গোল্ডেন গ্লাভস টুর্নামেন্ট উপলক্ষে জমজমাট যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর। সালটা ১৯৫৯, টুর্নামেন্ট ঘিরে আগ্রহীদের আলোচনার অন্যতম বিষয় তরুণ বক্সার ক্যাসিয়াস ক্লে; প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে হয়তো কোনো নতুন কৌশল দেখাবেন তিনি। তবে যাকে ঘিরে এত কথা, সেই ক্যাসিয়াস তখন শুধু দ্বন্দ্বযুদ্ধ নিয়ে ভাবছেন না, তার মনোযোগের কেন্দ্রে ‘নেশন অব ইসলাম’; শিকাগোর সাউথ আইল্যাল্ড এভিনিউয়ে অবস্থিত এ আফ্রিকান আমেরিকান ইসলামিক ধর্মীয় আন্দোলন সংস্থার হেডকোয়ার্টার ‘মস্কো মারিয়াম’। গোল্ডেন গ্লাভস টুর্নামেন্ট উপলক্ষে এ শহরেই পা রেখেছেন ক্যাসিয়াস ক্লে।
মূলত গোল্ডেন গ্লাভস চলার সময়ই নেশন অব ইসলাম সম্পর্কে শুনেছিলেন মোহাম্মদ আলী। বছর দুই পর এ সংগঠনের এক সভায় অংশ নেয়া, সেই থেকে নিয়ম করে তিনি উপস্থিত থাকতেন নেশন অব ইসলামের সব সভায়। তখন ক্যাসিয়াস ক্লে ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মানুসারী। তাই বাইরের বিশ্বের কাছে তাকে গোপন রাখতে হয়েছিল ইসলামপন্থী এ সংঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা।
এর মধ্যে ১৯৬২ সালে আমেরিকান মুসলিম মন্ত্রী ও মানবাধিকারকর্মী ম্যালকম এক্সের সঙ্গে তার পরিচয়, যিনি কিনা পরবর্তীতে জগত্খ্যাত এ বক্সারের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করেন। যা-ই হোক, নেশন অব ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক, ম্যালকম এক্সের সঙ্গে ভাবনা বিনিময়— সব মিলিয়ে ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে জুনিয়র দিনে দিনে অনুগত হতে থাকেন ইসলাম ধর্মের প্রতি। এভাবেই ক্যাসিয়াস ক্লে থেকে মোহাম্মদ আলী অধ্যায়ের শুরু।
শোনা যায়, ১৯৬৪ সালে আলী খ্রিস্টান থেকে মুসলমানে ধর্মান্তরিত হন। তবে জন্মনাম ছেড়ে অনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৫ সালে বেছে নেন মোহাম্মদ আলী নামটি। কেবল ধর্ম মেনে ইসলাম গ্রহণ নয়, এর আচার-আনুষ্ঠানিকতাগুলোও নিয়ম করে পালন করেছেন এ কিংবদন্তি। সে ধারাবাহিকতায় বুঝি ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে হজ পালন করতে মক্কা গমন।
প্রচলিত আছে মেন্টর ম্যালকম এক্সের জীবনের সঙ্গে মিল রয়েছে আলীর আধ্যাত্মিক ভ্রমণের। ম্যালকমের খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হওয়া, পরবর্তীতে নেশন অব ইসলামে যোগদানের ঘটনাগুলো ঠিক মিলে যায় মোহাম্মদ আলীর দিনপঞ্জির সঙ্গে।
পেশাদার জীবন শুরুর বছর খানেকের মধ্যে আলী বুঝে গিয়েছিলেন, রিংয়ে দাঁড়িয়ে তার হাত দুটো দিয়ে একের পর এক যে কাব্যিক ভঙ্গি বেরিয়ে আসে, তা ঠিক পার্থিব নয়। সে ভঙ্গি ঐশ্বরিক। সরাসরি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। তাই তো চারকোনা ঘেরা মঞ্চে প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়ানোর আগে আলীর মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটি নিয়ম করে প্রার্থনারত থাকত সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চেয়ে। সে প্রার্থনা যেন সঞ্জীবনী হয়ে শক্তি জোগাত আলীকে। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে আলী বলতেন, ‘খোদা, লক্ষ মানুষ অপেক্ষা করছে আমার পরাজিত দৃশ্য উপভোগের। তবে আমি জানি, যত দিন তুমি আমার সঙ্গে রয়েছ, আমাকে কেউ পরাস্ত করতে পারবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি রাজ্যের লুইভিলে জন্ম নেয়া ক্যাসিয়াস বড় হয়েছেন পরিপূর্ণ এক খ্রিস্টান পরিবারে। নিয়ম করে চার্চে যাওয়া, সানডে স্কুলে ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বড় হওয়ার এক গল্পবহুল শৈশব তার। পেশায় রঙমিস্ত্রি বাবা ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে আলীর শৈশব নিয়ে বলেন, ‘ক্যাসিয়াস ও রুডলফকে (আলীর সহোদর) বলতে পারেন গির্জা-বালক। আমার স্ত্রী ওদের ঠিক সেভাবেই বড় করেছে। সে ওদের প্রতি রোববার নিয়ম করে চার্চে নিয়ে যেত। শৈশব থেকেই ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে, যাতে ওরা বড় হয়ে সঠিক পথটি বেছে নেয় আর অন্যের কাছে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
