লিঙ্গবৈষম্য সময়ের অতি আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম। এ বিশেষ শব্দবন্ধটি বর্তমান সময়ের সমাজ অনুশীলনের ক্ষেত্রে বহুলভাবে চর্চিত। অক্সফোর্ড অভিধানে ‘লিঙ্গ’র ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘gender’ সম্পর্কে আমরা যে ব্যাখ্যা পাই তা হলো, ‘the fact of being male or female, especially when considered with reference to social and cultural differences, not differences in biology.’ আর তাই ‘জেন্ডার’ ও ‘সেক্স’ এক বিষয় নয়। অনেকেই এ দুয়ের ভেতরকার পার্থক্যকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নারী ও পুরুষের যে বাহ্যিক ও প্রত্যঙ্গগত পার্থক্য রয়েছে, তাকে বলা হয় যৌন পার্থক্য। আর এ যৌন পার্থক্যকে কেন্দ্র করে মূলত উভয়ের সাংস্কৃতিক বিভাজন গড়ে উঠেছে। এর ফলে নারী ও পুরুষের যে আলাদা আলাদা পরিচিতি, তা-ই হলো লিঙ্গ। তাহলে সেক্স হলো মূলত জৈবিক ব্যাপার, আর জেন্ডার হলো সাংস্কৃতিক।’ জেন্ডার ও সেক্স বিষয়ে Mackinnon-এর বক্তব্য, ‘Gender, being a man or a woman, is socially constructed, whereas sex, being male or fimale, is biologically defined.’ অন্যদিকে বৈষম্য হলো ‘পার্থক্য; প্রভেদ; অসমতা’। বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে অন্য কারো চেয়ে অথবা একই সমাজের কোনো গোষ্ঠী বা জাতিকে অন্য কোনো গোষ্ঠী কিংবা জাতি থেকে কম মূল্যায়ন করা অথবা কম সুযোগ-সুবিধা প্রদানের যে অনুশীলন, তাকেই আমরা ‘বৈষম্য’ বলতে পারি। এরই মধ্যে এটি উল্লিখিত যে, এ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো লিঙ্গবৈষম্য। নারী ও পুরুষকে অসম জ্ঞান করে তাদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যে দ্বিবিধ পারিবারিক আচার-আচরণ, তা-ই লিঙ্গবৈষম্য।

কী প্রাচ্য কী প্রতীচ্য, সর্বত্রই নারীরা আজ লিঙ্গবৈষম্যের শিকার। তবে উন্নত বিশ্বে নারী অধিকার আন্দোলন বেগবান থাকায় সেখানে তাদের অধিকার এখন সবক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই স্বীকৃত। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষ করে এর অনগ্রসর উত্তর জনপদে এমনটি আশা করা এখনো সুদূরপরাহত। কেননা, সুবিধাবঞ্চিত এ অঞ্চলের জনজীবনে লিঙ্গবৈষম্য আজো এক অতিসাধারণ ঘটনা। লিঙ্গবৈষম্যের ছবি তাই প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে এ জনপদের জনপ্রিয় লোকসংগীতগুলোতে। গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখই যেহেতু লোকসংগীতের উপজীব্য, এ অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, বিয়ের গীত ও পালাগানগুলোও তাই বৈষম্যের শিকার অবহেলিত অপাঙেক্তয় নারীদের দুঃখকথায় পূর্ণ। শ্বশুরালয়ে গৃহবধূর বন্দিদশার দৃশ্যায়নও সেখানে রয়েছে।

লোকসংগীতে সাধারণত গ্রামীণ জীবন ও বাস্তবতা সুরে সুরে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। ভাওয়াইয়া, মেয়েলি গীত, বিয়ের গীত, পালাগান, যোগীর (স্থানীয়ভাবে ‘যুগী’ বলা হয়) গান ইত্যাদি হলো উত্তরাঞ্চলের লোকসংগীতের কতিপয় শাখা, যেখানে আমরা পুরো জনজীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাই। আর উল্লেখ করার মতো যে বিষয়টি তা হলো, এ গান বা গীতগুলোর অধিকাংশেরই কথক হলো নারী; অর্থাৎ একজন নারী তার জীবনের কথা গানের ভাষায় বলে যায়। তবে নারীজীবনের আখ্যানসংবলিত এসব গান পুরুষ শিল্পীরাও গেয়ে থাকেন। যা হোক, নারীজীবনের দুঃখ, কষ্ট, ভোগান্তি, স্বামীগৃহে তাদের বন্দিদশা, তাদের জীবনের চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির সুনিপুণ চিত্রায়ণ ঘটেছে এ গান ও গীতগুলোয়। নিচের ভাওয়াইয়া গানটিতে এক বিবাহিত রমণীর অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে, যে কিনা তার অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে, কিন্তু তার যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে তার স্বামীর মর্জির ওপর। স্বামীকে রাজি করাতে স্ত্রীর এ মিনতিই শ্বশুরবাড়িতে তার বন্দিত্ব তথা তার দ্বিতীয় লিঙ্গগত নির্ভরশীল অবস্থানকেই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে:

পতি এ্যাকনা কতা কনু হয়,

বাপের বাড়ি নাইয়র গেনু হয়,

দিন চারিক ও মুই থাকিয়্যা আনু হয়।

ও মোর মাও জননীর হইচে জ্বর

নিন্দতে মুঁই পানু খবর —

সারা রাইতে পানি বুলি ঘ্যাংগায়

সারা রাইতে পানি বুলি নালায়।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান সর্বক্ষেত্রেই পুরুষের নিচে। পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই তার জীবনের গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো বিষয়েই যে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে না, উপরের গানটিতে আমরা সেই নির্মম বাস্তবতার খোঁজ পাই। স্ত্রী রাতে স্বপ্ন দেখেছে যে, তার মা জ্বরে আক্রান্ত। স্বপ্নে সে এও দেখেছে, তার মা পানির জন্য ছটফট করছে, অথচ তাকে এক গ্লাস পানি দেয়ার মতো কেউ সেখানে নেই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এদের অনেকের কাছেই স্বপ্নের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের বেশির ভাগেরই ধারণা, স্বপ্নের অনেক কিছুই বাস্তবে সত্য হয়ে দেখা দিতে পারে। আর তাই আমরা উপরের গানের কথককে অস্থির হয়ে যেতে দেখি স্বপ্নে তার মাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখার পর। অতঃপর মায়ের অসুখের আশঙ্কায় কাতর মেয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করছে। অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও যখন একজন নারীকে তার স্বামীর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়, তখন সেই সমাজে বসবাসকারী মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় ঠিক কতটুকু ব্যক্তিস্বাধীনতা উপভোগ করছে, তা সহজেই অনুমেয়। গানটির শেষ অংশে দেখা যায়, মাকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি আদায়ের জন্য স্বামীর কাছে সে নানাভাবে অনুনয় করছে। অবশ্য এ পর্যায়ে তার প্রত্যাশা, স্বামীও যেন তার সঙ্গী হয়:

                     মায়ের আপনজন আর কেউই নাই&dquote;&dquote;

                     আপন বলতে বেটি জামাই।

                     চলো পতি দোনো জনে যাই,

                     আইসো পতি দোনো জনে যাই।

স্বামীকে সে বোঝানোর চেষ্টা করছে, মেয়ে ও জামাই ছাড়া বর্তমানে তার মায়ের আর কেউ নেই। তাই সে মনে করছে, এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব অসুস্থ মায়ের কাছে গিয়ে তাকে কয়েক দিনের জন্য সেবা দিয়ে আসা। কিন্তু তার স্বামী যখন এতে ইতিবাচক কোনো সাড়া দিচ্ছে না, তখন নিরুপায় হয়ে সে বলছে:

                     ছাড়িয়্যা দিলে পতি

                     দ্যাখিয়্যা আনু হয়।

অর্থাৎ স্বামী সঙ্গে না গেলেও অন্তত তাকে যেন একা যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়— এটাই তার প্রত্যাশা। কিন্তু তার এ অসহায় আকুতি পাষাণ স্বামীর মনকে আদৌ সিক্ত করতে পারবে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু স্বামী যদি সুবিবেচক হতো এবং স্বামী-স্ত্রীর সমঅধিকারে তার শ্রদ্ধা থাকত, তাহলে পরিবারটিতে উভয়ের পারস্পরিক সহাবস্থান বৈষম্যহীন ও মর্যাদার হতো। আর সত্যি সত্যিই এমনটি হলে অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার জন্য স্ত্রীকে তার স্বামীর ইচ্ছার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো না। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজে এ সবকিছুই কেবল অবাস্তব সম্ভাবনা আর অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। আসলে এখানে সব আয়োজনই পুরুষের জন্য। আর নারীদের জন্য যা হওয়া উচিত, সবসময়ই তার উল্টোটা ঘটে।

শ্বশুরালয় তো নারীর জন্য বন্দিখানাসদৃশ। সেখানে শাসন-অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ নারীর প্রাণ হয়ে ওঠে প্রায় ওষ্ঠাগত। ক্লান্তিকর নিরানন্দ জীবনে অনেকেই ক্ষণিকের জন্য হলেও মুক্তির স্বাদ পেতে চায়। আর তাই তো গৃহবধূরা তাদের বাবার বাড়িতে নাইয়র (বেড়াতে) যাওয়ার সুযোগ লাভের আশায় অপেক্ষার প্রহর গোনে। তারা অপেক্ষায় থাকে, কখন বাবার বাড়ি থেকে কেউ একজন এসে তাদের সেখানে বেড়াতে নিয়ে যাবে। যদি কেউই না আসে, তখন তারা রাস্তার পানে চেয়ে থাকে এটা দেখতে যে, বাবার বাড়ির আশপাশের কেউ ওই পথ দিয়ে চলাচল করে কিনা। তেমন কাউকে পেলে তারা নিজেদের আবেগকে সংবরণ করতে পারে না। নিচের ভাওয়াইয়া গানটিতে এমনই এক চিত্র ফুটে উঠেছে:

                     বাড়িরও বগল দিয়্যা

                     কারবা গাড়ি যায় ছই বান্দিয়্যা

                     পরানটা মোর আউলারে আউলি করে।

                     ওকি ও গাড়িয়াল পাও ধরোঁ

                     এ্যাকনা কতা পুচ্ করো —

                     ক্যামন আছে মোর দয়ার বাপ ও মাও?

এ লোকসংগীতটির কথক ও আগে আলোচিত ভাওয়াইয়া গানটির কথকের সমস্যা প্রায় অভিন্ন। এ গানের কথক তার স্বামীর বাড়ির চার দেয়ালের বন্দিজীবনে হাঁপিয়ে উঠেছে। এদিকে আবার তার বাবার বাড়ি থেকেও কেউ তাকে নাইয়র নিতে আসে না। দীর্ঘদিন পিতা-মাতার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। আর তাই তারা কেমন আছে, তাও সে জানে না। সে প্রায়ই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া সদর রাস্তায় চলে আসে এটা দেখতে যে, তার বাবার এলাকার কোনো গাড়িয়াল ওই পথ দিয়ে যায় কিনা। এমন কাউকে পেলে সে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে যে, পিতা-মাতার খবর নেয়ার জন্য গাড়িয়ালের পা ধরতেও সে দ্বিধা করে না।

এরই মধ্যে এটি উল্লিখিত যে, শ্বশুরবাড়িতে মেয়েরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করতে পারে না। সেখানে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো তাদের দ্বারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিচের গানের কথকও তার শ্বশুরবাড়ির আবদ্ধ পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলিত। সবার মন জুগিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টার পরও লাঞ্ছনা-গঞ্জনাই তার নিত্যদিনকার পুরস্কার। স্বামীর বাড়ির এতসব সামাল দিতে দিতেই সে এখন প্রায় নিঃশেষিত। তাই সে ভাবছে, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। শারীরিক ও মানসিক পীড়ন থেকে মুক্তি পেতে সে তার বাবার বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে:

                     বাপ ও ভাইয়ের বাড়ি যাব

                     বারা বানিয়্যা খাব

                     তবু না যাব পানিয়্যা মরার বাড়ি।

উপরের গানের কথক এ প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে, সে যদি একবার তার বাবার বাড়িতে যেতে পারে, তাহলে সে আর কখনই স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসবে না। সে আরো বলছে যে, পিতার বাড়িতে যদি তার কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় এবং অন্নের সংস্থান যদি সেখানে নাও হয়, তবুও সে স্বামীর বাড়িতে ফিরবে না। সেক্ষেত্রে সে ঢেঁকিতে অন্যের ধান ভেনে (ভানা) জীবিকা নির্বাহ করবে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো গৃহবধূ যদি তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে সে আর শ্বশুরবাড়ির বন্দিজীবনে ফিরতে চায় না। নিচের ভাওয়াইয়া গানটিতে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাই:

                     নানি, মুই বলে যাইম ‘পরার বাড়ি’,&dquote;&dquote;

                     ওই যে দ্যাখ আইচে গাড়ি,

                     বুক খানোতে মোর ধড়ফড়ানি ওঠে।

রংপুর অঞ্চলের উপভাষায় ব্যবহূত শব্দ ‘পরার’-এর অর্থ ‘নিজের নয়, অন্যের’। উপরের গানের কথকের কাছে শ্বশুরবাড়ি হলো ‘পরার বাড়ি’, অর্থাৎ তা তার নিজের নয়, অন্যের বাড়ি। যে বাড়ির সদস্যরা সবসময় তার ত্রুটি খুঁজতে ব্যস্ত, যেখানে ‘পান থেকে চুন খসলেই’ দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মানসিক বা শারীরিকভাবে নিপীড়ন করা হয়, যেখানে তার চিন্তা-চেতনার কোনোই মূল্য নেই, যেখানে তার মত প্রকাশের বা সিদ্ধান্ত প্রদানের কোনো অধিকার নেই, সর্বোপরি যেখানে তাকে একজন বন্দির মতো জীবন যাপন করতে হয়, সেই বাড়িকে কীভাবে সে আপন জ্ঞান করবে, আর কীভাবেই বা তা তার নিজের হবে? তাই তো উপরের গানের কথককে দেখি স্বামীর বাড়িকে সে অন্যের আবাস হিসেবে গণ্য করছে এবং বাবার বাড়ির নাইয়র শেষ করে সেখানকার আবদ্ধ জীবনে ফিরতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। আর এ কারণেই স্বামীর বাড়ি থেকে তাকে নেয়ার জন্য পাঠানো গাড়ি দেখে সে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। বাবার বাড়িতে কয়েকদিন আয়েশি জীবন কাটানোর পর পুনরায় শ্বশুরবাড়ির বন্দিজীবনে প্রবেশ করতে হবে ভেবে সে ভীষণভাবে আঁতকে উঠছে। স্বামীর বাড়ির বন্দি খাঁচায় সে আর প্রবেশ করতে চায় না, কারণ:

                     শ্বশুরবাড়ি দিদি বাঘের ঘর

                     মোক না মোনায় যাবার দিদিলো।

উপরের গানের কথক শ্বশুরবাড়িকে বাঘের ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছে, যেখানে তার অবস্থা যেন অনেকটাই হরিণের মতো। শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূরা যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, সে বিষয়টিকে বিবেচনায় আনলে এটা সহজেই অনুমিত হয়, উপরের গানের কথক কেন তার শ্বশুরবাড়িকে বাঘের ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছে। শ্বশুরবাড়িকে পাখির খাঁচার সঙ্গে তুলনারও নজির লোকসংগীতে বিদ্যমান। নওগাঁ অঞ্চলের এ মেয়েলি গীতে তেমনই এক উদাহরণ আমরা খুঁজে পাই:

আইস আইস আইসরে নাসিমা

আমার খাঁচার মইধ্যে কি নারে।

তোমার খাঁচার মইধ্যে রে গেলে

আব্বা হারা হব কি নারে।

তোমার খাঁচার মইধ্যে গেলে

আম্মা হারা হব কি নারে।

আলাপচারিতামূলক এ লোকসংগীতটিতে প্রেমিক প্রেমিকাকে তার খাঁচায় প্রবেশের আহ্বান জানাচ্ছে। অর্থাৎ সে তাকে বিয়ে করে তার বাড়িতে তুলতে চায়। স্বামীগৃহ বা শ্বশুরবাড়ি যে গৃহবধূর জন্য বন্দি খাঁচাসদৃশ, সে বিষয়টির দিকেই এখানে সরাসরি ইঙ্গিত করা হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির চৌহদ্দি যেহেতু তারা পেরোতে পারে না, তাদের মাঝে স্বামীগৃহেই কারারুদ্ধ বা খাঁচাবন্দি থাকার অনুভূতি কাজ করে। সঙ্গত কারণেই শ্বশুরবাড়িতে বসবাসের সময়টাকে কোনো কোনো বিবাহিত রমণী বনবাসে থাকার শামিল জ্ঞান করেছে। নিচের লোকসংগীতটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ:

                     ভাবি গো,

                     বনবাস থাকি হামাক

                     নাইয়র নিয়া যাও।

                     মাস শেষে বছর আসে

                     দ্যাখং না বাপের গাঁও।

নিচের গানের কথকের কাছেও শ্বশুরবাড়ি যে একটা গৃহকারাগার, সেখানে যে তাকে নিদারুণ মনঃকষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়, গানটির বিশ্লেষণে আমরা তার প্রমাণ পাই। স্বামীগৃহে অবরুদ্ধ থাকার ভাবনাটি অনেকের মাথায় এমনভাবে জেঁকে বসে যে, তাদের কেউ কেউ মানসিক সুস্থতা হারানোর পর্যায়ে চলে যায়। এ গানের কথকের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারটি অনেকখানিই সত্য:

ওকি কাগারে কন কাগা মোক

মাও বা কেমন আছে কাগারে।

যখন মাও মোর আন্দনরে আন্দে

নাগান কাগা মোর মাওয়ের আগেরে।

উপরের গানের কথক স্বামীগৃহের বৈরী পরিবেশে মানসিকভাবে অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। স্বামীর বাড়ির কেউ তার আপনজন নয়, কোনো কিছুই তার অনুকূলে নয়। দুঃখ-কষ্টের কথা কারো কাছে বলে যে সে নিজেকে একটু হালকা করবে, তেমন কাউকেই সে খুঁজে পায় না। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে কাকই (পাখি) তার কাছে নিকটজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাকের কাছেই সে বরং তার মনের কথা খুলে বলছে। তার মা এখন কেমন আছে, তা যেমন সে জানতে চাইছে, তেমনি নিজের কষ্টের কথাও তার মাকে জানাতে বলছে। কাককে সে বলছে, তার মা যখন রান্না করতে বসবে, ঠিক তখনই যেন সে তার মাকে গিয়ে তার কষ্টের কথাগুলো বর্ণনা করে। একটা মেয়ে কতটা অসহায় আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লে কাকের মতো একটা পাখির সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে কথা বলতে পারে, তা ভেবে দেখার জন্য পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এটা এরই মধ্যে উল্লিখিত যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েরা স্বামীগৃহের চার দেয়ালে বাঁধা পড়ে যায়। অনেক অনেক নিপীড়ন-নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেও তাদের সেখানেই থাকতে হয়। নিচের যোগীর গানটিতে এমনই এক চিত্র ফুটে উঠেছে:

ও মোক মারিলু

ভালোয় রে করলু,

ছাওয়াক মারলু খাইতে,

আটো করিয়্যা পাড়িয়্যা বিছ্ন্যা

ধরাইম পাওঁ তোর আইতে।

মোক মারলু ক্যানে?

ওকি ও মোর শ্যাংনা,

মোক মারলু ক্যানে?

উপরের গানের কথকের স্বামী শুধু তাকেই প্রহার করেনি, খাওয়ার সময় সে তার সন্তানকেও প্রহার করেছে। এতে কথক একা একাই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। রাগের স্বরে সে স্বগতোক্তি করছে যে, রাতে যখন স্বামী তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করবে, সে তখন তাকে বঞ্চিত করবে। স্বামীকে মোকাবেলা করার উপায় হিসেবে প্রহূত কথক যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে, তাতে তার অসহায়ত্বই বরং ফুটে উঠেছে। নিত্যদিনকার নির্যাতনের কবল থেকে মুক্তি পেতে স্বামীকে ত্যাগ করে সে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারত। কিন্তু অশিক্ষিত ও পেশাহীন হওয়ায় কথকের ক্ষেত্রে পরাধীন জীবনের কোনোই বিকল্প নেই। এ রকম অবস্থায় অভিমান করে কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়িতে যাওয়ার ঝুঁকিও সে নিতে পারে না। কারণ তাতে তার স্বামী ক্রুদ্ধ হতে পারে এবং তাকে ফিরিয়ে না এনে পরিত্যাগ করতে পারে। তাছাড়া স্বামীর ঘর চিরদিনের জন্য ছেড়ে পিতা-মাতার গৃহে আসারও কোনো উপায় নেই। কেননা, এ অঞ্চলের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেখানে যেমন তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বোঝা হিসেবে ভাবা হবে, তেমনি ভ্রাতৃবধূ বা বধূদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বও অনিবার্য হয়ে পড়বে।

উপরের আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায়, শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূরা যেহেতু খুবই নিয়ন্ত্রিত ও সংযমী জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, এখানেই তারা কারাগারে থাকার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা লাভ করে। অন্যদিকে বিবাহিত পুরুষেরা সর্বক্ষেত্রেই মুক্ত ও স্বাধীন। বিয়ের পরও পুরুষেরা যেহেতু পিতা-মাতার সঙ্গে বা তাদের বাসস্থানের পাশেই বসবাস করে, তাই আবাস বদলের কারণে স্ত্রীদের মাঝে বিদ্যমান পিতৃগৃহকাতরতা স্বাভাবিকভাবেই তাদের (পুরুষ) মাঝে থাকে না। আর এতে তাদের ভাবনাহীন ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করতে দেখা যায়। কেবল শিক্ষা ও কর্মসংস্থানই একজন বিবাহিত নারীকে তার গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। শিক্ষিত হয়ে কর্মজীবী শ্রেণীভুক্ত হওয়া তাই তার জন্য অতীব জরুরি। আত্মনির্ভরশীলতা তাকে পরিবার ও সমাজের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস জোগাবে।