তিনদিন ধরে আমি একটি বাড়িকে ভেঙে পড়তে দেখছি। সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দটি হবে ‘বিনির্মাণ’, ভেঙে পড়া নয়। কোনো বুলডোজার নেই, ভবনের ওপর কোনো ভয়ানক আক্রমণ নেই, যন্ত্রপাতির গর্জন নেই... এখনো। ব্যাপারটা একটা কাঠামোকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলার মতো। পার্থক্য এটাই যে, এখানে শুধু বাটালি আর হাতুড়ির ক্ষত নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছুর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। খুব সতর্কভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, ভবনটিকে কেটে তার ভেতরের অংশগুলোকে বের করে ফেলা হচ্ছে।
এই বিনির্মাণ হতে থাকা সাইটে তৃতীয়বারের মতো গেলাম শুক্রবার, তখনই খবর পেলাম মহান এবং উর্বর বাংলাদেশী লেখক হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। এক বছর ধরে কোলন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে আগের রাতে ৬৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এটাও আমার কাছে মনে হয় কেটে ভেতর থেকে সবকিছু বের করে নেয়ার মতো অবস্থা।
বাড়ির সম্মুখভাগের উঠানের সামনে একটা সিমেন্ট পাইপের পাশে দাঁড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদের প্রোটাগনিস্ট এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কণ্ঠ মিসির আলীর কাজ করার পদ্ধতিকে স্মরণ করছিলাম, ‘চোখ বন্ধ করো এবং দেখতে চেষ্টা করো।’
জীর্ণ-ভগ্নদশার ভবন বাসযোগ্য নয়। এ রকম ভবন কোনো কাজে আসে না। কিন্তু তারপরও, এমনকি এই স্যাঁতসেঁতে বিকালেও, পাশেই একটা অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ারের নিচতলায় এডিডাস আর হুন্দাইয়ের ঝকমকে শো থাকা সত্ত্বেও, সেই পুরনো ম্যানশনের গথিক সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। ভবনের সামনে ওপড়ানো গাছগুলোর শিকড় স্প্যানিশ স্থপতি আন্তোনি গদির পাথরে তৈরি কিছু কাল্পনিক সৃষ্টি হয়ে উঠতে পারত।
আহমেদের লেখা তার মাতৃভূমি বাংলাদেশে বিপুল জনপ্রিয় এবং ভারতের বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গেও তার ভক্তকুলের সংখ্যা বাড়ছে। একবার আকস্মিকভাবে শুনেছিলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র অন্য আরেক ছাত্রকে বলছিল যে, ‘জানো, উনি এত টাকা কামিয়েছেন যে তিনি (হুমায়ূন আহমেদ) একটা দ্বীপ কিনে ফেলেছেন?’ তারপরও ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি যা লিখেছেন, সেগুলো খাপছাড়া, কিন্তু এসব লেখাই বাংলা এবং ইংরেজিসহ অনেক আঞ্চলিক ভাষায় দারুণ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আপনি যদি হুমায়ূন আহমেদের নাম না শুনে থাকেন, তাহলে তার কারণ তিনি নন। কারণটা হচ্ছে তার লেখা এখনো ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। এই ভাষা এবং সংযোগ উপাদানটি ‘অজানা’ লেখকদের ‘বিখ্যাত’ করে তোলে এবং জাদুমন্ত্রবলে সেই অখ্যাত লেখকদের বই পড়ার উপযোগী হয়ে ওঠে।
