কোটা আন্দোলনের শুরুর সময়টা আমি দেশের বাইরে ছিলাম। ১৭ জুলাই দেশে ফিরি। ওইদিনই আমাদের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হামলার প্রতিবাদে বসুন্ধরা গেটে প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করে। যখন দেখলাম আমার শিক্ষার্থীরা রাস্তায় প্রতিবাদ করছে তখন আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। ওইদিন থেকেই আমি ও আমার কয়েকজন সহকর্মী (ড. লামিয়া ইফতেখার, ড. নোভা আহমেদ, ড. বখতিয়ার আহমেদ, ড. মামুন মোল্লা) শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিগুলোয় সম্পৃক্ত হই। ওইসময়ে আমরা আহত শিক্ষার্থীদের যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। ১৮ ও ১৯ জুলাই ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়। ১৮ জুলাই হামলার পর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের নয়জন আহত শিক্ষার্থী বসুন্ধরায় আটকে পড়ে। আমি ও আমার সহকর্মীরা মিলে তাদের বিভিন্ন বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করি। শুরু হয় কারফিউ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট। ১৯ জুলাই এনএসইউর একজন স্টাফ আবির মারা যান এবং বেশকিছু শিক্ষার্থী গুলিতে আহত হন। এর মধ্যে ধরপাকড়, ব্লকরেইড চলতে থাকে। বসুন্ধরায় রায়ট পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন হয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয়ানক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবু তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিল। সারা দেশ একরকম স্থবির হয়ে পড়েছিল।

২৯ জুলাই আবারো ক্যাম্পাসের উদ্দেশে বের হই। ওইদিন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সেখানে জড়ো হওয়ার কথা ছিল। আমি আর আমার কলিগ নর্থ সাউথ থেকে বের হয়ে আইইউবি যাচ্ছিলাম। একটি পুলিশ প্রিজন ভ্যানে শিক্ষার্থীদের দেখে আমরা এগিয়ে যাই। পুলিশদের কাছে তাদের কেন আটক করেছে জানতে চাই। পুলিশ ওইসময় আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করে। বলে যে ‘নাশকতার উসকানিদাতা’ হিসেবে আমাদেরও তুলে নিয়ে যাবে। বিশেষত বিপ্লব নামে একজনের আচরণ খুব আগ্রাসী ছিল। আমি পুলিশকে বলি আমি ছাত্রদের নাম নেব, তাদের পরিবারকে জানাতে হবে। এটা বলে ভ্যানের সামনে দাঁড়াই। শিক্ষার্থীদের নাম ও কে কোন ইয়ারে পড়ে তা জানতে চাই। তিন-চারজনের নাম নেয়ার পরেই পুলিশ আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলে এবং প্রিজনভ্যান চলে যায় ১২ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে। এ ঘটনার পর আমরা আমাদের ফ্যাকাল্টিদের জানাই এবং পরদিনই নিরাপদ শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে মানববন্ধন করি। এরপর ১-৪ আগস্ট পর্যন্ত এ চারদিন ছেলেমেয়েরা কর্মসূচি আয়োজন করেছে, আর আমরা তাদের সঙ্গে ছিলাম। এ সময়গুলোয় আমাদের কয়েকজন বলার চেষ্টা করেছে ডিজিএফআই আমাদের নামের তালিকা করছে, আমরা জটিলতায় পড়তে পারি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আমরা সরাসরি কোনো বাধা পাইনি। এছাড়া চারপাশের পরিস্থিতি দেখে পরিবারেরও শঙ্কা ছিল। কিন্তু সবসময়ই মনে হয়েছে এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব। আমরা পুরো সময়টা তাদের সঙ্গে ছিলাম। নর্থ সাউথে আমরা সবচেয়ে ভয়ংকর দিন দেখেছি ৫ আগস্ট। ওইদিন নর্থ সাউথ রক্তাক্ত ছিল। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। এর পরও আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে বদ্ধপরিকর ছিল। তারা সামনে এগোবেই। আমরা তখন শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে প্রথমে আহতদের এভারকেয়ারে নেয়ার ব্যবস্থা করি। এছাড়া আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে মেডিকেল হেল্প চাই। ওইদিন আমরা যখন আহত শিক্ষার্থীদের নিয়ে এভারকেয়ারে, তখন জানতে পারি শেখ হাসিনা পদত্যাগ করবে। এভাবে নিজেদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাদের নিয়ে আমরা গর্বিত। তারা নতুন এক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের সূচনা করেছে। তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী বেশকিছু ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। বিশেষত নারীর প্রতি সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে, জুলাই আন্দোলনে সামনে থাকা নারীরা যেভাবে দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যাচ্ছে, এ বিষয়গুলো ইতিবাচক নয়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই নারীর যথাযথ সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই আন্দোলনের সাহসী নারীদের হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। আমাদের প্রত্যাশা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়গুলো অনুধাবন করবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

লেখক: শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি