সময় যত গড়িয়েছে ‘লাইক’ বাটনের গুরুত্বে বৈচিত্র্য এসেছে তত। আগে এটি ছিল শুধু পছন্দ জানানোর ছোট্ট এক থাম্বস-আপ চিহ্ন। কিন্তু এখন তা বদলে দিয়েছে যোগাযোগের ধরন, অনুভূতি প্রকাশের উপায় ও ডিজিটাল ব্যবসার দুনিয়া। আজকের দিনে ছোট্ট এ বাটন হয়ে উঠেছে অনলাইন জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতীকগুলোর একটি।

‘লাইক’ বাটন নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশিত হয়েছে—‘লাইক: দ্য বাটন দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’।

বইটিতে বলা হয়েছে কীভাবে লাইক বাটনের জন্ম হয়েছে, ধীরে ধীরে তা কীভাবে জনপ্রিয় হয়েছে, আর সমাজে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

২০০৫ সালের ১৮ মে। বব গুডসন নামের এক কর্মী ইয়েল্প নামের রিভিউ সাইটে কাজ করতেন। সেদিন তিনি খসড়া একটি স্কেচ আঁকেন। স্কেচটি ছিল একটি থাম্বস-আপ আর একটি থাম্বস-ডাউন চিহ্নের। উদ্দেশ্য ছিল, চিহ্ন দুটির মাধ্যমে রেস্টুরেন্টের রিভিউতে ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া জানানো। যদিও ইয়েল্প সেই ধারণা গ্রহণ করেনি। তবে ঠিক এ ধারণা থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘লাইক’ বাটনের ভিত্তি তৈরি হয়।

একই সময়ে সিলিকন ভ্যালির জিমেইলের পল বাচাইট, ইউটিউবের স্টিভ চেন, টুইটারের বিজ স্টোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে প্রতিক্রিয়া জানানোর সহজ উপায় খুঁজছিলেন। তাদের এ সৃষ্টিশীল ভাবনার সমন্বয় থেকেই ধীরে ধীরে ‘লাইক’ বাটনের ধারণা জন্ম নেয়।

ফেসবুক প্রথম ‘লাইক’ বাটন চালু করেনি। তবে তারাই এটিকে জনপ্রিয় করেছে। শুরুতে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ এ ফিচার চালুর পক্ষে ছিলেন না। তিনি ভাবতেন, এতে ফেসবুক অনেকটা হালকা মেজাজের হয়ে যাবে। তবে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর ২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্লাটফর্মটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লাইক’ বাটন চালু করা হয়।

এ ছোট্ট ক্লিকই ফেসবুকের পুরো কনটেন্ট ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবহারকারীদের পছন্দ বোঝা, আগ্রহ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখানো, বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্য ডাটা সংগ্রহ—সব—কিছুর মূল ছিল এই লাইক। ২০২৪ সালে মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) বিজ্ঞাপন থেকেই আয় করে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

এরপর ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারসহ প্রায় সব ডিজিটাল প্লাটফর্মেই লাইক বা অনুরূপ বাটন যোগ করা হয়। ২০১৬ সালে ফেসবুক নতুনভাবে ছয়টি প্রতিক্রিয়া (রিয়েকশন) চালু করে। সেগুলো হলো লাভ, কেয়ার, হাহা, ওয়াও, স্যাড ও অ্যাংরি।

তবে শুধু ইতিবাচক নয়, লাইক বাটনের কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। অনেক কিশোর-কিশোরী মনে করেন, কম লাইক মানেই তারা জনপ্রিয় নয়। অনেকে এই ডিজিটাল স্বীকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আবার কারো পোস্টে প্রতিক্রিয়া না এলে তারা হতাশায় ভোগেন।

প্রকৃতপক্ষে থাম্বস-আপের ইতিহাস অনেক পুরনো। রোমান সাম্রাজ্যের গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ থেকে শুরু করে সত্তরের দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ হ্যাপি ডেজের ফনজি চরিত্র পর্যন্ত—এ চিহ্ন পছন্দের প্রকাশ হিসেবে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। বইটির সহলেখক মার্টিন রিভস বলেন, ‘লাইক বাটন আমাদের এক প্রাচীন মানসিক চাহিদাকে স্পর্শ করে—আমরা চাই কেউ আমাদের পছন্দ করুক, বুঝুক, আর আমাদের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করুক।’

পরিশেষে বলা যেতে পারে, ‘লাইক’ এখন আর শুধু একটা বাটন নয়—এটা এক ধরনের অনুভূতি, একটি ডিজিটাল ভাষা, যা বদলে দিয়েছে সম্পর্ক, আচরণ ও ব্যবসার ধরন। —এপি অবলম্বনে