শক্তি ফাউন্ডেশন প্রায় ৩৩ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনমান উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছে। এ সংগঠনের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও নিপীড়িত নারীদের ক্ষমতায়ন ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে শক্তি ফাউন্ডেশন (শক্তি ফাউন্ডেশন ফর ডিসঅ্যাডভান্টেজড উইমেন) মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯২ সালে কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার মিরপুরের শাহ আলীবাগ ও লালবাগের আমলিগোলা বস্তিতে ৩০ জন নারী সদস্য নিয়ে মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রাম চালু হয়। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল অনুসরণ করে পরিচালিত এ কর্মসূচির মূল কাঠামো ছিল পাঁচজনের একটি গ্রুপ এবং ৩০ জনের একটি কেন্দ্র।

এ গ্রুপ ও কেন্দ্র ছিল নারী ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ এ কাঠামোর মধ্য দিয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত নারী সদস্যরা দলগতভাবে একত্র হয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। ফলে এ গ্রুপ এবং কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙার একটি কার্যকর প্লাটফর্ম। পরবর্তী সময়ে শক্তি ফাউন্ডেশনের মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রাম সারা দেশে বিস্তৃতি লাভ করে এবং বর্তমানে এ সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে তৎকালীন সময়ে একটি ‘মিথ’ ছিল যে শহরের বস্তিবাসী জনগোষ্ঠী মূলত ভাসমান; তাই তাদের ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় আনা ঝুঁকিপুর্ণ এবং অসম্ভব। কিন্তু আমাদের সাফল্য এ ‘মিথ’ ভেঙে দিয়েছে।

দেশের কতটি জেলায় শক্তি ফাউন্ডেশন কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

শক্তি ফাউন্ডেশন দেশের ৫৭টি জেলায় ৫৮৮টি শাখার মাধ্যমে মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ৯৬টি হেলথ কেয়ার সেন্টার এবং ২৫টি মোবাইল হেলথ ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বিশেষত নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

নারী এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য আপনারা কী ধরনের প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন?

প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন শক্তি ফাউন্ডেশনের নারী উদ্যোক্তারা অনেকেই ‘গ্র্যাজুয়েট বরোয়ার’, যার অর্থ হচ্ছে একজন দরিদ্র নারী ছোট ঋণ নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে সফল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেহেতু শক্তি ফাউন্ডেশনের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল নারী ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। তাই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমরা উদ্যোক্তা তৈরিতে বদ্ধপরিকর। এসএমই খাত যেমন অর্থনীতির প্রাণ ঠিক তেমনি উদ্যোক্তা হলো এসএমই খাতের প্রাণ। উদ্যোক্তার ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থায়নের চাহিদাও বাড়তে থাকে। একজন এসএমই উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে শক্তি ফাউন্ডেশন সহজ শর্তে, অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত যাচাই-বাছাই করে স্বল্প সময়ে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করে থাকে।

এসএমই খাতে আমাদের কার্যক্রম শুধু অর্থায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উদ্যোক্তার ব্যবসা কৌশল এবং পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ফোকাস গ্রুপে আলোচনা, ট্রেনিং ও কর্মশালা আয়োজনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম প্রচার করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি এসএমই সদস্যদের পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান এবং ব্যবসায়িক লিংকেজ তৈরির জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরির বিষয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। সর্বোপরি অর্থনীতিতে এসএমই খাতের ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে এ খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে শক্তি ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে।

এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আপনাদের বিভিন্ন উদ্যোগ তাদের জীবনমান বৃদ্ধিতে কেমন ভূমিকা রাখছে?

৩৩ বছর আগে যখন আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন লক্ষ্য ছিল খুবই সহজ—একজন নারী যেন ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে সংসারে আর্থিক অবদান রাখতে পারেন। প্রথমদিকে দেখেছি, একজন সদস্য হয়তো ছোট্ট টেইলরিং ব্যবসা শুরু করেছেন। তার আয় দিয়ে শুধু সংসারের দৈনন্দিন খরচই চালাননি, বরং মেয়ের স্কুলের ফি, সন্তানের চিকিৎসার খরচ দিয়েছেন। পাশাপাশি নিজের জন্য শাড়ি-গহনা বা শখের কিছু কিনে ছোটখাটো স্বাদ আহ্লাদ পূরণ করেছেন। ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বড় হয়েছে। আজ তিনি অন্যকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার তাদের পণ্য অনলাইনে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও পাঠাচ্ছেন। এভাবে অনেক নারীর জীবন বদলে গেছে। এখন অনেক নারীই সফল উদ্যোক্তা—তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো সমাজের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন। তাদের সন্তান অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এ পরিবর্তনই আমাদের সার্থকতা, পরম প্রাপ্তি বলে মনে হয়।

সরকারের কাছে আপনারা কোনো সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন কি?

শক্তি ফাউন্ডেশন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে আসছে। আমাদের প্রথম দিকের অনেক সদস্য এবং তাদের কমিউনিটির অনেকেই এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, যাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

এদের মধ্যে অনেকের অবস্থা করুণ, নানাবিধ অসুখে ভেঙে পড়েছেন। অনেকেই আবার পরিবার বিচ্ছিন্ন। এসব অসহায় মানুষ অনেক সময় রাস্তা, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে তাদের শেষ আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রম।

বর্তমানে শক্তি ফাউন্ডেশন চারটা বৃদ্ধাশ্রমের সঙ্গে কাজ করছে। এ রকম প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়নে বৃহত্তর পরিসরে সরকারের সঙ্গে আমরা কাজ করতে আগ্রহী।