বাংলাদেশে বিবাহ বাসরের ঐতিহ্য অতি পুরনো— মঙ্গলকাব্যের বহু আগে থেকেই বাসর নিয়ে বহু কাব্য-কাহিনী বা উপাখ্যানের জন্ম হয়েছে। সে সময়ের অনেক বাসর কথাই মৌখিকভাবে নিরক্ষর কবিদের সৃষ্ট হলেও অগণিত সাধারণ নারী-পুরুষের আনন্দ লাভে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

বাংলাদেশের বাসর কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বাসর উপাখ্যান গড়ে উঠেছে বেহুলার বাসরকে ঘিরে। এই একটি বাসর কথাই বিবাহের আনন্দযজ্ঞের মধ্যে একমাত্র বিষাদ-বাসর। অশুভ শক্তির প্রভাবে চাঁদ সওদাগর সর্বস্ব হারালেও নিজের মতাদর্শ আঁকড়ে থাকেন। তার অহঙ্কারের গনগনে আগুনে পোড়ানো লোহা দিয়ে তৈরি হয়েছিল বেহুলা-লখিন্দরের লোহার বাসর, মনসার ক্রোধ এড়াবার জন্য এর চেয়ে আর কার্যকরী প্রতিষেধক কি-ই বা ছিল চাঁদ সওদাগরের হাতে! বেহুলার সেই অভিশপ্ত বাসরে মৃত্যুর আশঙ্কায় যে আমোদ-আহ্লাদ হয়নি, তা তো সবারই জানা। সেখানে সুসজ্জিত নারীদের নৃত্যগীতের হিল্লোলে ভেসে যাননি অতিথিরা, কারণ সেই বাসরে বর-কনে ছাড়া আর কারো ছিল না প্রবেশাধিকার। হেতালের লাঠি হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে জীবন বাজি রাখা চাঁদ সওদাগর শেষ রক্ষা করতে পারেননি, হেরে গিয়েছিলেন তিনি দৈবের হাতে। পুরো মঙ্গলকাব্য ঘেঁটে পুরুষকাব্যের এমন নির্মম পরাজয়ের করুণ কাহিনী আর দুটি চোখে পড়ে না।

সেকালে বিয়ের পাত্রপাত্রীদের বয়স সাধারণত ১০ থেকে ১৩/১৪ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত— সেকালে বাংলার সব মনীষীই এই বয়সসীমায় বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন— দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে রবীন্দ্রনাথ— সকলেই এই প্রথা মেনে চলতে হয়েছে। সেই কমবয়সী বর-বধূ বরণের অনেক আনন্দ-বেদনা কৌতুক মধুর স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে সেকালের মানুষের আত্মকথা বা স্মৃতিচিত্রে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও ১৩/১৪ বছরে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন, পাত্রী দিনময়ীর বয়স ১০ পেরোয়নি— ঈশ্বরচন্দ্র পিতার ভয়ে ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেকালে বাঙালি বিয়ের প্রধান আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান ছিল স্ত্রী আচার। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই মিষ্টি— অতি আচারের কারণে জামাই বেচারাদের নানা রকম উত্কট রঙ্গ-রসিকতার বেড়া ডিঙিয়ে বাসরঘরে ঢুকতে হতো। ঈশ্বরচন্দ্রকেও এই আচারের অত্যাচার ডিঙিয়ে বাসরঘরে ঢুকবার ছাড়পত্র নিতে হয়েছিল পরিণত বয়সে। তিনি তার বিয়ের আসর ও বাসরের স্মৃতি মনে রেখেছিলেন। তবে তার কাছে এই বাসর আমোদ বলেই মনে হয়েছিল এবং তার প্রৌঢ় বয়সে প্রচলিত বিবাহের আসর ও বাসর তার মনে হয়েছিল তুলনামূলকভাবে পানসে। তার কিশোর বয়সের বিয়ের আনন্দ-অনুষ্ঠান তিনি যেন আর খুঁজে পাচ্ছিলেন না নতুন ইংরেজি শেখা এই আমলের বিয়েতে।

শুধু তাই নয় বিবাহ বাসরে আগের মতো আমোদের অভাব দেখে বিদ্যাসাগর খেদ পর্যন্ত করেছিলেন। তার মতে, আগের মতো ‘বরকেও তেমন সংকট পরীক্ষায় আজকাল আর পড়িতে হয় না! সেকালে এই সংকট পরীক্ষার ভয়েই বাসরঘরকে বিবাহের রণক্ষেত্র’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল আর সম্ভবত এই কারণেই বিবেকানন্দর ভাই নরেন্দ্রনাথ দত্ত বাসরঘরকে ‘শাস্তির ঘর’ বলতে দ্বিধা করেননি।

বিদ্যাসাগর বিয়ের বাসরের সংকটের রূপ, প্রকার বা ভয়াবহতা নিয়ে কিছুই বলেননি। যদিও, তিনি নিজেও এই ‘সংকট’ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। বাসরের কন্যাপক্ষের নারীরা তাকে পর্যুদস্ত করা তো দূরের কথা তারা নিজেরাই তরুণ ডাকাবুকো বিদ্যাসাগরকে ঘাঁটাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে সাদা কথায় ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র যে সংকটের কথা বলেছেন, তার সূত্রপাত বিয়ের ছাঁদনাতলার স্ত্রী আচারের হাত ধরে। সেকালে হিন্দু বিয়ের প্রধান অনুষ্ঠান ছিল স্ত্রী আচার— এই মিষ্টি অতি আচারের প্রায়োগিক রূপটি কিন্তু আদৌ মিষ্টি নয়। বরং স্ত্রী আচারের বাড়াবাড়ির কারণে বর বেচারাদের নানা রকম শারীরিক দুর্ভোগ পোহাতে হতো।&dquote;পালকী&dquote;

শ্যালিকা, শ্যালকজায়া প্রভৃতি ঠাট্টার সম্পর্ককৃত নারীদের অতি আদরের ফলে বরের কপালে জুটত প্রচুর কানমলা, চুল টানা, মাথায় নরম হাতে গাট্টা ও নানা ধরনের উত্কট পরিহাস বা রসিকতা। মুসলিম পাত্রদের অবশ্য ছাঁদনাতলার মহাসংকটে পড়তে হতো না। কিন্তু ছাঁদনাতলা-পরবর্তী অনুষ্ঠানের নানা উত্পাতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পাত্রকেই কমবেশি নাকাল হতে হতো বা এখনো হয়। হাল আমলের পরিমাণগত তারতম্য ঘটলেও গুণগত তারতম্যে তেমন ইতরবিশেষ হতে দেখা যায়নি। বিয়ের পাত্র বা বরকে নাকাল করার ব্যাপারে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বঙ্গললনাদের দক্ষতা আজও সমীহ করার মতো। বর প্রতিবাদ করলেই সে নেহাৎই বেরসিক বদরাগী বলে গণ্য হয়।

হিন্দু বিয়েতে স্ত্রী আচারের শুরু ছাঁদনাতলায় বর-বধূকে বরণ করা দিয়ে। এই ছাঁদনাতলায় বর-বধূর শুভ দৃষ্টি হয় অর্থাৎ বর বধূকে এবং বধূ বরকে ওই প্রথম দর্শন করে। উল্লেখ্য, মুসলিম বিবাহে শুভ দৃষ্টি কিন্তু আগেই অর্থাৎ বিয়ে পড়াবার সময় অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হিন্দু বিয়েতে শুভ দৃষ্টির আগে বর-বধূর পরস্পরকে দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তখন বরের অভিভাবকরা কন্যা দেখে পছন্দ করতেন। কন্যার অভিভাবকরা পাত্র দেখে আসতেন। এখন অবশ্য এসব নিয়ম মানা হয় না। সে সময়ে মেয়েরা খুব কম বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসত। বরের বয়স ১২/১৩ আর কন্যার বয়স ৮/৯-এর কাছাকাছি হলেই বিয়ে দেয়া হতো। সাধারণত বরের বয়স ১৪ বছরের বেশি হতো না, যদি না তৃতীয় কি চতুর্থ পক্ষে বিয়ে করতে যেত। বেশি বয়স হলে নতুন শ্বশুরবাড়িতে মেয়ে মহলে সেই বেশি বয়সী বরের কপালে বিস্তর দুর্ভোগ লেখা থাকত।

ছাঁদনাতলা থেকে কমবয়সী কিশোর বরদের ভবিষ্যৎ সংসার জীবনের নানা নিগ্রহের একটি প্রি-টেস্ট হিসেবে ধরা হতো। পুররঙ্গনাদের হাতে নাকাল হয়ে অনেক সময় বর বেচারাকে হাঁসফাঁস করতে দেখা যেত। দোজবর বা তেজবরের মতো অভিজ্ঞ জামাইটির রেহাই ছিল না।

কঙ্কাবতীর লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় সেকালের বাঙালি ঘরের সেই পরিচিত ছবিটিই তুলে ধরেছেন তার সৃষ্ট অমর চরিত্র ডমরুধরের তৃতীয় বিবাহের বর্ণনায়— পঁয়ষট্টি (৬৫) বছরের ডমরুধরকে ছাঁদনাতলায় মেয়েরা ঘিরে দাঁড়িয়ে দুই কান মলে দিয়ে বারবার বলে চলেছে— “বিবাহ তৃতীয় পক্ষে, সে কেবল পিত্তি রক্ষে।”

এবার ছাঁদনাতলার পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা যাক, হিন্দু বিয়েতে যখন বর-বধূকে বরণ করার সময় ছাঁদনাতলায় যে কাঠের পিঁড়ির ওপর বরকে দাঁড়াতে হয়, কোনো কোনো সুরসিকা সেই পিঁড়ির নিচে পাঁচ-সাঁতটা সুপারি লুকিয়ে রাখতেন, উদ্দেশ্য বর পিঁড়ির ওপর দাঁড়ানো মাত্র পিঁড়ি বর্তুলাকার সুপারির কারণে আচমকা সরে যাবে এবং তত্ক্ষণাৎ টাল সামলাতে না পেরে বরও মাটিতে কুপোকাত।

এই উত্কট রসিকতার কারণে কখনো কখনো কিশোর বরকে গুরুতর আহত হতে হয়েছে। এই বিপজ্জনক পিঁড়ির কারণে বিয়েবাড়ি যাত্রার আগে বরকে সাবধান করে দিতেন বরের বাড়ির অভিজ্ঞ মানুষেরা। ছাঁদনাতলায় পিঁড়িতে দাঁড়াবার আগে পা দিয়ে পিঁড়িটা ঠেলে দেখো তলায় সুপারি আছে কিনা। মুসলিম বিয়েতে যেহেতু ছাঁদনাতলা নেই, তাই দুলাহকে ছাঁদনাতলা নামের বিভীষিকার সম্মুখীন হতে হয়নি কখনো। তবে খাবার প্লেটে বা থালার নিচে অথবা বসার চাদর বা ফরাসের নিচে সুপারি রেখে বদ রসিকতা করার রেওয়াজ মুসলিম সমাজে যথেষ্ট ছিল বা আছে।

ছাঁদনাতলার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই যে বর বেচারা নিষ্কৃতি পেতেন, তা নয়। তার জন্য কঠোরতর পরীক্ষা অপেক্ষা করে খোদ বাসরঘরে। কখনো কখনো বর সপ্রতিভ হলে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ছাঁদনাতলা এবং বাসরঘর এই দুই ইনিংসেই পিটিয়ে খেলে ম্যাচ বের করে আনতে সমর্থ হতেন, এই করিত্কর্মা তরুণ এবং বিজয়ী খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বপ্রথম যার নাম উচ্চরণ করতে হয়, তিনি তরুণ ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র, যার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। এবং ভাবীকালের বিদ্যাসাগর হয়ে উঠতে তখনো অনেক বাকি তার। ঈশ্বরচন্দ্রের সে সময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না, কারণ লেখাপড়া শেষ হতে তখনো ঢের সময় লাগবে। পাছে পিতা মনঃক্ষুণ্ন হন এই ভেবে ১৮৩৫ খৃি. সুন্দরী কন্যা দিনময়ীকে বিবাহ করেন, তখন পাত্রীর বয়স ৯ বছর মাত্র।

কিশোর ঈশ্বরচন্দ্রকে ছাঁদনাতলা আর বিয়ের বাসর— এই দুই সমুদ্রই সাঁতারে পার হতে হচ্ছিল। প্রৌঢ় বয়সে পরিণত বিদ্যাসাগর কলকাতার এক বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ উপলক্ষে উপস্থিত ছিলেন। বিয়েবাড়ির উত্সবমুখর পরিবেশে স্মৃতি সরণি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জীবনযুদ্ধে কিছুটা ক্লান্ত বিদ্যাসাগর হয়তো এক সময় নিজের অজান্তেই তার তরুণ বয়সের বিবাহ বাসরের মুহূর্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিশোর বয়সের সেই দিনগুলো, যখন ‘তরুণ ছিল অরুণ আলো’ স্মৃতির দুয়ারে মৃদু করাঘাত করেছি কি কেউ? সেই স্মৃতি মেদুরতার প্রভাবেই কি পৌঁছে গিয়েছিলেন তার বিবাহবাসরের অনেকদিনকার আগের দিনটিতে, যে কারণে তিনি নিজেই হঠাৎ স্বতপ্রণোদিত হয়ে বলে ‘আজকাল বিবাহে তেমন আমোদ নেই। বরকেও তেমন অনিবার্য পরাজয়ের মুখোমুখি পড়তে হয়না।’ এই ঘটনাটি বিদ্যাসাগরের খণ্ডিত আত্মজীবনীতে যদি কেউ খোঁজেন তাহলে  হতাশ হবেন, তবে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন চণ্ডী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার বিদ্যাসাগর গ্রন্থে।

 

সেই আসরে ঈশ্বরচন্দ্রের বন্ধুরা তাকে সেকালের বিয়ের আমন্ত্রণ নিয়ে বলার অনুরোধ করায় বিদ্যাসাগর তার নিজের বিবাহ বাসরের কাহিনী বলা শুরু করলেন তার অননুকরণীয় ভাষায়— চণ্ডী চরণের লেখা পড়লে মনে হবে বিদ্যাসাগর তার বিবাহ বাসরের রঙ্গ কৌতুককে বেশ উপভোগ করেছিলেন। আরো মজার কথা এই কৌতুকে সক্রিয় অংশগ্রহণে বিন্দুমাত্র অনীহা বা অপ্রস্তুত বোধ করেননি তিনি।

