জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা নিয়ে এবং সে সময় থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের যে রূপান্তরকালীন সময় চলছে, সেখানে নারীর ভূমিকা এবং বর্তমান নারীর অবস্থানের জায়গা কী?
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ বা পরবর্তী সময়ে যত আন্দোলন হয়েছে নারীরা সেখানে একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এবারের জুলাই অভ্যুত্থানেও কিন্তু নারীরা বড় ভূমিকা পালন করেছেন। এ আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীরা খুব সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। আবার যখন সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে, তখন মায়েরা ভূমিকা পালন করেছেন, আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরা অনেকেই খুব জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন। নারী শিক্ষকরা এগিয়ে এসেছেন। আমারও একটা অবস্থান ছিল। আমার মনে হয়েছে যে গত ১৫-১৬ বছরে মানুষের ভেতরে যে ক্ষোভ সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে।
একটা ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। প্রথমে ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন, পরে ফ্যাসিস্ট সরকার নানাভাবে উসকানি দিয়ে সেটাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যে সারা দেশে একটা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। ঢাকা শহরও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। আমরা দেখলাম ধীরে ধীরে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে তারপর আসে এক দফার আন্দোলন এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পতন ঘটে।
আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ভূমিকা ছিল। মায়ের জায়গা থেকে, বোনের জায়গা থেকে, সহপাঠীর জায়গা থেকে, শিক্ষার্থীদের জায়গা থেকে। দেখা যায় যারা রাস্তায় ছিল না, আন্দোলনে ছিল না তেমন নারী ঘরের ভেতরে থেকেও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুই বোন যারা ঘরের ভেতরে ছিল, বুঝতেও পারেনি যে কীভাবে তাদের গায়ে গুলি লেগেছে।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা যতটা ছিল, যেভাবে তারা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন পরবর্তী সময়ে সেভাবে তাদের মূল্যায়নটা হচ্ছে না। এটা নানা কারণে হয় না। সেগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের অনেক পেছন থেকে আসতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সব প্রেক্ষিত থেকেই চিন্তা করতে হবে যে কেন নারীদের মূল্যায়নটা সঠিকভাবে হচ্ছে না।
আমরা ইদানীং দেখি নানা কারণে মব বলে যা তৈরি হচ্ছে সেখানে নারীদের প্রতি সহিংসতা হচ্ছে। নারীর প্রতি বৈষম্য আমরা দেশের সর্বত্রই দেখি—একদম নিচু শ্রেণী থেকে শুরু করে উঁচু শ্রেণী, সর্বত্রই। এখন যেহেতু আমাদের দেশে জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী নারী-পুরুষের সংখ্যা ৫০: ৫০, সেহেতু আমার মনে হয় নারীকে বাদ দিয়ে কোনোদিন এ রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারবে না। অন্য কোনো রাষ্ট্রও পারেনি।
নারীদের যথাযথ মূল্য করতে হবে। নারীর প্রতি যে সহিংসতা সেটা বন্ধ করতে হবে। নারীদের যথাযথ জায়গায় মূল্যায়ন করতে হবে। এ আন্দোলনে আপনারা দেখেছেন যে রাস্তায় একজন নারী, একটা ছোট মেয়ে সে একাই রাস্তায় পুলিশের ভ্যান আটকানোর চেষ্টা করেছে। এ ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্য অনেক বড়। এটা হলো একজন নারীর ভেতরের আবেগ, এটা তার মানসিক শক্তি। সে জানে হয়তো পুলিশের ভ্যানটাকে সে আটকাতে পারবে না, কিন্তু সে তার মনের জোর নিয়ে সেই ভ্যানটার সামনে দাঁড়িয়েছে। এটা প্রত্যেক নারীরই একটা প্রতীকী রূপ। আমি আমার জায়গা থেকে যে কাজটি করেছিলাম সেটা হলো আমি একজন মা হয়ে উঠেছিলাম। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলাম। জনগণের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলাম। আমার মনে হয়েছে যে আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু করার চেষ্টা করেছি এবং অন্যরাও যেন এ থেকে উদ্বুদ্ধ হন। তখন পর্যন্ত যারা আন্দোলনে নামেনি তারাও যেন রাস্তায় নেমে আসে স্বৈরাচারের পতনের জন্য। কারণ ১৫-১৬ বছর ধরে মানুষ যে গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছে, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বাকস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি ছিল, মানুষ তার নিজের কথা বলতে পারেনি, এমনকি গণমাধ্যমেরও কোনো স্বাধীনতা ছিল না। গণমাধ্যমকেও কোণঠাসা করে রাখা কিংবা টুঁটি চেপে ধরে রাখা হয়েছিল।
সেদিন আমার প্রতিবাদটা ছিল এসব জায়গা থেকেই। যে খুনির হাতে আমার সন্তানের রক্ত সে খুনির ছবি আমার অফিশিয়াল দেয়ালে রাখতে চাইনি। তখন আমার মনে হয়েছে যে স্বাধীন দেশে যেভাবে একজন সন্তানকে হত্যা করা হচ্ছে সেখানে চুপ থাকার কোনো উপায় নেই।
আমার মনে হয়েছে উনি যেভাবে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছেন এবং প্রতিনিয়ত যেভাবে মিথ্যাচার করছেন তার ওই গদিতে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমার একটা প্রতিবাদ ছিল প্রথম তার ছবি নামিয়ে, স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর আন্দোলনে এটা ছিল আমার নিজের উদ্যোগ।
জুলাই-আগস্টে প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি জায়গায় নারীরা ভূমিকা পালন করেছেন। মিছিলে নারীরা সামনের দিকেই ছিলেন। নারীদেরও অনেক আঘাত করা হয়েছে। তারা নিজেদের জায়গা থেকে যেভাবে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্বটুকু পালন করেছেন, রাষ্ট্রের উচিত নারীদের সেভাবে মূল্যায়ন করা এবং সব ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা। পাশাপাশি সবখানে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেন আমরা মানুষ হিসেবে চলাফেরা করতে পারি। আমাদের ন্যায্যতার ভিত্তিতে যতটুকু অধিকার পাওয়ার দরকার আমরা যেন সেই অধিকারটুকু পাই। আমাদের যেন সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





