এটা মানতেই হবে যে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের অনেকে একপেশে পূর্বধারণার ফলস্বরূপ এটা ধরে নেন যে প্রাচীন গ্রিসই হলো সব শিল্পের আঁতুড়ঘর এবং পাশ্চাত্যের মতো প্রাচ্যেও প্রাচীন গ্রিসের শিল্পকলার প্রভাব পাকাপোক্তভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে পশ্চিমা মনীষীরা, যাদের সবাই আবার শিল্পীও নন, সাধারণত এটা বুঝতে অক্ষম হন যে ভারতীয়ই হোক, বা চৈনিক, প্রাচ্যের শিল্পকলাগুলো যেকোনো সময়ের পাশ্চাত্য শিল্পকলার চেয়ে কম মূল্য বা গুরুত্ব বহন করে না। এ-যাবৎ কালের সবচেয়ে বড় যে অসুবিধাটি দেখা গিয়েছে সেটি হলো, শুধু প্রত্নতাত্ত্বিকরাই ভারতীয় শিল্পকলা নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। অথচ শিল্প হিসেবে বিবেচিত শিল্পকর্মগুলোর গুরুত্ব বিচার ও তাদের প্রভাব নিরূপণের যথাযথ যোগ্যতা শিল্পীদের অথবা অন্তত শিল্প নিয়ে অধ্যয়নকারী ব্যক্তিদেরই রয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিকদের নয়। ভারতীয় চিত্রকলার অসাধারণত্বের সঙ্গে পরিচিতি আছে, এমন কোনো শিল্পীই ধরে নিতে পারতেন না যে গান্ধার স্কুলই হচ্ছে ভারতীয় ফিগার স্কাল্পচার শিল্পের প্রকৃত ভিত্তি বা গ্রিক-রোমান ধারার এমন ক্ষয়িষ্ণু ধারা থেকে ভারতীয় শিল্পকলার পত্তন।
গ্রিক শিল্পকলার রমরমা অবস্থা ছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বা তারও আগে, যেখানে ভারতীয় শিল্পকলার পরম অবস্থাটা নিশ্চিতভাবেই তৈরি হয় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর পরে। এর কারণ ও প্রভাবের বিন্যাসটি নির্ণয় করা কঠিন; অন্য একটি ধারার পতন থেকে অন্যটির অর্জন শুরু, এমনটিও নয়।
যা
হোক, ধর্মীয় ও দর্শনগত বিবেচনার ওপর প্রশ্নটি বিশেষভাবে নির্ভর করে। গ্রিক ও ভারতীয় শিল্পকলার দর্শন যেন দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। প্রাচীন শিল্পকর্মের বিরল ও চমত্কার কয়েকটি নিদর্শনকে বাদ দিয়ে যদি বলা হয়, গ্রিকদের দেবতার চিত্রায়ন পুরোপুরিই গ্রিক ধর্মের অলিম্পিয়ান ধারার অন্তর্গত। যেমনটি বলা হয়েছে, গ্রিক চিত্রকলায় অতীন্দ্রিয়বাদের কোনো ছোঁয়া নেই। দেবতারা বরং বেশ বড়সড় এবং আকর্ষণিয় গড়নের কিছু মানুষ; উদাহরণস্বরূপ অ্যাপোলোর কয়েকটি চিত্রায়নের কথাই যদি বলা হয়, এমন কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে হয় যে এ চিত্রায়নগুলো আসলেই কোনো দেবতার নাকি কোনো ক্রীড়াবিদের। অন্যদিকে ভারতীয় শিল্পকলা সারত অতীন্দ্রিয়তায় ভরপুর। একজন নিখুঁত মানুষের প্রতিকৃতি তৈরির প্রতি ভারতীয় শিল্পকলার তেমন কোনো ঝোঁক নেই, বরং দেবত্বের অনুকৃতি তৈরিতেই তার আগ্রহ। মিসরীয়দের মতো অতটা স্পষ্টভাবে না হলেও এদের সবচেয়ে বেশি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘প্রতিকৃতি গ্রহণের ঊর্ধ্বে’ গিয়ে, যা চমত্কার সব অলিম্পিয়ানদের গ্রিক নিদর্শনগুলোতে অনুপস্থিত। দারুণ সব গ্রিক নিদর্শন ও অসাধারণ ভারতীয় নিদর্শনগুলোর সঙ্গে সামান্য পরিচিতি যাদের রয়েছে, তারা একটি শিল্পের ধারাকে অন্যটির চেয়ে মহৎ না বলেও এ কথা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে পারেন যে এ দুই শিল্পের ধারা একটি অন্যটির চেয়ে এতটাই আলাদা যে একটির অন্যটির ওপর নির্ভরশীলতার কথা ভাবা শুধু কঠিনই না, এমনকি অসম্ভব। এ সত্যকে স্বীকৃতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় শিল্পকলার বাহ্যিক চিত্রে প্রাচীন শিল্পের প্রভাব কতটুকু সে প্রশ্নটির উত্তর পাওয়ার পরিসর আরো ছোট হয়ে আসে।
কাঠের টুকরো আর কাদামাটিকে মানুষ বা দেবতার অবয়বে পরিণত করার সাধ্য বা ইচ্ছাটুকুর কথা বাদ দিলে আদি আর্য সংস্কৃতির সবটুকুতেই আর্যদের
ভাগ, এ কথা পূর্বনির্ধারিত আভিজাত্যবোধের ধারণা নিয়ে বসে নেই, এমন একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্বাস করানোর জন্য পাথরে খোদাই করা শিল্পকর্মের অবশিষ্টাংশের অনুপস্থিতির চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন।
ভারতীয়
শিল্পের যে অতীন্দ্রিয়বাদী চরিত্র তার উৎস মোটেও প্রাচীন ক্ল্যাসিক্যাল যুগ নয়। এর মানে এই নয় যে প্রাচীন কোনো প্রভাব তাতে নেই, কিন্তু সেটা কতটুকু তা নির্ধারণ করা হয়নি বরং বেশি বেশি ভাবা হয়েছে।
কুশ
জাতকে রাজার প্রধান কর্মকারকে দিয়ে তৈরি স্বর্ণের প্রতিকৃতির কথা এমনভাবে উল্লেখ করা আছে যা থেকে ধারণা করা যায় যে এ ধরনের প্রতিকৃতি সে সময়ের গল্পের গাঁথুনিতে সুপরিচিতই ছিল, যা বর্তমান সময় এসে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর ঐতিহ্যকে ধারণ করে নিয়েছে। এর পরে আমরা বুদ্ধের নিজের সময়ের চিত্রকর্ম নির্মাণের যে উল্লেখ রয়েছে তার দিকে তাকাতে পারি। কুশল বিম্ব বর্নানভে উল্লেখ আছে যে বুদ্ধের ইচ্ছাতেই তার একটি চন্দন কাঠে মোড়ানো প্রতিকৃতি তুলে ধরা হয়েছিল, যারা দূর-দূরান্ত থেকে বুদ্ধকে দর্শন করতে আসতেন, তারা যদি কোনো কারণে তাকে অনুপস্থিত দেখতে পেতেন, সেক্ষেত্রে তাদের মনোবেদনার ক্ষতিপূরণ করতেই এটি করা হয়।
দিব্যভবনে
এটিও সম্পর্কায়িত করা হয়েছে যে মগধের রাজা বিম্বিসার কাপড়ের ওপর চিত্রিত একটি বুদ্ধের প্রতিকৃতির আশা করেছিলেন। বুদ্ধ নিজের ছায়াকে এর ওপর ফেলেন এবং নির্দেশ করেন যেন এই দেহরেখাকে রঙ দিয়ে পরিপূর্ণ করে তোলা হয় এবং এর ওপর যেন তার বিশ্বাসের মূল নিবন্ধগুলো লিখে ফেলা হয়। Grünwedel যথাযথভাবেই এই যৎসামান্য নিদর্শনকে প্রমাণবিহীন বলে নিন্দা করেছেন, তবে তার পরও তিনি দাবি করেন যে সে সময় কোনো আদর্শ নিদর্শন সৃষ্টির কোনো ইচ্ছাই ছিল না। বুদ্ধের মতো একজন শিক্ষক তার জীবদ্দশায় তার নিজের প্রতিকৃতি তৈরিকে উৎসাহ দিয়েছেন, এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম এবং বরহট ও সাঁচিতে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অথবা রথের ওপর চিত্রায়িত করা হয়েছে।
