ব্যবসায়ে-বিনিয়োগে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন?

ব্যবসা-বিনিয়োগ একটি পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। একজন বিনিয়োগকারী যখন কোনো দেশে বিনিয়োগের কথা ভাবেন, তখন প্রথমেই সেখানকার সামগ্রিক পরিবেশ, নীতি ও মানুষের মনোভাব দেখেন। আফ্রিকায় একসময় কেউ বিনিয়োগ করতে চাইত না। কারণ সেখানকার মানুষের আচরণ ও পরিবেশ অনুকূল ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা যখন শিক্ষিত হলো, পরিবেশ উন্নত হলো, তখন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আসতে শুরু করল। আজ তাদের অর্থনীতি অনেকটা উন্নত হয়েছে। একজন বিনিয়োগকারী ততক্ষণ পর্যন্ত বিনিয়োগ করবেন না, যতক্ষণ তিনি নিশ্চিত হবেন যে তার বিনিয়োগটা নিরাপদ। এটা শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনার মতোই। সবাই চিন্তা করে, ‘আমি যে টাকাটা বিনিয়োগ করছি, সেটা ফেরত পাব তো?’ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে বিনিয়োগ হবে না।

বিনিয়োগের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কীভাবে?

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমি একজন বিনিয়োগকারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমি কিনেছিলাম। কিন্তু জমি কেনার পর দেখি, সেখানে কোনো কাজ করতে হলে ডিসি অফিসের পারমিশন লাগবে। আজ প্রায় তিন বছর ধরে ডিসি অফিসের পেছনে দৌড়াচ্ছি, কিন্তু সে পারমিশনটা এখনো পাইনি। কেন পাচ্ছি না? কারণ নানা অজুহাত, নানা কথায় কাজটা হতে দেয় না। এই যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এই যে ‘‌লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’, এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগের জন্য একটি বড় বাধা। আমরা ভেবেছিলাম গত ১৭ বছরের এসব জঞ্জাল থেকে মুক্ত হওয়া গেছে, কিন্তু হয়নি। রেজিস্ট্রিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের অনীহার কারণে তা সম্ভব হয়নি। কোনো আইন মন্ত্রণালয় মনে হয় এ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত এ দুটি দপ্তর এক ছাতার নিচে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যত ডিজিটালাইজেশনই হোক না কেন, আসল সমস্যার সমাধান হবে না।

সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছে। আপনি কি মনে করেন এটি একটি কার্যকর উদ্যোগ?

ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ করা ভালো। কিন্তু সেখানে এখনো পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা হয়নি। এত বড় ইকোনমিক জোন, এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল কিন্তু সেখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা এখনো নেই। কলকারখানায় ব্যবহারের জন্য পানির বন্দোবস্ত হয়নি। একবার বলা হয় মেঘনা থেকে পানি আনা হবে, আরেকবার অন্য জায়গা থেকে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে সেটি কেউ বলছে না। এটি আসলে শুধু একটি নিয়মের ব্যাপার নয়, এর বাস্তব প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বিনিয়োগটা কখন থেকে স্থবির হলো?

বাংলাদেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ার পেছনে অনেক কারণ দায়ী। প্রথমে কভিড, তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এরপর ডলার সংকট— এ তিনটি বড় ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। কেউ গণতন্ত্রের অধিকারের জন্য, কেউ চাকরির জন্য, কেউ আবার অটোরিকশা চালানোর অনুমতি চেয়ে রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে। এ ধরনের অস্থিরতা একটি দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। আমরা এখন এমন এক গণতন্ত্রে পৌঁছে গেছি, যেখানে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে বারবার ব্যবসার পথ বন্ধ হচ্ছে। আমরা নতুন কিছু করতে পারছি না। পুরনো জঞ্জাল থেকেও বের হতে পারছি না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো বিনিয়োগকারী কীভাবে ব্যবসা করবে? সে ব্যবসায় ৪০ শতাংশ লাভ করতে হবে কেবল সুদের চাপ সামলানোর জন্য! এটি অবাস্তব। লাভ-লোকসান যাই হোক না কেন, ট্যাক্স আপনাকে দিতেই হবে। টার্নওভারের ওপরেও ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। এ ধরনের কঠোরতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ নষ্ট করে দেয়।

সিমেন্ট শিল্প বাংলাদেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে কী ধরনের সংস্কার আনা সম্ভব?

চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। শুধু সিমেন্ট নয়, যেকোনো শিল্পেই সংস্কারের অনেক জায়গা আছে। প্রথমত, খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ডলার ব্যবস্থাপনার সংকট এবং শুল্কনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন এ খাতের উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও এখন ডলারের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু ১৪-১৫ শতাংশ সুদহারে বিনিয়োগ করে ৪০ শতাংশ লাভ করা কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষেই সম্ভব নয়। ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পে মূল্য প্রতিযোগিতা অনেক বেশি, যা লাভের হারকে আরো কমিয়ে দেয়।

পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও সবুজ শিল্পায়নের বিষয়ে বলুন।

পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে আমাদের আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা পরিবেশের সঙ্গে আপস না করে টিকতে পারব কিনা। উদাহরণ হিসেবে চামড়া শিল্পের কথা বলি। এত বছরেও তারা একটি কার্যকর সেন্ট্রাল ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিটিপি) বসাতে পারেনি। এটি একটি সরকারি প্রকল্প এবং সরকার এটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। এতে বোঝা যায় এ ধরনের কাজ সরকারি খাতের জন্য নয়। এটি বেসরকারি খাতকে দেয়া উচিত।

সিমেন্ট শিল্পে কর্মসংস্থান নিয়ে জানতে চাই।

প্রতিটি শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান আছে। কাজ আছে মানেই মানুষের কর্মসংস্থান থাকে। তবে এখনকার প্রধান সমস্যা হলো মূল্য। প্রাইসিং এত কম যে এতে লাভ করা কঠিন। ফলে অনেক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে বা লোকবল কমাচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য আমাদের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। এসব বিষয় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রিমিয়ার সিমেন্টের উদ্যোগগুলো কী?

বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, ডলারের দাম বাড়ছে, মানুষের বেতন বাড়ছে। কে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কেউ দেখে না। আমি এটাকে নেতিবাচক বলব না। সবকিছু বাড়ার কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। পণ্যেরও দাম বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। যে পারছে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কেউ ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

আগামী পাঁচ বছরে আপনি সিমেন্ট খাতকে কোথায় দেখছেন?

বাংলাদেশে অবকাঠামো সংস্কার হতেই হবে। মাথাপিছু ব্যবহারের কথা যদি বলি, আমরা এখনো মাটির সঙ্গে কথা বলছি। আমাদের শহর, বন্দর ও গ্রামগুলোয় প্রচুর অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ আছে। এখনো আকাশপথ থেকে হাজার হাজার গ্রাম দেখা যায়, যেখানে উন্নয়নের প্রচুর সুযোগ রয়েছে।

চলমান সংকট নিরসনে আপনার পরামর্শ কী?

আমি মনে করি, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্বাসের একটি পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি। ১৯৯৫ সালের পর নতুন উদ্যোক্তাদের আগমন অনেক কমে গেছে। যারা আসছেন, তারা ভবিষ্যতমুখী। কিন্তু তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। দেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশের বন্দর লজিস্টিকস খাতের সংস্কার কীভাবে ব্যবসা-বিনিয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে?

আমরা বন্দরের কার্যক্রমে আমরা গতি চাই। যদি বন্দরের কাজ দ্রুত হয়, তাহলে পণ্য আমদানি-রফতানি সহজ হবে, খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। বন্দরের আধুনিকীকরণ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যবসার গতি বাড়াতে পারে।