সেই সময়ের রেওয়াজমাফিক শুভ দৃষ্টির সময়ে এক পলক দেখার পর বাসরঘরে এসে বরকে কনে খুঁজে নিতে হতো। গহনা-শাড়ি পরা একপাল কিশোরীর মধ্যে নিজের কনে বের করে আনা প্রায়ই অসম্ভবের কোঠায় পড়ে। তরুণ বরদের বাসরঘরে সেই একনজর দেখা ছাঁদনাতলার কনে খুঁজে নিতে যে বিড়ম্বনা পোহাতে হতো, তা বলাই বাহুল্য। একে ‘সংকট’ বললে কমই বলা হয়। এ এক ভয়াবহ মজার পরীক্ষা। ঈশ্বরচন্দ্র জানিয়েছেন, ‘‘আমার বিবাহের সময়ে বাসরঘরে পা দিতে না দিতেই আমাকে বলা হলো, ‘তোমার কনে খুঁজে বের করো।’ কনে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে শুনিয়া মহামুশকিলে পড়িলাম। আমি দেখিলাম এই মেয়ের দঙ্গলের ভিতর হইতে সেই অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনীকে খুঁজিয়া বাহির করা আমার কর্ম নয়— আমি ভাবিয়া চিন্তিয়া শেষে আমার বয়সের বেশ একটি টুকটুকে ফরসা মেয়েকে বাহির করিয়া বলিলাম, ‘এই আমার কনে।’ যেমন ধরা অমনি এক মহাগণ্ডগোল পড়িয়া গেল। কে কার ঘাড়ে পড়ে, কে কোথা দিয়া পালাইবে, তার পথ পায় না। আমি যাকে ধরেছি, তাকে খুবই ধরেছি, তার আর পালাইবার উপায় নাই। আমি তার হাত ধরিয়া বলিলাম, ‘তুমিই আমার কনে, তোমাকে হলে আমার ঘর চলবে। আমি আর অন্য কনে চাই না,’ সে মেয়েটি বাপরে-মারে বলে চিত্কার করিতে লাগিল, গিন্নী বান্নী গোছের দুই একজন নিকটে আসিয়া বলিল, ‘ও তোমার কনে নয়, ওকে ছেড়ে দাও।’ আমি বলিলাম, ছাড়িব কেন? খুঁজিয়া নিতে বলেছো, আমি খুঁজিয়া এটিকেই বাহির করিয়াছি— এটি হলেই আমার বেশ মনের মতো হবে। তার পর সেই মেয়েটি হাতে-পায়ে ধরিয়া বলিল, ‘আচ্ছা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমার কনে বার করে দিচ্ছি। তখন আপনারাই আসল কনে আনিয়া হাজির করিল।” চণ্ডীচরণ লিখেছেন, ‘‘বিবাহ-বাসর-সংকটে বিদ্যাসাগর মহাশয় পরিহাসপ্রিয় আত্মীয় স্বজনের হাতে এই রূপে নিস্তার পাইলেন, আর কেহ বড় তাহাকে নাড়া-চাড়া দিল না।’’

(পৃষ্ঠা-৩৩৩, চণ্ডীচরণ মুখোঃ বিদ্যাসাগর)

সকলেই জানেন ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় খুব দুরন্ত ও ডানপিঠে ছিলেন। প্রখর স্মৃতিশক্তি, প্রচণ্ড বুদ্ধি এবং তীক্ষ উপস্থিত বুদ্ধি তার বরাবরই ছিল সাফল্যের প্রধান আয়ুধ। বাসরঘরেও এই উপস্থিত বুদ্ধি বলেই তিনি বাসররণে বিজয়ী হয়েছিলেন।

কাঠখোট্টা টুলো পণ্ডিত কোনো কালেও ছিলেন না তিনি। পরিণত বয়সে তিনি যে মেয়েটিকে বিবাহ বাসরে ‘ভালো করেই ধরেছিলেন’, তাকে যে মনে রেখেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই।

সন্দেহ নেই বিবাহ বাসরে বিদ্যাসাগর তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে ‘বাসর সংকট’ কাটিয়ে দিয়েছিলেন কিশোর বীরের বেশে। কিন্তু বাঙ্গলার জাগরণ অথবা রেনেসাঁর আরেক অগ্রপথিক শিবনাথ শাস্ত্রী বিবাহ বাসরে কিন্তু এতটা সফলকাম হতে পারেননি। শিবনাথ ছাঁদনাতলা আর বিয়ের আসরে ভালোই উতরে গিয়েছিলেন নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও। তার বিয়ের আসর বসেছিল গ্রামের বাড়িতে প্রায় একশ তেত্রিশ চৌত্রিশ বছর আগে। ১২/১৩ বছর তার। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমাকে লইয়া সেই আসরে বসাইল, অমনি গ্রামের সমবয়স্ক বালকেরা আসিয়া ওরে তুই কি পড়িস? বলিয়া পরীক্ষা আরম্ভ করিল।’ শিবনাথ ডাকসাইটে ছাত্র ছিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই বরের লজ্জা ভুলে গিয়ে শাস্ত্রী তাদের সঙ্গে বাগযুদ্ধে নেমে পড়লেন এবং ‘আমাকে তাহারা ঠকানো দূরে থাক। আমি তাহাদিগকে ঠকাইয়া দিলাম।’

শাস্ত্রী মশায়ের বিজয় পতাকা কিন্তু একটু পরেই মুখ থুবড়ে পড়ল। কারণ ‘বাড়ির মধ্যে লইয়া গেলে বাসরঘরে সমবয়স্কা বালিকাদিগের কানমলা আরম্ভ হইল। সেইবার ঠকিয়া গেলাম, কানমলার পরিবর্তে কানমলা দিতে পারিলাম না। এই ঘটনার অনেক বছর পর পরিণত বয়সের লেখা তার আত্মজীবনীতে সে সময়ের কথা মনে করে লিখেছেন, ‘নারী দল আমাকে ঘিরিয়া ফেলিল, এত মেয়ে একসঙ্গে দেখিয়া ভ্যাবাচ্যাকা লাগিয়া গেল।’ শাস্ত্রী মশায়ের মনোদুঃখ আমরা বুঝতে পারি পল্লী বালকেরা হেরে গেলেও পল্লী বালিকারা শাস্ত্রীকে হারিয়ে সুদে আসলে শোধ তুলে নিয়েছিল। বাসর সংকট যে ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে, তাতে সমাজের ভালোই হয়েছে।

শিবনাথ শাস্ত্রী ছিলেন নেহাত ছেলে মানুষ, মেয়েদের দঙ্গলে তাই সহজেই হেরে গিয়েছিলেন। একে অল্প বয়স, তাতে সরল-সহজ মন। কিন্তু বঙ্কিমের ইন্দিরার উপন্যাসে ইন্দিরার উপেন্দ্র বয়স্ক অভিজ্ঞ পুরুষ। তিনি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে। অথচ তিনিও কিন্তু সাহসিকতার যুদ্ধ অভিজ্ঞতা কিছুই কাজে ব্যবহার করতে পারেননি। শিবনাথ শাস্ত্রী তো উপেন বাবুর তুলনায় নেহাতই শিশু, তাই বাসরে তার নাকাল হওয়া মোটেই কাপুরুষের কাজ হয়নি।

বঙ্কিম লিখেছেন, ‘উপেন্দ্র-ইন্দিরার বিবাহ বাসরে কত যে মেয়ে এসেছিল, তার সংখ্যা নেই। সেই বাসরের ‘বড় বড় পটল-চেরা ভ্রমর-তারা চোখ’, সারি বেঁধে এসে হাজির। তাদের কালো কুণ্ডুলী করা ফণা ধরা কেশরাশি লতার মতো ঘুরে ঘুরে ফুলে ফুলে দুলে উঠছে। ইন্দিরার স্বামী অনেক পল্টন জয় করেছেন, ‘অনেক কর্নেল-জানরেলের বুদ্ধি ভ্রংশ’ করেছেন। কিন্তু এই সুন্দরীর পল্টন দেখে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত। যুদ্ধের তোপের আগুনের জায়গায় নয়নবহ্নির উদগার, বেয়নেটের পরিবর্তে এই অলঙ্কারের রুনুরুনি, জয়ঢাকের পরিবর্তে আলতাপরা পায়ে মলের ঝমঝমি তাকে বিভ্রান্ত করবে এতে আর আশ্চর্য কি। এ ঘোর রণক্ষেত্রে তাকে রক্ষা করিবার জন্য উপেন্দ্র বাবু আমাকে (ইন্দিরাকে) দ্বার দেশে দেখতে পেয়ে ইঙ্গিতে ডাকলেন। কিন্তু (ইন্দিরা) তাকে এ রণে তার সাহায্যে গিয়ে এলেন না, ইন্দিরার যুক্তি দেখিয়েছেন এই সব মজলিসে অনেক নির্লজ্জ ব্যাপার ঘটিয়া থাকে, তাই তিনি সেখানে গেলেন না বাইরে রয়ে গেলেন, সেখান থেকে মধ্যে মধ্যে উঁকি মারতে লাগলেন।

ইন্দিরার  বাসরে রসঘন বর্ণনার বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন নাই। সেই বাসরে প্রথামাফিক নাচের জন্য পীড়াপীড়ি করা হলেও শেষ পর্যন্ত নাচের দায় এড়ানো গিয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরার স্বামী গানের জন্য ধরা পড়লেন। মজলিস থেকে হুকুম হলো উপেন বাবুকে অর্থাৎ ইন্দিরার স্বামীকে গাইতে হবে। উপেন বাবু পশ্চিমাঞ্চলে রীতিমতো তালিম নিয়ে গানবাজনা শিখেছিলেন— তিনি উত্তর ভারতীয় খেয়াল পরিবেশন করলেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতে মজলিসের অপ্সরাগণ খুশি হলেন না, তাদের ফরমাশ হলো বদন অধিকারী কি দাশুরায় গাইতে হবে। উপেন বাবু এ ধরনের সংগীতে অপটু— সুতরাং মজলিসের তারকারা আদৌ সন্তুষ্ট হলেন না— অধিক রাত্রিতে বাসরের অতিথিরা বিদায় নিলেন।

বঙ্কিম নিজেই ইন্দিরা উপন্যাসে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি এই বিবাহ বাসরের পরিচ্ছদটি না লিখিলেও পারিতেন। এ দেশের গ্রাম্য স্ত্রীলোকদের জীবনের এই ভাগটুকু এখন লোপ পাইয়াছে, যদি লোপ পেয়ে থাকে, তো ভালোই হয়েছে কেননা এর সঙ্গে অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা, কদাচিৎ বা দুর্নীতি অনিয়ম মিশিত। কিন্তু পরিশেষে তার মন্তব্য ‘যাহা লোপ পাইয়াছে, তাহার একটি চিত্র দিবার বাসনায় এই পরিচ্ছদটা লিখিলাম।’

বঙ্কিমচন্দ্র তার ইন্দ্রিরা উপন্যাসে যথেষ্ট হাসির খোরাক সরবরাহ করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রের মুখে প্রচুর হাসিতং দুনিতং ও নাচিতং ইত্যাদি শব্দের দক্ষ মিশেল দিয়ে মজার আবহ তৈরি করেছেন। তবে বাসরের দু-একটি গান উপহার দিলে আমোদের চূড়ান্ত হতো। বঙ্কিম দু’দুবার দার পরিগ্রহ করেছিলেন, সুতরাং বাসরের আমোদ ও গান বাজনার সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। সম্ভবত স্থূল রসিকতা তার স্বভাববিরুদ্ধ বলেই বাসরঘরের মোটা দাগের ইঙ্গিতপূর্ণ গানের অবতারণা থেকে বিরত হয়েছেন।

সে আমলে বাসরঘরে বর বসার একটু পরেই হুকুম হতো বরকে গান গাইতে হবে। বর যতক্ষণ না গান ধরত, ততক্ষণ তাহার ওপর জুলুম চলিত। বাসরঘরে সমবেত মহিলারা অনেক সময় বরের সঙ্গে এমন উত্কট রসিকতা করতেন যে, বরের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হতো। পানের ভেতর অত্যধিক পরিমাণে চুন বা লংকাবীজ দিয়ে বরকে খেতে দেয়া হতো। শোনা যায়— সেই রেলগাড়িবিহীন দিনে এক বর সুদূর পাড়াগাঁয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিল, বাসরে তার গরম লাগায় সে এক খানা পাখা চাহিয়াছিল। তাহা শুনিয়া সমাগত নারীরা বলে, আমাদের দেশে গরম বোধ হলে লেপ গায়ে দিতে হয়। এই বলে একখানা লেপ বরের উপর চাপা দিয়া তাকে এমন চেপে ধরেছিল যে, তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এই কাহিনী অতিরঞ্জিত হতে পারে, কিন্তু সেকালে গ্রামের অশিক্ষিত রমণী সমাজে রসিকতাজ্ঞান কী রকম ছিল, তা এ গল্প হতে অনুমান করা যেতে পারে।

দুই.

বাসরের গান

বাসরের আর সব আমোদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও বাসরের গান কিন্তু আজও টিকে আছে। যদিও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই গানের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। সেকালে বাসরে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল সে যুগের খেউর আর টপ্পা গানের। ১২৭০ সনের ১৫ অগ্রহায়ণের ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এই গানের সমালোচনা করা হয়েছে, কারণ ‘বাসরঘর হইতে অনেকের ভদ্রনীতি শিক্ষার বিঘ্ন উপস্থিত হয়। বাসরঘরে গান ও শ্লোক পাঠ করিতে হইবে বলিয়া অনেকে বাল্য অবস্থায় অশ্লীল গানাদি শিক্ষা করে।’

১২৭০-এর সোমপ্রকাশ আরো উল্লেখ করছে ১২৭০ সনে জনৈক ‘বশম্বদ দোজবর’কে বাসরে গান গাইতে অনুরোধ করা হয়। প্রথমে তিনি একটি ব্রাহ্ম সংগীত শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক হতে ‘চুপ চুপ’ রব ওঠে এবং কানমলা চলতে থাকে। এর পর তিনি কী গান গাইলেন, তার জবানিতেই শোনা যাক। ‘আমি তত্ক্ষণাৎ একটি রামপ্রসাদী পদ ধরিলাম। সেবারও প্রশংসা পাইলাম না। শেষে হতাশ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কী প্রকার গান গাইতে হবে? ইহা শুনিয়া দশ যুবতী বলিয়া উঠিলেন টপ্পা, খেয়াল, একজন হরি ঠাকুরের খেউর শুনিতে চাহিলেন। আমার মাথা ঘুরিয়া গেল। অনেক চেষ্টায় দুই চারিটি ভদ্র গোছের টপ্পা ও খেয়াল গাইলাম। কিন্তু স্নানযাত্রার খেয়াল ও হরি ঠাকুরের খেউড় আমা হইতে হইল না। অমনি ‘দুর বোকা’ ‘অরসিক’ বলিয়া ধ্বনি উঠিল। (সোমপ্রকাশ ১৫ অগ্রহায়ণ ১২৭০, ২১ ও ২২ পৃষ্ঠা।)

সেকালে দিদিমা-ঠাকুরমারা বাসরঘরে কথায় কথায় ছড়া কাটতেন। মেয়েরা অবশ্য বর ও বরযাত্রী ঠকাতে হেঁয়ালি ও ধাঁধা মুখস্থ করে রাখতেন। এটা অবশ্য হিন্দু-মুসলিম উভয়ই সমাজে প্রচলিত ছিল। মেয়েরা হয়তো নতুন জামাইকে বলত, “বারো মাস বয়স তার তেরো মাস কালে/ গণ্ডা গণ্ডা প্রসব করে আগণন ছেলে— বলুন দেখি কী?” উত্তর দেয়ার আগেই চিমটি বা চড়চাপড় মেরে বলত, ‘কলাগাছ— জানেন না’? এমনি করেই বাসর জমিয়ে রাখা হতো। হেঁয়ালি, ধাঁধা যদিও কিছু সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাসর ছড়া সম্ভবত আজ পর্যন্ত সংগৃহীত হয়নি। মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাই বলেছেন, ‘পাড়ার এক একটা বুড়ি বড় ছড়া কাটাতে পারিত— সেই সব ছড়ার কবিত্বশক্তি ছিল— যদি কেহ এই বাসরঘরে ছড়া সংগ্রহ করিতে পারেন, তাহা হইলে বুঝিতে পারিবেন যে, বঙ্গ সাহিত্যের কি রূপ উন্নতি হইয়াছিল।’

উল্লেখ্য, পুরনো বাংলা সাহিত্যে বাসরঘরের নাম পাওয়া যায় ‘কৌতুক গৃহ’ বলে— নামেই বোঝা যায় সব।

ছাঁদনাতলা আর বাসরঘরে নতুন বর-বধূকে নিয়ে যারা তামাশায় মেতে উঠতেন, তাদের আগে থাকতেন ঠাকুমা-দিদিমা, শালি, শালাবউরা। প্রতিবেশিনী-কুটুম্বিনীরা পিছিয়ে থাকতেন না। তবে শ্বশুর-শাশুড়ি, মা-বাবা বা অন্য গুরুজনরা এই তামাশায় অংশ নিতেন না। শুধু যাদের সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরার সম্পর্ক, তারাই এই বাসরের প্রধান কুশীলব হতেন।

