গত এক বছরে স্লোগানে, জনসভায়, সেমিনারে, চায়ের আড্ডায় যে শব্দটি বহুবার আলোচনায় এসেছে তা হলো সংস্কার। শুধু আলোচনায় নয়, পোস্টারে, দেয়ালে, সংবাদপত্রে, কমিশন-কমিটির রিপোর্টেও তা অনেকবার লেখা হয়েছে। অর্থাৎ সংস্কার কাঙ্ক্ষিত, অত্যাবশ্যক ও অনতিবিলম্বে দরকার।

এত আলোচনা হলেও কোন ধরনের পরিবর্তনকে সংস্কার বলা হবে, সে বিষয় কি সুস্পষ্ট? অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রেখে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা উন্নতিই কি সংস্কার? সূচকগুলোকে কাঙ্ক্ষিত দিকে নিয়ে যেতে ও দুর্নীতি কমাতে সামষ্টিক অর্থনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মতো কৌশল তো সব দেশে সব সময় নেয়া হয় এবং হচ্ছে। সেটিকে তো বড় সংস্কার বলে দাবি করা হয় না।

এদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতিকে তখনই সংস্কার বলা যাবে, যখন তার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কর্মসংস্থান বাড়বে। উন্নতমানের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যেটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান বাড়ায় ও বৈষম্য কমায়। ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ ও আন্দোলন এসব আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। ঘটেছিল সরকার পতন।

বিগত দুই দশকে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল, সেখানে বড় ব্যর্থতা ছিল। কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্তিমিত হয়েছিল। কর্মসংস্থানের মান বাড়েনি। কারণ আনুষ্ঠানিক বা বিধিসম্মত খাতে কর্মসংস্থান হয়নি। কর্মসংস্থান বাড়েনি আধুনিক শিল্প ও সেবা খাতে। ফলে কৃষিতে শ্রমশক্তির চাপ বেড়েছে। সেখানে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতাও কমেছে।

এসব কারণে বেসরকারি নিয়োজনে মজুরি-বেতন থেকে প্রকৃত আয় বাড়েনি। অনেক পেশায় কমেছে। অধিকাংশ খাতেই অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও কর্মপরিবেশে উন্নতি দৃশ্যমান নয়।

তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে কর্মস্থলে শ্রমিকের অধিকার উন্নয়ন আসলে আলাদা-বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কর্ম নিয়োজনের অধিকার না বাড়লে কর্মস্থলে অধিকার বৃদ্ধির যুদ্ধে জয় হবে না। আর সে জন্যই অর্থনৈতিক সংস্কারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। সেখানে সাফল্য এলে প্রকৃত মজুরি বা বেতন বেড়ে তা বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সংস্কার কার্যক্রম ও কৌশল প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়ে কর্মসংস্থান ঘাটতির চিত্রটি খতিয়ে দেখতে হবে। সাম্প্রতিক দশকের প্রবণতা ও বিভিন্ন সূচকের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে; তাহলে সংস্কারের আবশ্যকতা সুস্পষ্ট হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাফল্য যে অর্জিত হয়নি বা ‍খুবই সীমিত, সেটি সরকারি পরিসংখ্যান থেকেও দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দশকটিতে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড়ের তুলনায় অনেক নিম্ন হারে। তরুণ শিক্ষিত জনশক্তির ক্ষেত্রে তার অভিঘাত পড়েছে। অতি উঁচু হারে বেকারত্বের শিকার তারা।

আরেকটি সূচক থেকে তরুণদের বঞ্চনার বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। তা হচ্ছে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে কত সংখ্যক (বা কত অংশ) উপার্জনকাজে নেই বা শিক্ষা-প্রশিক্ষণেও নেই। এমন কর্মহীনদের সংখ্যা থেকে হিসাব করে দেখা গেছে যে ২০২২ সালে গড়ে প্রতি গ্রামে ২৮ জন তরুণ ও ২৫ জন তরুণী কর্মহীন ছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শ্রমশক্তি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে এ সময়ে কর্মহীনদের মোট সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ এ তরুণদের সম্মানজনক উপার্জন কাজ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে স্বপ্ন ছিল, তা হরণ করেছে বৈষম্যমূলক উন্নয়ন কৌশল।

দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাফল্যের অভাব পরিস্ফুট হয়, এমন আরো কিছু তথ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।

তরুণদের জন্য দেশের মধ্যে উপার্জন কাজের আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি না হওয়ায় তারা বিদেশে পাড়ি দিতে উদগ্রীব। সব সরকারেরই বিদেশে কর্মী প্রেরণকে সাফল্য হিসেবে দেখানোর প্রবণতা থাকে। আগামী এক, দুই বা তিন বছরে অনেক কর্মী নেয়ার আগ্রহ আসছে। কিন্তু সে সুফল ফলবে কিনা তা অনিশ্চিত। আর বিদেশে স্বল্প দক্ষ কর্মী প্রেরণকে উজ্জ্বল সাফল্য বলা যাবে কিনা সেটা নিয়েও পুনর্ভাবনার প্রয়োজন, বিশেষ করে বিদেশে স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ-স্বাস্থ্য ও মৃত্যুঝুঁকি বিবেচনা করলে।