অর্থাৎ
বেশ কিছু সাহিত্যিক প্রমাণাদিই রয়েছে, যা থেকে পরবর্তী সময়ে চিত্রগুলো গান্ধার আমলের অনেক আগেই তৈরি করা হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়।
এখানে দেখা যায়, সাহিত্য নিদর্শনগুলো সবসময় মূল্যবান ধাতু, অথবা কাঠ বা কাপড়ের মতো অস্থায়ী উপাদানগুলোর কথাই উল্লেখ করে। সেগুলো যদি আদি পাথুরে চিত্রগুলোর কথা বলত, তাহলে কালাতিক্রমণের সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠত। আসল সম্ভাবনার প্রতি এই অনুরাগ মূলত সাহিত্যিক প্রমাণাদির পক্ষেই কথা বলে।
বরাহটের
মতো প্রাচীন নিদর্শনের স্থানগুলোতে চিত্রকর্মের অনুপস্থিতিকেই প্রাচীন সময়ে ভাস্কর বা চিত্রশিল্পীদের চর্চাস্থলের অভাবের একটি প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। অথচ এই অনুপস্থিতিগুলো এটা প্রমাণ করতে আসলেই ব্যর্থ যে সে সময় অস্থায়ী ও মূল্যবান ধাতু দিয়ে কোনো শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়নি। এমনকি অনুরাধাপুরাতেও আমরা বড় বড় স্তূপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বুদ্ধের কোনো মূর্তি দেখতে পাই না। কিন্তু এর দ্বারা এ কথা প্রমাণ হয় না যে প্রতিবেশী বিহারগুলোতে কাঠ, কাদামাটি বা পাথর দিয়ে চিত্রকর্ম তৈরি করে তার উপাসনা করা হয়নি। অশোকের সময়ে কাঠের বা কাদামাটির প্রতিকৃতিকে উপাসনা করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই, অথচ প্রমাণাদির অনুপস্থিতি ভুল তথ্যও দিতে পারে এবং যদি বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েক শতাব্দী পরও তার প্রতিমূর্তি অজানা থেকে যায়, যেমনটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, এর মাধ্যমেও কোনো ধরনের চিত্রকলার অনুপস্থিতির কথা প্রমাণ হয় না।
ক্ষণস্থায়ী
উপাদানের ব্যবহারই সম্ভবত এ জটিলতাগুলোর আসল ব্যাখ্যা।
পূর্ব
ও পশ্চিমের শিল্পে কারিগরি পদ্ধতিতে একটা কৌতূহলোদ্দীপক ফারাক আছে। এটা হলো অনুপাত। ভারতে মাথা নয় বরং মুখমণ্ডলকে পরিমাপের আদর্শ ধরা হয়েছে। ভারতীয় শিল্পশাস্ত্র পুরোপুরি পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত।
প্রচীন
ভারতে শিল্পজ্ঞানের অভাব ছিল। সেটা সবখানের জন্যই সত্য। গ্রিকো-রোমান প্রভাবকাল শিল্পের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এ প্রভাব পুরোপুরি কেটে যাওয়ার পরই ভারতীয় শিল্পের সেরা সময়টা হাজির হয়েছিল।
আনন্দ
কে. কুমারস্বামী (১৮৭৭-১৯৪৭): ভারতীয়
শিল্পের ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক
প্রবন্ধের উৎস: Source : Studies
in Comparative Religion, Vol. 8, No. 1 (Winter, 1974). © World Wisdom, Inc.