‘অপরাজিতা’ রাধারানী দেবীর কবিতায় সেকালের বাসরঘরের রঙ্গরসের বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে। কৌতূহলী দাদু বাসরঘরের মেয়েদের ভিড়ে লুকিয়েছেন কিন্তু তার গিন্নীর তীক্ষদৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে ব্যর্থ হলেন। গিন্নী শাসনের সুরে বলছেন, পুরুষ মানুষ হয়ে তুমি বাসরে মেয়েদের ভিড়ে ঢুকে বসে আছো। এর পর তিনি মেয়েদের ডেকে দাদুর গোঁফজোড়া ছিঁড়ে দিতে হুকুম দিলেন। এমন আনন্দ কৌতুক ঝরনার মতো ছড়িয়ে পড়ত সেকালের বাসরঘরে।

ব্রাহ্ম ধর্মমত অনুসারে, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিবাহাদি অনুষ্ঠানে পৌত্তলিকতার অংশগুলো উঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী আচার, ছাঁদনাতলা, বাসরঘর ইত্যাদি প্রথা অটুট রেখেছিলেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের বিয়েতেও বাসরঘর, স্ত্রী আচার ইত্যাদি পালন করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের বাসরের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। তার বিয়ে হয়েছিল জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাড়িতেই, তিনি বিয়ে করতে যশোর-খুলনায় কনের বাড়িতে পদার্পণ করেননি। তাই বিয়ের বাসর হয়েছিল কলকাতায় নিজ বাড়িতে। পরিবারিক শালটি গায়ে দিয়ে নিজের বাড়ির পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে বাড়ির এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হেঁটে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে গেলেন। তাই বাসরঘরে রবীন্দ্রনাথ দিব্যি সপ্রতিভ ছিলেন। সেই বাসরের কথা লিখে গেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্রবধূ— হেমলতা ঠাকুর। তার ভাষায় বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুড় করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। ছোট কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরীর বকুনির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘জানো না কাকিমা, সব যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে— কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উল্টে দিচ্ছি।’ ‘রবীন্দ্রনাথ সব যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে’— সে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বা হেমলতা ঠাকুর কোনো আলোকপাত করেননি। তিনি ভাঁড়গুলোই বা কেন উল্টে দিচ্ছেন, তারও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তারপর গান গাইবার অনুরোধ শুনে ১১ বছরের নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ গান ধরলেন ‘আ মরি লাবণ্যময়ী।’

রবীন্দ্রনাথের মেয়ে মীরা দেবী ও নগেন্দ্রনাথের বিবাহ অনুষ্ঠানের এবং কৌতুকাবহ বিবরণ আছে রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতার একটি চিঠিতে (পত্রাবলি শারদীয়া দেশ ১৪০১)। চিঠিখানি আমেরিকায় পাঠরত কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা।

বিয়ের সময় নগেন্দ্রনাথের বয়স ১৭ বছর ৭ মাস। কনের বাড়িতেই গায়ে হলুদের বন্দোবস্ত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মাধুরীলতা তার ভাইকে চিঠিতে লিখেছেন যে, বরকে দোরস্ত রাখবার জন্য অনেকগুলি কর্ণমর্দন তাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দিতে হয়েছিল। ‘ফল হল হলুদে তাকে চুবিয়েছিল নগেন্দ্রনাথ, বড় বৌঠানও বাদ যাননি।’ বরকেই হলুদ দেয়ার প্রথা, বরকে শালি-শালারা হলুদ দেয়— এ প্রথা মাধুরীলতা কখনো দেখেনি, শোনেওনি বলে অনুযোগ করেছিলেন। মাধুরীলতা লিখেছেন, ‘নগেন্দ্র ল্যাজটি আসবার সময় বাড়ী রেখে এসেছিল বটে কিন্তু ব্যবহার সঙ্গে এনেছিল কাজে লাফানি কাঁপানি করতে কোনো রকম কসুর করেনি।’

এর পর বরকনেকে সাজিয়ে বরণের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। বরের বরণের কাহিনী মাধুরীলতা লিখেছিলেন এমনি ভাষায়, ‘বরের বরণের কথা শোন। ছটফট করে তো বরণের সময় বড় বৌঠানকে পাগল করে তুললে যদিওবা কোন রকমে শেষ হতে যেই মাথায় টোপর পড়াতে যাচ্ছি অমনি হাত থেকে টোপরখানা কেড়ে নিয়ে দুখানা করে ছিঁড়ে ফেলে দিলে। সে সময় কি বলব রথী! ঠাট্টা নয় বরের অসভ্যতায় আমাদের পর্যন্ত লজ্জাবোধ হয়েছিল। সব কাজেরই সীমা আছে কিন্তু নগেন্দ্রর বেহায়াপনার সীমা নেই। বরকে এমন সংয়ের মতো ব্যবহার করতে আমার বয়সে কখনো দেখিনি।’

সপ্তপদী শেষ করে মাধুরীলতা এবার বরকনের বাসরের কথা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, তার ভাষায়, বাসরের যা কাজ ফুলের মালা বদল, আতর মাখানো, পান সন্দেশ খাওয়ানো সেসবও যেন একটা আজগুবি কাণ্ড হলো। বর-মালাটা ছুড়ে কোন গতিকে কনের গলায় পরিয়ে দিয়ে সন্দেশ খাওয়াবে বলে মীরা দেবীর ‘গলা এক হাতে চেপে ধরে এক হ্যাচকা দিয়ে ওর মুখ সোজা করে নাকে দিলে না মুখে দিলে তার ঠিক নেই।’ এসেন্স মীরা দেবী অর্থাৎ কনের গায়ে হুড়হুড় করে খানিক ঢেলে পড়ে মাধুরীলতা ও অন্যদের গায়ে দিলে। মাধুরীলতার নিজের বর্ণনাই এবার শোনা যাক, ‘ঢিপ ২ করে— বড় বৌঠান ও আমাকে প্রণাম করেলে আর সেই সঙ্গে এমন পা কামড়ে দিলে যে জলুনি দুদিন ধরে গেল না।’ এর পরই তিনি একটি মোক্ষম মন্তব্য করেছেন নগেন্দ্রনাথ সম্পর্কে— ‘ওর সব ঠাট্টাই সাংঘাতিক রকমের— নগেনের কামড়ানো রোগ বিলক্ষণ আছে।’ বাসি বিয়ে বা ফুলশয্যায় কিছুই হয়নি।

পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়, যিনি এই চিঠি সংকলন করেছেন, তার অভিমত— এই চিঠিখানিতে মীরা-নগেন্দ্রর ভবিষ্যতের বিষাদিত সংসারজীবনের পূর্বাভাস মেলে।

সেকালের বাসরঘরে অনেক বিখ্যাত জামাই পর্যন্ত অল্পবিস্তর নাকাল হতেন অন্তঃপুরিকাদের হাতে। কমবয়সী শ্যালকদের তাতে যোগসাজশ থাকত। ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরী তার দুই শ্যালকের বৈজ্ঞানিক কারিগরিতে যথেষ্ট বিব্রত হয়েছিলেন। হেমেন্দ্রনাথের বড় মেয়ে প্রতিভার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। সরলাদেবীর লেখায় জানা যায়, প্রতিভার ছোট দুই ভাই ব্যারিস্টার সাহেবের বিয়েবাসরে মসলন্দের তলায় বিজলির তার পেতে তাকে চমক দিয়ে দিয়ে অস্থির করে তুলেছিল। নতুন জামাই স্থির হয়ে বসতেই পারছেন না। শালীর বরের বিপত্তিতে হেসে হেসে অস্থির।

কবি অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরীর লেখিকা স্ত্রী শরত্কুমারী সেকালে বাসরঘরের আরেক ধরনের চিত্র তুলে ধরেছেন— এটি অবশ্যই ইতিবাচক। সেকালের এমএ, বিএ পাস পাত্ররা চাইতেন পাত্রীরা কিছুটা শিক্ষিত হোক। কনে অশিক্ষিত দেখে বর বাসরঘরে শালী-শালাদের কনেকে লেখাপড়া শেখাতে অনুরোধ জানাতেন। কনেকে লেখাপড়া শেখাতে বরের আগ্রহ প্রশংসনীয়। তবে অচিরেই দেখা গেল কনের প্রথমভাগ শেষ না হতেই প্রেমপত্র এসে যায় কনের হাতে।

বাসরঘরের সঙ্গে জড়িয়েছিল আরো একটি প্রথা সেজ তোলানি বা শয্যাতোলানি। বাসররাত ভোর হলে বাসরজাগানি মেয়েরা বরের কাছে নানা ধরনের মধুর দাবি বাখত। শয্যাতোলানির দরুন বরের বাপের কাছ হইতে পাড়ার মেয়েরা টাকা পাইত। লিখেছেন কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথার লেখক মহেন্দ্রনাথ দত্ত। শয্যাতোলানি না দিলে বরকে যেতে দিন না। এই ছিল পাড়ার মেয়েদের আমোদ। ৮ টাকা হোক ১০ টাকা হোক— পাড়ার মেয়েরা এটা ভারি আনন্দ করে হাতে নিত। শহর, পাড়াগাঁ— প্রায় সব জায়গায় এই শয্যাতোলানি প্রথা চালু ছিল।

এতক্ষণ যেসব বাসরের গল্প বলা হলো, তার অধিকাংশ শহর বা নগরের উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী। তবে গ্রামীণ অঞ্চলে বিয়ের আসর বা বাসরের রীতিনীতিতে তেমন ফারাক ছিল না। হিন্দু-মুসলিম উভয় পরিবারেই বাসররাতে আড়ি পাতা, জামাই ঠকানো, হেঁয়ালি ছড়ার প্রতিযোগিতা এসব ছিল সাধারণ আমোদের অংশ। হিন্দু-মুসলিম উভয় পরিবারের অভিভাবকরা নজর রাখতেন যাতে আমোদ-প্রমোদের সীমা শালীনতা বা লোকাচার বা সুস্থ সামাজিকতার বেড়া ডিঙিয়ে না যায়। রক্ষণশীল সমাজের লঙ্ঘনরেখা যেন অতিক্রান্ত না হয়। উপরের বর্ণনায় শহুরে পরিবারের বিয়েই বেশি। কিন্তু এর মধ্যে গ্রামীণ বিয়ের কাহিনীও লুকিয়ে রয়েছে। যেমন শিবনাথ শাস্ত্রী বিয়ে করতে গিয়েছিলেন প্রায় ১৩৩/১৩৪ বছর আগে রাজপুর গ্রামে। শিবনাথ শাস্ত্রী কানে মাকড়ি ও দুল পরে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। প্রায় কাছাকাছি সময়েই রাজপুর গ্রাম থেকে পাইকন গ্রামে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন ১১ বছরের বর গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

এই বাসর কাহিনীও ব্যতিক্রমধর্মী এবং মানবিকতার ছোঁয়ায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। তার বাসরঘরে বিশেষ উত্পাত হয় নাই। তিনি লিখেছেন, ‘অধিক রাত্রে যখন বাসরগৃহে শয়ন করিলাম একটি ক্ষুদ্র শালী মাত্র পার্শ্বে শয়ন করিল। সেও ঘুমাইল, আমার স্ত্রীও ঘুমাইল।’ ঘুমছিল না ১১ বছরের বরটির চোখে সদ্য স্বামীপুত্র হারা শাশুড়িকে তিনি বিস্তর উপদেশ ও সান্ত্বনা দিলেন সারা রাত।

নিজের বিয়ের বিশদ বর্ণনা লিখে গেছেন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মতো হেমেন্দ্রনাথ বাসরে উপস্থিত মহিলাদের সঙ্গে বাদ রসিকতা না করে গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তার বাড়ির মেয়েরা সকলেই যে লেখাপড়া করেন, এ কথা জেনে বাসরের নারীরা সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন।

পল্লী গ্রামে সেকালের গৃহস্থ বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে পালকি করে বর নিয়ে যেতেন। আবার পালকি করে বধূ উঠিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতেন। শিবনাথ শাস্ত্রী বারো তেরো বছরে পালকি করে বাবপুর গ্রামে প্রসন্নময়ীকে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন সঙ্গে বাজনা ও আলোর ব্যবস্থা ছিল। প্রসন্নময়ীকে পালকি করে শিবনাথ নিজের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। পূর্ব বাংলার বর আসত নৌকা বা বজরা করে। সোনাবঙ্গ গ্রামের মেয়ে মানদা শৈশব কথায় লিখেছেন, কেমন বিরাট বজরা করে গ্রামের রাজপরিবারের ১৩ বছরের বর এসেছিলেন তার তিনি বিয়েতে এবার গ্রামের বিয়ের আসর ও বাসর সাজানোর কথা মানদা কেমন লিখেছেন দেখা যাক।

তার দিদির বিয়ের সময় মস্ত বড় কারুকার্যময় বিরাট সামিয়ানা টাঙ্গানো হইল। বিবাহের বাসর ঝাড় লণ্ঠন ইত্যাদিতে অপরূপ শ্রী ধারণ করিল। মানদাদেবীর বাল্যস্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে তার দিদির শ্বশুরবাড়ি যাত্রার কথা, ‘বিরাট বজরা বিরাট শোভাযাত্রার সঙ্গে বর-কন্যা লইয়া  ময়ূরপঙ্খী নায়ের মতো চড়িল তার গন্তব্যপথে’

কল্যাণী দত্ত বেশ কয়েকটি বাসরঘরের গান সংগ্রহ করে আমাদের উপকৃত করেছেন। তার সংগৃহীত একটি হলো— দেবীর কাছে নতুন বরের আকুল আবেদন এই মর্মে যেন এই বাসরঘরের ‘ভুজঙ্গ’ নারীদের কাছে তার মান বজায় থাকে। গানের কথাগুলো একদম— এ বাসরে রেখ আমার মান/ আমি যেন নারীর কাছে হইনে অপমান/ বেষ্টিত ভুজঙ্গ নারী, বসেছে সব সারি সারি/ দেখ মম বিষহরি উড়ে গেছে প্রাণ। গানটির বয়স কল্যাণী দত্তের মতে, কমপক্ষে ১২৫ বছর। তিনি বিগত শতকের তিরিশ দশকের স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত আরেকটি বাসরের গান আমাদের উপহার দিয়েছেন। গানটি হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাসরে গাওয়া হতো—

নেচে নেচে বল সখি— বন্দে মাতরম।

বাসরঘর ধন্য হবে

এয়োকুলের পুণ্য হবে

জননী ভগিনী বল— বন্দে মাতরম।

এর পরে গানের মুখ্য উদ্দেশ্য নিবেদিত হয়েছে এমনই ভাষায়—

বিলাতি মাল কেনে দিব/ ঢাকাই শাঁখা কিনে দিব

গুলবাহারি শাড়ি পরি— হইবে সুন্দরম।

যুগলমিলনে আজি হইবে— মঙ্গলম।

স্বদেশীয়ানা যে ততদিনে বাসরঘরেও ঠাঁই করে নিয়েছে, এই গানটি তার বড় প্রমাণ। রচয়িতার নাম জানাননি কল্যাণী দত্ত।

হালকা চালের গানও রয়েছে বাসরের উপযোগী পরিবেশের জন্য।

তপসে মাছ টাকায় কুড়ি/ বড় সস্তা দরে যায় গো/ রসের খাজা জিভে গজা, বড় বাবু নাও গো।

