আকিজ রিসোর্সের বিনিয়োগ ও ব্যবসায় বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কেমন? চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে?

বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদহার ব্যবসায়িক বিনিয়োগকে সীমিত করছে।

শুধু সিমেন্ট শিল্পেই বলা যায়, দেশে চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে আট কোটি টন। এই অতিরিক্ত সক্ষমতা প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্র করছে। একইভাবে ফিড শিল্পে বার্ষিক গড়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বাস্তবতায় আকিজ রিসোর্স দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৌশল নিচ্ছে। আমরা স্থানীয় সরবরাহ চেইনের উন্নয়ন, কস্ট অপ্টিমাইজেশন (ব্যবসার ভ্যালু ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসের জন্য গৃহীত কৌশলগত পদক্ষেপ), উদ্ভাবনী পণ্য আনা এবং ডিজিটালাইজড সিস্টেমের দিকে জোর দিচ্ছি। পাশাপাশি, সবুজ প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছি, যাতে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায়ও টিকে থাকতে পারি।

আকিজ রিসোর্সের বহুমুখী শিল্প খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গত এক বছরে বাংলাদেশের নীতিগত সংস্কারগুলো কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে?

কিছু নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে। যেমন ডিজিটাল রূপান্তর বা কর সংক্রান্ত কিছু উদ্যোগ। তবে এখনো তা প্রত্যাশিত মাত্রায় সহায়ক নয়। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ প্রয়োজন।

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে স্থানীয় বিনিয়োগ ও আর্থিক নীতি কীভাবে পরিবর্তন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশ এখন ৪০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। যেখানে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৫ শতাংশ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে স্থানীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের নীতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। আমার মতে ট্যাক্স ও ভ্যাট নীতির সরলীকরণ জরুরি। ডলারের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণ ও সাশ্রয়ী সুদহার নিশ্চিত করতে হবে ও রফতানি খাতে লজিস্টিক ব্যয় কমাতে হবে। বর্তমানে আমাদের লজিস্টিক ব্যয় ভারতের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

এআই ফার্স্ট, মোবাইল ফার্স্ট ও ক্লাউড ফার্স্ট কৌশল অনুযায়ী বাংলাদেশের অবকাঠামো ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সংস্কার কতটা কার্যকর হয়েছে?

বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বর্তমানে দেশে সাড়ে ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ই-গভর্নেন্স ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-র জন্য আমাদের ডাটা সিকিউরিটি, এন্টারপ্রাইজ ক্লাউড ও এআই ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিস্টেম আরো উন্নত করা প্রয়োজন।

আকিজ রিসোর্স এরই মধ্যে এআই ফার্স্ট, মোবাইল ফার্স্ট ও ক্লাউড ফার্স্ট কৌশল গ্রহণ করেছে। যেমন সরবরাহ চেইনে এআই-ভিত্তিক চাহিদার পূর্বাভাস তৈরি, সেলসে মোবাইল সিআরএম অ্যাপ ও ক্লাউডভিত্তিক ডাটা ম্যানেজমেন্ট সলিউশন ব্যবহার করা হচ্ছে।

নির্মাণ ও নির্মাণ উপকরণ খাতসহ আকিজ রিসোর্সের উৎপাদন ইউনিটগুলোর কার্যক্রমকে স্থায়ী ও টেকসই করার জন্য সরকারি অবকাঠামোগত নীতি কতটা সহায়ক?

বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটে অগ্রগতি হয়েছে, তবে গ্যাস সংযোগ সংকট, লজিস্টিক খরচ এবং বন্দরজট এখনো চ্যালেঞ্জ। আমরা বিশ্বাস করি আঞ্চলিক শিল্প হাব তৈরি, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সবুজ জ্বালানিতে প্রণোদনা দিলে টেকসই শিল্প নিশ্চিত হবে।

পরিবহন, লজিস্টিকস ও শিপিং অবকাঠামো উন্নয়ন কীভাবে আকিজ রিসোর্সের সরবরাহ চেইন ও রফতানিকে প্রভাবিত করেছে?

নতুন পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে সরবরাহ চেইনে গতি এনেছে। আমাদের ফ্যাক্টরি থেকে পরিবেশক পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের জট এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং সীমাবদ্ধতা এখনো রফতানির প্রধান বাধা। আমরা বিশ্বাস করি, পায়রা ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের রফতানি ক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে।

আকিজ রিসোর্স কীভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও ধরে রাখছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে?

আমরা বিশ্বাস করি মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এজন্য নিয়মিত ইন-হাউজ ট্রেনিং ও লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছি। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে টেকনিক্যাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালাচ্ছি এবং তরুণদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি প্রোগ্রাম রয়েছে। এর ফলে আমরা শুধু দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছি না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগও দিচ্ছি।

কর্মসংস্থান বিস্তারে কোন ধরনের নীতি বা সংস্কার সবচেয়ে কার্যকর বলে আপনি মনে করেন?

আমাদের মতে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা বিস্তৃত করা, এসএমই-বান্ধব ঋণনীতি চালু করা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে কর প্রণোদনা দেয়া সবচেয়ে কার্যকর। শুধু বড় শিল্প নয়, এসএমই খাত যদি শক্তিশালী হয়; তবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

আগামী পাঁচ বছরে আকিজ রিসোর্সের বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের পরিবেশকে উন্নত করার জন্য করপোরেট কৌশল কীভাবে সাজানো হচ্ছে?

আমাদের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হলো সবুজ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নির্মাণ উপকরণ, এফএমসিজি, ফার্মেসি ও লজিস্টিকস খাতে নতুন পণ্য ও সলিউশন বাজারে আনা এবং তরুণ ও প্রযুক্তি দক্ষ জনশক্তির জন্য অন্তত ২০ শতাংশ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। শুধু গ্রুপকে এগিয়ে নেয়া নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা রাখাও আমাদের লক্ষ্য।