১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির পরম গৌরব। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জনতার হয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এ যুদ্ধের সম্পর্কে প্রধানত এতটুকু বলতে চাই, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার জন্য সদা প্রস্তুত ছিলেন, তাদের কথা ইতিহাসে সঠিকভাবে উল্লেখিত হয়নি।
১৯৭১ সালে আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসার। মার্চে যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলাম। আমার বয়স তখন ২৭ বছর। তখন চাকরি বয়স আড়াই বছরের মতো হয়েছে। ৩০ মার্চে যশোর ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সরদার আব্দুর রহিম দুররানী এসে আমার ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র হওয়ার নির্দেশ জারি করেন। আমার কমান্ডিং অফিসার ছিলেন বাঙালি। তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল। তার পরের সিনিয়র আমি। আমার পরে একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ছিলেন। তার নাম আনোয়ার হোসেন। আমরা এ তিনজন বাঙালি এই ইউনিটের সদস্য ছিলাম। আমাদের ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করার খবর পেয়েই সৈনিকরা সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আমরা অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র হাতে নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে ৮ ঘণ্টাব্যাপী একটি যুদ্ধ হয় যশোর ক্যান্টনমেন্টে। এ যুদ্ধে আমি বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমার সাথী ছিলেন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন। তিনি এ যুদ্ধে শহীদ হন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হওয়ার পর আমি দেখতে পেলাম যে ক্যান্টনমেন্টের পাশাপাশি খিতিবদিয়া একটি গ্রাম। সেখানে গ্রামের হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ও সাধারণ গ্রামবাসী লাঠি, খুন্তি, কুড়াল বিভিন্ন দাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছাত্ররা এসে বলে, ‘স্যার অস্ত্র দেন যুদ্ধ করব দেশের জন্য।’ জনগণের এ উত্তেজনা, দেশপ্রেম ও দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তাদের যে আগ্রহ, এটি দেখে আমরাও অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়েছি।
পরে আমাদের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর নির্দেশে আমি যশোর অঞ্চল থেকে ৬০০ ছাত্রকে আমার ব্যাটালিয়নে ভর্তি করি। ৬০০ জনকে নিয়ে বেনাপোল থেকে তেলঢালা নামক একটি জায়গায় আমরা ছাত্রদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করি। এর আগে এপ্রিল ও মে দুই মাস যশোর বেনাপোল অঞ্চলে আমরা রক্ষণব্যূহ গড়েছিলাম। কাগজপুকুর নামে একটি স্থানে আমার রক্ষণব্যূহের ওপর পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ করে। তারপর সেখান থেকে পিছিয়ে এসে বেনাপোল থেকে দুই মাইল পূর্ব দিকে যশোরের দিকে মুখ করে গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের ওপরে আমাদের অবস্থান গ্রহণ করি। এ দুই মাস প্রায় প্রতিদিনই পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের ওপরে আক্রমণ চালিয়েছে। আক্রমণগুলোয় আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর পরও বেনাপোলকে শেষ পর্যন্ত মুক্ত রেখেছি। আক্রমণগুলোয় শত্রুপক্ষেরও প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
রিক্রুট করা ৬০০ ছাত্রকে ট্রেনিং দেয়ার জন্য আমাদের নিয়ে আসা হয় ভারতের তেলঢালায়। জুনে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনীর প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড জেড ফোর্স। এর কমান্ডার ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান। দেড় মাস ট্রেনিংয়ের পর এ ছাত্ররা দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হয়। তাদের নিয়ে আমাদের প্রথম আক্রমণ পরিচালিত হয় জামালপুরের সীমান্তবর্তী শত্রুঘাঁটি কামালপুরে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় প্রথাগত যুদ্ধ বা কনভেনশনাল ওয়ার। কনভেনশনাল অ্যাটাক আমরা এখানে করেছিলাম। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে তারা কামালপুরের প্রতিরক্ষা ব্যূহতে অপেক্ষা করছিল। সেখানে তাদের বাংকারগুলো ছিল কংক্রিট নির্মিত। সামনে মাইনফিল্ড ও গাছপালা কেটে তারা পরিষ্কার করে রেখেছে, যাতে আমাদের ওপরে তারা লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। এ ধরনের আক্রমণের জন্য অবশ্য প্রয়োজন ছিল আর্টিলারি বা কামানের গুলার সহায়তা। ৩১ জুলাই আমরা এ কামালপুর শত্রুঘাঁটি আক্রমণ করি। দুটি কোম্পানি অর্থাৎ প্রায় ২৫০ জন সৈনিক ছিল। এ দুই কোম্পানির একটির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ। অন্যটির কমান্ডার ছিলাম আমি। এ যুদ্ধে আমাদের কামানের গোলা ছিল না। তার পরও নতুন প্রশিক্ষিত সৈনিকরা তাদের প্রথম অপারেশনে এ ধরনের একটি ভয়াবহ প্রথাগত আক্রমণে শামিল হয়। এটি আমাদের জন্য একটু বিব্রতকর ছিল। এ সৈনিকদের আরো দু-চারটি ছোটখাটো অপারেশন রেড, অ্যাম্বুস ইত্যাদির পরে এ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তারা আরো ভালো ফলাফল করতে পারত। যেহেতু আমাদের কামানের কোনো সাপোর্ট ছিল না। এ আক্রমণে আমাদের ২৫০ জনের মধ্যে প্রায় ১০০ মুক্তিসেনা হতাহত হই। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হন। আমি নিজেও এ যুদ্ধে আহত হই।
এ যুদ্ধে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় আমরা মাইনফিল্ড পেরিয়ে শত্রুর ওপরে হামলা করেছি। এ সদ্য প্রশিক্ষিত ছাত্র যুবকদের শতকরা ৮০ জনই ছিল ছাত্র। ছাত্ররা দেড় মাস আগেও একটা রাইফেল পর্যন্ত ধরেও দেখেনি। এ ছাত্ররা যে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেছে, এটি আমাদের জন্য এক বিশ্বময়কর অভিজ্ঞতা। ১৯৭৩ সালে আমি ইংল্যান্ডের রয়েল আর্মি স্টাফ কলেজে একটি কোর্স করার জন্য যাই। সেখানে যেহেতু অফিসারদের মধ্যে আমারই কম্বেট এক্সপেরিয়েন্স ছিল, সেজন্য আমাদের প্রশিক্ষকরা কামালপুর আক্রমণের বিষয়ে জানতে চাইতেন। যখন আমি তাদের বলেছি, মাত্র দেড় মাসে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাইনফিল্ডের ভেতর দিয়ে গিয়ে কামানের সাপোর্ট ছাড়া শত্রুর কংক্রিট বাংকারের ওপরে আমরা আক্রমণ করেছিলাম। এটি শুনে তারা খুবই আশ্চর্য হতো এবং তারা আমার কথা শুনে শেষে বলত কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষে এ ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। একমাত্র যারা সুইসাইড স্কোয়াড, হাইলি মোটিভেটেড দেশের জন্য জীবন দিতে এসেছে, তারাই এ ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। আমি লক্ষ করেছি শত্রুর মুহুর্মুহু মেশিনগানের গুলি এবং তাদের কামানের ভয়াবহ গোলার শব্দের পরও আমাদের একজন লোকও পেছনের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। সবাই সামনের দিকে গিয়েছি। কিন্তু এত বেশি হতাহত, একজন কমান্ডার শহীদ এবং আমি আহত হওয়ার কারণে আমাদের একসময় পিছিয়ে আসতে হয়।
এ আক্রমণের পরে আমাদের নিয়ে আসা হয় সিলেট অঞ্চলে। সিলেটে আরেকটি অপারেশনের কথা বলি। সিলেটের গৌরীপুরে ২৮ নভেম্বর আমাদের ওপরে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। আমরা সেখানে গৌরীপুরের রক্ষণব্যূহ অবস্থান করছিলাম। খুব ভোরে তারাই আক্রমণ করে। এ আক্রমণে তাদের ৮০ জন নিহত হয়। পাকিস্তানি কমান্ডার মেজর সরোয়ার নিহত হন এবং তাদের ৩২ জনকে আমরা জীবিত অবস্থায় বন্দি করি। আমাদের পক্ষে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান আলফা কমান্ডার তিনি শহীদ হন। আরো ১০ জন সৈনিক শহীদ হন। এ ভয়াবহ যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তারা সিলেটের দিকে পিছু হটা শুরু করে। আমরা অপ্রচলিত পথ ধরে সিলেট জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সঙ্গে ১ হাজার ২০০ সৈনিক। আমাদের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানও সঙ্গে ছিলেন। চিড়া, গুড়, শুকনা খাবার পিঠে আমাদের ব্যাগপ্যাকে নিলাম অ্যামুনিশনের সঙ্গে এবং চা বাগানের মধ্যে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সিলেটের দিকে এগোতে থাকলাম। ১৪ ডিসেম্বর আমরা দেখতে পাই সামনে একটা সাদা দোতলা বিল্ডিং। পরে জানতে পারলাম এটা সিলেটের এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসা। সেখানে ১৪ ডিসেম্বর সকালে যুদ্ধ চলছিল সিলেট থেকে আট মাইল দূরে খাদিমনগরে। শত্রুরা কল্পনাও করেনি এরই মধ্যে শহরে প্রবেশ করেছে মুক্তিবাহিনী। সকাল হওয়ার পর টিলার ওপরে পাকিস্তানি বাহিনীর সৈনিকেরা রোদ পোহাতে বের হয়ে আসে। আমাদের দেখে অবাক হয়ে চিৎকার করে জানতে চায়, আমাদের পরিচয়। তাদের উল্টা দিকের একটা টিলাতে ৩০০ গজ দূরেই ছিল আমাদের অবস্থান। আমরা কোনো কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত পরিখা খননে মনোনিবেশ করি। তারা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমার কোম্পানির ওপর চারটি আক্রমণ পরিচালনা করে। আমরা যেহেতু পরিখা খনন সম্পন্ন করতে পারিনি, তার আগেই আক্রমণ করা হয়, সেজন্য আমাদেরও বেশ হতাহত হয়। আমার প্রায় ১৮ জন সৈনিক এখানে শহীদ হন। আমাদের একজন কমান্ডার সুবেদার ফয়েজ বীর উত্তম, তিনিও এ যুদ্ধে শহীদ হন। বিকালের দিকে আমাদের সঙ্গে একজন ভারতী বাহিনীর মেজর ছিল বেতার সেটসহ। তিনি আমাকে বেতার যোগে জানান এ তিনদিন ঘন জঙ্গলের কারণে তাদের বেতার সেট কাজ করেনি। এখন তিনি চাইলে তার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কামানের গোলা ফেলতে পারেন এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসায়। আমি বললাম, আমরা যেহেতু হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত, এখন গোলা নিক্ষেপ করলে আমাদের ওপরও পড়তে পারে। তাই আমি তাকে একটা বিমান আক্রমণ আনার জন্য অনুরোধ করলাম। আধা ঘণ্টা পরে দুটি মিগ বিমান এসে এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসার সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর যে বাংকারগুলো ছিল, সেগুলার ওপরে ১৫ মিনিট ধরে রকেট নিক্ষেপ করে। বিমান আক্রমণের শব্দ অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এ রকেটের গোলায় পাকিস্তানি বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। তারা আতঙ্কিত হয়ে সাদা পতাকা উড়িয়ে দেয়। এভাবে সেদিন আমিও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। আক্রমণে অলরেডি আমার ১৮ জন সেনা শহীদ হয়েছিল। ডানে বামে একেকজন করে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে দুইটা মেশিনগান ছিল। দুইটা মেশিনগান যারা চালায় তারা সবাই শহীদ হয়েছে। এটা আমার নয় মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল।
অবশেষে আল্লাহর রহমতে তারা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। সেদিন আমরা সবাই বেঁচে যাই। ৩০ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহের মাধ্যমে যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সূচনা করেছিলাম, ১৪ ডিসেম্বর সিলেটের এমসি কলেজের যুদ্ধে সেই আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সফল পরিসমাপ্তি দেখতে পেলাম।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির যুদ্ধ। পুরো জাতির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বিভিন্ন পেশার মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। লাখ লাখ তরুণের জীবনের বিনিময়ে আমরা এ স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র। সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য। সে গণতন্ত্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামান্য কিছু সময় আমরা গণতন্ত্র পেয়েছি। কিন্তু গত ১৫ বছরের দুঃশাসনের ফলে আমাদের জাতির অনেক লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। যে স্বপ্ন ধারণ করে আমরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। আমি নিজেও যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম। জীবন দিতে গিয়েছিলাম একটি সুখীসমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যে। একটি স্বাধীন দেশ রেখে গেলাম। আমরা আশা করব পরবর্তী প্রজন্ম যেন এ গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশে গড়ে তুলতে পারে।
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: আনিকা মাহজাবিন