আগেই বলা হয়েছে, সেকেলে বাসরে খেউড়, টপ্পা গানের সমাদর ছিল। ১২৭০ সনের ১৫ অগ্রহায়ণের ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদীয় স্তম্ভে এই গানের সমালোচনা করা হয়েছে কারণ, বাসরঘর হইবে অনেকের ভদ্র নীতি শিক্ষার বিঘ্ন উপস্থিত হয়। বাসরঘরে গান ও শ্লোক পাঠ করিতে হইবে বলিয়া অনেকে বাল্য অশ্লীল গানা করে।

ঐ সনে জনৈক দোজবরকে বাসরে গান গাইতে বলা হয়। প্রথমে তিনি একটি ভদ্র গোছের সংগীত শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ‘চুপ চুপ’ ধ্বনি ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে কানমলাও চলতে লাগল। এর পর তিনি কী গাইলেন তার মুখেই শুনুন, ‘আমি তত্ক্ষণাৎ একটি রামপ্রসাদী পদ ধরিলাম। সেবারও প্রশংসা পাইলাম না। শেষে হতাশ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কী প্রকার গীত আবশ্যক? ইহা শুনিয়া দশ যুবতী বলিয়া উঠিলেন— টপ্পা, খেয়াল; একজন হরি ঠাকুরের খেউড় শুনিতে চাইলেন, আমার মাথা ঘুরিয়া গেল। অনেক চেষ্টায় দুই-চারিটি ভদ্র রকমের টপ্পা ও একটি হিন্দুস্থানি খেয়াল গাইলাম। কিন্তু স্নানযাত্রার গান ও হরি ঠাকুরের খেউড় আমা হইতে হইয়া উঠিল না। অমনি দুর বোকা, অরসিক বলিয়া ধ্বনি উঠিল।’ (সোমপ্রকাশ ’১৬, অগ্রহায়ণ ১২৭০)

এখানে একটি কথা বলা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বরের সঙ্গে ইয়ারকি সম্পর্ক যাদের, তাদেরই বাসরঘরে থাকার কথা। কিন্তু সে আমলে তা হতো না, হিন্দু বিবাহ বাসরে তিন বছরের বালিকা থেকে দন্তহীন অশীতিবর্ষ পর্যন্ত দেখা যেত। আবালবৃদ্ধ সবাইকে এক করে দেয়ার জন্য সেকালে বাসরঘরকে জগন্নাথ ক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, ‘জগন্নাথ ক্ষেত্রে যেমন ব্রাহ্মণ ও শূদ্র বিবেচনা নাই, এখনকার বাসর গৃহেও সেইরূপ সমন্ধ বিচার থাকে না। বরের সহিত যাহাদের ঠাট্টার সম্পর্ক নয়, তাহারা ঠাট্টার সম্বন্ধের পরিচয় দিয়া আমোদ-প্রমোদে প্রবৃত্ত হন। অশ্লীল সংগীত, পরিহাস ও শ্লোকাদি পঠিত হইয়া থাকে। (সোমপ্রকাশ ৩০ নভেম্বর, ১৮৬৩)

[মুসলিম সমাজে বাসর প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হয় জামাইবাড়িতে।] বিয়ের গীত গাওয়া মেয়ের দলের প্রধান হচ্ছেন মেরাসীন। বিয়েবাড়ির কর্তা এদের গান করার জন্য নিমন্ত্রণ করেন। মুসলিম বিয়েতে কনের বাড়িতে শুভদৃষ্টির সময় বর বধূকে মিষ্টি খেতে দেয়। এ সময়ে শুরু হয় বর নির্যাতন। মৃদু কানমলা, নরম কিল, চিমটি মারার ভয় দেখানো প্রভৃতি শুরু হয়। বাসরঘরে আড়ি পাতা হয়, জামাই ঠকানোর জন্য সব রকম প্রচলিত ব্যবস্থারই অনুকরণ করা হয়ে থাকে।

বিয়ের গীতের বাহক যে ‘মেরাসীন’ বা মূল গায়িকা তাদের অধিকাংশ নিরক্ষর, সুতরাং এ গানগুলো সবদিক দিয়েই মৌখিক সৃষ্টি। বিয়ের গানগুলো মেয়েলি ভাষায় রচিত। এ ভাষাটি রক্ষণশীল। ধর্মীয় রীতিনীতি, খাদ্যাদির ইসলামীয় ঐতিহ্যবাহক শব্দগুলো এখানে অবৃিকতভাবে ব্যবহূত হয়েছে।

নিচে বধর্মানের মুসলিম সমাজের কয়েকটি বাসরের গীত (শক্তিনাথ ঝা এর সৌজন্যে)  সংকলিত দেয়া হলো—

‘কালিয়া মেঘে কাটাবিয়া সিঁদুরে মেঘে জল

জলদি জলদি চালাও গাড়োয়ান ভাই।

মায়ের সুয়ারী (মায়ের মেয়ে/বধূ) ভিজনো ভাই

ভিজুক মায়ের সুয়ারী

ঠাণ্ডা বাসর ঘরে শুকায়ে যাই।’

আবার বাসরে গাওয়া হয় এমন গান, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে দাদাদের (জামাইয়ের) জীবনে মা-বোনকে সরিয়ে বধূ প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে—

‘সারা রাতি এনে হে দামাদ নিহরে নিহরে (শিশির)

ভোররাতি এনে হে দামাদ তির ঘামন ঘেমে (তীব্র ঘাম)

কে বা আছে আছে রে দামাদের এ দামাদে মা

সেনা এনে মুছাবে রে দামাদের সোনামুখের ঘাম।’

দুবার গাওয়া হবে উপরের পঙিক্ত। এর পর গাওয়া হয়—

‘আর বাসরে যে বসিয়েছি আমরা রসের কামিনী

সেনা এলে মুছাবে কে দামাদের সোনামুখের ঘাম।’

বিয়ে নয়ে বাঙালি মুসলিমসমাজে অজস্র ছড়া-গীত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অন্দরের নারী মহলে প্রচলিত রয়েছে, ছড়া-গীত— বর্ধমাান মুসলিম সমাজে। তার মধ্যে কন্যাবিদায়ের সময় বিয়ের ভোজে অনুপস্থিত বরের মায়ের জন্য ভোজের সেরা খাদ্যদ্রব্য বেশ যথেষ্ট পরিমাণে কন্যার সঙ্গে বরের মায়ের সামনে হাজির করার রেওয়াজ আছে বর্ধমানে,  একে ‘হাজরি’ বলা হয়। সেখানকার মুসলিম পরিবারে এই রীতিটি আবশ্যিকভাবে মানা হয়, এমন একটি হাজরি গান নিচে দেয়া হলো। সৌজন্যে- রত্নারশীদ, বর্ধমান।

‘হাজরি যাবে বিয়ান বাড়ী লুচি গোস্ বিরিনী (বিরিয়ানি)

সবে আয় সবে আয়

পথ ছাড় দেখিনি

দই আসছে টলোমলো

দই এর পর মিঠাপানী

সবে আয় সবে আয়

ভাবের গোয়ালানী।’

সব সমাজের মতো মুসলিম সমাজেও জামাইকে বিশেষভাবে যত্ন করে। বর্ধমান সমাজের জামাই আদরের এমন একটি ছড়া উল্লেখ করা যেতে পারে— 

‘জামাই এলো জামাই এলো/ জামাই জানের জান/ তার জন্য গড়ে রেখেছি পুন্নিমারের চাঁদ/ বসতে দেবো ফুলের সুজনী (ফুলতোলা নক্সিকাঁথা)/ নক্সা পাখার হাওয়া কাসার বদনায় পানি/ দুকে চিনির বাসনে খাওয়া। (চীনেমাটির বড় রঙিন প্লেট)। নাস্তায় দেব কলজে ভুনা-ঘিয়ে ভাজা পরটা/ ঠিক দুপ্পুর বারোটায়।’

তবে সব বাসরেই উত্কট নাচগানে ভেসে যেত না, তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ইন্দিরা দেবীর স্মৃতিচারণে— দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক পৌত্রীর অভিনব  বাসরের কাহিনীতে। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন, ‘আমার পিসতুতো বোন সুপ্রভা দিদির বিবাহের সময়ে মনে পড়ে— পুজোর দালান থেকে বরকনে দোতলার বাসরে পৌঁছবার আগেই কনের হল ফিট। তখন বাড়িতে কি জানি কেন হিস্টিরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। আমি আর ঊষারানী (দ্বিজেন্দ্রনাথের মেয়ে) কোন রকমে সেই মূর্ছিত কনেকে দুদিক থেকে ধরে অতিকষ্টে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালার বাসরঘরে এনে ফেললুম। সেখানে কনে মসলন্দে অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে রইলেন। পাশে বর সুকুমার হালদার হতভম্ব হয়ে বসে কী মনে করছিলেন, তা তিনিই জানেন। এই বাসরে বাড়ির মেয়ে বউরা অবশ্য আনন্দ করতে ছাড়েননি, তার সবাই মিলে স্বর্ণ কুমারী দেবীর ‘বিবাহ বিভ্রাট’ প্রহসন অভিনয় করেছিলেন।’

নিজের বিয়ের বাসরের কথা লিখেছেন ইন্দিরা দেবী। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। ইন্দিরা বালিগঞ্জ থেকে জোড়াসাঁকো যাওয়ার পথে বার গেট কোম্পানির দোকান থেকে মাথার তেল কিনে নিয়ে গেছিলেন। বর যখন এল তখন সবার মনে হলো, রোজ যেমন আসেন আসছেন, তেমন বিশেষ সমাদর করে নামতে ভুলে গেছিল সবাই।

ইন্দিরার আসন হয়ে বসে থাকতে থাকতে পাইজোরে পা লেগেছিল মনে আছে— ‘উপরে গিয়ে বাসরঘরে (বাড়ির ভেতরে দ্বিপ দাদার ঘরে) কি রকম কৌতুকখেলা বা ঠাট্টা তামাশা হলো, ভালো করে মনে নেই।’ তবে মামুলি ল্যাজ নিশ্চয় কেউ করে থাকবে— আড়ি পাতাও হয়েছিল— লিখেছেন ইন্দিরা।

এবার বিগত শতকের প্রথম দিকে ঢাকার ইডেন স্কুলে পড়া ১৪ বছরের কনা শ্রীমতি শোভা ঘোষের আত্মজীবনী আজও তারা পিছু ডাকে। বরিশালের গাভায় তার অধ্যাপক স্বামীর সঙ্গে বিবাহের আসর ও বাসরের কথা বিধৃত আছে— স্টিমার ঘাট থেকে নেমে শ্বশুরবাড়ির প্রাঙ্গণে এসে একটি চিকন পাটির উপর বরবধূ বসলেন। ‘এ দেশের প্রথা অনুসারে চাউল, কড়ি ইত্যাদি খেলা শুরু হইল। বর ও বধূকে বরণ করা হল এবং সকলেই নতুন বধূ দেখিতে গেলেন... কতক্ষণ ওইভাবে বসিয়া ছিলাম, মনে নাই। আমাকে অতঃপর কোন কোন মেয়েরা যেন জামা, কাপড়, গহনা ইত্যাদি খুলিতে সাহায্য করিল এবং একটি খাটের উপর বসাইয়া দিল। একজন মহিলা আসিয়া বলিল, এই গরমে অনেক কষ্ট গেছে, তুমি শুয়ে পড়। এমনিতেই আমি নিদ্রালু হইয়া পড়িয়াছিলাম। সেই যে ঘুমাইয়া পড়িলাম আর উঠিলাম পরদিন সকালে। ভোর হইয়া গিয়েছে দেখি— ধীরে ধীরে মাথার কাপড়টা একটু বেশী করিয়া টানিয়া নিঃশব্দে দরজা খুলিলাম, কারণ দেখিলাম অধ্যাপক মহাশয় এখনও গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন।’

এর পর গুরুজনদের প্রণাম শেষ করে আম দুধ খৈ মুড়ি এবং বাপের বাড়ী হতে পাঠানো ঢাকাই মিষ্টি দিয়ে সকলের প্রাতরাশ করা হলো। এই সময় একজন বয়স্কা মহিলা আসিয়া উপস্থিত হইলেন কনের খাওয়ার তদারকি করতে। তিনি বরিশালের ভাষায় বললেন, ‘দ্যাহো (দেখো) এই মুড়ি চিড়াই খাইতে অইব, লুচি পুরী জোটবে না।’ শোভা ঘোষ লিখেছেন— এই কথাটি শুনে তার এত মজা লেগেছিল যে, অনেক বয়স পর্যন্ত তিনি এই কথাটি ভুলতে পারেননি। পরবর্তীতে তার ছেলেমেয়েরাও এই গল্প শুনে খুব মজা পেয়েছিল। তার ছেলেরা তাদের বউদের এবং জামাইরা তাদের কন্যাদের কপট শাসন করে বলতোু— দ্যাখো, লুচি পুরী জোটবে না, এই দিয়াই চালাইতে অইবে।

আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখন দেশীয় মেয়েরা অন্দরমহলে বন্দি ছিলেন— শ্বশুর, ভাসুর, গুরুজনদের ভয়ে তারা জড়সড় হয়ে থাকতেন। দুটি সময়ে কিছুটা স্বাধীনতা তাদের জুটত— এক. গর্ভধারণ কাল, দুই. বিবাহ বাসর। হঠাৎ মুক্তির উল্লাস, তাদের খোলাঠাট্টা মশকরা সমাজের অনেকের ভালো লাগেনি। সোমপ্রকাশ এ নিয়ে সম্পাদকীয়ও লিখেছিল এই বলে— ‘এই কি স্ত্রী জাতির অপ্রগলভতা? এই বিনয় নম্রতা? তবে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে বাসরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিবাহের গান বা বাসর গীত যা-ই বলি না কেন মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু শিল্পীর সৃষ্টিতে বড় উজ্জ্বল হয়ে আছে বাঙালি পরিবারে কন্যাবিদায়ের করুণ গান। মঙ্গলকাব্যে আলাওলের পদ্মাবতীতে কন্যাবিদায়ের মর্মান্তিক দুঃখে আতুর পিতা-মাতার ছবি বারবার পুরো কাব্যের পটভূমিকে অশ্রুসিক্ত করে তুলেছে।’

এই বেদনাকে রবীন্দ্রনাথ তার অসাধারণ বিশ্লেষণে বলে গেছেন— ‘একান্নবর্তী পরিবারে আমরা দূর ও নিকট এমনকি নামমাত্র আত্মীয়কেও বাঁধিয়া রাখিতে চাই— কেন কন্যাকেই ফেলিয়া দিতে হয়— আমাদের। মিলনধর্মী পরিবারে এই একমাত্র বিচ্ছেদ।’

ফরিদপুর থেকে সংগৃহীত একটি গানে পতিগৃহযাত্রী কন্যার জন্য মায়ের কান্না দেখে বালিকা কন্যা বিচলিত হয়ে বলে, ‘চাচীনো, ফুপলো মাকে নে যা ঘরে—

মায়ের কান্দনে আমার ডুলি পাক পাড়ে।’

বাসরের গান হয়তো অতি অল্পদিনের মধ্যেই লুপ্ত হয়ে যাবে। বাসর প্রথার হয়তো ঘটবে আমূল পরিবর্তন। বাসর শব্দটিও হয়তো উঠে গিয়ে রূপান্তরিত হবে মধুচন্দ্রিমা, হানিমুন বা অন্য কোনো নামে। কিন্তু কন্যাবিদায় বেদনা থাকবে চিরদিন। সঙ্গে থেকে যাবে গ্রামে-গঞ্জে নিভৃত পল্লীতে কোনো মায়ের গলায় কন্যাবিদায়ের বিষাদমাখা দু-চারটি করুণ গীত। শেষ বিকালের ম্লান আলোয় বাড়ির পাশে বাঁশ বাগানে একা একা গুনগুন করে ঘুরে বেড়াবে কোন মায়ের সেই বিষণ্ন গীত...।&dquote;&dquote;