আলী-ফোরম্যানের বিখ্যাত লড়াই
সাল ১৯৭৪। সেই সময়কার জায়ারে আর অধুনা কঙ্গো রিপাবলিকে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। বিগ জর্জকে (জর্জ ফোরম্যান) নকআউট করে দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলেন বক্সিংজগতের কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলী। ‘রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’ খ্যাত রোমহর্ষক সেই লড়াইয়ে তিনি হলেন চ্যাম্পিয়ন। আলীর মৃত্যুর পরের দিন সে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের কথা স্মরণ করতে মার্কিন মিডিয়া অর্গানাইজেশন ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও বা এনপিআরের উপস্থাপক মেরি লুইস কেলির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে হাজির হয়েছিলেন জর্জ ফোরম্যান। বলেছেন বক্সিং রিংয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়ালেও তার বাইরে তাদের পরিচয় শুধুই বন্ধুত্বের। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বক্সিং কমেন্টেটর বব শেরিডানও। তাদের সে আলাপচারিতা এখানে তুলে ধরা হলো:
মেরি লুইস কেলি: আজ আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করব, যিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জোরালো কণ্ঠস্বর, যুদ্ধ ও আগ্রাসনবিরোধী, প্রজাপতি নৃত্য দেখিয়ে বক্সিং রিংয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মৌমাছির হুল ফোটানোর মতো ক্ষিপ্র এবং একজন চ্যাম্পিয়ন— তিনি মোহাম্মদ আলী। গত রাতে মাত্র ৭৪ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনবারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। ভিন্নমত থাকলেও মুষ্টিযুদ্ধে তার জীবনের সেরা লড়াটি হয়তো ছিল জায়ারের কিনশাসার ‘রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’ ফাইটটি। সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সাক্ষী হয়েছিলেন ৬০ হাজার দর্শক, যাদের সামনে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ঠাসা এ লড়াইয়ে ফোরম্যানকে পরাজিত করে ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট টাইটেলটি জিতে নিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী।
বব শেরিডান: সত্যিই এটা ছিল অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা। রীতিমতো বুনো একটা লড়াই হয়েছিল সেদিন। একের পর এক নকডাউন দিয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করছিলেন মোহাম্মদ আলী।
কেলি: যে মানুষটি তার নকডাউনের শিকার হচ্ছিলেন, তিনি ছিলেন আরেক বক্সিং টাইটান জর্জ ফোরম্যান। আজ আমরা তার কাছ থেকে শুনব সেই দুধর্ষ লড়াইয়ের কথা। জর্জ ফোরম্যান, আপনার সঙ্গে এমন এক শোকার্ত মুহূর্তে এ বিষয়ে কথা বলতে হচ্ছে যে, তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
ফোরম্যান: হ্যাঁ, আমরা তাকে হারিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে, মাথার ওপর থেকে একটা বটবৃক্ষের ছায়া সরে গেছে। মোহাম্মদ আলী— তার মতো দ্বিতীয় আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কেলি: আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো ১৯৭৪ সালের ‘রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’ খ্যাত সেই দিনটির কথা আজীবন মনে রাখবেন। যেদিন আপনারা দুজন একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, আমরা সে সময়ে ফিরে যেতে চাই । মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে লড়াইটা আসলে কেমন ছিল।
ফোরম্যান: সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। কারণ আমি এর আগে হারিয়েছিলাম জো ফ্রেজিয়ারকে, যে কিনা মোহাম্মদ আলীকে হারিয়েছিল। আমি কেন নর্টনকেও হারিয়েছি, সেও একসময় মোহাম্মদ আলীকে হারিয়েছিল। তাই আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এ ম্যাচটা হবে আমার জন্য বাঁ হাতের খেলা।
কেলি: (মুচকি হাসি নিয়ে বললেন) কিন্তু আপনার হিসাবটা ভুল প্রমাণ হলো।
ফোরম্যান: হ্যাঁ, ঠিক তাই। রিংয়ে আমি তার কাছে ধরাশায়ী হলাম। আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করছিলাম। কিন্তু সে বেঁচে যায়। যখন ছয় রাউন্ড শেষ হলো, আলী ফিসফিস করে বলতে শুরু করে, জর্জ ভেব না তুমি সব হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছ। আমাকে মোকাবেলা করো। এটা ছিল ভয়ঙ্কর একটা মুহূর্ত। তখন বেশ বুঝতে পারছিলাম, বাস্তবতার সঙ্গে আমার ভাবনার কোনো মিল নেই।
কেলি: আপনাদের দুজনার কতবার দেখা হয়েছে? কতবার রিংয়ে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন দুজনে?
