ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো—
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা
...শহীদ কাদরীর এই আশ্বাসেই হয়তো সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল মেয়েটি। বাসার সামনে হইহল্লা শুনে বাবা ছুটে যান ছাদ থেকে মেয়েকে ঘরে আনতে। মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। মুহূর্তেই ছোট্ট দেহটি ঢলে পড়ে বাবার কোলে। জুলাই বিপ্লবে প্রাণ হারানো প্রথম নারী শহীদের নাম সম্ভবত রিয়া গোপ। মাথায় লাল ঝুঁটি, টুকটুকে লাল জামা পরে সামনে জন্মদিনের কেক নিয়ে ছবি তোলা রিয়া গোপের বয়স ছয় বছরে আটকে গেল।
‘মেয়ের যাতে লেখাপড়া নষ্ট না হয়, সেই জন্য রান্না করতে দিতাম না। চায়ের দোকান দিয়ে যা দুই টাকা উপার্জন করেছি, মারওয়ার লেখাপড়ায় দিয়েছি। মেয়ে আমাকে না জানিয়ে ১৮ জুলাই থেকে উত্তরায় যেত আন্দোলনে। সারা দিন দোকানে থাকায় খোঁজ পেতাম না। প্রতিবেশীর কাছে জেনে মেয়েকে ঘরে আটকাই। আন্দোলনে যাওয়া নিয়ে খুব রাগ করেছিলাম। তবে মেয়ে আমাকে ফাঁকি দিছে। ৩ আগস্ট বলল, লেখাপড়া নেই, ঘরে থেকে দমবন্ধ লাগছে। সাভারে মামার বাসায় বেড়াতে যাবে। ভেবেছিলাম, সাভারে গেলে আন্দোলনে যাবে না’—শহীদ নাফিসার বাবা আবুল হোসেন এভাবেই বলছিলেন মেয়ের গল্প। নাফিসা হোসেন ৫ আগস্ট মামার নিষেধ না শুনে মামার বাসা থেকে পালিয়ে অংশ নিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। দুপুরের পর সাভার মডেল মসজিদ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার কিছুদিন বাদেই প্রকাশ হয় এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। জিপিএ ৪ দশমিক ২৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হলেও সেই ফলাফল দেখে যেতে পারেননি রাজপথে প্রাণ হারানো নাফিসা।
মোসাম্মৎ রিতা আক্তার, নাঈমা সুলতানা, সুমাইয়া আক্তার, নাজমা বেগম—কী মনে হচ্ছে? গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান নাম? হয়তো তাই ছিল। কিংবা গড়পড়তা বলেই হয়তো নামগুলো তেমন পরিচিত ঠেকছে না। অস্বস্তি লাগছে? আরো কিছু নাম শোনাই। তানহা, লিজা, মেহেরুনিসা—আমি নিশ্চিত এ নামগুলোও অপরিচিত। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে এ নামের মানুষগুলোও হয়তো প্রিয় মাতৃভূমিকে ঠিক চিনে উঠতে পারেনি। সরল মনে বিশ্বাস করেছিল তারা স্বাধীন দেশে যৌক্তিক দাবি নিয়ে রাজপথে নামা তাদের সাংবিধানিকভাবে রাজনৈতিক অধিকার। ছয় বছরের রিয়া গোপ থেকে শুরু করে ৬০ বছরের মায়া ইসলাম—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন এমন অনেক নারী।
‘আমি নারী পাই না ভয়, কোটা ছাড়া করবো বিশ্বজয়’ কিংবা
‘নারীই যেখানে অগ্রসর, কোটা সেখানে হাস্যকর’
আন্দোলনের সূচনা থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী শাসনের পতন পর্যন্ত মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে নারী শিক্ষার্থীরা বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। নারীরা রাজপথে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিয়েছে, পুলিশ ভ্যানের সামনে বাঘিনীর মতো রুখে দাঁড়িয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে, লড়াই করেছে, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছে, অন্ন ও চিকিৎসা প্রদান করেছে, শিল্পের মাধ্যমে জনগণকে অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করেছে। নারীরা নারী কোটায় নয়, মিছিলের শোভাবর্ধনকারী রূপে নয়, সক্রিয়ভাবে এ বিপ্লবের অংশ ছিল। অথচ বিপ্লবের পর নারীদের এ গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে; পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় তাদের পরিকল্পিতভাবে পাশ কাটানো হয়েছে। নেতৃত্বের পর্যায়ে তারা যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায়নি। জুলাই বিপ্লবে নারীদের অবদান, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসে যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য।
স্বৈরতন্ত্র যেমন জনগণের ওপর একক শাসকের আধিপত্য বজায় রাখে, তেমনিভাবে পুরুষতন্ত্র নারীদের ওপর পুরুষদের স্থায়ী আধিপত্য তৈরি করতে চেষ্টা করে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সবখানেই নারীদের ভূমিকা সীমিত রাখার এক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলে। নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশ, এমনকি তাদের শরীরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাধা সৃষ্টি করে।
স্বৈরতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্র যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। উভয় ব্যবস্থাই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন উপভোগ করে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখে। স্বৈরতন্ত্রে এটি হয় একনায়কের হাতে, আর পুরুষতন্ত্রে এটি থাকে পুরুষদের হাতে কিংবা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী নারীদের হাতে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে জনগণের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে স্বৈরতন্ত্র জনগণের অধিকার হরণ করে। একইভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। উভয় ব্যবস্থাই জনগণ বা নারীদের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করে তাদের স্বাধীনতা সীমিত রাখে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের হাতে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তেমনিভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য ও শোষণকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বৈধতা দেয়া হয়।
১২ জুলাই প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রের নির্মম সহিংসতার পরেও নারী কর্মী ও প্রতিবাদকারীরা পিছু হটতে অস্বীকার করেন। বরং তাদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং তাদের উপস্থিতি রাস্তায় দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত একটি বৃহত্তর জনগণের বিদ্রোহে পরিণত হতে শুরু করে, যেখানে নারীদের অবিরাম অংশগ্রহণ একটি শক্তিশালী প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। সহিংসতার মুখে তাদের সাহস ও সহনশীলতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করে। জুলাই বিপ্লবের কয়েকটি আইকনিক ছবি বেছে নিতে হলে নিঃসন্দেহে প্রথম দিকে উঠে আসবে সেই ছবিটি, যেখানে আমরা দেখতে পাই চশমা পরিহিত এক তরুণী সন্ত্রাসী সংগঠনের নির্যাতনে কুঁকড়ে যাচ্ছে। তার চোখ বেয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। প্রকাশ্য দিবালোকে নির্যাতনের এমন দৃশ্য নিশ্চিতভাবে পুরো বিশ্বে সাড়া ফেলেছিল। এ ছবি দেখে শত শত মানুষ দ্বিগুণ আক্রোশে রাজপথে নেমে এসেছিল। নৃশংসভাবে আক্রমণ করা সত্ত্বেও নারীরা আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছে, তাদের অবস্থান দৃঢ় রেখেছে এবং অন্যদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছে। সহিংসতার সম্মুখীন হয়েও তাদের এ অটুট সাহস ও দৃঢ় সংকল্প আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বহুদূর।
নুসরাত তাবাসসুম, উমামা ফাতেমা ও রাফিয়া রেহনুমার মতো নারী শিক্ষার্থী সমন্বয়করা আন্দোলনের পরিচিত কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন। ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের রাজাকারের সঙ্গে তুলনা করায় রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসগুলোয় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে নারী শিক্ষার্থীরা সবার আগে হল গেটের তালা ভেঙে প্রতিবাদে যোগ দেন। আত্মরক্ষার্থে অসাধারণ দৃঢ়তায় দৈনন্দিন রসুইঘরের সরঞ্জামাদি হাঁড়ি, পাতিল, মরিচের স্প্রে, চামচসহ, ভাঙা গাছের ডাল, যিনি যা পেয়েছেন তা নিয়েই যোগ দেন মিছিলে। মেডিকেল কলেজের ছাত্রীর হাতে তাদের স্টাডি কিট থেকে ফিমার হাড়, গৃহপরিচারিকার হাতে ঝাড়ু এবং কাঁচিকে আত্মরক্ষা সরঞ্জামে পরিণত হতে দেখেছি আমরা। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মায়েরা তাদের বাড়ির সামনে বিপ্লবীদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন।
২৫ জুলাই বিপ্লবকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে এবং বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশী নারীরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন, দেশে ঘটা বিপ্লবের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। লন্ডন থেকে ওয়াশিংটন ডিসি, হামবুর্গ, কোপেনহেগেন এবং আরো বিভিন্ন শহরে এই নারীরা প্রতিবাদ সমাবেশে নেতৃত্ব দান এবং ধারাবাহিকভাবে সহায়তা প্রদান করেন।
মনে আছে উম্মে খায়ের ঈদির কথা? ভাই আরিফ সোহেলের মুক্তি এবং ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। তার গম্ভীর অভিব্যক্তি ও দৃঢ় অবস্থান রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার সব পরিবারের সদস্যদের নীরব কিন্তু অবিচলিত শক্তির প্রতীক। ২৮ জুলাই শুধু ঢাকাতেই ২ লাখ ১৩ হাজার মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়। ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম নারী কেন্দ্রীয় ছাত্র সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে মিরপুরের বাসা থেকে আটক করে। একই দিন বিপ্লবের অন্যান্য কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তাদের নিজ নিজ স্থান থেকে অপহৃত হন।
জুলাই এমন এক মাস যে মাসের তারিখ ক্যালেন্ডারের পাতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং সেসব তারিখের প্রতিটি দিন প্রতিটি রাত নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন বিপ্লবে। এত কিছুর পর অর্ধেক জনসংখ্যার অধিকারী হয়েও নারীরা বাংলাদেশের বৃহত্তম মাইনরিটি। যেন সময়ের প্রয়োজনে তারা গর্জে উঠেছিলেন আবার চিরচেনা পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে সময়ের সাথে সাথে মিলিয়ে যাচ্ছেন। বৈশিষ্ট্যগত দিকে লক্ষ করলে পুরুষতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্রের মাঝে পার্থক্য খুব কম। যে পুরুষতন্ত্র পোশাকের মাপকাঠিতে নারীকে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়, বিপ্লবের দিনগুলোয় সেই পুরুষতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিছিলে হাতে হাত ধরে হিজাব-নিকাব থেকে টপস-প্যান্ট পরা নারীরা বেরিয়ে এসেছিলেন। স্বৈরতন্ত্রের পোষা পুলিশ বাহিনীর ভ্যান একা হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নুসরাত জাহান টুম্পা। যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের গৃহকোণে আটকে রেখে শোক পালন করতে শিখিয়েছে, সেই সমাজে মীম ও মিতু তাদের ১৬ বছর বয়সী ভাই ইসমাইল হোসেন রাব্বির নিথর দেহ কাঁধে তুলে মিছিল করতে করতে স্বৈরতন্ত্রের পতন চেয়েছেন অগ্নিঝরা কণ্ঠে।
জুলাই বিপ্লবে বাকস্বাধীনতার জন্য নারীরা ব্যক্তিগত মূল্য কম দেননি। অনেক মা হারিয়েছেন তার নাড়ি ছেঁড়া ধন, অনেক নারী অকালে বৈধব্য বরণ করেছেন, অকালে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক নারী। এসব নারী আমাদের মুক্তি, সাহস, ত্যাগের স্থায়ী উত্তরাধিকার করে দিয়ে গেছেন। এবার আমাদের পালা। ঘুমন্ত ভিসুভিয়াস গর্জে উঠুক আরেকবার। স্বৈরাচারের পতন তো হলো, কিন্তু পুরুষতন্ত্র?
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ
কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ
লেখক: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





