১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ৩ টাকা দামের উপন্যাস ‘পথের দাবী’ বাজারে নামে (প্রকাশক কলকাতা ভবানীপুরের ৭৭ নম্বর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় রোডের উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশকাল ৩১ আগস্ট ১৯২৬; বলা আবশ্যক উমাপ্রসাদ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে)। ৪১৬ পৃষ্ঠার বই পথের দাবী।

সে বছর সরকার প্রকাশিত বর্ষপঞ্জিতে ইংরেজিতে যা লেখা হলো, তার বাংলা অনুবাদ: বইটির প্রায় সব পাতায় অত্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান রয়েছে।

কলকাতার পুলিশ কমিশনার বিষয়টি বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে কাগজে-কলমে জানিয়ে দেন। ইন্দ্র মিত্র অনূদিত গোপনীয় পত্রটি শিশির কর ‘ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন:

‘বাংলায় সুপরিচিত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের লেখা পথের দাবী বইটি থেকে আপত্তিকর অনুচ্ছেদগুলো বিবেচনার এবং সরকারি আদেশের জন্য আমি পেশ করছি। বইটি ৬৭ হ্যারিসন রোডের কটন প্রেস থেকে সত্যকিঙ্কর ব্যানার্জি কর্তৃক মুদ্রিত এবং ৭৭ আশুতোষ মুখার্জি রোড, ভবানীপুর কলকাতা থেকে উমাপ্রসাদ মুখার্জি কর্তৃক প্রকাশিত। কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামতের জন্য বইটির একটি মুদ্রিত কপি তার কাছে পাঠানো হয়। এবং তিনি এ অভিমত জানিয়েছেন যে, বইটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারা অনুসারে বাজেয়াপ্ত করার যোগ্য এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ অনুসারে লেখক ও মুদ্রাকরকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।’

ইন্দ্র মিত্র চিফ সেক্রেটারির লিখিত মন্তব্যেরও অনুবাদ সংযুক্ত করেছেন:

‘এটা একটা বিষাক্ত সৃষ্টি। তবে যেহেতু ৯৯/এ ধারা অনুসারে আদেশ জারি হলে হাইকোর্টে বৈধতার প্রশ্ন হতে পারে। তাই আমি মনে করি যে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারানুসারে বইটি অভিযুক্ত করা যায় কিনা, সে সম্পর্কে আমাদের উচিত অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামত নেয়া।’

অ্যাডভোকেট জেনারেল স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্র তার মতামতের সূচনায় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির ঔপন্যাসিক হিসেবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রশংসা করেন। যত্ন নিয়ে তিনি ‘পথের দাবী’ পড়েছেন বলে যে দাবি করেছেন, তা যথার্থ।

তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘এতে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যগুণ থাকলেও... উপন্যাস হিসেবে বইটি শিল্পগুণসম্পন্ন নয়।’ জোরের সঙ্গে ও দক্ষতা-সহকারে কিছু রাজনৈতিক মতবাদ এতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক উদাহরণের মধ্যে তিনি একটি চরিত্র সুমিত্রার উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘যে দেশের সরকার মানে ব্রিটিশ বণিক এবং যেখানে সারা দেশের রক্ত শুষে নেবার জন্য এই বিরাট শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে... বইয়ের ৩৪১-৩৪৬ পাতায় যেসব আপত্তিকর কথা আছে, সেগুলি ইউরোপীয় সভ্যতা নয়, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধেও বর্তায়। এখানে ব্রিটিশ বণিক ও সরকারকে একই পর্যায়ে ফেলা হয়েছে।’

অ্যাডভোকেট জেনারেল তার মতামতের উপসংহারে বলেছেন:

‘এখানে কোনোই সন্দেহ থাকে না যে এ বইয়ের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করা। এ বইয়ের সমিতি ভেঙ্গে দেবার কথা, বিপ্লবের উপযুক্ত সময় আসেনি— এসব যে আছে এগুলি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে... এই বইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদ্রেগ করার অপচেষ্টা যথেষ্টভাবে পরিষ্কার... আমি মনে করি এই বইটি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারার আওতায় পড়ে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ  ধারা অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার যোগ্য।’

১৪ ডিসেম্বর ১৯২৬ বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারির নোটের ভাষান্তর (নিবন্ধকার কৃত) উপস্থাপন করা হলো:

‘অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামত পড়ে দেখা যেতে পারে। বাংলায় বিপ্লবী বিষয়ে প্রপাগান্ডা সম্পর্কে ১৯২৫ এর মে মাসে সরকারের ইচ্ছে ঘোষিত হয় যে মামলার সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে সে বিবেচনা না করে, এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মাত্রই উক্ত মাধ্যমকে (প্রেস) বিচারের আওতায় আনতে হবে। পত্রটি পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে তখন গভর্নরের পরিষদ (গভর্নর ইন কাউন্সিল) প্রেস বলতে দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোকে বুঝিয়েছে। বইয়ের ব্যাপারে এ ধরনের কোনো ঘোষণা নেই। বর্তমান অবস্থায় এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমি ‘পথের দাবী’ নামক বইটিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারার বিধান অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে, দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করার পক্ষে নই। একটি মামলার সাফল্য নিয়ে আমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, তার মানে এই নয় যে আমি অ্যাডভোকেট জেনারেলের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি— কারণ একটি মামলায় আদালত চাইলে অভিযুক্তকে বেনিফিট অব ডাউটের সুযোগে অব্যাহতি দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ৯৯/এ ধারার অপরাধে ৯৯/বি-তে আনীত অভিযোগে তিনজন বিচারকের বেঞ্চে অভিযোগটি উত্থাপিত হবে। সেখানে লেখক কিংবা মুদ্রণকারীকে সাজা দেবার প্রশ্ন আসবে না, কেবল বিবেচনা করা হবে প্রকাশনাটিতে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান আছে কি নেই।’

পুলিশ কমিশনার, অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং চিফ সেক্রেটারি সহমত পোষণ করায় বাংলা সরকার ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি যেখানেই পাওয়া যাবে শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত ‘পথের দাবী’ গ্রন্থটিকে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দিল। ১৩ জানুয়ারি ক্যালকাটা গেজেট নিষিদ্ধকরণের আদেশটি ছাপাল।

বাংলার সংসদে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রসহ অনেকেই প্রতিবাদ করলেন। সরকারের  ভাষ্য, এতে রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান।

দুই

পথের দাবী: শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ

পথের দাবী যখন বঙ্গবাণীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে, সরকারের পক্ষে দ্রুত এর ইংরেজি অনুবাদ করে উপন্যাসে ভয়ঙ্কর কোনো বিরুদ্ধাচার আছে কিনা, সে পরীক্ষাও চলতে থাকে। ২৪ সংখ্যায় সম্পূর্ণ উপন্যাসটি ছাপা হয়।

প্রকাশক এমসি সরকার অ্যান্ড সন্সের মালিক সুধীরচন্দ্র সরকার শরৎচন্দ্রকে নগদ ১ হাজার টাকা সম্মানীও পাঠিয়ে দেন। কিন্তু পুরো পাণ্ডুলিপি পড়ার পর তিনি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেন। পরীক্ষা করে আইনজীবী বললেন, এতে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান রয়েছে। মামলা অনিবার্য।

সুধীরচন্দ্র পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু চিহ্নিত অংশ পরিবর্তনের অনুরোধ করলে শরৎচন্দ্র জানান, ‘একটি শব্দও না।’ তারপর তিনি টাকা ফিরিয়ে দেয়ার কথা বললেন।

অতঃপর রমাপ্রসাদ প্রকাশে সম্মত হলেন কিন্তু প্রেস এ ঝুঁকি নিতে রাজি হলো না। সংগোপনে ছাপার কাজ শেষ করা হলো। প্রকাশক হিসেবে বড় ধরনের ঝুঁকির মোকাবেলা করতে যাচ্ছেন জেনেও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজের নাম বসিয়ে দিলেন। শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে, উমাপ্রসাদও উপেক্ষা করার মতো নন। দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দিলে এর ঝক্কি সামলাতে সরকার হিমশিম খাবে এটা বোধগম্য। উমাপ্রসাদ বললেন, শরৎচন্দ্রের সঙ্গে জেলবাস তার জন্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে।

‘পদের দাবী’ প্রকাশিত হলো ১৯২৬ সালে। সরকার লেখক-প্রকাশকের দিকে না গিয়ে বইটি বাজেয়াপ্ত করল। ১৯২৭ সালের ১৩ জানুয়ারি, ততদিনে প্রায় তিন হাজার বই পাঠকের হাতে চলে গেছে। বিপ্লবীদের হাতে হাতে ‘পথের দাবী’। ‘পথের দাবী’ সেকালে বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে বিপ্লবের পথে নামিয়েছে।

শরৎচন্দ্র চাইলেন ‘পথের দাবী’ প্রকাশ ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে রবীন্দ্রনাথও সরকারের ওপর চাপ দিন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন। কিন্তু দুজন যে দুই শ্রেণীর মানুষ। রবীন্দ্রনাথের হিসাব ভিন্ন। তিনি জবাব দিলেন। কিন্তু সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে দুজনের সম্পর্ক বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ হাজির করা যাক:

দিলীপ কুমার রায় শরৎচন্দ্রের ‘নিষ্কৃতি’র ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং রবীন্দ্রনাথকে এর একটি ভূমিকা লিখে দিতে অনুরোধ করেন।

বিষয়টি জেনে শরৎচন্দ্র দিলীপ কুমার রায়কে লিখলেন:

‘রবীন্দ্রনাথ আমাকে ইন্ট্রোডিউস করে দিতে চাইবেন বলে ভরসা করিনে। আমার প্রতি তিনি ত প্রসন্ন নন। তাছাড়া তাঁর এত সময়ই বা কই? সাহিত্যসেবার কাজে তিনি আমার গুরুকল্প, তাঁর ঋণ আমি কোন কালে শোধ করতে পারবো না, মনে মনে তাঁকে এমনি ভক্তি শ্রদ্ধাই করি। কিন্তু ভাগ্য বাদ সাধলো, আমার প্রতি তার বিমুখতার অবধি নেই। সুতরাং এ চেষ্টা করা নিরর্থক।’

চেষ্টা নিরর্থক হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ভূমিকা লিখেছেন এবং এতে উল্লেখ করেছেন: He has achieved the best reward of a novelist: he has completely won the hearts of Bengali readers.

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একটি মানসিক সংঘাত রয়েই যায়। দিলীপ কুমার রায় এবং আরো কয়েকজন বিশিষ্ট শরত্ভক্ত নোবেল পুরস্কারের জন্য শরৎচন্দ্রের নাম প্রস্তাব করতে রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সাড়া দেননি।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাস সিনেমা হচ্ছে। চিত্রস্বত্ব দিয়ে টাকা পাচ্ছেন। প্রায় হাজার তিরিশেক টাকা ‘নষ্ট’ করে কলকাতায় বাড়ি করলেন। সে বাড়ির গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন। সেদিন তিনি আবৃত্তি করেছিলেন:

যদিও সন্ধ্যা নামিছে মন্দ মন্থরে

সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া

যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,

যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া

মহা-আশঙ্কা জাগিছে মৌন মন্তরে

দিক দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা

তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।

‘পথের দাবী’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র নিজ নিজ অবস্থান আরো স্পষ্ট করে তুললেন পরস্পরকে লেখা দুটো চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথ চাইছেন ইংরেজের সঙ্গে, শাসকের সঙ্গে সমঝোতা, শরৎচন্দ্রের দাবিই যে পথের দাবী, তিনি আরো স্পষ্ট করে তুললেন রবীন্দ্রনাথের চিঠির জবাবে। তিনি চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ‘পথের দাবী’ পড়ুন। রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন— কিন্তু এ তো তার উপন্যাস নয়।

রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখলেন ২৭ মাঘ, ১৩৩৩। শরৎ জবাব লিখলেন ২ ফাগ্লুন, ১৩৩৩। চিঠির ইতিতে একজন লিখলেন, ‘তোমাদের শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। অন্যজন লিখলেন, ‘সেবক শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’। দুটি চিঠি বাংলা সাহিত্য ও রাজনীতির দুটি স্পষ্ট ধারাকে তুলে ধরে। স্বব্যাখ্যাত চিঠি দুটো মুদ্রিত হলো:

কল্যাণীয়েষু,

তোমার ‘পথের দাবী’ পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে এটা দোষের না হতে পারে— কেননা লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই। ইংরেজরাজ ক্ষমা করবেন এই জোরের উপরেই ইংরেজরাজকে আমরা নিন্দা করব, সেটাতে পৌরুষ নেই। আমি নানা দেশ ঘুরে এলাম, আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলেম, একমাত্র ইংরেজ গভর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্টই এতটা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করবে না। নিজের জোরে নয়, পরন্তু সেই পরের সহিষ্ণুতার জোরেই যদি আমরা বিদেশী রাজত্ব সম্বন্ধে যথেচ্ছ আচরণের সাহস দেখাতে চাই তবে সেটা পৌরুষের বিড়ম্বনা মাত্র— তাতে ইংরেজরাজের প্রতিও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়, নিজের প্রতি নয়। রাজশক্তির আছে গায়ের জোর, তার বিরুদ্ধে কর্তব্যের খাতিরে যদি দাঁড়াতেই হয়, তাহলে অপরপক্ষে থাকা উচিত চারিত্রিক জোর— অর্থাৎ আঘাতের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার জোর। কিন্তু আমার সেই চারিত্রিক জোরটাই ইংরেজরাজের কাছে দাবী করি, নিজের কাছে নয়। তাতে প্রমাণ হয় যে, মুখে যাই বলি নিজের অগোচরে ইংরেজকে আমরা পূজা করি— ইংরেজকে গাল দিয়ে কোনো শাস্তি প্রত্যাশা না করার দ্বারাই সেই পূজার অনুষ্ঠান। শক্তিমানের দিক দিয়ে দেখলে তোমাকে কিছু না বলে তোমার বইকে চাপা দেওয়া প্রায় ক্ষমা। অন্য কোন প্রাচ্য বা প্রতীচ্য বিদেশী রাজার দ্বারা এটি হত না। আমরা রাজা হলে যে হতই না, সে আমাদের জমিদারের ও ভারতীয় রাজন্যের বহুবিধ ব্যবহারে প্রত্যহই দেখতে পাই। কিন্তু তাই বলে কি কলম বন্ধ করতে হবে? আমি তা বলিনে— শাস্তিকে স্বীকার করেই কলম চলবে। যে কোন দেশেই রাজশক্তিতে প্রজাশক্তিতে সত্যকার বিরোধ ঘটেছে, সেখানে এমনিই ঘটেছে— রাজবিরুদ্ধতা আরামে নিরাপদে থাকতে পারে না এই কথাটা নিঃসন্দেহে জেনেই ঘটেছে।

তুমি যদি কাগজে রাজবিরুদ্ধ কথা লিখতে, তাহলে তার প্রভাব স্বল্প ও ক্ষণস্থায়ী হত— কিন্তু তোমার মতো লেখক গল্পচ্ছলে যে কথা লিখবে তার প্রভাব নিয়ত চলতেই থাকবে। দেশে ও কালে তার ব্যাপ্তির বিরাম নেই— অপরিণত বয়সে বালক-বালিকা থেকে আরম্ভ করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত তার প্রভাবের অধীনে আসবে। এমন অবস্থায় ইংরেজরাজ যদি তোমার বই প্রচার বন্ধ করে না দিত তাহলে এই বোঝা যেত যে সাহিত্যে তোমার শক্তি ও দেশে তোমার প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে তার নিরতিশয় অবজ্ঞা ও অজ্ঞতা। শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সইবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই কারণেই সেই আঘাতের মূল্য— আঘাতের গুরুত্ব নিয়ে বিলাপ করলে সেই আঘাতের মূল্য একেবারেই মাটি করে দেওয়া হয়।&dquote;&dquote;

ইতি-২৭ মাঘ ১৩৩৩

১০ই ফেব্রুয়ারী, ১৯২৭।

তোমাদের শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শরৎচন্দ্রের জবাব

শ্রীচরণেষু,

আপনার পত্র পেলাম। বেশ তাই হোক। বইখানা আমার নিজের বলে একটুখানি দুঃখ হবারই কথা, কিন্তু সে কিছুই নয়। আপনি যা কর্তব্য এবং উচিত বিবেচনা করেছেন তার বিরুদ্ধে আমার অভিমানও নেই, অভিযোগও নেই। কিন্তু আপনার চিঠির মধ্যে অন্যান্য কথা যা আছে সে সম্বন্ধে আমার দুই-একটা প্রশ্নও আছে, বক্তব্যও আছে। কৈফিয়তের মত যদি শোনায় সে শুধু আপনাকেই দিতে পারি।

আপনি লিখেছেন ইংরেজরাজের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। ওঠবারই কথা। কিন্তু এ যদি আমি অসত্য প্রচারের মধ্যে দিয়ে করবার চেষ্টা করতাম, লেখক হিসেবে তাতে আমার লজ্জা ও অপরাধ দুইই ছিল। কিন্তু জ্ঞানতঃ তা আমি করিনি। করলে Politician-দের Propaganda হত, কিন্তু বই হত না। নানা কারণে বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না। আমি যখন লিখি এবং ছাপাই তার সমস্ত ফলাফল জেনেই করেছিলাম। সামান্য অজুহাতে ভারতের সর্বত্রই যখন বিনা বিচারে অবিচারে অথবা বিচারের ভান করে কয়েদ নির্বাসন প্রভৃতি লেগেই আছে তখন আমিই যে অব্যাহতি পাব, অর্থাৎ রাজপুরুষেরা আমাকেই ক্ষমা করে চলবেন—এ দুরাশা আমার ছিল না। আজও নেই। কিন্তু বাঙলাদেশের গ্রন্থকার হিসাবে গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি এবং তৎসত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয় তো করতেই হবে—তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি, কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়?

রাজবন্দিরা জেলের মধ্যে দুধ, ছানা, মাখন পায় না। চিঠি লিখে কাগজে কাগজে রোদন করায় আমি লজ্জা বোধ করি। কিন্তু মোটা ভাতের বদলে যদি Jail authority-রা ঘাসের ব্যবস্থা করে, তখন হয়ত তাদের লাঠির চোটে তা চিবোতে পারি, কিছু ঘাসের ড্যালা কণ্ঠ রোধ না করা পর্যন্ত অন্যায় বলে প্রতিবাদ করাও আমি কর্তব্য মনে করি।

কিন্তু বইখানা আমার একার লেখা। সুতরাং দায়িত্ব একার। যা বলা উচিত বলে মনি করি, তা বলতে পেরেছি কিনা এইটেই আসল কথা। নইলে ইংরাজ সরকারের ক্ষমাশীলতার প্রতি আমার কোন নির্ভরতা ছিল না। আমার সমস্ত সাহিত্যসেবাটাই এই ধরনের। যা উচিত মনে করেছি তাই লিখে গেছি। আমার প্রশ্ন ইংরাজ রাজশক্তির এ বই বাজেয়াপ্ত করবার Justification যদি থাকে পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে Protest করার Justification তেমনি আছে।

আমার প্রতি আপনি এই অবিচার করেছেন যে আমি যেন শাস্তি এড়াবার ভয়েই প্রতিবাদের ঝড় তুলতে চেয়েছি এবং সেই ফাঁদে নিজে গা ঢাকা দেবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। দেশের লোকে যদি প্রতিবাদ না করে আমাকে করতেই হবে। কিন্তু সে হৈচৈ করে নয়, আর একখানা গ্রন্থ লিখে।

আপনি যদি শুধু আমাকে এইটুকু আদেশ দিতেন যে, এ বই প্রচারে দেশের সত্যকার মঙ্গল নেই, সেই আমার সান্ত্বনা হোতো। মানুষের ভুল হয়, আমারও হয়েছে মনে করতাম।

আমি কোনরূপ বিরুদ্ধ ভাব নিয়ে এ চিঠি আপনাকে লিখিনি, যা মনে এসেছে তাই অকপটে আপনাকে জানালাম। মনের মধ্যে যদি কোন ময়লা আমার থাকত আমি চুপ করেই যেতাম। আমি সত্যকার রাস্তাই খুঁজে বেড়াচ্ছি, তাই সমস্ত ছেড়ে-ছুড়ে নির্বাসনে বসে আছি। অর্থে সামর্থ্যে সময়ে কত যে গেছে সে কাউকে জানাবার নয়।

আপনার অনেক ভক্তের মাঝে আমিও একজন, সুতরাং কথায় বা আচরণে আপনাকে লেশমাত্র ব্যথা দেবার কথা আমি ভাবতেও পারিনে।

ইতি, ২রা ফাল্গুন, ১৩৩৩।

সেবক

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়