বিশ্বাস, আশা এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই—ক্যান্সার রোগীদের কাছে এ যেন মূলমন্ত্র। কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিই এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। তাই একে প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রাথমিক অবস্থায় তা নির্ণয়ের ওপর সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় বিশ্ব ক্যান্সার দিবস; যেখানে আছে হেরে যাওয়া নয়, মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগটিকে হারানোর বার্তা।
ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্সার কন্ট্রোল (ইউআইসিসি) নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পুরো বিশ্বে এ দিবস পালন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি আগে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। এটির সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা। ১৭০টির বেশি দেশে এ প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই হাজার সদস্য রয়েছে।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসটি প্রবর্তন করা হয় ২০০০ সাল থেকে। এ দিবসের মূল লক্ষ্য ক্যান্সারসংক্রান্ত গবেষণার প্রচার করা, ক্যান্সার প্রতিরোধ করা, রোগীর সেবা উন্নত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা। এ বছরের ক্যান্সার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ইউনাইটেড বাই ইউনিক’। অর্থাৎ ক্যান্সার চিকিৎসায় মানুষের কী প্রয়োজন সেগুলোর ওপর দৃষ্টি ফেরানো। স্বাস্থ্য এবং ক্যান্সার পরিষেবাগুলো নতুন আঙ্গিকে সাজানোর দিকে গুরুত্ব দেয়া; যার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বেড়ে সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হবে তামাক, মাদক ও বায়ুদূষণ।
আইএআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও বলা হয়, ৩৫ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে ক্যান্সার আক্রান্ত হবে ২০৫০ সালে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ২০ মিলিয়ন। ১৮৫টি দেশ থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ রিপোর্ট তৈরি করে আইএআরসি। এতে ৩৬ ধরনের ক্যান্সারের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে ৯৭ লাখ মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়। প্রতি নয়জনে একজন পুরুষ ও ১২ জনে একজন নারীর ক্যান্সারে মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি দেশেও বাড়ছে ক্যান্সার রোগী। দেরিতে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগের অভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় শনাক্তের হার কম। অন্যদিকে মৃত্যুর হার বেশি। ক্যান্সারে আক্রান্তদের চিকিৎসায় রেডিয়েশন বা রেডিও থেরাপি ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের মতো সেবা পাওয়ার সুবিধা কম। যাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো তারা দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ তাদের বেশির ভাগই সুচিকিৎসা পান না।
দেশের মোট ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। তবে দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। গবেষণার তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০৬ জন। এছাড়া প্রতি বছর এ রোগে নতুন করে ৫৩ জন আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে মোট মৃত্যুর ১২ শতাংশের জন্য দায়ী ক্যান্সার।
ওই গবেষণায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশে ৩৮ ধরনের ক্যান্সারের রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে স্তন, মুখ, পাকস্থলী, শ্বাসনালি ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোগীর সংখ্যাই বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ রোগীর বয়স ১৮-৭৫ বছর। ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ২ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু ও ৫ দশমিক ১ শতাংশ রোগীর বয়স ৭৫ বছরের বেশি।
আবার গ্লোবাল ক্যান্সার অবজারভেটরি ২০২২ সালে ক্যান্সার রোগী শনাক্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ওই বছর বাংলাদেশে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৯৪ হাজার ৯২২, আর নারী ৭২ হাজার ৩৩৪। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল খাদ্যনালির ক্যান্সারে আক্রান্ত, যার সংখ্যা ২৫ হাজার ২৩২ বা মোট নতুন শনাক্তকৃত রোগীর ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। ঠোঁট বা মুখের অভ্যন্তরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ১৬ হাজার ৮৩ জন। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ১৩ হাজার জন, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত ১২ হাজার ৯৮৯ জন, জরায়ু মুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ৯ হাজার ৬৪০ জন। এছাড়া অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৩১২।
উল্লেখ্য, ক্যান্সারের চিকিৎসা সব ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় এ রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে সেখানেও রোগীর তুলনায় জনবল ও চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা সুবিধা অপর্যাপ্ত। আর এর এক-তৃতীয়াংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশে রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আছে মোট ২৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে। এর ১৫টি সরকারি ও নয়টি বেসরকারি। এছাড়া আরো আটটি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে রেডিওথেরাপি সুবিধা আনার কাজ চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট খাতে জড়িতরা জানান, দেশের মানুষ যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে সেই অনুযায়ী জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বাড়ছে না। হাসপাতালগুলোয় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকাটাও একটি সমস্যা। দ্য লেনসেট অনকোলজির গবেষণা অনুসারে, দেশে রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের সংখ্যা ২৫০। এছাড়া মেডিকেল অনকোলজিস্ট ২২ জন, পেডিয়াট্রিক অনকোলজিস্ট ৪৭ জন, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ৭০ জন ও রেডিয়েশন থেরাপি টেকনোলজিস্ট আছেন ১১৫ জন।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহারও বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সার আক্রান্তের পাশাপাশি অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যেও ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ক্যান্সার। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রতি লাখে প্রায় চারজনের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। আর শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৬৪ জন। এর মধ্যে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত ছিল ৬২৯ জন। নন-হজকিন্স লিম্ফোমায় ২০২, হজকিন্স লিম্ফোমায় ১৪২ ও মস্তিষ্কের (ব্রেন) ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল ১৬২ জন। অন্যদিকে ওই বছর ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৬৯ জন। এর মধ্যে লিউকেমিয়ায় ৩১৩, ব্রেন ক্যান্সারে ৯২, নন-হজকিন্স লিম্ফোমায় ৯১ ও হজকিন্সে ৫২ জন মারা গেছেন। লিউকেমিয়া, নন-হজকিন্স লিম্ফোমা এবং হজকিন্স লিম্ফোমা ব্লাড ক্যান্সারের একেকটি ধরন।
দেশে শিশু ক্যান্সার শনাক্তের হার বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়নি। এছাড়া পেডিয়াট্রিক অনকোলজিস্টের সংখ্যা রোগী অনুপাতে কম। প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও নার্সের সংখ্যাও কম। এছাড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় চিকিৎসা শুরু দেরি হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে যারা ঢাকায় আসেন, তাদের চিকিৎসা খরচের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক আরো অনেক খরচ হয়।
ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। সুযোগ-সুবিধা কম থাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণেও আক্রান্তদের বিদেশনির্ভরতা বাড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষকে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। দিন দিন এ খরচ আরো বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। ক্যান্সার সচেতনতাবিষয়ক কর্মসূচি আরো বাড়ানো জরুরি। এজন্য ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। প্রাথমিক স্টেজে ধরা পড়লে ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। এছাড়া দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো জরুরি। ক্যান্সার চিকিৎসায় নিয়োজিত দক্ষ চিকিৎসকের পাশাপাশি দক্ষ নার্স এবং টেকনিশিয়ান বাড়াতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, গত কয়েক দশকে ক্যান্সার একটি প্রধান স্বাস্থ্য উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। এটি একটি নীরব ঘাতক, যা প্রায়ই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায় না। রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশের আগেই এটি শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্তকরণই এ মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। এছাড়া ক্যান্সার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এটা কী ধরনের রোগ, কী কী কারণে ঝুঁকি বাড়ে, প্রতিরোধের জন্য কী কী করণীয় সে বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয়
নিয়মিত স্ক্রিনিং করা: প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ক্যান্সার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য। সেজন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং করা জরুরি। বিশেষ করে স্তন, কোলন এবং সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের জন্য স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করা: পুষ্টিকর খাবার, যেমন ফল, শাকসবজি, শস্যদানা জাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রক্রিয়াজাত মাংস বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
ভ্যাকসিন দেয়া: জরায়ু মুখ ক্যান্সার হয় একটি সাধারণ ভাইরাস (এইচপিভি) থেকে এবং এটি গোটা বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেও নারীর মৃত্যুর একটি অন্যতম কারণ। তবে প্রাণঘাতী এই ক্যান্সার এইচপিভি টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়।
ধূমপান-তামাকজাত পণ্য সেবন করা থেকে বিরত থাকা: অতিরিক্ত তামাকজাত পণ্য সেবন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা: ফুসফুস, কিডনি, কোলন, প্রোস্টেট, স্তন ইত্যাদির ক্যান্সার এড়াতে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: অনেক ক্ষেত্রে ধূমপানের চেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে স্থূলতা। এ কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।





