কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংকের ঋণপত্র বিদেশী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তিতে আমদানিকারকদের সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট রয়েছে। আবার অন্যদিকে ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিকারকদের ঋণপত্র খোলার লিমিট অনেক কমে গেছে।

কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত সংস্কার সিটি গ্রুপের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?

কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে নিজস্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণ, দেশব্যাপী সরবরাহ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমন পণ্যের শুল্কায়ন, শুল্ক প্রদান, বিভিন্ন ল্যাবে পণ্যের মান যাচাইসহ কোনো কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যনির্ধারণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এসব সংস্থার যথাযথ সমন্বয় হলে তা দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠালগ্নে সরকার বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দেয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে আগ্রহী হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সরকার আগের ঘোষণা থেকে সরে এসে অনেক সুযোগ-সুবিধা সীমিত ও রহিত করে। যেমন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাকালে যেকোনো পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কর অবকাশের (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধার বিধান ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি আদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন আটা, ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল ও অন্য শিল্পসামগ্রী উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপন করলেও বর্তমানে কর অবকাশ সুবিধা পাবে না মর্মে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে কতটা উন্নতি হয়েছে?

খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামো সংস্কারে সরকার কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে অধিকতর সংস্কারের সুযোগ রয়েছে। দেশব্যাপী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ও রফতানির জন্য এ বিষয়ে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।

বন্দর ও কাস্টমস সংস্কার কাঁচামাল আমদানি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ চেইনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং আরো কী পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন?

প্রথমত, আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে সুদক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজন। সাম্প্রতিককালে, বিশেষত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এ দুটি খাতে দুর্নীতি কমবে, ব্যবস্থাপনা উন্নতর হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরিত হবে এবং হয়রানি কমবে। এর মধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অতি সামান্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের আদেশ জারির পর শুল্ক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রয়ায় দেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হয়েছে, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ফলে আমাদের পণ্য আমদানি ও খালাস তথা সাপ্লাই চেইন পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় আসেনি।

দ্বিতীয়ত, আমরা আশা করেছিলাম বাজেটে ব্যবসাবান্ধব নীতিসহায়তা থাকবে। কিন্তু কিছু ব্যবস্থা উৎপাদকদের পরিবর্তে ট্রেডার সহায়ক হয়েছে। যেমন, র সুগারের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি প্রতি টনে ৩ হাজার টাকা কিন্তু ফিনিশড সুগারের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রতি কেজিতে পার্থক্য মাত্র ১ টাকা। এতে আমাদের মতো চিনি উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছি। তদুপরি প্রতিবেশী দেশ থেকে চিনি চোরাচালান তো আছেই। এক্ষেত্রে আমাদের দাবি ফিনিশড চিনির কাস্টমস ডিউটি প্রতি টনে ৬ হাজার টাকা ধার্য করা।

তৃতীয়ত, বন্দর ব্যবস্থাপনা আগের মতোই গতানুগতিক অবস্থায় আছে। তদুপরি, সাম্প্রতিককালে বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিদেশী অপারেটর নিয়োগ করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা চাচ্ছে এটি যাতে না হয়। কর্তৃপক্ষ মনে করছে বিদেশী অপারেটর নিয়োগের ফলে ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা উন্নতর হবে। ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের দাবি একটি সুদক্ষ ও উন্নততর বন্দর ব্যবস্থাপনা, যেখানে আমরা কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাতে জিম্মি হব না। আবার বিভিন্ন প্রকার মাশুল বাড়িয়ে আমাদের ব্যবসার খরচও বাড়ানো হবে না।

কৃষিভিত্তিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে সিটি গ্রুপ কীভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে?

কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও দেশব্যাপী সরবরাহের লক্ষ্যে প্রচুর জনবল প্রয়োজন রয়েছে। সিটি গ্রুপ সর্ম্পূণভাবে দেশীয় জনবল ব্যবহার করে এ কাজ পরিচালনা করছে। এতে বেকার জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সংস্কার টেকসই খাদ্যশিল্প গড়ে তুলতে কীভাবে সহায়ক হতে পারে?

টেকসই খাদ্য শিল্প গড়ে তুলতে হলে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বন্দর থেকে পণ্যসামগ্রী আনয়ন ও দেশব্যাপী বিতরণের লক্ষ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রাপ্যতা যেমন পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়ক হবে, অন্যদিকে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা হলে উৎপাদিত পণ্যগুলো সহজে ও কম সময়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছনো যাবে।

আগামী দিনে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সংস্কার সিটি গ্রুপ কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেবে?

খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সংস্কার তিনটি খাতেই সবিশেষ উল্লেখেযোগ্য। আমরা আগামী দিনে খাদ্যনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেব। আমাদের মূল উদ্দেশ্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদন করে যৌক্তিক মূল্যে সারা দেশে সরবরাহ করা। এছাড়া আমরা ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়ার আশা করছি।