২০২৩ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করলে বিদেশে কর্মসংস্থানের ওপর অতিনির্ভরশীলতার বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এ বছরে নতুন শ্রমশক্তি যোগ হয়েছে ১৫ লাখ। তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ—প্রায় পাঁচ লাখের দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান হয়েছে, বাকিদের বিদেশে। এভাবে চলতে থাকলে যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটছে এমন তো বলা যায় না।

কর্মসৃজনের গতি বাড়াতে দেশে কর্মসংস্থানে বিশাল ঘাটতি কেন, সেটা বুঝতে হবে। তবেই প্রাসঙ্গিক সংস্কারে হাত দেয়া যাবে। হাতে নেয়ার আগ্রহ হবে।

বিগত দশকের উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে। সেখানে বড় মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে, যেগুলোয় পুঁজিঘনত্ব বেশি ও কর্মসৃজনের সুযোগ কম। শিল্প খাতেও বৃহদায়তন ও পুঁজিঘন শিল্পের প্রতাপ বেড়েছে। ফলে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিল্পে কর্মসংস্থান স্থবির হয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার বিপরীত হওয়ার কথা। অর্থাৎ শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়াটাই প্রত্যাশিত।

সুতরাং সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য বিনিয়োগ হার শুধু বাড়ালেই হবে না, বিনিয়োগের ধরন ও খাত-উপখাতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেখানে শ্রমঘন আধুনিক শিল্প ও সেবা খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতীতে শিল্প উপখাতের বহুমুখীকরণের কথা মুখে বা শুধু কাগজে থাকলেও বাস্তবে সেটা ঘটেনি। শিল্পনীতিতে জোর-অগ্রাধিকার খাতের তালিকা ধীরে ধীরে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। নানা উপখাত থেকে আসা অনুরোধ ঢোকানোর ফলে কোনগুলো আসলে প্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, সেটা যাচাই করা হয়নি। এখন সময় হয়েছে, শ্রমঘন কয়েকটি উপখাত চিহ্নিত করার, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান লাভজনক হতে পারে এবং যারা কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে ও ন্যায্য মজুরিও দিতে পারে। ছোট শহরের আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করাতে পারলে বৈষম্য হ্রাসে তা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সেখানে বড় বাধা হিসেবে আসবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রম অবনতি। থাকবে বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা। বড় আকারের প্রতিষ্ঠান এসব বিষয়ে নিজেরা অনেক কিছু করতে পারে। যেমন উঁচু পাঁচিল দেয়া, প্রচুর নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ, নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর— ইত্যাদির ব্যয় তারা পুষিয়ে নিতে পারবে। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো এসব পারবে না। অর্থনৈতিক-সামাজিক-পুলিশি সংস্কার তাই একসঙ্গে হতে হবে। তখনই টেকসইভাবে কর্মসৃজন হবে।

তবে এটাও ঠিক যে মানসম্মত কর্মসংস্থানের জন্য শুধু শিল্প বা আধুনিক সেবা খাতের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। দেশের শ্রমশক্তির সর্ববৃহৎ অংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। কাজেই সেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। সে বিনিয়োগ অবশ্য এমন হতে হবে যে কৃষক বা কৃষি-মজুরের কাজ যেন কেড়ে নেয়া না হয়।

এতক্ষণ যা বলা হলো, তাতে চাহিদার দিকটি গেল। সেই সঙ্গে শ্রমশক্তির সরবরাহ শুধু নয়, মানসম্পন্ন শ্রমশক্তি তৈরির কৌশলও জরুরি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বহুল আলোচিত। এক কথায় বললে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন এবং বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা বাড়ানো। এসব বিষয়ে কমিটি-টাস্কফোর্স রিপোর্ট, বহু পরামর্শকের ব্যয়সাপেক্ষ রিপোর্ট-সুপারিশ গত দুই দশক বা আরো বেশি সময় ধরে স্তূপীকৃত হয়েছে। কিন্তু তার পরও দৃশ্যপটে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

এখন প্রয়োজন, তরুণদের জন্য কর্মসৃজন ও সমাজে বৈষম্য হ্রাসকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। তাহলে সব পক্ষকে, যেমন চাহিদা সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা, কর্মসন্ধানী শ্রমশক্তি ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একত্রে কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

কাজেই কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা খাতে দেশের বাজেটের আরো বড় অংশ বিনিয়োগ করার প্রয়োজন অনুভব না করলে ভবিষ্যতে অর্থনীতিও পিছিয়ে পড়বে। সামাজিক পরিস্থিতিও পশ্চাৎপদতার দিকে ধাবিত হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক