মুক্তিবাহিনী কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল এবং ২৬ মার্চের পর থেকে ৩ ডিসেম্বর তারা কোন ধরনের রণনীতি ও রণকৌশল অবলম্বন করেছিলেন?
আপনাদের মনে আছে ২৬ মার্চ থেকে শত্রুকে প্রতিরোধ এবং বাঙালিকে দমনে শত্রুদের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে প্রথমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর বাঙালি সৈনিক, প্রাক্তন ইপিআরের বীর বাঙালিরা এবং আনসার, মোজাহিদ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বীর জওয়ানেরা। সঙ্গে সঙ্গে এদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছিলেন যুবক ও ছাত্ররা।
সর্বপ্রথমে যুদ্ধ হয় নিয়মিত পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালু থাকে মে মাস পর্যন্ত।...তবে একটা বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাই। নিয়মিত বাহিনীর যেটা স্বাভাবিক কৌশল তা আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার জন্য কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল। আমরা ছোট ছোট অংশে অর্থাৎ ছোট ছোট প্যাট্রল বা ছোট ছোট কোম্পানি প্লাটুনের অংশ দিয়ে শত্রু বাহিনীর তুলনামূলক অধিকসংখ্যক লোককে রুদ্ধ করে রাখি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর ওপর আঘাতও হানতে থাকি। এভাবে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলে সর্বপ্রথমে যুদ্ধ শুরু হয়।
সে সময় আমার ও আমার অধিনায়কদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আমরা কেবল নিয়মিত বাহিনীর পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে চলতে পারব না। কারণ আমাদের সংখ্যা তখন মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন। এছাড়া আমাদের সঙ্গে সাবেক ইপিআরের বাঙালি জাওয়ানেরা, আনসার, মোজাহিদ, পুলিশ ও যুবকরাও ছিলেন। যুবকদের অস্ত্র দেয়া একটু কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমরা ভেতর থেকে যে অস্ত্রগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম, সেগুলো দিয়ে তাদের তাড়াতাড়ি মোটামুটি প্রশিক্ষণ নিয়ে দাঁড় করিয়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে তখন শত্রু বাহিনীর ছিল তিন-চারটি ডিভিশন। এ তিনটি ডিভিশনকেই নিম্নতম সংখ্যা হিসাবে ধরে নিয়ে আমরা দেখতে পেলাম যে এদের প্রতিরোধ করা, ধ্বংস করা সোজা নয়, সম্ভব নয়। তাই এপ্রিল নাগাদ এটি আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে আমাদের একটি বিরাট গণবাহিনী এ রকম হতে হবে, যেমন মানুষের পেটের অন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী জীবাণু অন্ত্রটিকে ধ্বংস করে দিতে পারে তেমন ভেতরে থেকে শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী শত্রুর অস্ত্রগুলো বিনষ্ট করে দেবে। শত্রুকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। কারণ তাদের সংখ্যা বেশি, তাদের অস্ত্র বেশি, তাদের বিমান রয়েছে, আর আমাদের কাছে বিমান ছিল না। এছাড়া সম্বল তাদের অনেক বেশি।
কিন্তু এই সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার ছিল যে বাইরে লেখা ক্ল্যাসিক্যাল ওয়ারফেয়ার করে দেশ মুক্ত করতে হলে বহুদিন যুদ্ধ করতে হবে। এরই মধ্যে আমাদের দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের সবচেয়ে বড় জনসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর বিশেষ কিছু উদ্ধার করার থাকবে না। সেজন্য এপ্রিলের শেষ দিকে এটাও আমার কাছে পরিষ্কার ছিল যে আমাদের একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে সময় কমানোর জন্য। সে পদ্ধতিতে বড় একটি গেরিলা বাহিনী গঠন করে ভেতর থেকে শত্রুদের আঘাত করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বাহিনীর ছোট ছোট ইউনিট কোম্পানি বা প্লাটুন দিয়ে শত্রুকে আঘাত করতে হবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তাকে বাধ্য করতে হবে, সে যেন কনসেনট্রেটেড না থেকে ডিপার্জড হয়। এ বিচ্ছিন্নতার ফলে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতাজনিত শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে ছোট ছোট সংযোগের রাস্তা, তার রিইনফোর্সমেন্টের রাস্তা ধ্বংস করে তাকে ছোট ছোট পকেটে আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করা যাবে।
এজন্য আমার অনেক নিয়মিত বাহিনীরও প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজনের কথা আমি মে মাসের শুরুতে সরকারকে লিখিতভাবে জানাই এবং এর ভিত্তিতে মিত্রদের কাছ থেকে সাহায্যও চাই। তাতে উদ্দেশ্য ছিল (ক) কমপক্ষে ৬০-৮০ হাজার গেরিলা বাহিনী ও (খ) ২৫ হাজারের মতো নিয়মিত বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এ বাহিনী সত্বর গড়ে তুলতে হবে। কারণ একদিকে গেরিলা পদ্ধতি এবং সঙ্গে সঙ্গে শত্রুকে নিয়মিত বাহিনীর কমান্ডো ধরনের রণকৌশল দিয়ে শক্তি বণ্টনে বাধ্য করতে হবে, যাতে তার শক্তি কমে যায়।
এ পদ্ধতি আমরা কার্যে পরিণত করি। ক্রমে গড়ে উঠল একটি বিরাট গণবাহিনী—গেরিলা বাহিনী। এর সঙ্গে সঙ্গে আরেক দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। আমাদের নৌবাহিনী ছিল না। আমার কাছে নিয়মিত নৌবাহিনীর বহু অফিসার, ওয়ারেন্ট অফিসার ও নাবিক আসেন। ফ্রান্সের মতো জায়গা থেকে কয়েকজন পাকিস্তানের ডুবোজাহাজ ছেড়ে আমাদের সঙ্গে যোগদান করেন। আমি তাদের ভিত্তি করে এবং আমাদের বড় শক্তি যুবশক্তিকে ব্যবহার করে নৌ-কমান্ডো গঠন করি।

মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত কামান। ছবি: বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর
১৯৭১ সালের ১৪ আগস্টে আমাদের এ নৌ-কমান্ডোদের আক্রমণ শুরু হয়। তারা যে বীরত্ব ও কৃতিত্ব দেখিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির নেই। তারা মোংলায় বহু জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। তারা শত্রুর জন্য বিভিন্ন অস্ত্র-সামান নিয়ে যেসব জাহাজ আসছিল চট্টগ্রামে, সেগুলো ধ্বংস করে। এজন্য অত্যন্ত দুঃসাহসের প্রয়োজন ছিল। তারা দুটো বন্দর বন্ধ করে দেয় এবং নদীপথেও তাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়।
আমাদের কৌশল অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ শত্রু রক্তহীন হয়ে ওঠে। ২৫ হাজারের মতো সৈন্য বিনষ্ট হয়। বহু যানবাহন লোকসান হয়। ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত শত্রুদের এ অবস্থা দাঁড়ায় যে একজন বক্সার রিংয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্লান্ত হয়ে ঘুরছে এবং একটা কড়া ঘুসি খেলে পড়ে যাবে, তার যোগাযোগ অবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যেভাবে আমার উদ্দেশ্য ছিল সেভাবে বিভিন্ন জায়গায় তারা ছোট ছোট পকেট বানিয়েছিল। তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে রিইনফোর্সড কংক্রিটের বাংকার বানিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে তারা ঢুকেছিল। রাতের বেলা তো বেরোতই না, দিনের বেলায়ও বেশিসংখ্যক লোক ছাড়া বেরোত না। শত্রুদের তখন এ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল।
অক্টোবর-নভেম্বর থেকেই শত্রু যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। যাতে তাদের জান বাঁচে, জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের পর একটা যুদ্ধবিরতি হয়, অবজারভার এসে যায় এবং জাতিসংঘের কাছে সমস্যাটি দিয়ে তাদের জান রক্ষা হয়। শত্রুপক্ষের এই ছিল প্রচেষ্টা। কারণ তখন তারা নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল যে তাদের পরাজয় একেবারে অনিবার্য। জাতিসংঘ যখন হস্তক্ষেপ করল না, তখন তারা একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাল, যাতে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। প্রথমে তারা আমাদের ঘাঁটি, পজিশন ও বেসগুলোর ওপর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাঞ্চলেও গোলাগুলি শুরু করে।
আরেকটি ব্যাপার আমি বলতে চাই। আমার কাছে বিমান ছিল না। তবে শেষ দিকে কয়েকটি বিমান নিয়ে আমি ছোটখাটো একটি বিমান বাহিনী গঠন করেছিলাম। আমি যে বিমান পেয়েছিলাম তা ছিল দুটো হেলিকপ্টার, একটি অটার এবং আমার যানবাহনস্বরূপ একটি ডাকোটা। সেই অটার ও হেলিকপ্টারগুলোয় মেশিনগান লাগিয়ে যথেষ্ট সজ্জিত করা হলো। আমাদের যেসব বৈমানিক স্থলযুদ্ধে রত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক লোক নিয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে একটি ছোট বিমান বাহিনী গঠন করা হলো। এ বাহিনীর কৌশল ছিল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা করা এবং ইন্টারডিকশন অর্থাৎ শত্রুর যোগাযোগের পথকে বন্ধ করে দেয়ার জন্য লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানা।
আপনারা জানেন কিনা জানি না, শত্রুর ওপর প্রথম যে বিমান হামলা হয়েছে তা বাংলাদেশের বীর বৈমানিকেরা করেছে। ২৬ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে যুদ্ধ হয়েছে তাতে যদিও আমাদের কাছে বিমান ছিল না, কিন্তু আমরা বিমানঘাঁটিগুলোয় আঘাত হেনেছি। শেষ দিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা সিলেট বিমানঘাঁটিতে একটি সি-১৩০ বিমানের ওপর অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে মেশিনগান চালায়। মেশিনগানের গুলিতে যদিও সি-১৩০ বিমানটি পড়ে যায়নি, তবে কোনো রকমে ঢুলু ঢুলু করে চলে গিয়ে শমসেরনগরে নেমেছিল এবং পরে অনেক দিন মেরামতে ছিল।
৩-১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিত বাহিনীর রণনীতি কৌশল কী ছিল?
একদিনের কথা আমার মনে পড়েছে। সে অঞ্চলে যুদ্ধরত আমার মুক্তিবাহিনীর ওপর আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের কাছে ট্যাংক ছিল না। পাকিস্তানি ট্যাংকগুলো ভারতীয় অঞ্চলের ওপরও গোলাবর্ষণ করছে। আমি তখন ওদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা এর জবাব দিচ্ছেন না কেন? তারা বললেন, ‘পলিটিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নেই। তখন আমার নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনীর যোদ্ধারা অতিবীরত্ব ও কৃতিত্বের সহিত মোকাবেলা করেছে।’
ভারতীয় বাহিনী ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধে নামে এবং শত্রু আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত ১৩ দিন যুদ্ধ করেছিল। অবশ্য এর আগে তারা আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন। ভারতীয় বাহিনীর যখন যুদ্ধে নেমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন আমরা সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করে একটি রণনীতি অবলম্বন করি। সে নীতি ছিল যেহেতু ভারতীয়দের কাছে ট্যাংক, কামান ও বিমান রয়েছে, সেজন্য যেখানে অধিক শক্তিশালী প্রতিরোধ রয়েছে এবং বড় অস্ত্রশক্তি প্রয়োজন, সেখানে তারা প্রথম লক্ষ্য দেবেন এবং আমাদের বাহিনী শত্রুকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ অর্থাৎ শত্রুকে দুই পাশ দিয়ে অতিক্রম করে ‘ক্রস কান্ট্রি’ দিয়ে গিয়ে ব্যূহের পার্শ্বভাগে আক্রমণ করবে অথবা ভারতীয়রা সামনের দিকে শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখবে এবং আমাদের বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছন দিক দিয়ে আক্রমণ করবে।
যেসব অঞ্চল কেবল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অর্থাৎ মুক্তিবাহিনী মুক্ত করেছিল, সেখানে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের পরিকল্পিত পদ্ধতিতেই যুদ্ধ করে। আমাদের বাহিনী যেসব অঞ্চল এভাবে মুক্ত করে তার মধ্যে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চল, সিলেটের সুনামগঞ্জ ও দুতিক অঞ্চল, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরাঞ্চল, চট্টগ্রামের করেরহাট, হায়াকো, হাটহাজারী অঞ্চলের ‘এক্সেল অব অ্যাডভান্স, কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চল, যশোরের মণিরামপুর ও অভয়নগর অঞ্চল, খুলনার বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও কালীগঞ্জ অঞ্চল, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চল, বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চল এবং ঢাকা পৌঁছার শেষ পর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, ঢাকা—এই ‘এক্সেল অব অ্যাডভান্স’ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত মিত্ররাও পদ্ধতিটি বেশি কার্যকর বলে মেনে নিয়েছিলেন। এ পদ্ধতি ছিল শত্রুদের সেখানে পাকা বাংকার বা রিইনফোর্সড কংক্রিটের শক্তিশালী ব্যূহ বা স্ট্রং পয়েন্ট রয়েছে, সেখানে গিয়ে সরাসরি ঢুঁ মারা বোকার কাজ। এক্ষেত্রে যা করতে হবে তা ১৯৪২ সালে জাপানিরা ব্রিটিশ বাহিনীকে (যাতে আমিও ছিলাম) শিখিয়েছিল। এক্ষেত্রে সামনে দিয়ে শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে হবে এবং তাকে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে ওর পেছনে গিয়ে স্ট্রং পয়েন্ট বানিয়ে বসুন। সে যাবে কোথায় এবং এর রিইনফোর্সমেন্ট ও গোলাবারুদ, রসদ ইত্যাদি আসবে কোত্থেকে? এভাবে তাকে বিছিন্ন করে তার ব্যূহের পেছনে ও পার্শ্বভাগে আঘাত করুন। প্রথম প্রথম মিত্রদের অনেকে ভাববেন তাকে বিছিন্ন করে তার ব্যূহকে পেছনে ও পার্শ্বভাগে আঘাত করেন। প্রথম প্রথম মিত্রদের অনেকে ভাবতেন আমরা ভিতু নাকি! তারপর একটি অভিজ্ঞতা হওয়ার পর বুঝলেন যে আমাদের পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর রণপদ্ধতি। এভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেবল একটি ব্যাটালিয়ন শত্রুদের ১৪ নং ডিভিশনকে আশুগঞ্জের যুদ্ধের পর ঘেরাও কের অকেজো করে দেয়।
তাই যেসব অঞ্চলে আমরা একা যুদ্ধ করেছি, সেখানে আমাদের পদ্ধতি ছিল শত্রুদের শক্তিশালী ঘাঁটিকে বিছিন্ন করে তাকে সম্মুখভাগে ব্যস্ত রেখে ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে পেছনে গিয়ে বসা এবং তারপর পার্শ্বভাগ ও পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করে ধ্বংস করা। অভ্যন্তর ভাগের গেরিলাদের (গণবাহিনীর) ও আমাদের নিয়মিত বাহিনীর আক্রমণের সামঞ্জস্য বিধান করা। নির্দেশ থাকত গেরিলারা যখন অমুক জায়গায় আক্রমণ করবে তখন দৃষ্টিকে অন্যদিকে ধাবিত করতে হবে এবং শত্রুরা যাতে গোলাগুলি ও থ্রি-ইনফোর্সমেন্ট না আসতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। গেরিলারা অমুক জায়গায় অমুক পুলটি ওড়াবেন। তবে আমরা বড় পুলগুলোয় হাত দিইনি। সেই পুলগুলো শত্রুরাই আত্মসমর্পণের আগে ভেঙেছিল।
যেখানে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি, সেখানে কৌশল ছিল, যেখানে অধিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাংক ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেবে, ‘এক্সেল অব অ্যাডভান্স’-এ তার শত্রুর স্ট্রং পয়েন্টের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ বাহিনী ‘আউটফ্লাঙ্ক’ করে গিয়ে পার্শ্বভাগে বা পেছনের দিক থেকে আক্রমণ করবে।
এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও সুস্পষ্ট নীতি ছিল যে স্ট্রং পয়েন্টগুলো ‘ক্লিয়ার’ করার পরবর্তী পর্যায় শত্রুর অন্য পজিশনগুলো আয়ত্ত করতে হবে, সেখানে মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এগোবে। তাদের অগ্রাভিযানে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী যতটুকু সাপোর্ট দেয়ার ঠিক ততটুকু দেবে।
[জেনারেল ওসামানীর সাক্ষাৎকারটি (১৯৭২) হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ১০ খণ্ড’ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত রূপে সংকলিত]





