বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসা একসময় অনেক ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ ক্যান্সার রোগের ওষুধ ও আনুষঙ্গিক উপাদানের উৎপাদনক্ষমতা আর কারিগরি দক্ষতার অভাব ছিল প্রকট। হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির ঘাটতির। পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক এবং সহায়ক প্যারামেডিকসের সংখ্যার অপ্রতুলতা ছাড়াও রোগের ধারাবাহিক চিকিৎসায় রোগীর অনীহা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলত। কিন্তু এখন সেই অবস্থার তুলনামূলক পরিবর্তন এসেছে। বিশের দশকে দু-একটি স্থানীয় ওষুধ কোম্পানির কারিগরি দক্ষতায় স্থানীয়ভাবে ক্যান্সারের গুটিকয় কেমিক্যাল মলিকুলের উৎপাদন সক্ষমতা এবং তার কোয়ালিটি বিদেশী ওষুধের সমপর্যায়ে উঠে আসে। ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। চিকিৎসকের ওপর আস্থা, রোগীর ক্রয়ক্ষমতা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়।
বিশের দশকে আরো একটি দিক লক্ষণীয় ছিল। কারবোপেনেম গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক যেমন মেরপেনেম, ইমিপেনেম এগুলোও ছিল বিদেশনির্ভর। এছাড়া অ্যানেস্থেটিক এজেন্ট, ডায়াগনস্টিক ডাই (যা রেডিওথেরাপির অনুষঙ্গ রসদ) তাও ছিল বিদেশী আমদানিনির্ভর। ধীরে ধীরে স্থানীয় দক্ষ ফারমাসিস্টদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ মেডিসিনগুলো দেশে সহজলভ্য হলে দেশে চিকিৎসা পদ্ধতির দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে।
এভাবে দেশের ওষুধ শিল্পে জাগরণ ও অগ্রগতি দেখা যায়। একুশের দশকে এ অগ্রগতি যুক্ত হয় ওয়ান ফার্মার। কোম্পানির কর্ণধার ও দক্ষ নেতৃত্ব বায়োলজিক্যাল (বায়সিমিলার) ওষুধ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেন। এর ধারাবাহিকতায় এবং তার অদম্য উৎসাহে ২০১৫ সালে ওয়ান ফার্মার নতুন যাত্রা শুরু হয়। আধুনিক ফ্যাসিলিটি স্থাপনার মাধ্যমে বায়ো-মলিকুলার অ্যান্টিক্যান্সার ওষুধ উৎপাদন শুরু করে।
বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১০৬ জন ক্যান্সার রোগী। (সূত্র: বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি) আর প্রতি বছরে গড়ে ৫৩ জন নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশ ক্যান্সারের রোগী। অর্থাৎ ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজন ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে।
সাধারণত বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সারের ধরন হচ্ছে মহিলাদের স্তন ক্যান্সার, পুরুষের ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখ বা মুখগব্বরের ক্যান্সার, পাকস্থলীর ক্যান্সার, শ্বাসনালির ক্যান্সার, জরায়ুমুখের ক্যান্সার (অবশ্য জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং এর ব্যবহার হওয়ার কারণে এ ক্যান্সারের হার এখন কম)। ওয়ান ফার্মা বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগের ধরন এবং এর ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তিকে সামনে রেখে এর বায়োটেক ওষুধ উৎপাদনে বিশেষ কার্যক্রমে মনোনিবেশ করেছে। এরই মধ্যে ওয়ান ফার্মা ফুসফুসের ক্যান্সারের ওষুধ, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ও কোলন ক্যান্সারের ওষুধ বাজারে সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের আধুনিক বায়োসিমিলার ওষুধ উৎপাদনের লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে কোম্পানিটি।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যান্সারের কারণ খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, সাধারণ মানুষের কিছু কিছু বিষয়ে অসচেতনতা ক্যান্সার প্রসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যেমন ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য ও জীবনযাত্রা, পরিবেশদূষণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো ইত্যাদির কারণে দেশে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এসব ক্ষেত্রে ওয়ান ফার্মা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় জনসংযোগ, প্রচার ও নিয়মিত মতবিনিময় করে আসছে।
ক্রমবর্ধমান এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন পর্যায়ে পদার্পণ করেছে বা করতে যাচ্ছে এর একটু বিবরণ জানা আমাদের প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে প্রথম উদ্যোগ হলো, রোগ ছড়ানোর আগেই সার্জারি করে টিউমারটি কেটে ফেলে দেয়া। এটা তখন সম্ভব যদি রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগ প্রথমিক পর্যায়ে থাকে না। পরবর্তী চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে রেডিয়েশন থেরাপি। হাই এনার্জি রেডিয়েশন যেমন প্রোটন থেরাপি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর। তারপর অনকোলজিস্টরা কেমোথেরাপির কথা ভাবেন।
কেমোথেরাপির নানাবিধ পর্যায়ে চিন্তা করতে হয় ড্রাগ প্রয়োগের বিষয়ে। তার মধ্যে থাকে কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল বা টারগেটেড থেরাপি অথবা উভয়ের সংমিশ্রণ। একমাত্র রোগের স্টেজ এবং তার পরিবেশ নির্ধারণ করে কেমোথেরাপির ধরন কী রকম হবে। বিজ্ঞ অনকোলজিস্টরা তখন কেমিক্যাল অ্যান্টিক্যান্সার মলিকুলের চেয়ে আধুনিক বায়োটেক মলিকুলের স্বচ্ছতা, সহনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর রোগীর সার্বিক সারভাইবাল বেনিফিটের দিকে নজর দেন।
সর্বাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার চমৎকার আবিষ্কার হচ্ছে ইমিউনোথেরাপি, যা ইমিউন সিস্টেমকে সাহায্য করে ক্যান্সার সেলকে খুঁজে বের করে তাকে ধ্বংস করা। এর মধ্যে রয়েছে চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর এবং সেলথেরাপি। মেলানোমা (স্কিন ক্যান্সার) এবং ফুসফুসের ক্যান্সার নিরাময়ে ইমিউনোথেরাপি খুব ভালো কাজ করে।
বর্তমান সময়ে আবিষ্কৃত এসব বায়োটেক টেকনোলজিতে বায়োসায়েন্টিস্টরা খুব সতর্কতার সঙ্গে ম্যাব (মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি), রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ, টাইরোসিন কাইনেজ ইনহিবিটর, বায়োসিমিলার টেক নিয়ে বিস্তর গবেষণায় অগ্রসর হতে পেরেছেন। ওয়ান ফার্মার প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে এসব নতুন মলিকুল দেশে তৈরি করে মানুষের কাছে ওষুধগুলোকে সহজলভ্য করে চিকিৎসার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া।
আমাদের দেশে এখন বেশ কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বায়োসিমিলার ক্যান্সার প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। ওয়ান ফার্মাও আজ জাতির এ বিশেষ প্রয়োজনে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
নতুন আবিষ্কৃত ক্যান্সার বায়োটেক মলিকুল ক্যান্সার চিকিৎসার জটিলতাকে সহজ ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আধুনিক টেকনোলজির সমন্বয়ে উৎপাদন দক্ষতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম মানদণ্ড মেনে দেশে ক্যান্সার নিরাময়ের ওষুধ উৎপাদনে নিয়োজিত আছে ওয়ান ফার্মা এবং নিরলসভাবে কাজ করবে এটাই আমাদের লক্ষ্য।