পরিবার আর চার্চে শেখা ধর্মীয় রীতি-নিয়ম মেনেই বড় হওয়া আলীর। তার প্রশিক্ষকের স্ত্রী মার্টিনের বয়ান অনুযায়ী, ‘যেখানেই যেত সবসময় সঙ্গে একটি বাইবেল রাখত ক্যাসিয়াস। বেশির ভাগ সময় অন্য ছেলেরা যখন বাইরের এটা-ওটা জিনিস নিয়ে উত্সাহী ছিল, ও তখন কোথাও ফাঁকা একটি জায়গা খুঁজে নিয়ে নিবিষ্টমনে সঙ্গে রাখা বইটি খুলে পড়তে শুরু করত।’
শুরু থেকেই সৃষ্টিকর্তার ওপর দৃঢ়বিশ্বাস নিয়েই ক্যাসিয়াসের বড় হওয়া, যা কিনা শৈশবেই তাকে এক ধরনের অন্তর্গত শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই বিশ্বাসের প্রভাব ছিল তার সর্বত্র, গোটা জীবনজুড়ে।
আলীর সহধর্মিণী লোনি (১৯৮৬ সালে ইয়োলানডা উইলিয়ামসকে বিয়ে করেন আলী, যিনি কিনা লোনি নামে পরিচিত ছিলেন) একবার বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ আগাগোড়াই ধার্মিক এক প্রাণ। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী মানুষ। সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করত এ মহাবিশ্ব সৃষ্টির নেপথ্যে অনেক বড় কোনো শক্তির উপস্থিতির কথা। আর তাই সেই সত্যের অনুসন্ধান করছিল সে।’
আলীর সেই অনুসন্ধান বুঝি পূর্ণতা পায় নেশন অব ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দিয়ে; আমেরিকার মতো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের দেশে কালোদের অধিকারের কথা বলে যে সংগঠনটি।
আগেই বলেছি ম্যালকম এক্সের সঙ্গে আলীর সম্পর্কের কথা। সহজাত দক্ষতাসম্পন্ন ম্যালকমের সঙ্গে আলীর বন্ধুত্ব জমতে খুব একটা কালক্ষেপণ হয়নি। সেই বন্ধুত্ব গড়িয়ে ম্যালকমের সঙ্গে আলীর সম্পর্ক পৌঁছে যায় নতুন সমীকরণে। আলী তাকে মানতে শুরু করনে আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা হিসেবে। শোনা যায়, ম্যালকম দিয়ে আলী এতই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, নিজের নাম তিনি ক্যাসিয়াস এক্স রাখার কথাও ভাবেন।
নতুন ধর্মদর্শনের উপলব্ধিতে আলীর হূদয়ে যে স্ফুলিঙ্গের প্রজ্বলন হয়, তা কেবল একজন কিংবদন্তি বক্সার নয়, তার চেয়েও বেশি মাত্রায় মহিমান্বিত করে তাকে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় আলীর এ কথায়, ‘মিয়ামির মসজিদে পা রেখে ভিন্ন এক ঐশ্বরিক অনুভূতিতে আক্রান্ত হই আমি। আগে কখনো এমন উপলব্ধির সঙ্গে পরিচয় ঘটেনি। মনে আছে, ব্রাদার জন তখন কথা বলছেন। আমার কানে তার বলা প্রথম যে কথাগুলো এল তা ছিল, কেন আমাদের নিগ্রো বলে ডাকা হয়? আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, এভাবেই তো সাদারা আমাদের পরিচয় কেড়ে নিচ্ছে... সেই কথাগুলো দিয়ে আমি প্রভাবিত হই, সে কথারা আমাকে তাড়িত করে, আমি এ সম্পর্কে আরো জানতে চাই।’
নেশন অব ইসলামের বার্তাগুলো ছিল রোমাঞ্চকর: এটি যেমন তার সদস্যদের শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলে, তেমনি পরিচ্ছন্ন পরিপাটি জীবনধারণের আহ্বান জানায়। সর্বোপরি একটি নৈতিক পরিসরে স্বাধীনতা, সমতা আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে মিলিত হয় এর সদস্যরা।
এ প্রসঙ্গে আবারো লোনির কথা শোনা যাক, ‘সমাজ পরিবর্তনের আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছে নেশন অব ইসলাম। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার নিয়ে সচেতন ছিলেন আলী। তাই আমেরিকা কিংবা অন্য কেউ এ নিয়ে তাকে কী বলছে, সেসব কানে তুলত না সে। আমেরিকায় বসবাসরত একজন কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও তার মন আর আত্মার মতোই সে ছিল এক মুক্ত মানুষ।’
তাই বুঝি আলীকে ‘সত্যিকারের প্রথম মুক্ত কালো মানুষ’ বলে ডাকতেন লোনি। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির কাছে অপরাজিত কিংবা কারো মনোভাবে প্রভাবিত ছিলেন না বলেই বুঝি আলী প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী এক সত্তা হিসেবে।
নেশন অব ইসলামের ধর্মীয় নেতা এলিজা মোহাম্মদের পছন্দ অনুসারে রাখা হয় মোহাম্মদ আলী নামটি। সে সময় খ্রিস্ট থেকে আলীর ইসলাম ধর্মে যাওয়াকে ভালোভাবে নেয়নি অনেকে। কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেউ বলেছেন, তার কত সাহস যে, খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে মোহাম্মদ আলীর মতো একটি ‘জংলি’ নাম গ্রহণ করে!
