আমার জন্ম ইন্টারনেট যুগের বহু বছর আগে, সে যুগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র প্রবন্ধের একটি ‘লাইব্রেরি’ স্কুলপাঠ্য ছিল। সেই লেখাটির প্রথম অনুচ্ছেদটি আমার মতো অনেককেই মুখস্থ রাখতে হয়েছে:

‘মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া ফেলে অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে! হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানব হূদয়ের বন্যা কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে!’

লাইব্রেরির তাকে সাজানো বইয়ের শব্দ বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে রবীন্দ্রনাথের এ আশঙ্কা খ্রিস্টজন্মের আগে থেকেই সত্য হয়ে আসছে। নতুবা আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন গ্রন্থাগার কেন বছরের পর বছর ধরে জ্বলতেই থাকবে!

দুই সহস্র বছর পরও বইপত্রের অগ্ন্যুৎসবের সংস্কৃতিতে এতটুকু পরিবর্তন ঘটেনি। হিটলারের ব্রাউন শার্ট স্টর্ম ট্রুপার্স বাহিনী বইয়ের স্তূপে আগুন দিয়ে মার্চপাস্ট করে আগুনকে সামরিক অভিবাদন জানাল, গাইল নািস সংগীত। তারা বাদ্য বাজিয়ে আগুনের কুণ্ডের ওপর বই ছুড়তে শুরু করল। যাদের বই নিক্ষিপ্ত হলো তাদের মধ্যে রয়েছেন: সিগমুন্ড ফ্রয়েড, আলবার্ট আইনস্টাইন, জন গলসওয়ার্দি, আঁদ্রে জিদ, ম্যাক্সিম গোর্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এরিখ কাস্টনার, হেলেন কেলার, জ্যাক লন্ডন, হাইনেরিখ হাইনে, টমাস মান, কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলস, মার্সেল প্রুস্ত, এরিখ মারিয়া রেমার্ক, এইচজি ওয়েলশ, ফ্রানত্জ কাফকা, ম্যাক্স ব্রড এমন আরো অনেকেই। তারা বই পুড়িয়েছে, লাইব্রেরি পোড়ায়নি। তারা একটি নীতিমালা অনুসরণ করে বই বাছাই করেছে: ইহুদি লেখকদের যেকোনো বই; জার্মান বিশুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ববিরোধী বই; মার্ক্সবাদ, সাম্যবাদ, বলশেভিকবাদ প্রচার ধর্মী বই, জার্মান জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে খাটো করে লিখা কোনো বই; এ ধরনের আরো কিছু শ্রেণীকরণ রয়েছে। নতুন সহস্রাব্দ একবিংশ শতকে এসে বই-বর্বর হিসেবে পরিচিত হয়েছে ২০০৩ সালে বাগদাদের লাইব্রেরিতে আগুন দেয়া আমেরিকান সেনাবাহিনী।

জার্মান কবি হাইনেরিখ হাইনে বলেছেন, যেখানে তারা বই পুড়াতে শুরু করে, শেষ করে মানুষ পুড়িয়ে। এটা জার্মানির জন্য সত্য। হিটলারের ইয়োলো শার্ট স্টর্ম ট্রুপার্স আগুনে বই ছুড়েই শুরু করেছিল, নািস বাহিনী তার উপসংহার টেনেছে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে।

কিন্তু হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী লাইব্রেরিতে আগুন দেয়ার আগেই বাগদাদের অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করেছে। আব্বাসীয় শাসনের শেষ দিকে ত্রয়োদশ শতকে সাম্রাজ্যের সংহতিতে ঘাটতি পড়লেও বাগদাদের লাইব্রেরিগুলোয় বইয়ের ঘাটতি পড়েনি। বাগদাদের রাস্তায় অন্তত ২০০ লাইব্রেরি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। শ্রেষ্ঠতম লাইব্রেরিটির নাম বায়ত আল-হিকমা, জ্ঞানের গৃহ বা হাউজ অব উইজডম। এখানকার বই যখন টাইগ্রিস নদীতে ছুড়ে ফেলা হয়, তখন বইয়ের কালিতে টাইগ্রিসের পানি কালো হয়ে গেল। আরো একটি বর্ণনা রয়েছে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষিপ্ত বই জমা হতে হতে নদীতে এমন একটি সেতুর সৃষ্টি হয়েছিল, যার ওপর দিয়ে একজন অশ্বারোহী অবলীলায় পারাপার হতে পারত।

বায়ত আল-হিকমার একটি অসাধারণ উদ্যোগ ছিল অনুবাদ আন্দোলন। সম্ভবত খলিফা হারুন আল-রশিদের পৃষ্টপোষকতায় শুরু হওয়া এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানগ্রন্থগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করে আগ্রহী জনের মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। প্রায় ১৫০ বছর ধরে সিরিয়ার খ্রিস্টান পণ্ডিতরা এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থেকে গ্রিকভাষার শ্রেষ্ঠ বেশকিছু গ্রন্থ অনুবাদ করেন। সভ্যতার পাদপীঠ গ্রিসের জ্ঞানকে আল-হিকমাতে স্থানান্তরের প্রয়োজন অনুভূত হয়। অ্যারিস্টটলের ‘টপিকস’ গ্রন্থের অনুবাদ দিয়ে জ্ঞান অধিগ্রহণের কাজটা শুরু হয়, খলিফা আল মামুন এ কাজের পরিধি আরো বাড়িয়ে দিলেন। কেবল গ্রিস নয় পৃথিবীর সব অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বইগুলো অনূদিত হতে হবে। ততদিনে আরবিতে অনূদিত হয়েছে: পিথাগোরাস, প্লেটো, হিপ্পোক্র্যাটস, ইউক্লিউ, প্লটিনাস, গ্যালেন, আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, সুশ্রুত। চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, কৃষি, প্রকৌশল, অর্থব্যবস্থাপনাসহ অনেক বিষয়ের বই অন্তর্ভুক্ত হলো। শুধু অনুবাদই নয় বাগদাদের পণ্ডিতরাা গ্রন্থের সমালোচনা লিখলেন, প্রাচীন জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরলেন নতুন বিতর্ক সামনে নিয়ে এলেন।

শুধু অনুবাদ মূল গ্রন্থ নিয়ে এগিয়ে এলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরা। বায়ত আল-হিকমার পরিচালক আল খোয়ারিজমি ‘কিতাব আল জাবের’—এখান থেকেই প্রকাশিত হলো— জ্ঞানের জগতে শুরু হলো নতুন গণিত অ্যালজেব্রা। তিনিই আবির্ভূত হলেন প্রথম মুসলমান ভূগোলবিদ হিসেবে ‘পিকচার অব দ্য আর্থ’ শিরোনামের গ্রন্থের মাধ্যমে। নবম শতকের প্রথমার্ধ ৩০০-৮৫০ এ সময়টিকে বিজ্ঞান-ঐতিহাসিক জর্জ সাটন বলেছেন আল খোয়ারিজমির কাল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক নতুন বিষয় আল-হিকমার ছায়াতলে বসে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান সাধকরা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি মুসলমান বিজ্ঞানীদের যে কৌতূহল, এমন অন্য কারো মধ্যে দেখা যায়নি। তারা এমনকি অনেক মিথ ভেঙে নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা আল মামুনের নির্দেশে ইয়াহিয়া ইবনে আবি মনসুরের তত্ত্বাবধায়নে বাগদাদে অবজার্ভেটরি—নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগারগুলোর সঙ্গে বায়ত আল-হিকমার সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কনস্টান্টিনোপল লাইব্রেরি থেকে এখানে আসে গণিত ও দর্শনের মূল গ্রন্থ। বাগদাদবাসী শ্রেষ্ঠজ্ঞানী ও ভাষাবিদদের হাতে এসব বই অনূদিত হয়।


ইরাকের স্বর্ণযুগের প্রতিষ্ঠান বায়ত আল-হিকমা। ইসলামের এবং আব্বাসীয় শাসনেরও স্বর্ণযুগ। ৭৫০-৭৭৫ সাল পর্যন্ত খেলাফতের অধিষ্ঠাতা আল মনসুরের আরবি ও ফার্সি ভাষায় লিখিত দুর্লভ গ্রস্থসংগ্রহ দিয়ে বায়ত আল-হিকমার সূচনা বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ মনে অষ্টম শতকের শেষ দিকে খলিফা হারুন আল-রশীদের তত্ত্বাবধানে এটি প্রতিষ্ঠিত। হারুন আল-রশিদের শাসন কাল ৭৮৬ -৮০৯ খ্রিস্টাব্দ। আল মামুন খলিফা হয়ে (৮১৩-৮৩৩ পর্যন্ত) বাগদাদকে বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান একটি কেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি আল মনসুর প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিকে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সমর্থন দিয়ে একে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরিতে পরিণত করেন। শুধু বইয়ের সমাহার নয়, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ মানুষেও সমাহার ঘটিয়েছেন।

অবশ্য উমাইয়া শাসনামলেও প্রথম মুয়াবিয়া রাজধানী দামেস্ক শহরে একটি বায়ত আল-হিকমা স্থাপন করে তাতে গ্রিক, ল্যাটিন ও ফার্সি ভাষায় লেখা বইপত্র সংরক্ষণ করেন। খলিফা আল-মামুন যতটা দরাজ হস্ত হয়ে বায়ত আল-হিকমার উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়োজিত করেছেন, তার উত্তরসূরি আল মুতাসিম তা কমবেশি ধরে রাখেন।

হালাকু খানের মঙ্গোল সেনাবাহিনী খলিফা আল মুস্তাসিমের আব্বাসীয় বাহিনীকে পরাস্ত করে প্রায় সবাইকে হত্যা করে। খলিফাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১২৫৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারি সৈন্যরা বাগদাদ শহরে প্রবেশ করে। তারা ইচ্ছেমতো লুটপাত করে অগ্নিসংযোগ করে শহরের সর্বত্র। বায়ত আল-হিকমার আগুন ঝলসানো বই তারাই টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করে। মঙ্গোলীয় বর্বরতায় নিঃশেষ হয়ে যায় সভ্যতার অমূল্য ও শ্রেষ্ঠতম সম্পদ।

হাজার বছরের ব্যবধানে দুটি সমমানের বিশ্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞনগৃহ আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি ও বাগদাদের বায়ত আল-হিকমা মুনষেরই অবিবেচনা, প্রতিহিংসা ও বর্বরতার কাছ ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। আলেকজান্দ্রিয়াতেই সৃষ্টি হয়েছিল থিওপলিস মন্দির, এ মন্দিরে স্থাপন করা হযেছিল একটি লাইব্রেরি আর একে বলা হতো ধ্বংসপ্রাপ্ত আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কন্যা। কিন্তু পোপ থিওফেলিসের নির্দেশে ৩৯১ সালে গোঁড়া খ্রিস্টান ও সম্রাট থিওসোডিয়াসের সৈন্যরা মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়। পুরো লাইব্রেরিটি ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।

বায়ত আল-হিকমার মনিষী-পণ্ডিত

বায়ত আল-হিকমার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এমন মনিষীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা:

ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭): দার্শনিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী। ক্যানন অব মেডিসিন গ্রন্থের লেখক।

আল-গাজ্জালি ( ১০৫৮-১১১১): ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক।

মুহাম্মদ আল ইদ্রিসি (১০৯৯-১১৬৯): আরব ভূগোলবিদ, পৃথিবীর মানচিত্রকার।

আল কিন্দি (মৃত্যু ৮৭৩): অ্যারিস্টটল ও প্লেটো প্রভাবিত দার্শনিক।

মাসলামা আল-মাজরিতি (৯৫০-১০০৭): আরব গণিতবিশারদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও অনুবাদক।

হুনাইন ইবনে ইসহাক (৮০৯-৮৭৩): খ্রিস্টান আরব পণ্ডিত, দার্শনিক, জীবদ্দশায় ১১৬টি বিশিষ্ট রচনার অনুবাদক।

বানু মুসা ভ্রাতৃদ্বয়: পারস্যের প্রকৌশলী ও গণিত বিশারদ।

সিদ্দ ইবনে আলী (মৃত্যু ৮৬৪): জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও অনুবাদক।

আল জাহিজ (৭৮১-৮৬১): লেখক, জীববিজ্ঞানী বিখ্যাত গ্রস্থ কিতাব আল হাইওয়ান।

জাবির ইবনে হেইয়ান (৭২১-৮১৩): বিজ্ঞানী, ধাতব পদার্থ বিষয় গ্রন্থের লেখক ল্যাটিন থেকে আরবিতে অনুবাদক।

মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি (মৃত্যু ৮৫০): বহু বিষয়ে জ্ঞানী বহু ভাষাবিদ এবং বায়ত আল-হিকমার প্রধান।

এটি একটি সংক্ষিপ্ত তালিকামাত্র। এ জ্ঞানগৃহের সব পণ্ডিতদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বা অনুবাদ গ্রন্থ রয়েছে।


আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক