দ্বারাবতী নগরে ছিল এক গোপ। তার স্ত্রী গোপী ছিল দুশ্চরিত্রা। গ্রামের মোড়ল ও তার পুত্র উভয়ের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— আগুন যেমন অনেক কাঠেও তৃপ্ত হয় না, সমুদ্র যেমন অনেক নদীতেও তৃপ্ত হয় না, সমস্ত প্রাণীকে গ্রাস করেও যেমন যম তৃপ্ত হয় না, তেমনি দুষ্টা স্ত্রীলোক অনেক পুরুষেও তৃপ্ত হয় না। এ ধরনের স্ত্রীলোক দান, মান, সরলতা, সেবা, শস্ত্র, শাস্ত্র— কোনো কিছুতেই তুষ্ট হয় না। তারা গুণবান, কীর্তিমান, সুন্দর, কামপটু, ধনবান ও যুবক পতিকে ছেড়ে নির্গুণ ও চরিত্রহীন অন্য পুরুষকে আশ্রয় করে। বিচিত্র শয্যায় শোয়ালেও তারা তেমন আনন্দ পায় না, যেমন পায় পরপুরুষের সঙ্গে গাছতলায় শুয়ে।

একদিন গোপ গেছে গরু চরাতে। এ সুযোগে মোড়লের পুত্র এসে গোপীর সঙ্গে রতিক্রীড়ায় লিপ্ত হয়েছে। এমন সময় মোড়লও এসে উপস্থিত। তার আগমন টের পেয়ে গোপী মোড়লপুত্রকে ধানের গোলায় লুকিয়ে মোড়লের সঙ্গে রতিক্রীড়ায় লিপ্ত হয়। কার্য সম্পন্ন হলে গোপী মোড়লকে বলে লাঠিহাতে রাগ দেখাতে দেখাতে চলে যেতে। মোড়ল সেভাবেই চলে গেল। এমন সময় গোপ বাড়িতে ঢুকছিল। মোড়লকে ওইভাবে চলে যেতে দেখে স্ত্রীকে তার কারণ জিজ্ঞেস করল। গোপী বলল, মোড়ল কোনো কারণে তার ছেলের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছে। তাকে খুঁজতেই এদিকে এসেছিল। তাই আমি তার ছেলেকে ওই ধানের গোলায় লুকিয়ে রেখে বাঁচিয়েছি। মোড়ল তাকে না পেয়ে রেগেমেগে চলে গেল।

এই বলে গোপী মোড়লের পুত্রকে ধানের গোলা থেকে বের করে আনল।

দমনক বলল: তাই আমি বলছিলাম, কার্যকালে যার বুদ্ধি নষ্ট হয় না, সে বিপদ থেকে উদ্ধার পায়।

করটক: তা তো বুঝলাম। কিন্তু পিঙ্গলক আর সঞ্জীবকের মধ্যে যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, তা তুমি নষ্ট করবে কীভাবে?

দমনক মাথা চুলকে বলল, কৌশল একটা বের করতে হবে। দেখো, কৌশলে যা হয়, তা শক্তি দিয়ে হয় না। তাই তো কৌশলের আশ্রয় নিয়েই কাক বিষধর সাপকে মেরেছিল।

করটক: সেটা কী রকম?

দমনক: শোনো বলছি...

 

কাক ও সর্প

কোনো এক গাছে এক কাক দম্পতী বাস করত। সেই গাছের কোটরে থাকত এক বিষধর সাপ। কাকের যখন বাচ্চা হতো, তখন সে বাচ্চাগুলো খেয়ে ফেলত। এরূপ একাধিকবার ঘটেছে। এবার যখন কাকী গর্ভবতী হয়েছে, তখন সে কাককে বলল অন্য কোথাও চলে যেতে।

কাক বলল, কেন?

কাকী বলল, কারণ এ গাছের কোটরে থাকা সাপটা প্রতিবার আমাদের বাচ্চাগুলো খেয়ে ফেলে। তাই এখানে আর আমাদের থাকা উচিত নয়। শাস্ত্রেও তো বলা হয়েছে, দুশ্চরিত্রা স্ত্রী, ধূর্ত মিত্র, বিশ্বাসঘাতক ভৃত্য আর সাপ আছে, এমন ঘরে বসবাস মৃত্যুর সমান।

কাক কাকীকে আশ্বস্ত করে বলল, প্রিয়ে, ভয় পেও না। ওই দুষ্টের অনেক অপরাধ সহ্য করেছি। আর নয়।

কাকী হতাশার সঙ্গে বলল, এত বড় শত্রুর সঙ্গে তুমি লড়বে কী করে?

কাক তাকে নির্ভয় দিয়ে বলল, তুমি আশঙ্কা করো না। বিদ্বানেরা বলেন, বুদ্ধি যার বল তার, নির্বুদ্ধির কোথায় বল? এ বুদ্ধির বলেই তো সামান্য খরগোশ ওই বিশালাকার সিংহকে হত্যা করেছিল।

কাকী বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, সে কীভাবে সম্ভব হলো?

কাক: বলছি শোনো...

 

খরগোশ ও সিংহ

মন্দর পর্বতে দুর্দান্ত নামে এক সিংহ বাস করত। সে ইচ্ছেমতো পশু হত্যা করত। পাঁচটা মারত, দুইটা খেত। বাকিটা ফেলে দিত। তাই একদিন সব পশু মিলে তাকে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, মহারাজ! আপনি যেভাবে আমাদের হত্যা করছেন, তাতে যে আমাদের বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আপনারও খাদ্যাভাব দেখা দেবে। তার চেয়ে আমরা যদি প্রতিদিন আপনার আহারের জন্য একটি করে পশু পাঠাই, তাহলে আমাদেরও বংশ রক্ষা পাবে আর আপনাকেও পরিশ্রম করতে হবে না।

দুর্দান্ত চিন্তা করল, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এখন না হয় গায়ে জোর আছে। ধরে-মেরে খাচ্ছি। কিন্তু বয়স হলে যখন গায়ের জোর কমে যাবে, তখন কী হবে? অতএব ওদের প্রস্তাবে রাজি হওয়াই ভালো। কিন্তু তার এ দুর্বলতা গোপন রেখে সে গম্ভীর গলায় বলল, বেশ, তাই হবে। কিন্তু এর অন্যথা হলে সবক’টাকে শেষ করে দেব।

পশুরা ‘তথাস্তু’ বলে চলে গেল এবং প্রতিদিন একটি করে পশু তার কাছে পাঠাতে লাগল। একদিন এক বৃদ্ধ খরগোশের পালা এল। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিও পেকেছে। সে ভাবল, জীবনের আশা থাকলে ভয়ের যে কারণ, তার কাছে কাকুতি-মিনতি করা যায়। কিন্তু যেখানে বাঁচার কোনো আশা নেই, সেখানে কাকুতি-মিনতি করে কোনো লাভ নেই। তাই ওই সিংহকে আমার ভয় কিসের? আমি আমার ইচ্ছেমতো তার কাছে যাব।

এই ভেবে খরগোশ দুপুরবেলা যাত্রা করল। ধীরে ধীরে যাচ্ছে। যেতে যেতে পথে একটা গভীর পাতকুয়া দেখতে পেল। কুয়ার মধ্যে তাকাতেই জলের ওপর নিজের ছায়া দেখতে পেল। অমনি তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে ওখান থেকে আবার যাত্রা করল এবং বিকালবেলা গিয়ে সিংহের কাছে পৌঁছল। ক্ষুধার্ত সিংহ তাকে দেখে দাঁত কটমট করতে লাগল। সে গর্জন করে বলল, হারামজাদা! সারাদিন পর এই বিকালবেলা এসে হাজির হয়েছিস! তাও তুই একা। তোতে আমার পেটের কতটুকু ভরবে!

খরগোশ হাত জোড় করে বলল, প্রভু, আমার অপরাধ নেবেন না। আমি ছোট বলে আমার সঙ্গে আরো চারটাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পথে আপনার মতো আরেকজন আমাদের পথ আটকে বলল, ‘আমিই তোদের রাজা। তোরা আমার আহার হবি।’ এই বলে সে আমাদের আটকে দিল। আমরা অনেক অনুনয়-বিনয় করলাম। শেষে সে আমাকে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুই একা গিয়ে তাকে আমার কাছে নিয়ে আয়।’ তাই আমি একা এসেছি। এখন প্রভুর যা করার করুন।

খরগোশের কথা শুনে দুর্দান্ত প্রচণ্ড ক্ষেপে গেল। সে চিত্কার দিয়ে বলল, কোথায় সে পাঁজিটা? এক্ষুনি আমাকে সেখানে নিয়ে চল।

দুর্দান্তের কথামতো খরগোশ তাকে সেই কুয়ার কাছে নিয়ে গেল এবং কুয়ার তলার দিক নির্দেশ করে বলল, প্রভু, ওই যে ওইখানে সে লুকিয়ে আছে।

দুর্দান্ত সেদিকে তাকিয়ে কুয়ার জলে নিজের ছায়া দেখে গর্জন করে ঝাঁপ দিল এবং মারা গেল। খরগোশ আনন্দে নাচতে নাচতে ফিরে গিয়ে খবরটা সবাইকে দিল। সেদিন থেকে বনের পশুরা নিশ্চিন্তে বসবাস করতে লাগল।

কাক বলল, তাই আমি বলছিলাম, বুদ্ধি যার বল তার...।

কাকী এবার বলল, তা তো বুঝলাম। এখন আমি কী করব তাই বলো।

কাক: শোনো, সামনের ওই সরোবরে প্রতিদিন রাজপুত্র স্নান করতে আসে। স্নান করতে নামার আগে সে তার গলার হারটা খুলে সিঁড়ির ওপর রাখে। সুযোগমতো তুমি সেটি ঠোঁটে করে এনে ওই সাপের কোটরে রাখবে। তারপর দেখো কী হয়।

তারপর একদিন রাজপুত্র স্নান করতে এসেছে। বরাবরের মতো সে তার সোনার হারটি খুলে সিঁড়ির ওপর রেখে স্নান করতে নেমেছে। আর ঠিক তখনই কাকী হারটি ঠোঁটে করে নিয়ে আস্তে আস্তে উড়ে সাপের সেই কোটরে রাখল। রাজপুত্রের রক্ষীরা কাকীর পেছনে পেছনে ছুটতে ছুটতে এসে হারটি আনার সময় সাপটাকে দেখে মেরে ফেলল। সেদিন থেকে কাক দম্পতি সুখে জীবন যাপন করতে লাগল।

দমনক এবার করটকের উদ্দেশে বলল, তাই বলছিলাম, কৌশলে যা হয়, তা শক্তি দিয়ে হয় না।

করটক তার কথায় সায় দিয়ে বলল, তাই যদি হয় তাহলে তুমি যাও। তোমার যাত্রাপথ মঙ্গলময় হোক এবং তোমার সাধনা সিদ্ধিলাভ করুক।

এরপর দমনক করটকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পিঙ্গলকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তার কাছে গিয়ে তাকে প্রণাম করে করজোড়ে বলল, মহারাজ, আপনার সর্বনাশকারী ভয়ের কারণ উপস্থিত দেখে আপনার অনুমতি ছাড়াই আপনার কাছে এসেছি। কারণ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি প্রভুর বিপদ, প্রভুর অসত্পথে গমন ও কর্তব্য কর্মের সময় অতিবাহিত হচ্ছে দেখলে প্রভুকে জিজ্ঞেস না করেই তার প্রতিকার করবে। শাস্ত্রে আরো বলা হয়েছে, রাজা হলেন ভোগের পাত্র, আর মন্ত্রী কাজের পাত্র। কিন্তু মন্ত্রী যদি রাজার কাজ নষ্ট করেন, তাহলে তিনি দণ্ডনীয় হন। মন্ত্রী রাজার প্রয়োজনে প্রাণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকবেন। কিন্তু তিনি যদি প্রভুর পদ পেতে চান, তাহলে তা ক্ষমার অযোগ্য।

পিঙ্গলক সাগ্রহে বলল, তা তুমি কী বলতে চাইছ স্পষ্ট করে বলো।

দমনক: মহারাজ, মন্ত্রী সঞ্জীবক আর আগের মতো আপনার প্রতি আচরণ করছে না বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এই তো সেদিন আপনার সামনেই আপনার প্রভুশক্তি, উৎসাহশক্তি আর মন্ত্রশক্তির নিন্দা করল। আসলে সে আপনার রাজ্য চায়।

দমনকের কথা শুনে পিঙ্গলক যেন একটু ভয় পেয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ নীরব রইল। দমনক আবার বলল, মহারাজ, অন্য মন্ত্রীদের ত্যাগ করে আপনি কেবল তাকেই সব দায়িত্ব দিয়েছেন। এজন্য তার অহঙ্কার বেড়ে গেছে। তাই আপনাকে সরিয়ে সে এখন রাজা হতে চায়। দেখুন, রাজা ও মন্ত্রী উভয়ই সমান প্রবল হলে রাজলক্ষ্মী তখন উভয়ের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হন। এতে তার কষ্ট হয়। তখন তিনি একজনকে পরিত্যাগ করেন। তাছাড়া রাজা যখন অন্য সব মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে কেবল একজন মন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হন, তখন তার মনে অহঙ্কার দেখা দেয়। অহঙ্কার থেকে আলস্য দেখা দেয় এবং সে তখন রাজকার্য পালনে অবহেলা করে। ফলে সে রাজার বিরাগভাজন হয়। তখন তার মনে স্বাধীন হওয়ার লোভ জন্মায় এবং এজন্য সে রাজাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। মহারাজ, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে, যে ঐশ্বর্য চায় না? তাই তো বিদ্বানেরা বলেন, নড়বড়ে দাঁত আর দুষ্ট মন্ত্রী— এ উভয়ের একেবারে মূলোৎপাটন করা উচিত। অতএব এখন কী করণীয়, তা আপনিই স্থির করুন।

পিঙ্গলক কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, তুমি হয়তো ঠিকই বলছ। কিন্তু সঞ্জীবকের সঙ্গে আমার যে প্রীতির সম্পর্ক। যে লোক প্রিয়, সে খারাপ কাজ করলেও প্রিয়ই বটে। এ শরীর অনেক দোষে দুষ্ট হলেও কার না প্রিয় বলো?

দমনক বলল, মহারাজ, এখানেই আপনি ভুল করছেন। দেখুন, রাজনীতি শাস্ত্রে বলা হয়েছে, পুত্র হোক বা মন্ত্রী হোক কিংবা অন্য কেউ, রাজা যাকে বেশি প্রশ্রয় দেবেন, রাজলক্ষ্মী তাকেই আশ্রয় করেন। আরো বলা হয়েছে, অপ্রিয় হলেও তা যদি হিতকর হয়, তাহলে তার পরিণাম সুখকর হয়। যেখানে এ ধরনের কথা বলার ও শোনার লোক থাকে, সেখানেই সমৃদ্ধি বিরাজ করে। আপনি পুরনো ভৃত্যদের পরিত্যাগ করে অজানা একজনকে একেবারে শ্রেষ্ঠ পদে বসিয়েছেন। এটা রাজনীতিবিরুদ্ধ কাজ।

পিঙ্গলক: দেখো, আমি তাকে অভয় দিয়ে কাছে রেখেছি। তাকে লালন-পালন করেছি। তাহলে সে আমার অপকার করবে কেন?

দমনক: মহারাজ, কুকুরের লেজ যদি আপনি হাজার বছর ধরেও দড়ি দিয়ে টেনে বেঁধে রাখেন, দড়ি ছেড়ে দিলেই সে আবার বাঁকাই হয়ে যাবে। কারণ এটাই তার স্বভাব। বিষবৃক্ষের মূলে অমৃত সেচন করলে সে কি মিষ্ট ফল দেবে? তার বিষ কি অমৃত হয়ে যাবে? কখনো নয়।

দমনকের কথা শুনে পিঙ্গলক মনে মনে ভাবল, পরের মুখে নিন্দা শুনে কাউকে দণ্ড দেয়া উচিত নয়। নিজে সব জেনে তারপর যা করণীয় তা করা উচিত। শাস্ত্রেও তো বলা হয়েছে, ভাবনা-চিন্তা না করে কোনো কাজ করা উচিত নয়। পরের কথায় সাপের মুখে হাত দিলে যেমন নিজের মৃত্যুর কারণ হয়, তেমনি ভাবনাবিহীন কাজও নিজের মরণ ডেকে আনে।

এরূপ ভেবে পিঙ্গলক প্রকাশ্যে বলল, তাহলে তুমি বলছ সঞ্জীবককে ত্যাগ করব?

দমনক: না, না, মহারাজ। কখনো নয়। আগে জানুন তার অপরাধ সত্যি কিনা। যদি সত্যি হয়, তাহলে শত্রুকে কখনো হাতছাড়া করতে নেই। একেবারে নির্মূল করা উচিত।

পিঙ্গলক: তবে তাই হোক। তুমি আগে জানো, সে আমাদের বিরুদ্ধে কী ষড়যন্ত্র করছে।

দমনক: তাই হবে। তবে তার আগে তার ক্ষমতাটাও আমাদের পরীক্ষা করতে হবে। কারণ ক্ষুদ্র হলেও বুদ্ধিবলে যে কেউ বড়কে নাস্তানাবুদ করতে পারে। যেমন করেছিল ক্ষুদ্র টিট্টিভ পাখি ওই বিশাল সমুদ্রকে।

পিঙ্গলক: কী রকম?

দমনক: বলছি, শুনুন...