মে মাসের মাঝামাঝি আমি আগরতলায় মিলিত হই মরহুম ক্যাপ্টেন খালেক, বর্তমান বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন ও ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিনের সঙ্গে। ক্যাপ্টেন খালেক ছিলেন পিআইএর ট্রাইডেন্ট বিমানের একজন কমান্ডার। পিআইএতে বাঙালিদের অভাব-অভিযোগের একজন প্রবক্তা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যে আগরতলায় আমাদের দলে যোগ দিলেন ক্যাপ্টেন মুকিত। ক্যাপ্টেন মুকিত আদিতে ছিলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাইলট। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরে তিনি বিমান বাহিনী ছেড়ে পিআইএতে যোগদান করেন। মুকিতের যোগদানের ফলে আমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। তখন থেকে আমাদের একমাত্র ধ্যান-ধারণা ও প্রচেষ্টা ছিল কেমন করে একটা ছোট বিমান বাহিনী গড়ে তোলা যায়।

জুলাইয়ের দিকে পাকিস্তান বিমান বিভাগের পাইলট আকরাম আহমেদ ও ঢাকা ফ্লাইং ক্লাবের সদস্য আহমেদুল আমিন আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। আকরাম আহমেদ ও আহমেদুল আমিনের আগরতলা গমনের দুই-তিনদিনের মধ্যেই ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন ও আমাকে ভারতীয় বৈদেশিক দপ্তর দিল্লিতে ডেকে পাঠালেন। দিল্লিতে আমদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনী ও বৈদেশিক দপ্তরের উচ্চপদস্থ অফিসারদের অনুধাবন করানো যে ছোট ছোট দিয়েও কার্যকরী একটা বিমান বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব। বিমান বাহিনী প্রসঙ্গে আমাদের আরো পরিকল্পনা ছিল, ছোট ছোট বিমানে ফ্লোটিংয়ের ডিভাইস সংযোজন করে শত্রু সৈন্যদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা ও তাদের শক্ত ঘাঁটির ওপর অতর্কিতে আঘাত হানা। আমাদের শক্তির সমর্থন আমরা বায়াফ্রার যুদ্ধে সুইডিশ বৈমানিক কাউন্ট ভনরজেন কর্তৃক রকেট সজ্জিত ছোট বিমানে ভূমিতেই অবস্থানরত ১১ খানা নাইজেরীয় মিগ-১৯ বিমান ধ্বংস করার ঘটনা দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করলাম। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরে দিল্লির উচ্চপদস্থ অফিসাররা আমাদের সঙ্গে একমত হলেন এবং তারা মুজিবনগরের বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার কমডোর আবদুল করিম খোন্দকারের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ স্থাপন করলেন। পরবর্তী পর্যায়ে এয়ার কমডোর খোন্দকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও নেতৃত্বে জন্মলাভ করল বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে আমরা বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের জন্মদিবস পালন করি।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে তখন এর প্রতিষ্ঠাতা এয়ার কমডোর এ কে খন্দকার ছাড়া আরো কয়েকজন বৈমানিক ছিলেন—মরহুম ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন সাত্তার (লেখক), ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন, ক্যাপ্টেন মুকিত, ক্যাপ্টেন আকরাম ও ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিন। পাকিস্তান বিমান বাহিনী ছেড়ে যারা এসেছিলেন তারা হলেন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম। আরো ছিলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগকারী ৬৭ জন এয়ারম্যান। আমাদের বিমান ছিল ডাকোটা অটার ও এলুভেট হেলিকপ্টার।

ডাকোটা বিমানকে পাঁচ হাজার পাউন্ড বোমা বহন করার উপযোগী করা হলো এবং পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হলো ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন মুকিত ও আমাকে। অটার বিমানকে সজ্জিত করা হলো সর্বাধুনিক রকেট, মেশিনগান ও বোমাবর্ষণের উপযোগী করে।

পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হলো ফ্লা. লে. শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন আকরাম ও মরহুম সরফুদ্দিনকে। হেলিকপ্টারকে সজ্জিত করা হলো রকেট ও ভারী মেশিনগান দ্বারা। পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করা হলো স্কো. লি. সুলতান মাহমুদ, ফ্লা. লে. বদরুল আলম ও ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিনকে।

অতঃপর অক্টোবরের প্রথম তারিখ থেকে এয়ার কমডোর খোন্দকার সাহেবের নেতৃত্বে আমাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ, অনুশীলন ও মহড়া শুরু হলো। নাগাল্যান্ড, মনিপুর, অরুণচল, ত্রিপুরা ও আসামের জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি এলাকার কোনো প্রকার পথ নির্ধারক ব্যতিরেকে শুধু কম্পাসের ওপর নির্ভর করে রাতের পর রাত আমরা অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড্ডয়নের কৌশল আয়ত্ত করার অনুশীলন করতাম।...

পরিকল্পনা মাফিক ঠিকমতো আক্রমণ পরিচালনা করতে পারলে ছোট ছোট বিমানও যে অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমানের সমকক্ষ হতে পারে তা আমাদের বৈমানিকরা দুনিয়াবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের বৈমানিকদের দক্ষতা দেখে ভারতীয় বিমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসাররা বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছেন।

আমাদের দক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ও ফ্লা. লে. বদরুল আলম নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পাকিস্তানি বিমান জ্বালানিঘাঁটির ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। ফ্লা. লে. শামসুল আলম ও ক্যাপ্টেন আকরাম আহমদ ওই একই সময়ে চট্টগ্রামে এক ব্যাপক বিমান আক্রমণ পরিচালনা করেন। চট্টগ্রামের অভিযানের পরে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আকরাম মরহুম সরফুদ্দিনকে নিয়ে ১২ বারেরও বেশি বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তানি দুশমনদের শক্ত ঘাঁটি ও কনভয়ের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের প্রভূত ক্ষতিসাধন করেন। আমার মনে আছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকলে ডাকোটা, অটার ও হেলিকপ্টার—এ তিন গ্রুপের মধ্যে শুধু একটি বিষয়েই প্রতিযোগিতার মনোভাব ছিল, তা হলো কোন গ্রুপ কত বেশি বিপজ্জনক অভিযানের দায়িত্ব লাভ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করব। ডাকোটা বিমান নিয়ে বাংলাদেশের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমাবর্ষণের জন্য একটি দিন স্থির করা হয়। অভিযানটি ছিল ভয়ানক বিপৎসংকুল। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনের মাত্র একদিন আগে যখন বিশেষ কারণে এ অভিযান পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেল তখন ক্যাপ্টেন খালেক ও ক্যাপ্টেন মুকিত অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে যান।

বিমান আক্রমণ পরিচালনাকালে আমাদের বৈমানিকদের অনেকবার মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।...

বহুতর বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল আমাদের এই ছোট্ট এয়ার ফোর্সের প্রত্যেক বৈমানিককে। কিন্তু তাই বলে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নিবেদিতপ্রাণ এসব বৈমানিকের কেউই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি।

[ক্যাপ্টেন আবদুস সাত্তারের স্মৃতিচারণটি (১৯৭২) হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ১০ খণ্ড’ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত রূপে সংকলিত]