সেসব সমালোচকের উদ্দেশে আলীর কোমল স্বীকারোক্তি ছিল অনেকটা এমন: ‘নিজের চাওয়ার কাছে আমি স্বাধীন, অন্যের ইচ্ছামতো কাজ করতে বাধ্য নই একবিন্দু।’ লোনির মতে, ‘নিজের এমন সিদ্ধান্তের জন্য কখনো ওকে এক মুহূর্ত অনুশোচনায় ভুগতে দেখিনি আমি।’
স্বাভিমান যে শব্দটি রয়েছে, আলী তা শিখেছেন তার বাবার কাছ থেকে। তিনি মনে করতেন, শৈশব থেকে কোনো শিশুকে যদি গাদাখানেক নেতিবাচক প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে এ নিদারুণ অভিজ্ঞতাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে তার আত্মমর্যাদাবোধকে। ‘অন্যের থেকে কম মূল্যবান তুমি— কখনো তাদের মধ্যে এমন ধারণা দিতে হয় না।’ বাবার এ কথাগুলো বলে দেয় আলীর শৈশবের পরিচর্যার কথা, আর তাই তো এমন অক্ষত আত্মমর্যাদাবোধ নিয়েই বেড়ে ওঠা ক্যাসিয়াস ক্লের।
তার বন্ধুদের মতে, বরাবরই অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন আলী। তা সে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা ভারতের অধিবাসী হোক। নেশন অব ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়ার পরের ঘটনা— আলী শুনতে পেলেন, পর্যাপ্ত অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে ইহুদিদের একটি বৃদ্ধনিবাস। এ সম্পর্কে জানার পর ওই বৃদ্ধাশ্রমটির কর্মকর্তাকে ফোন করে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন তিনি।
বাস্তব জীবনে নানা ধরনের লোকের উপস্থিতি ঘিরে ছিল তাকে। তার প্রশিক্ষক ছিলেন একজন ইতালীয়, সহকারী প্রশিক্ষক ছিলেন ইহুদি, ক্যাম্প ম্যানেজার একজন শ্বেতাঙ্গ, চিকিত্সক কিউবান ও তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি ছিলেন একজন খ্রিস্টান। সবাইকে আলী তার নিজের পরিবারের মতো করেই বিবেচনা করতেন।
১৯৭২ সালে ম্যালকম এক্সের উত্সাহেই হজ পালন করতে আগ্রহী হন মোহাম্মদ আলী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই ব্রত নিয়ে জমায়েত হওয়া মানুষের সান্নিধ্যে এসে দারুণ এক আধ্যাত্মিক সজাগতা তৈরি হয় তার। আমেরিকা ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে আফ্রিকার মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আলী। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠীর প্রিয়পাত্রেও পরিণত হন তিনি।
১৯৭৫ সালে এলিজা মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তার পুত্র ওয়ালেস দীন মোহাম্মেদের ওপর বর্তায় নেশন অব ইসলামের দায়িত্ব। তিনি ইসলামের গোঁড়ামি বা সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর বদলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সংস্থাটির পরিসরকে আরো প্রশস্ত করার কথা ভাবেন। দ্বার খুলে দেন ইসলাম ধর্মের অন্যান্য গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তকরণের। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই পাশ্চাত্যের মুসলিম সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় সংস্থাটির। নেশন অব ইসলাম পরিণত হয় ইসলাম ধর্মানুসারীদের একটি আন্তর্জাতিক সংঘে। বিশেষ করে আমেরিকান মুসলিম সমাজের কাছে এর কদর ও আস্থার বৃদ্ধি ঘটে।
ধর্মতত্ত্বের প্রাচীন বিধিনিষেধের বদলে ইসলামের যেকোনো গোষ্ঠীর অনুসারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় নেশন অব ইসলামের সদস্যপদ, আর ওয়ালেস দীন মোহাম্মেদের নতুন সিদ্ধান্তগুলোকে স্বাগত জানান আলী। তিনি বিশ্বাস করতেন, গায়ের রঙ কিংবা শরীরের কাঠামো অনুসারে কোনো ব্যক্তি খারাপ প্রবৃত্তি দিয়ে তাড়িত হয় না। সৃষ্টিকর্তার কাছে বিবেচ্য মানুষের কাজগুলো তিনি প্রত্যক্ষ করেন ব্যক্তির অন্তর্গত প্রবৃক্তিকে। পাশাপাশি মোহাম্মদ আলী বরাবরই সব ধরনের গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাই বলা যায়, দীন মোহাম্মদের এমন অবস্থান তাকে বাড়তি স্বস্তি দিয়েছিল।
বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মানুসারীদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নিয়ম করে ইসলামের বেঁধে দেয়া কাজগুলো চর্চা করতেন তিনি। অনেক সময় অসুস্থতার কারণে শরীরের সঙ্গে পেরে উঠতেন না, বিশেষ করে রমজান মাসে। তবে শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই রোজা পালন করতেন আর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকেননি কখনো।
সর্বোপরি আলী ছিলেন মানবতাপ্রেমী। তাকে ইসলামের অন্ধ অনুসারী বললে ভুল হবে। কারণ পীড়িত মানবতার দুর্দশা নিয়ে সচেতন ছিলেন। বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় লোনির কথায়, ‘আমরা এমন একটি নিরাপত্তাহীন রাজ্যে থাকি, যেখানে দুর্ঘটনাগুলো রোজকার। তাই কখন যে কে আত্মঘাতী বোমা কিংবা সহিংসতার শিকার হয়, তা নিয়ে চিন্তিত থাকত আলী।’ আলী বিশ্বাস করতেন, যারা নিষ্পাপ মানুষ হত্যা করে, তারা ইসলামের যথার্থ অনুসারী নয়। এসব মানুষ একটি ধর্মকে হাইজ্যাক করে নিয়েছে তাদের অপরাধগুলোকে পরিণতি দিতে, যার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। নাইন/ইলেভেনের ঘটনা সম্পর্কে আলী বলতেন, এ দুর্ঘটনাটি মানবজাতিকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। তাই নতুন করে অনেক কাজ করতে হবে। কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, তিনি বিশ্বমানবতার কথা ভাবতেন। কাজ করতে চাইতেন তাদের কল্যাণের লক্ষ্যে। হতাশ ছিলেন বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে। মনে করতেন, নবী ও কোরআন শরিফ নির্দেশিত পথে না হেঁটে ইসলামের নামে যারা সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করছে, তাতে সুদূরভবিষ্যতে এর ফলাফল ভালো হবে না। বড় ধরনের ঝামেলা তৈরি হবে।
আলী বলতেন, ‘আমি যে কাজগুলো করি, তার উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, তা করি আল্লাহকে খুশি করতে। আমি বিশ্বকে জয় করেছি, কিন্তু সেসব আমার জন্য প্রকৃত সুখ বয়ে আনতে পারেনি। সত্যিকারের শান্তি আমি পেয়েছি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনারত মুহূর্তে। প্রকৃত মুসলিম হিসেবে এটা আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এটা একজন কৃষাঙ্গ কিংবা একজন আমেরিকান হওয়ার চেয়ে ঢের বেশি অর্থবহ। আমি কখনো অন্যের আত্মাকে রক্ষা করতে পারব না, যা কেবল সৃষ্টিকর্তাই পারেন। তবে আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে তো পারি।’
রিংয়ে হইচই ফেলে দেয়া মোহাম্মদ আলীর লড়াইটা তাই কেবল তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে ছিল না। বর্ণবাদী আমেরিকার অহমকেও আঘাত করেছেন তিনি। তাই তো খ্রিস্ট ধর্মের বদলে তিনি যখন মুসলমান হলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তার নতুন পরিচয় মেনে নিতে পারেনি অনেক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। আলীকে অবাঞ্ছিতের তালিকায় রেখে দিতে চেয়েছে কেউ কেউ। কেবল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, আলী উচ্চৈঃস্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের, নিরীহ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন বক্সিংয়ের হেভিওয়েট খেতাব।
‘তুমি যেমন, ঠিক সেভাবেই নিজেকে প্রকাশ করো। তাহলে কেউ তোমার পরিচয় ছিনিয়ে নিতে পারবে না’— কথাগুলো মনে-প্রাণেই বিশ্বাস করতেন মোহাম্মদ আলী।