শ্যামবাজারের কাছে চিড়িয়ামোড়ের শতবর্ষের বেশি পুরনো ভবনটির কথা সবাই ভুলে গেছেন। এমনকি উত্তর কলকাতার প্রায় অপরিবর্তনীয় ল্যান্ডস্কেপ দেখে অভ্যস্ত কলকাতাবাসীও ভবনটিকে ভুলে গেছেন। ভুলে যাওয়া মানে অনেকটা অজানা থাকা। এই ম্যানশনটি মানে পাইকপাড়া রাজবাড়িটি ছিল সিনহা পরিবারের। এই সিনহারা ছিলেন মধ্য-বাংলার মুর্শিদাবাদের কান্দি এবং উত্তর কলকাতার পাইকপাড়ার জমিদার। বাড়ির অর্ধেকটা আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই অংশেই গড়ে উঠেছে অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এখন বাকি অর্ধেক অংশে বিশ শতকের মধ্যভাগের দৃশ্যকল্পে দাঁড়িয়ে থাকা উনিশ শতকের ডিজাইনের ভবনটি ভাঙার সময় হয়ে গেছে। তবে আরো কিছুদিন এটা অ্যান্টি-বিল্ডিং হিসেবে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, এমন একটা স্থাপনা যার কোনো ব্যবহার নেই কিন্তু যা দেখতে প্রকাণ্ড, অভিজাত।
আহমেদের মিসির আলী একজন সাইকোলজিস্ট, মানুষের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে মিসির রহস্যের সমাধান করেন। সবসময়ই তার গল্পে স্বল্প ভাষায় কৌতুক অব্যাহত থাকে। ‘আমি এবং আমরা’ উপন্যাসে আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এক সাইকোপ্যাথ খুনির সঙ্গে। উপন্যাসে খুনি যখন নিজের অপরাধ নিয়ে আস্ফাালন করছিল তখন মিসির তাকে এমন ভঙ্গিতে কিছু কথা বলে যেন সে তার ধূমপানের অভ্যাস নিয়ে বলছে, ‘তুমি দু’জনকে খুন করেছ। তৃতীয় আরেকজনকে মারবে। আমার কী বলার আছে? ব্যাপারটা তো এমন নয় যে তোমার আমার অনুমতির প্রয়োজন আছে।’
পাইকপাড়া রাজবাড়ি আর সংস্কারের যোগ্য নয়। উত্তর কলকাতায় আরো অনেক পুরনো এবং আধা পুরনো চমত্কার অনেক ভবন ভগ্নদশায় পড়ে আছে। এগুলোর অনেকগুলো সংস্কার করা সম্ভব এবং খুব সম্ভবত করা হবেও। কিন্তু এটা সংস্কার করা হবে না।
উপমহাদেশের ফিকশন (এবং সংস্কৃতি) প্রকৃতপক্ষে কোনো জনপ্রিয় অ্যান্টি-হিরো তৈরি করেনি। কিন্তু আহমেদের আরেক জনপ্রিয় সৃষ্টি হিমু সেই দুর্লভ অ্যান্টি-হিরো। দারুণ বুদ্ধিমান হিমু নিশ্চিতভাবেই অদ্ভুত স্বভাবের। হিমু সমাজের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত, সমাজের প্রথাবদ্ধ ভালো আচরণের বিরুদ্ধে সে সব সময় লড়াই করে এবং হিমুর পেশা বা বৃত্তি নেই। তার জীবনের দৃশ্যমান কোনো উদ্দেশ্যও নেই। হিমু আমাকে ৪০-৫০ দশকের অপরাধ কাহিনীর লেখক জিম থম্পসনের নায়ক এবং দস্তয়ভস্কির মহিমান্বিত সোশিওপ্যাথদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
পাইকপাড়া জমিদারবাড়ি এবং হুমায়ূন আহমেদের বিপুল রচনার ‘সংরক্ষণ’-এর প্রয়োজন নেই। জামিদারবাড়ির স্পষ্ট গৌরবোজ্জ্বল সময় ছিল আর আহমেদ রেখে গেছেন গুণমুগ্ধ আর পাঠকদের একটি বিরাট দল। জমিদারবাড়ি দেখতে আগামী কয়েকসপ্তাহের মধ্যে কলকাতায় শ্যামবাজারের উদ্দেশে একটা ট্যাক্সি নিতে হবে, তালা সেতু পেরিয়ে হুন্দাইয়ের শোরুমের কথা জিজ্ঞেস করতে হবে। আর আহমেদের লেখার স্বাদ পেতে তার সায়েন্স ফিকশন ‘অঁহক’-এর অনুবাদ পড়তে হবে এবং আরো অনুবাদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্বাস করুন, জমিদারবাড়ি দর্শন এবং আহমেদের লেখা পড়া দুটোতেই আপনার সময় ব্যয় ফলপ্রসূ হবে।
ইন্দ্রজিৎ হাজরা: ভারতীয় লেখক। ২০১৩ সালে ভারত ও ফ্রান্সে প্রকাশিত হয় তার আলোচিত উপন্যাস দ্য বায়োস্কোপ ম্যান। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর দুদিন পর তাকে নিয়ে হাজরার এই লেখাটি হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত হয়েছিল।
ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব





