ডিসেম্বরে শেষ হতে থাকা বছরের মূল্যায়ন করা এবং নতুন বছরের দিনগুলো কেমন যাবে তা নিয়ে অনুমান এক ধরনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সত্য: পরিবারে আমরা সাধারণত একসঙ্গে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করি। তবে এটি আরো বৃহৎ পরিসরেও সত্য। কারণ বছরের এ সময়টি অর্থনীতি, জাতীয় রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সংযোগস্থলের পর্যালোচনার সুযোগ এনে দেয়।

আপনি যদি প্রাথমিকভাবে মনে করেন যে এ তিনটি ক্ষেত্র একে অন্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে, তবে আপনি ক্ষমা পাবেন। প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়গুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যা তাদের নিজস্ব গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। তবে ২০২৪ সালে এ সম্পর্কের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক বিচ্যুতি দেখা গেছে, যা বছরজুড়ে হ্রাস হওয়ার পরিবর্তে আসলে আরো প্রসারিত হয়েছে।

ভূরাজনীতি দিয়ে শুরু করা যাক। ২০২৪ সালে এক বছর আগের পূর্বাভাস থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া অনেক বেশি সুবিধা অর্জন করেছে। একইভাবে গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের ফলে মানবিক বিপর্যয় এবং হতাহতের মাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং এটি অন্যান্য দেশে, যেমন লেবাননেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। শক্তিমানদের দায়মুক্তি এবং মারাত্মক মানবিক সংকট প্রতিরোধের কার্যকর উপায় না থাকার কারণে অনেকের মধ্যে এ অনুভূতি গভীর হয়েছে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত ভারসাম্যহীন এবং তা মানুষের কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অনেক দেশে অস্থিরতা ছিল গত বছরের অন্যতম আলোচনার বিষয়। ফ্রান্স ও জার্মানি হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ। সেখানেও সরকারগুলো পতিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন অবস্থায় ফেলেছে। গত মাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে সম্ভবত নতুন একটি ‘কাউন্টার-এলিট’ শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।

অন্যদিকে আছে একটি ‘অ্যাক্সিস অব কনভেনিয়েন্স’—যার মধ্যে চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া রয়েছে। এ অক্ষ পশ্চিমা আধিপত্যাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে। আমরা একটি অসাধারণ ভূরাজনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বসবাস করছি। অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনা, যেমন এখন অভিশংসিত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের হঠাৎ সামরিক আইন ঘোষণা (যেটি দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়েছিল) এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন—এ ধারণাকে শক্তিশালী করেছে।

গত বছর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু উদ্বেগজনক পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপের সমস্যাগুলো গভীরতর হয়েছে। কারণ দেশগুলো কম প্রবৃদ্ধি এবং বড় বাজেট ঘাটতির মোকাবেলা করছে। চীন ‘জাপানীকরণের’ বর্তমান স্পষ্ট এবং বর্তমান বিপদে আস্থার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ চীনের সমস্যাজনক এমন জনমিতিক পরিস্থিতি, ঋণের বোঝা এবং সম্পত্তি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, অর্থনৈতিক দক্ষতা ও ভোক্তাদের আস্থার অভাব।

তবু স্টক মার্কেটগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং উচ্চ রিটার্ন প্রদান করেছে, যার মধ্যে এসঅ্যান্ডপি সূচকের প্রায় ৬০টি রেকর্ড-হাই ক্লোজ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্সই এর প্রধান কারণ। যেমনটা বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল না হয়ে আরো এগিয়ে গেছে। যে পরিমাণ বিদেশী মূলধন যুক্তরাষ্ট্র আকর্ষণ করছে ও উৎপাদনশীলতার ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগের মাত্রা, প্রতিযোগিতা ও প্রবৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় ২০২৫ সালে এটি অন্য প্রধান অর্থনীতিগুলোর চেয়ে আরো ভালো পারফর্ম করতে থাকবে।

এ সাফল্যের একটি ফল হলো যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সেই প্রত্যাশিত ১ দশমিক ৭৫ থেকে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নেয়নি, যা এক বছর আগে বাজার হিসাব করেছিল। এ প্রবণতাও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিসেম্বরে নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ফেড ২০২৫ সালে কম সুদের হারের সংখ্যা হ্রাস এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি হারের ইঙ্গিত দিয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নতির সীমিত সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। যদিও আশা করা হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র তার সমকক্ষদের থেকে ভালো পারফর্ম করতে থাকবে; কিন্তু তার পরও একই সঙ্গে তাদের প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি দুটোই বৃদ্ধি পাবে বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং নীতিমালাসংক্রান্ত বিষয়গুলো এখন আরো বেশি বেশি নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ একদিকে যেমন ঝুঁকির পরিমাণ বেড়েছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীববিজ্ঞান, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবনের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো বিভিন্ন খাতকে রূপান্তরিত করতে এবং উৎপাদনশীলতার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে আমার ভিত্তিমূলক অনুমান (২০২৫ সালের জন্য) হলো সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কম থাকবে। যদিও অর্থনীতি তার সমকক্ষদের থেকে ভালো পারফর্ম করবে। মুদ্রাস্ফীতি স্থির থাকবে। এতে ফেডের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ আসবে। তারা কি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মুদ্রাস্ফীতি মেনে নেবে নাকি তা কমানোর চেষ্টা করবে, যা অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিভাজন অব্যাহত থাকবে, যা কিছু দেশকে তাদের রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের চেয়েও বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে পারে এবং পশ্চিমা পেমেন্ট সিস্টেমগুলোর বিকল্প অনুসন্ধানে উৎসাহিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের দশ বছরের সরকারি বন্ডের আয়—যা একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড—ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে এবং প্রধানত ৪ দশমিক ৭৫ থেকে ৫ শতাংশ পরিসরে লেনদেন হবে। আর্থিক বাজারগুলোর ক্ষেত্রে, প্রতিকূল ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ‘‌গুড হাউজ’ হিসেবে স্থিতি বজায় রাখা আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।

এখন পরিস্থিতি এমনটাই মনে হচ্ছে। তবে ২০২৫ সালে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ফলাফলের বিস্তৃত পরিসরকে স্বীকার করার বাইরে, যেকোনো ভিত্তিমূলক অনুমান গ্রহণ করার পর তা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে নিয়মিতভাবে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ: দিদারুল হক

মোহামেদ এ এল-এরিয়ান: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স কলেজের প্রেসিডেন্ট, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ারটন স্কুলের অধ্যাপক। ‘‌দি অনলি গেম ইন টাউন: সেন্ট্রাল ব্যাংক, ইনস্ট্যাবিলিটি, অ্যান্ড এভয়েডিং দ্য নেক্সট কলাপস (র‍্যানডম হাউজ-২০১৬)’-এর লেখক; এছাড়া পারমাক্রাইসিস: আ প্ল্যান টু ফিক্স এ ফ্রাকচারড ওয়ার্ল্ড (সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, ২০২৩) বইয়ের সহলেখক (গর্ডন ব্রাউন, মাইকেল স্পেন্স ও রিড লিডয়ের সঙ্গে)।