ফোরম্যান: আলীর সঙ্গে আমার একবারই লড়াই হয়েছে। তার কাছে আমি হেভিওয়েট টাইটেল খুইয়েছি। তারপর আর তার সঙ্গে লড়াই করতে নামিনি।
কেলি: মাত্র একবার!
ফোরম্যান: হ্যাঁ, এটাই আমার জন্য অনেক।
কেলি: (আবারো হেসে বললেন) তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
কেলি: আজকে টুইটারে দেখলাম, আপনি টুইট করেছেন, আলী, ফ্রেইজার এবং ফোরম্যান, আমরা সবাই এক।
ফোরম্যান: এটা অবশ্যই সত্যি। আলীর চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, আমি নিজের একটা অংশ হারিয়েছি। মোহাম্মদ আলী, বক্সিংয়ের প্রতি আমার আসক্তি জন্মেছে তার জন্যই। ফ্রেজিয়ারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আমরা বক্সিংকে দেখেছি তার চোখ দিয়েই। আমরা প্রতিনিয়ত একে অন্যকে নিয়ে কথা বলতাম, একে অন্যকে প্রেরণা জোগাতাম। আবার একে অন্যকে নকআউট করাতেও পিছপা হইনি। আমরা সহকর্মীর মতোই ছিলাম। বিশ্বাস করুন, সত্যিই, তাই ছিলাম আমরা। যদি আমাদের মধ্যে এসব না ঘটত, তাহলে হয়তো আমার জীবন কখনই ঠিকঠাক চলত না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সবকিছুই শেষ। আমি আমার একটি অংশ চিরদিনের জন্য হারিয়েছি।
কেলি: একজন মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে আলীকে কি বলবেন আপনি?
ফোরম্যান: আলী ছিল আমার সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল বক্সারের একজন। তবে তাকে শুধু বক্সার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা রীতিমতো বোকামি হবে। তার পরিচয়ের গণ্ডি বক্সিংকেও ছাপিয়ে গেছে । তার পরিচয় আরো বিশাল, যার সীমা ছাড়িয়ে গেছে পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে। তিনি যখন রিংয়ে প্রবেশ করতেন, জেতার মানসিকতা নিয়েই খেলতেন। তার মধ্যে হার মেনে নেয়ার মনোভাবের লেশ মাত্র থাকত না। শুধু চ্যাম্পিয়নশিপ বেল্ট বা পকেটে কিছু ডলারের জন্য লড়তেন না, তিনি লড়াই করতেন আরো বেশি কিছু অর্জনের আশায়।
কেলি: বর্তমান প্রজন্ম বিশেষ করে যেসব তরুণ বক্সিংয়ে আসছে, তাদের জন্য তিনি কি উদাহরণ রেখে গেছেন বলে মনে করেন?
ফোরম্যান: বিশেষ কোনো একটি গোষ্ঠীর জন্য নয়, তিনি সব অ্যাথলেটদের জন্যই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি, তিনি বক্সারের চেয়েও আরো বেশি কিছু হতে চেয়েছিলেন। আর তিনি তা করে দেখিয়েছেন। তিনি সবার জন্যই একটা বার্তা রেখে গেছেন তা হলো, বর্তমানের চেয়েও বেশি কিছু করার চেষ্টা করো।
কেলি: আজকের অনুষ্ঠানে অনেককেই আমি বলতে শুনেছি, বক্সার হিসেবেই শুধু নয়, আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্যও তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ।
ফোরম্যান: তার পরিচয় কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। গায়ের বর্ণকে ছাপিয়ে আলী একজন মহত্ মানুষে পরিণত হয়েছেন । কেন্টাকির লুইভিল থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত, মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে। আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই তার নাম শুনেছি, আলী, আলী। আর তখন আমি বিস্মিত হতাম। বলতাম, হায়! এখানেও তার নাম পৌঁছে গেছে।
(কেলি হাসলেন)
ফোরম্যান: যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই তার বক্সিং ম্যাচ দেখেনি। কিন্তু তাদের চোখে তিনি মহত্। তিনিই সবার সেরা।
কেলি: খেলা দেখেননি, অথচ তারা জানেন আলী কে ছিলেন?
ফোরম্যান: হ্যাঁ। তারা জানত, তিনি কে ছিলেন। যখন আপনি আলীর নামটি উচ্চারণ করবেন, আপনার হূদয়কে তা আন্দোলিত করবে। কিছু একটা অনুভব করবেন আপনি।
কেলি: জর্জ ফোরম্যান আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমাদের সময় দেয়ার জন্য। আপনি আপনার খুব প্রিয় একজন বন্ধু হারিয়েছেন, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
ফোরম্যান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাত্কারটি ইংরেজী থেকে অনুবাদ করেছেন: সানজিদা রীপা





